পাম্পে তেল নিতে গিয়ে মৃত্যু, বাঁশঝাড়ে মিলছে ডিজেল, পেট্রোল-অকটেন বোতলজাত। জ্বালানিতে রেশনিং, আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আসলে কোথায় ছিল?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:১২ পিএমআপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
পাম্পে তেল নিতে গিয়ে মৃত্যু, বাঁশঝাড়ে মিলছে ডিজেল, দীর্ঘ হচ্ছে পাম্পে অপেক্ষার লাইন
“ভাই একটু বাড়ায় দিয়েন। তেলের পাম্পে লাইন দিয়ে তেল পাই নাই, তাই পাম্পে ১২০ টাকা লিটারের তেল মিরপুর ১১-এর একটি দোকান থেকে খোলা কিনছি ১৫০ টাকা করে,” শনিবার রাতে কথাগুলো বলছিলেন রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেল চালক এমডি আনারুল।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুর আসাদ গেট সংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনের গাড়ির লাইন আসাদগেট থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান হয়ে ছুঁয়েছে বিজয় সরণি।
এই পাম্প থেকে তেল নিতে আসা জোবায়ের শিহাব জানালেন, “মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যে প্যানিক বাইয়িং শুরু করেছিল তা এখন সত্যিকারের সংকটে ফেলে দিয়েছে। সরকারের তেল রেশনিংয়ের ঘোষণার পর থেকে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে,” আলাপকে বলেন তিনি।
তার ইয়ামাহ এফজেড২৫ মডেলের ২৫০ সিসির বাইকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমি ২ লিটার তেল দিয়ে কী করব? শুধু অফিসে যাতায়াতের পেছনেই তেল শেষ হয়ে যাবে। এখন আমি অফিস বাদ দিয়ে কি দুই, আড়াই ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন তেল কিনব?”
প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে অনেকেই তেল কিনে হোম রিজার্ভ করে আবারও লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও মনে করেন তিনি।
কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তেল পাওয়া কঠিন হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তারা তেল কেনার পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল বোতলে সংরক্ষণ করছেন।
আর এতেই পাম্পে বারবার ভিড় বাড়ছে।
তবে শুধু ক্রেতারাই নন, বিক্রেতারাও রিজার্ভ করছেন; এমন সংবাদও দেখা যাচ্ছে।
এ নিয়ে শিহাব বলেন, “আগে দেখতাম খাটের নীচে সয়াবিনের খনি পাওয়া যাচ্ছে, এখন দেখছি বাঁশবাগানে মিলছে ডিজেলের খনি।”
তেল রিজার্ভের এমন তেলেসমাতি ঘটনাটি ঘটেছে নাটোরের সিংড়া উপজেলায়।
বাঁশঝাড়ের মধ্যে মাটির নিচে ১০টি পানির ট্যাংক বসিয়ে ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল লুকিয়ে রেখেছিলেন রুবেল হোসেন নামের এক জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী।
“যদিও এই ব্যবসায়ীর রিজার্ভ করার অনুমতি ছিল তবে এভাবে রিজার্ভ করাটা সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে,” আলাপকে জানিয়েছেন সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত।
দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকার পরও সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বার বার এমন ঘোষণার পরও দেশজুড়ে এমন চিত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার সরকারের তেল রেশনিংয়ের ঘোষণার পর জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আর এখানে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক বার্তার ঘাটতি দেখছেন জ্বালানি ও শক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম।
“সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে সেটা কনফিউজিং (বিভ্রান্তিকর) ছিল। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিপিসি, পেট্রোবাংলা আলাদা আলাদা কথা বলেছে এতে প্যানিক পারচেজ এমন আকার ধারণ করেছে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
ছোট-খাটো মারামারির চিত্র দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ভিডিওতে।
কখনো নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছেন বাকবিতণ্ডায় কখনোবা পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে।
এতটাই ভয়াবহ যে শনিবার ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার তাজ ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গিয়ে সেখানকার কর্মচারীদের পিটুনিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন।
মানুষ প্যানিকড হয়ে ভিড় করে তেল কিনছে যার ফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।
“বিভিন্ন জায়গায় তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে প্যানিক বাই আরও বেড়েছে। যার ফলে অনেক জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
শুক্রবার জ্বালানি ক্রয়ে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ার পর রবিবার থেকে পাম্পগুলোতেও রেশনিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যার অন্যতম কারণ চাহিদা বাড়লেও মজুত সক্ষমতা বাড়াতে না পারার ব্যর্থতা, মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২০ সালে কমপক্ষে ৬০ দিনের তেল মজুত সক্ষমতা তৈরির সিদ্ধান্ত থাকলেও বর্তমানে দেশের মজুত ক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান মজুত আসলে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং এটি কেবল স্বাভাবিক পরিচালনা পর্যায়ের মজুত।
তার ভাষ্য, “বিপিসি একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে গত এক মাস আগে থেকে। তাদের এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।”
এই সংকট একদিনের নয় বলে মনে করেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও।
“এমন অনিশ্চয়তা হওয়ারই কথা ছিল। যুদ্ধের কারণে এটা সামনে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ খাতে দেশি গ্যাস খোঁজা বা অন্যান্য সক্ষমতা বাড়াতে নজর দেওয়া হয়নি। বরং আমদানিতে বিদেশ নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারও এখানে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এদিকে জ্বালানি সংকট মাথায় রেখে জ্বালানিতে রেশনিং, আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২৬এ মার্চে দেশব্যাপী কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার তিনি বলেছেন, “জাতীয় দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে আমরা আলোকসজ্জা করে থাকি। এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং যাতে ফুয়েল ক্রাইসিস যাতে না হয় এবং কৃচ্ছতা সাধন করতে পারি সে জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার দেশব্যাপী এই দিবস উপলক্ষ্যে কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না।”
যুদ্ধ শুরুর পর বিপিসি ও তিন বিতরণ কোম্পানি ১লা মার্চ থেকে ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন এবং ডিলারদের ডিপো থেকে প্রায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
অথচ ওই সময়ে তেল বিক্রিতে সবচেয়ে সচেতন হওয়া দরকার ছিল।
জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি’র ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেন বিক্রির হিসাবে বাংলাদেশে দিনে অকটেনের চাহিদা গড়ে ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। অথচ ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম চার দিনে বাংলাদেশে গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ২ হাজার টনের বেশি।
অন্যদিকে দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ৩০০ টনের আশপাশে। তবে ১লা থেকে ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দৈনিক চাহিদা ছাড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০ টন।
আর বাংলাদেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার টনের আশপাশে হলেও এই সময়ে দৈনিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টন।
৮০ দিনের অকটেন, পেট্রোল যত ইচ্ছা
বাংলাদেশে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালাতে সাধারণত অকটেন ব্যবহৃত হয়। আবার পেট্রোল দিয়েও এসব যানবাহন চলে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, অকটেনের ৫০ শতাংশ এবং পেট্রোলের শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। তাই পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।
সরকারি তেল শোধনাগার থেকে কোনো অকটেন পাওয়া যায় না। তবে আমদানির বাইরে দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কেনে বিপিসি।
দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ও আমদানি করা ‘কনডেনসেট’ শোধন করে অকটেন ও পেট্রোলসহ জ্বালানি তেল উৎপাদন করে তারা।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কনডেনসেট আমদানি ব্যাহত হতে পারে।
বিপিসির হিসাবে দেশে যে পরিমাণ অকটেন মজুত রয়েছে এবং কেবল দেশীয় উৎস থেকেই যে পরিমাণ অকটেন পাওয়া যাবে তাতেই চলা যাবে ৫২ দিন।
এরপরও সরকার পাম্পগুলোতে সরবরাহ কমিয়েছে, বাড়াচ্ছে মজুত।
বিপিসি বলছে, দিনে গড়ে ১১’শ মেট্রিক টনের চাহিদা থাকলেও রোববার থেকে প্রতিদিন তারা ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করবে।
এমনটা করা গেলে শনিবার পর্যন্ত যে ২৩ হাজার ৫৫ টন অকটেনের যে মজুত ছিল তাতে ২৫ দিনের মতো চলা যাবে।
পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে এ মাসেই ২৫ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আরও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির উৎস খুঁজছে বিপিসি।
এই ৫০ হাজার টন যুক্ত হলে আর তখনো রেশনিং চলতে থাকলে অন্তত আরও প্রায় ৫৫ দিনের সরবরাহ থাকবে বাংলাদেশের কাছে।
অর্থাৎ সবমিলে ৮০ দিনের মজুত নিশ্চিত করা গেলে মে মাস পর্যন্ত অকটেনের সংকট হওয়ার কথা নয়।
আর পেট্রোলের ক্ষেত্রে দেশে গত অর্থবছরে যে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে তার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে।
এর মধ্যে ১৬ শতাংশ এসেছে সরকারি শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে আর বাকি ৮৪ শতাংশ এসেছে বেসরকারি শোধনাগার থেকে।
বিপিসির দেওয়া হিসাবে, শনিবার পর্যন্ত পেট্রোলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ টন।
রবিবার থেকে দিনে ১ হাজার ৭০ টন করে সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে বর্তমান মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলবে।
তবে ইআরএল থেকে প্রতিদিন ৪০০ টন করে পেট্রোল পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও আসবে নিয়মিত। এখানে কোনো সংকট নেই।
বিপিসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেছেন জুন মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে, “জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করব। শুধু চলতি মাস নয়, আগামী জুন পর্যন্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।”
তেল নিয়ে তুলকালাম, সংকট এতটা বাড়ল কেন?
পাম্পে তেল নিতে গিয়ে মৃত্যু, বাঁশঝাড়ে মিলছে ডিজেল, পেট্রোল-অকটেন বোতলজাত। জ্বালানিতে রেশনিং, আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি আসলে কোথায় ছিল?
“ভাই একটু বাড়ায় দিয়েন। তেলের পাম্পে লাইন দিয়ে তেল পাই নাই, তাই পাম্পে ১২০ টাকা লিটারের তেল মিরপুর ১১-এর একটি দোকান থেকে খোলা কিনছি ১৫০ টাকা করে,” শনিবার রাতে কথাগুলো বলছিলেন রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেল চালক এমডি আনারুল।
সরেজমিনে রবিবার সকাল সাড়ে সাতটায় দেখা গেল বিজয় সরণির সামনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট পাম্পের অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি পৌঁছে গেছে মহাখালি রেল ক্রসিং পর্যন্ত।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুর আসাদ গেট সংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনের গাড়ির লাইন আসাদগেট থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান হয়ে ছুঁয়েছে বিজয় সরণি।
এই পাম্প থেকে তেল নিতে আসা জোবায়ের শিহাব জানালেন, “মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যে প্যানিক বাইয়িং শুরু করেছিল তা এখন সত্যিকারের সংকটে ফেলে দিয়েছে। সরকারের তেল রেশনিংয়ের ঘোষণার পর থেকে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে,” আলাপকে বলেন তিনি।
তার ইয়ামাহ এফজেড২৫ মডেলের ২৫০ সিসির বাইকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমি ২ লিটার তেল দিয়ে কী করব? শুধু অফিসে যাতায়াতের পেছনেই তেল শেষ হয়ে যাবে। এখন আমি অফিস বাদ দিয়ে কি দুই, আড়াই ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন তেল কিনব?”
প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে অনেকেই তেল কিনে হোম রিজার্ভ করে আবারও লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও মনে করেন তিনি।
কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তেল পাওয়া কঠিন হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তারা তেল কেনার পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল বোতলে সংরক্ষণ করছেন।
আর এতেই পাম্পে বারবার ভিড় বাড়ছে।
তবে শুধু ক্রেতারাই নন, বিক্রেতারাও রিজার্ভ করছেন; এমন সংবাদও দেখা যাচ্ছে।
এ নিয়ে শিহাব বলেন, “আগে দেখতাম খাটের নীচে সয়াবিনের খনি পাওয়া যাচ্ছে, এখন দেখছি বাঁশবাগানে মিলছে ডিজেলের খনি।”
তেল রিজার্ভের এমন তেলেসমাতি ঘটনাটি ঘটেছে নাটোরের সিংড়া উপজেলায়।
বাঁশঝাড়ের মধ্যে মাটির নিচে ১০টি পানির ট্যাংক বসিয়ে ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল লুকিয়ে রেখেছিলেন রুবেল হোসেন নামের এক জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী।
“যদিও এই ব্যবসায়ীর রিজার্ভ করার অনুমতি ছিল তবে এভাবে রিজার্ভ করাটা সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে,” আলাপকে জানিয়েছেন সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত।
সরকারের ঘোষণার পরও বাড়ছে ভয়াবহতা
দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকার পরও সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বার বার এমন ঘোষণার পরও দেশজুড়ে এমন চিত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার সরকারের তেল রেশনিংয়ের ঘোষণার পর জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আর এখানে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক বার্তার ঘাটতি দেখছেন জ্বালানি ও শক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম।
“সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে সেটা কনফিউজিং (বিভ্রান্তিকর) ছিল। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিপিসি, পেট্রোবাংলা আলাদা আলাদা কথা বলেছে এতে প্যানিক পারচেজ এমন আকার ধারণ করেছে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
ছোট-খাটো মারামারির চিত্র দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ভিডিওতে।
কখনো নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছেন বাকবিতণ্ডায় কখনোবা পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে।
এতটাই ভয়াবহ যে শনিবার ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার তাজ ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গিয়ে সেখানকার কর্মচারীদের পিটুনিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন।
মানুষ প্যানিকড হয়ে ভিড় করে তেল কিনছে যার ফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক।
“বিভিন্ন জায়গায় তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে প্যানিক বাই আরও বেড়েছে। যার ফলে অনেক জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
অব্যবস্থাপনা ও চ্যালেঞ্জ
শুক্রবার জ্বালানি ক্রয়ে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ার পর রবিবার থেকে পাম্পগুলোতেও রেশনিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যার অন্যতম কারণ চাহিদা বাড়লেও মজুত সক্ষমতা বাড়াতে না পারার ব্যর্থতা, মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২০ সালে কমপক্ষে ৬০ দিনের তেল মজুত সক্ষমতা তৈরির সিদ্ধান্ত থাকলেও বর্তমানে দেশের মজুত ক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান মজুত আসলে আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং এটি কেবল স্বাভাবিক পরিচালনা পর্যায়ের মজুত।
তার ভাষ্য, “বিপিসি একটি অদক্ষ প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে গত এক মাস আগে থেকে। তাদের এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।”
এই সংকট একদিনের নয় বলে মনে করেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও।
“এমন অনিশ্চয়তা হওয়ারই কথা ছিল। যুদ্ধের কারণে এটা সামনে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ খাতে দেশি গ্যাস খোঁজা বা অন্যান্য সক্ষমতা বাড়াতে নজর দেওয়া হয়নি। বরং আমদানিতে বিদেশ নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারও এখানে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এদিকে জ্বালানি সংকট মাথায় রেখে জ্বালানিতে রেশনিং, আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২৬এ মার্চে দেশব্যাপী কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার তিনি বলেছেন, “জাতীয় দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে আমরা আলোকসজ্জা করে থাকি। এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবং যাতে ফুয়েল ক্রাইসিস যাতে না হয় এবং কৃচ্ছতা সাধন করতে পারি সে জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার দেশব্যাপী এই দিবস উপলক্ষ্যে কোনো আলোকসজ্জা করা হবে না।”
দ্বিগুণ জ্বালানি বিক্রি
যুদ্ধ শুরুর পর বিপিসি ও তিন বিতরণ কোম্পানি ১লা মার্চ থেকে ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন এবং ডিলারদের ডিপো থেকে প্রায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
অথচ ওই সময়ে তেল বিক্রিতে সবচেয়ে সচেতন হওয়া দরকার ছিল।
জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি’র ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেন বিক্রির হিসাবে বাংলাদেশে দিনে অকটেনের চাহিদা গড়ে ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। অথচ ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম চার দিনে বাংলাদেশে গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে ২ হাজার টনের বেশি।
অন্যদিকে দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ৩০০ টনের আশপাশে। তবে ১লা থেকে ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দৈনিক চাহিদা ছাড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০ টন।
আর বাংলাদেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার টনের আশপাশে হলেও এই সময়ে দৈনিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টন।
৮০ দিনের অকটেন, পেট্রোল যত ইচ্ছা
বাংলাদেশে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালাতে সাধারণত অকটেন ব্যবহৃত হয়। আবার পেট্রোল দিয়েও এসব যানবাহন চলে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, অকটেনের ৫০ শতাংশ এবং পেট্রোলের শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। তাই পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।
সরকারি তেল শোধনাগার থেকে কোনো অকটেন পাওয়া যায় না। তবে আমদানির বাইরে দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কেনে বিপিসি।
দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া ও আমদানি করা ‘কনডেনসেট’ শোধন করে অকটেন ও পেট্রোলসহ জ্বালানি তেল উৎপাদন করে তারা।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কনডেনসেট আমদানি ব্যাহত হতে পারে।
বিপিসির হিসাবে দেশে যে পরিমাণ অকটেন মজুত রয়েছে এবং কেবল দেশীয় উৎস থেকেই যে পরিমাণ অকটেন পাওয়া যাবে তাতেই চলা যাবে ৫২ দিন।
এরপরও সরকার পাম্পগুলোতে সরবরাহ কমিয়েছে, বাড়াচ্ছে মজুত।
বিপিসি বলছে, দিনে গড়ে ১১’শ মেট্রিক টনের চাহিদা থাকলেও রোববার থেকে প্রতিদিন তারা ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করবে।
এমনটা করা গেলে শনিবার পর্যন্ত যে ২৩ হাজার ৫৫ টন অকটেনের যে মজুত ছিল তাতে ২৫ দিনের মতো চলা যাবে।
পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে এ মাসেই ২৫ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আরও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির উৎস খুঁজছে বিপিসি।
এই ৫০ হাজার টন যুক্ত হলে আর তখনো রেশনিং চলতে থাকলে অন্তত আরও প্রায় ৫৫ দিনের সরবরাহ থাকবে বাংলাদেশের কাছে।
অর্থাৎ সবমিলে ৮০ দিনের মজুত নিশ্চিত করা গেলে মে মাস পর্যন্ত অকটেনের সংকট হওয়ার কথা নয়।
আর পেট্রোলের ক্ষেত্রে দেশে গত অর্থবছরে যে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে তার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে।
এর মধ্যে ১৬ শতাংশ এসেছে সরকারি শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে আর বাকি ৮৪ শতাংশ এসেছে বেসরকারি শোধনাগার থেকে।
বিপিসির দেওয়া হিসাবে, শনিবার পর্যন্ত পেট্রোলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ টন।
রবিবার থেকে দিনে ১ হাজার ৭০ টন করে সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে বর্তমান মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলবে।
তবে ইআরএল থেকে প্রতিদিন ৪০০ টন করে পেট্রোল পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও আসবে নিয়মিত। এখানে কোনো সংকট নেই।
বিপিসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেছেন জুন মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে, “জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করব। শুধু চলতি মাস নয়, আগামী জুন পর্যন্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।”
ডিজেলে ভাবনা কোথায়
অকটেন ও পেট্রোল নিয়ে সমস্যা না থাকলেও সংকট ঘনীভূত হতে পারে ডিজেল নিয়ে। কারণ এর বেশিরভাগটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয় বাংলাদেশকে।
এ জন্য এখানে সবচেয়ে বেশি রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
দৈনিক ১২ হাজার টনের মতো চাহিদা থাকলেও রবিবার থেকে দৈনিক ডিজেল দেওয়া হচ্ছে ৯ হাজার ২২ লিটার করে।
শনিবার পর্যন্ত হিসাবে, নতুন একটি জাহাজ আসার পর ডিজেলের বাংলাদেশে ডিজেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন। তা দিয়ে ১৮ দিন চলার কথা।
এদিকে বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, ১৩ মার্চের মধ্যে ডিজেল নিয়ে আরও পাঁচটি জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা।
ওই সব জাহাজে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল রয়েছে, যা দিয়ে আরও ১৬ দিন চলার কথা।
সব মিলে অন্তত ৩৪ দিনের ডিজেল সরবরাহও প্রায় নিশ্চিত।
এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে যে কোনো একজনকে জ্বালানি বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দিচ্ছেন আনু মুহাম্মদ।
“সবাই মিলে কথা না বলে একজন কথা বললে জনগণের জন্য বুঝতে সুবিধা হতো। অবস্থা এতটা ঘোলাটে হতো না।”