টানা ৫০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে বাড়ছে মজুরি। ফলে বেতন বাড়লেও কমছে বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত আয়। এতে ভেঙে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের হিসাব, কাটছাঁট হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেও, ছোট হয়ে আসছে জীবনযাত্রা।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৫:৫২ পিএমআপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
বেতন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু জীবনটা যেন আরও ছোট হয়ে গেছে।
জানুয়ারিতে ইনক্রিমেন্ট হয়েছে? তখন থেকেই ভাবছেন সেভিংস বাড়াবেন, কিন্তু কোনোভাবেই বাড়তি টাকার হিসাব মেলাতে পারছেন না? হয়তো ভাবছেন, সামনের মাস থেকেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হচ্ছে না।
আসলে এটা শুধু আপনার একার বাস্তবতা নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই চিত্র টানা চার বছর দুই মাস ধরে।
এই টানা ৫০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। সহজ ভাষায় এর মানে, আপনার আয় যতটা বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়েও বেশি।
এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক এর রিপোর্ট বিশ্লেষণে।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদ সেলিম। গত বছর বেতন পেতেন ১৮ হাজার টাকা। এ বছর ইনক্রিমেন্ট হয়েছে দেড় হাজার টাকা।
ভেবেছিলেন, আগের দুই হাজার টাকার সঞ্চয়ের সঙ্গে এ বছরের ইনক্রিমেন্ট মিলিয়ে সেভিংসটা সাড়ে তিন হাজারে নিয়ে যাবেন। কিন্তু নতুন বছরে পাওয়া বাড়তি আয় নিয়েও হিসাব মিলছে না।
উল্টো গত মাসে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর এক সহকর্মীর কাছ থেকে ধার নিয়ে মাসের খরচ সামলাতে হয়েছে তাকে।
“বেতন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু জীবনটা যেন আরও ছোট হয়ে গেছে,” আলাপ-কে বলছিলেন ৪২ বছর বয়সী এই চাকরিজীবী।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আগে পরিবারের সঙ্গে মাসে একদিন ঘুরতে যেতাম। এখন সেটা ভাবিও না। হিসাব মেলে না।”
বাংলাদেশের লাখো পরিবারের বাস্তবতা এখন অনেকটা এমনই।
কাগজে-কলমে আয় হয়তো কিছুটা বাড়ছে, বেতন বাড়ছে, কিন্তু বাজারের আগুন গিলে ফেলছে সেই বাড়তি টাকাও।
ফলে বাস্তবে মানুষের ‘আসল আয়’ বা ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
আয় বাড়ছে, কিন্তু কেন গরিব হচ্ছেন
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। কিন্তু পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায় মূল্যস্ফীতি।
সে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ; তখন মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
তখন থেকেই উল্টোপথে চলছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সূচক। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বেশি।
সবশেষ এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে আবারও ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে এপ্রিলে মজুরি সূচক ছিল সোয়া ৮ শতাংশ।সহজ করে বললে, আয় বাড়লেও বাস্তবে আপনি আগের চেয়ে গরিব হয়েছেন।
আর এই বাস্তবতা অব্যাহত রয়েছে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরির সম্পর্ক
বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে এভাবে বলা যায়, এপ্রিল মাসে দেশে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হলো ২০২৫ সালের এপ্রিলে চাল, ডাল, তেল, লবণ, পোশাক, বাসাভাড়া,
যাতায়াত, শিক্ষা খরচসহ জীবনযাপনের খরচ চালাতে যদি ১০০ টাকা খরচ হতো, তাহলে এ বছরের এপ্রিলে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা।
এবার দেখা যাক, এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে মানুষের আয় কতটা বাড়ল।
বিবিএস বলছে, জাতীয় মজুরি বেড়েছে বা বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এর মানে ২০২৫ সালের এপ্রিলে যদি কারও আয় ১০০ টাকা হয়, তাহলে এপ্রিল মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ১৬ পয়সা।
ফলে আয় খানিকটা বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় একই পণ্য ও সেবার জন্য বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথবা খরচের ফর্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
আয় বাড়লেও খরচ যখন তার তুলনায় বেশি বাড়ে, তখন ‘প্রকৃত’ আয় কমে যায়। বাংলাদেশে ঠিক তাই ঘটছে, যা ৫০ মাস আগে দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট এখন “ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া”।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত মজুরির ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে।
“মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো অনেক। হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকা দিয়ে আগের মতো জিনিস কেনা যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।
এই পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার বাস্তব চিত্র বলেই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহণকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষকে।
এই ধারা কবে থেকে চলছে জানেন? এক-দুই মাস নয়, এটি অব্যাহত রয়েছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, সবশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা না পারলেও অর্থনীতির এই কঠিন সমীকরণ কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছে।
কি হয়েছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে?
ওই মাসেই শুরু হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
এমনকি সেই চাপ এখনও অব্যাহত আছে বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তার ভাষায়, “২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বড় ধরনের চাপ পড়ে অর্থনীতিতে। সেই সংকট মোকাবিলায় আমরা যেভাবে এগিয়েছি, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কমেনি।”
আগের সেই চাপের ওপর মধ্যপ্রাচ্য সংকট নতুন করে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা তার।
অর্থাৎ, গত ৫০ মাসের চাপ সামনে আরও দীর্ঘ হতে পারে বলেই মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
বাজারে প্রকট হচ্ছে অর্থনীতির চাপ
শুধু ঢাকা নয়, দেশের যে কোনো বাজারে ঢুকলেই বোঝা যায় কেন মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা।
ভোজ্যতেল ও গ্যাসের দাম গত মাসে বাড়িয়েছে সরকার। এর আগে বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দামও।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন। ডিমের দাম কিছুদিন কমলেও আবার বেড়েছে। সবশেষ তা ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে। চাল, মাছ, মুরগি সবকিছুর দাম আগের চেয়ে বেশি।
এর সঙ্গে বাড়ছে বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ। নতুন করে বিদ্যুতের বিলও বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার।
ফলে মানুষ এখন প্রথমেই কাটছাঁট করছে শখের যায়গাগুলোতে এরপরই খাবারে।
আগে যেখানে সপ্তাহে দুই দিন গরুর মাংস কিনতেন রায়হান জুবায়ের, এখন তিনি সেটি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।
আগের মতো ফলও কিনতে পারছেন না। তিন সন্তানের জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ দুধ কিনতেন, সেটিও কমিয়ে আনতে হয়েছে। আর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আগের মতো বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে।
নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছে, যাতে বাজারে টাকার প্রবাহ কমে এবং চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
সরকার আমদানি শুল্কও কমিয়েছে কয়েকটি পণ্যে। কিন্তু তারপরও বাজারে বড় স্বস্তি ফেরেনি।
কিন্তু কেন? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সুদহার বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হয় না। বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি নীতির মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে দ্রুত কোনো সমাধানও দেখছেন না তারা।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, মানুষের স্বপ্নও ছোট করে দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির এই সংকট শুধু মূল্যস্ফীতির গ্রাফ বা মজুরি সূচকের হিসাব নয়; এটি এখন মানুষের জীবনযাত্রার নীরব পরিবর্তনের গল্প।
যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাভাবিক জীবন থেকে অনেক কিছু বাদ দিতে শিখছে।
কারও সন্তানের কোচিং বন্ধ হচ্ছে, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের ব্যাগ ছোট করছেন। আগে যে পরিবার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করত, এখন তারা
ভাবছে মাসটা কোনোভাবে পার করা যাবে তো?
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “মূল্যস্ফীতি কত” নয়, বরং “এই আয়ে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা যাবে তো?”
আয় বাড়লেও টানা ৫০ মাস আপনি আগের চেয়ে গরিব
টানা ৫০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে বাড়ছে মজুরি। ফলে বেতন বাড়লেও কমছে বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত আয়। এতে ভেঙে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের হিসাব, কাটছাঁট হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেও, ছোট হয়ে আসছে জীবনযাত্রা।
জানুয়ারিতে ইনক্রিমেন্ট হয়েছে? তখন থেকেই ভাবছেন সেভিংস বাড়াবেন, কিন্তু কোনোভাবেই বাড়তি টাকার হিসাব মেলাতে পারছেন না? হয়তো ভাবছেন, সামনের মাস থেকেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হচ্ছে না।
আসলে এটা শুধু আপনার একার বাস্তবতা নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই চিত্র টানা চার বছর দুই মাস ধরে।
এই টানা ৫০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। সহজ ভাষায় এর মানে, আপনার আয় যতটা বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়েও বেশি।
এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক এর রিপোর্ট বিশ্লেষণে।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদ সেলিম। গত বছর বেতন পেতেন ১৮ হাজার টাকা। এ বছর ইনক্রিমেন্ট হয়েছে দেড় হাজার টাকা।
ভেবেছিলেন, আগের দুই হাজার টাকার সঞ্চয়ের সঙ্গে এ বছরের ইনক্রিমেন্ট মিলিয়ে সেভিংসটা সাড়ে তিন হাজারে নিয়ে যাবেন। কিন্তু নতুন বছরে পাওয়া বাড়তি আয় নিয়েও হিসাব মিলছে না।
উল্টো গত মাসে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর এক সহকর্মীর কাছ থেকে ধার নিয়ে মাসের খরচ সামলাতে হয়েছে তাকে।
“বেতন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু জীবনটা যেন আরও ছোট হয়ে গেছে,” আলাপ-কে বলছিলেন ৪২ বছর বয়সী এই চাকরিজীবী।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আগে পরিবারের সঙ্গে মাসে একদিন ঘুরতে যেতাম। এখন সেটা ভাবিও না। হিসাব মেলে না।”
বাংলাদেশের লাখো পরিবারের বাস্তবতা এখন অনেকটা এমনই।
কাগজে-কলমে আয় হয়তো কিছুটা বাড়ছে, বেতন বাড়ছে, কিন্তু বাজারের আগুন গিলে ফেলছে সেই বাড়তি টাকাও।
ফলে বাস্তবে মানুষের ‘আসল আয়’ বা ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
আয় বাড়ছে, কিন্তু কেন গরিব হচ্ছেন
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। কিন্তু পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায় মূল্যস্ফীতি।
সে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ; তখন মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
তখন থেকেই উল্টোপথে চলছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সূচক। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বেশি।
সবশেষ এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে আবারও ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে এপ্রিলে মজুরি সূচক ছিল সোয়া ৮ শতাংশ।সহজ করে বললে, আয় বাড়লেও বাস্তবে আপনি আগের চেয়ে গরিব হয়েছেন।
আর এই বাস্তবতা অব্যাহত রয়েছে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরির সম্পর্ক
বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে এভাবে বলা যায়, এপ্রিল মাসে দেশে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হলো ২০২৫ সালের এপ্রিলে চাল, ডাল, তেল, লবণ, পোশাক, বাসাভাড়া,
যাতায়াত, শিক্ষা খরচসহ জীবনযাপনের খরচ চালাতে যদি ১০০ টাকা খরচ হতো, তাহলে এ বছরের এপ্রিলে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪ পয়সা।
এবার দেখা যাক, এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে মানুষের আয় কতটা বাড়ল।
বিবিএস বলছে, জাতীয় মজুরি বেড়েছে বা বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এর মানে ২০২৫ সালের এপ্রিলে যদি কারও আয় ১০০ টাকা হয়, তাহলে এপ্রিল মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১০৮ টাকা ১৬ পয়সা।
ফলে আয় খানিকটা বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় একই পণ্য ও সেবার জন্য বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথবা খরচের ফর্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
আয় বাড়লেও খরচ যখন তার তুলনায় বেশি বাড়ে, তখন ‘প্রকৃত’ আয় কমে যায়। বাংলাদেশে ঠিক তাই ঘটছে, যা ৫০ মাস আগে দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট এখন “ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া”।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত মজুরির ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে।
“মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো অনেক। হাতে টাকা থাকলেও সেই টাকা দিয়ে আগের মতো জিনিস কেনা যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।
এই পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার বাস্তব চিত্র বলেই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহণকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষকে।
২০২২ এর ফেব্রুয়ারি থেকে এই চাপ
এই ধারা কবে থেকে চলছে জানেন? এক-দুই মাস নয়, এটি অব্যাহত রয়েছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, সবশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা না পারলেও অর্থনীতির এই কঠিন সমীকরণ কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছে।
কি হয়েছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে?
ওই মাসেই শুরু হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
এমনকি সেই চাপ এখনও অব্যাহত আছে বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তার ভাষায়, “২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বড় ধরনের চাপ পড়ে অর্থনীতিতে। সেই সংকট মোকাবিলায় আমরা যেভাবে এগিয়েছি, তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কমেনি।”
আগের সেই চাপের ওপর মধ্যপ্রাচ্য সংকট নতুন করে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা তার।
অর্থাৎ, গত ৫০ মাসের চাপ সামনে আরও দীর্ঘ হতে পারে বলেই মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
বাজারে প্রকট হচ্ছে অর্থনীতির চাপ
শুধু ঢাকা নয়, দেশের যে কোনো বাজারে ঢুকলেই বোঝা যায় কেন মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা।
ভোজ্যতেল ও গ্যাসের দাম গত মাসে বাড়িয়েছে সরকার। এর আগে বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দামও।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন। ডিমের দাম কিছুদিন কমলেও আবার বেড়েছে। সবশেষ তা ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে। চাল, মাছ, মুরগি সবকিছুর দাম আগের চেয়ে বেশি।
এর সঙ্গে বাড়ছে বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ। নতুন করে বিদ্যুতের বিলও বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার।
ফলে মানুষ এখন প্রথমেই কাটছাঁট করছে শখের যায়গাগুলোতে এরপরই খাবারে।
আগে যেখানে সপ্তাহে দুই দিন গরুর মাংস কিনতেন রায়হান জুবায়ের, এখন তিনি সেটি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।
আগের মতো ফলও কিনতে পারছেন না। তিন সন্তানের জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ দুধ কিনতেন, সেটিও কমিয়ে আনতে হয়েছে। আর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আগের মতো বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন তিনি।
সুদহার বাড়িয়েও কেন মিলছে না সমাধান
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে।
নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছে, যাতে বাজারে টাকার প্রবাহ কমে এবং চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
সরকার আমদানি শুল্কও কমিয়েছে কয়েকটি পণ্যে। কিন্তু তারপরও বাজারে বড় স্বস্তি ফেরেনি।
কিন্তু কেন? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সুদহার বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হয় না। বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি নীতির মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে দ্রুত কোনো সমাধানও দেখছেন না তারা।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, মানুষের স্বপ্নও ছোট করে দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির এই সংকট শুধু মূল্যস্ফীতির গ্রাফ বা মজুরি সূচকের হিসাব নয়; এটি এখন মানুষের জীবনযাত্রার নীরব পরিবর্তনের গল্প।
যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাভাবিক জীবন থেকে অনেক কিছু বাদ দিতে শিখছে।
কারও সন্তানের কোচিং বন্ধ হচ্ছে, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের ব্যাগ ছোট করছেন। আগে যে পরিবার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করত, এখন তারা
ভাবছে মাসটা কোনোভাবে পার করা যাবে তো?
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “মূল্যস্ফীতি কত” নয়, বরং “এই আয়ে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা যাবে তো?”
বিষয়: