দুর্বল রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে অভ্যন্তরীণ ঋণ, জনগণের ওপর বাড়বে চাপ

ঋণ নিলে জনগণের জন্য সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতা কমে যায়। যে ঋণের বোঝা আবার বহন করতে হয় জনগণকেই। কারণ সরকারের বাজেট ব্যয় মেটাতে বেড়ে যায় ভ্যাট, ট্যাক্স।

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ধার-কর্জ করে চলছে নতুন সরকার। তবে বিদেশি ঋণের সংকুলান না হওয়ায় চাপ বাড়ছে দেশের ভেতরের উৎসগুলোতে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে।

ইতোমধ্যেই এই অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে সরকারের যে ঋণ লক্ষ্যমাত্রা তা পূরণ হয়ে গেছে। অথচ অর্থবছর শেষ হতে এখনও বাকি আড়াই মাস।

তার ওপর নতুন করে চাপে ফেলেছে জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় ও ভর্তুকি।

দেশ-বিদেশ যেখান থেকে ধার নেওয়া হোক, সরকারের এই ঋণের দায় জনগণের কাঁধেই ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব বিশ্লেষকরা।

কারণ দেশে-বিদেশে যেখান থেকেই ঋণ নেওয়া হোক আসল তো বটেই তার সাথে গুনতে চড়া অঙ্কের সুদ।

আর এই আসল এবং সুদ পরিশোধে যে চাপ তৈরি হবে তাতে চাপ পড়বে আসছে বাজেটে। তাতে আবারও বাড়বে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা।

অতিরিক্ত সেই টাকা উঠিয়ে আনতে ট্যাক্স, ভ্যাট বাড়ায় সরকার। যা সরাসরি জনগণের ওপর ফেলে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ।

“ঋণ নিলে জনগণের জন্য সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতা কমে যায়। কারণ ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয়। এর ফলে বাজেট থেকে টাকা চলে যায়। ওইটা শোধ করতে না হলে, তা জনগণের জন্য ব্যয় করতে পারত সরকার,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি। 

নতুন রেকর্ডের পথে রাজস্ব ঘাটতি

প্রতি বছরই বাড়ে বাজেটের আকার। বাড়ে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। গত অর্বছর শেষ হয়েছে রেকর্ড ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি নিয়ে।

তবে এই বছরের ঘাটতি সেই রেকর্ডও ছাপিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘাটতিতে বাড়ছে চাপ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সময়ে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।

আর আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২২ শতাংশ কম।

অর্থবছরের বাকি চার মাসে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে, কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় হয়নি। ফলে বছরের শেষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করা এবং প্রত্যক্ষ করভিত্তি দুর্বল থাকা রাজস্ব ঘাটতির বড় কারণ বলে মনে করেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন,

“কর প্রশাসনে ডিজিটাইজেশন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো না গেলে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া কঠিন হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ব্যাংক ঋণ

এই বিশাল ঘাটতি পূরণে বেড়েছে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ। যার চাপ পড়েছে সরকারের ব্যাংক ঋণে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই, ৩০এ মার্চ শেষে ব্যাংকঋণের পরিমাণ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।

যেখানে পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা, সেখানে মার্চের শেষেই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫১ কোটি টাকায়।

পরবর্তী সময়ে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরো ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

ব্যাংক খাত থেকে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে।

ফলে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে কমছে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ। চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য ধরলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

সবমিলে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতিও দ্রুত বাড়ছে।

জানুয়ারি পর্যন্ত মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ব্যাংকিং খাতে চাপ ও ব্যবসায়ীদের বাস্তবতা

সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ  বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং খাতে।  ব্যাংকগুলোর বড় অংশের তহবিল সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল কিনতে ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে আসে।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর। তখন ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায় একই সঙ্গে বাড়ে সুদের হার। এর ফলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়।

অর্থনীতির এই বাস্তবতা অবশ্য এখন কাজ করছে না বলে জানিয়েছেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

“সাধারণত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। তবে দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা এবং ব্যাংকের ঋণ সুদ যে অবস্থায় রয়েছে তাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নয় ব্যবসায়ীরা। তাই ব্যাংকের আসলে তেমন চাপ নেই,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

বাজারে অর্থের প্রবাহ ও সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে পণ্যমূল্যেও প্রভাব পড়ে

সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব

তবে সরকারের ঋণ সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করছে তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও প্রভাব ফেলছে বলেই মনে করেন আব্দুল মজিদ।

“সরকার ভাবে আয় বাড়বে। এই ভেবে ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, ঋণ বাড়ায়। যা অর্থনীতিতে প্রেসার তৈরি করে,” বলেছেন তিনি।

সরকার যখন বেশি ঋণ নেয়, তখন সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যায়, যা ভবিষ্যতে কর বাড়ানো বা ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে সামাল দিতে হয়।

একই সঙ্গে বাজারে অর্থের প্রবাহ ও সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে পণ্যমূল্যেও প্রভাব পড়ে যাতে মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব পড়ে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়া, কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়া এবং সেবার খরচ বৃদ্ধি এসবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি এই চাপ অনুভব করে।

বৈদেশিক ঋণও ঊর্ধ্বমুখী

একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার সমান।

জুন মাসে এই পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১১ কোটি টাকা।

বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ, দুই দিক থেকেই ঋণের চাপ বাড়তে থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির দাম সংকুলানে সরকার নতুন করে ঋণের পেছনে ছুটছে। যার ফলে দেশি-বিদেশি ঋণ আগামীতে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যা শুধু সরকারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও গভীরভাবে অনুভূত হবে।