জোরপূর্বক শ্রম: যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ঝুঁকিতে
ইউএসটিআরের তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠে এসেছে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশসহ ৬০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চূড়ান্ত হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ পিএমআপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব ইউএসটিআরের।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নতুন এক বাণিজ্যিক অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ বা ইউএসটিআর বলছে, ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ।
এ কারণে বাংলাদেশের নীতিকে ‘অযৌক্তিক’ এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউএসটিআরের প্রস্তাব, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
যেসব অর্থনীতি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই সিদ্ধান্ত শুধু শ্রম অধিকার বা মানবাধিকার ইস্যু নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
যা বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে বলেই মনে করেন তারা। কারণ নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে প্রতিযোগি দেশ গুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাব নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হলেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক পর্যায়ে ট্যারিফ চুক্তির মতোই সফলতা আনতে পারবে এবং সেটা নিয়ে শিগগিরই পরিকল্পনা করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, “তারা প্রস্তাব করেছে আমরা শুনেছি। আশা করি আগে ট্যারিফ ইস্যুতে আমরা যেভাবে সফল নেগোসিয়েশন করেছি সেটা অব্যাহত রাখতে পারব। এ জন্য দেশের স্বার্থরক্ষায় আমরা আমাদের আন্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো মিলে পরিকল্পনা করব।”
চলতি বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক পণ্য আমদানিতে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের শুল্ক দিতে হবে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর সঙ্গে নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশি পণ্যের উপর শুল্ক হবে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
কোন দেশকে কত শুল্ক দিতে হবে, সে বিষয় ইউএসটিআরের বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার না হলেও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে।
এ তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। বাকি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য।
অন্যদিকে বাকি ৪৫টি দেশের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইউএসটিআর নিজেই অবশ্য বলেছে, এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ছয়ই জুলাই পর্যন্ত মতামত নেওয়া হবে, এরপর ৭ই জুলাই ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি গণশুনানি হবে।
যেখানে ব্যবসায়ী, শিল্প প্রতিনিধি, শ্রম সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরতে পারবেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে বাংলাদেশ সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও রপ্তানিকারকদের জন্য নিজেদের অবস্থান তুলে ধরারও সুযোগ রয়েছে।
কী বলছে ইউএসটিআরের প্রতিবেদন?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান’-এর আওতায় গত মার্চে ৬০টি দেশের ওপর তদন্ত শুরু করে ইউএসটিআর।
তদন্তের মূল প্রশ্ন ছিল, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর আইন ও প্রয়োগ ব্যবস্থা চালু করেছে কি না।
তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায় ইউএসটিআর বলছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি এ ধরনের পণ্য আমদানিতে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও করেনি।
প্রতিবেদনেএ ইউএসটিআর উল্লেখ করেছে যে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে বাংলাদেশের ব্যর্থতা একটি ‘আনরিজনেবল’ বা অযৌক্তিক পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ অংশে এর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ‘বার্ডেনস অর রেসট্রিক্টস’ অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত বা সীমাবদ্ধ করছে ।
সহজ করে বললে, তদন্ত শেষে ইউএসটিআর দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধ করার জন্য যথাযথ আইন ও ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি, এবং যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলোও ঠিকভাবে কার্যকর হয়নি।
এর ফলে এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ মনে করছে এবং বলছে, এতে তাদের বাণিজ্যের ওপর চাপ পড়ছে বা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যদিও বাংলাদেশ অংশে তারা আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) আলোচনার আওতায় এ বিষয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশকে এখানে “উৎপাদক” হিসেবে নয়, বরং “বড় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক সাপ্লাই চেইন হাব” হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেখানে কাঁচামালের উৎস নিয়েই উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেদটি নিয়ে ইউএসটিআর অ্যাম্বাসেডর জ্যামিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে মার্কিন শ্রমিকদের একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশে বৈশ্বিক বাজারে লড়তে হচ্ছে।”
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।
তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল এবং অন্যান্য সব ধরনের পণ্য মিলিয়ে বার্ষিক মোট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
এ অবস্থায় ইউএসটিআরের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করতে পারে।
যদি সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত বা মধ্য আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প গত এক দশকে শ্রম নিরাপত্তা, কারখানা পরিবেশ এবং শ্রম অধিকার ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের চাপের মুখে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান তদন্ত সরাসরি বাংলাদেশের কারখানায় জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশ কি অন্য দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত কাঁচামাল বা পণ্য আমদানি ঠেকানোর জন্য কার্যকর আইন ও নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলা, সুতা এবং টেক্সটাইল কাঁচামালের উৎস শনাক্তকরণ এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের তুলা ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম এ প্রস্তাবকে ‘হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
“ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর এমন সিদ্ধান্ত আরও বিস্ময়কর। বিশেষ করে তদন্তে বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি,” বলেছেন তিনি।
জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা সরকারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আপিল করার আহ্বান জানাই, যাতে দেখানো যায় যে বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমমুক্ত দেশ।”
চুক্তির বাইরে যেসব পণ্য ও করণীয়
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কয়েকটি পণ্যকে এই শুল্কের বাইরে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে ইউএসটিআর।
এর মধ্যে রাখা হতে পারে জ্বালানি পণ্য, বিরল খনিজ, কিছু ধাতু, গরুর মাংস, কফি, কিছু ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক ও বিমান যন্ত্রাংশ।
এ ছাড়া ইউএসটিআর পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থারও প্রস্তাব করেছে, যার আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
যদিও সেই কোটা বা শুল্কহার এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সবমিলে তাই পুরো বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর বাণিজ্য কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যখন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে।
শোভন ইসলামের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে শুধু শ্রম অধিকার ইস্যু হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
“সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান-এর অধীনে নতুন এই পদক্ষেপকে সেই বৃহত্তর বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে।”
এ জন্য বাংলাদেশের জন্য শুধু নিজের দেশে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য নিষিদ্ধ করলেই হবে না; অন্য দেশ থেকেও এমন পণ্য আমদানি বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
“বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমমুক্ত দেশ। তাই যথাযথ প্রক্রিয়ায় আপিল ও আলোচনার মাধ্যমে অতিরিক্ত শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে হবে,” বলেছেন এই ব্যবসায়ী।
জোরপূর্বক শ্রম: যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় ঝুঁকিতে
ইউএসটিআরের তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠে এসেছে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশসহ ৬০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চূড়ান্ত হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নতুন এক বাণিজ্যিক অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ বা ইউএসটিআর বলছে, ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ।
এ কারণে বাংলাদেশের নীতিকে ‘অযৌক্তিক’ এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউএসটিআরের প্রস্তাব, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
যেসব অর্থনীতি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই সিদ্ধান্ত শুধু শ্রম অধিকার বা মানবাধিকার ইস্যু নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
যা বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে বলেই মনে করেন তারা। কারণ নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে প্রতিযোগি দেশ গুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাব নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হলেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক পর্যায়ে ট্যারিফ চুক্তির মতোই সফলতা আনতে পারবে এবং সেটা নিয়ে শিগগিরই পরিকল্পনা করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, “তারা প্রস্তাব করেছে আমরা শুনেছি। আশা করি আগে ট্যারিফ ইস্যুতে আমরা যেভাবে সফল নেগোসিয়েশন করেছি সেটা অব্যাহত রাখতে পারব। এ জন্য দেশের স্বার্থরক্ষায় আমরা আমাদের আন্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো মিলে পরিকল্পনা করব।”
চলতি বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক পণ্য আমদানিতে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের শুল্ক দিতে হবে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর সঙ্গে নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশি পণ্যের উপর শুল্ক হবে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
নতুন শুল্ক কার কত, কবে কার্যকর
কোন দেশকে কত শুল্ক দিতে হবে, সে বিষয় ইউএসটিআরের বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার না হলেও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে।
এ তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। বাকি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য।
অন্যদিকে বাকি ৪৫টি দেশের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইউএসটিআর নিজেই অবশ্য বলেছে, এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ছয়ই জুলাই পর্যন্ত মতামত নেওয়া হবে, এরপর ৭ই জুলাই ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি গণশুনানি হবে।
যেখানে ব্যবসায়ী, শিল্প প্রতিনিধি, শ্রম সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরতে পারবেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে বাংলাদেশ সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও রপ্তানিকারকদের জন্য নিজেদের অবস্থান তুলে ধরারও সুযোগ রয়েছে।
কী বলছে ইউএসটিআরের প্রতিবেদন?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান’-এর আওতায় গত মার্চে ৬০টি দেশের ওপর তদন্ত শুরু করে ইউএসটিআর।
তদন্তের মূল প্রশ্ন ছিল, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর আইন ও প্রয়োগ ব্যবস্থা চালু করেছে কি না।
তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায় ইউএসটিআর বলছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি এ ধরনের পণ্য আমদানিতে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও করেনি।
প্রতিবেদনেএ ইউএসটিআর উল্লেখ করেছে যে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে বাংলাদেশের ব্যর্থতা একটি ‘আনরিজনেবল’ বা অযৌক্তিক পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ অংশে এর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ‘বার্ডেনস অর রেসট্রিক্টস’ অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত বা সীমাবদ্ধ করছে ।
সহজ করে বললে, তদন্ত শেষে ইউএসটিআর দেখতে পেয়েছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধ করার জন্য যথাযথ আইন ও ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি, এবং যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলোও ঠিকভাবে কার্যকর হয়নি।
এর ফলে এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ মনে করছে এবং বলছে, এতে তাদের বাণিজ্যের ওপর চাপ পড়ছে বা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যদিও বাংলাদেশ অংশে তারা আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) আলোচনার আওতায় এ বিষয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশকে এখানে “উৎপাদক” হিসেবে নয়, বরং “বড় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক সাপ্লাই চেইন হাব” হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেখানে কাঁচামালের উৎস নিয়েই উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেদটি নিয়ে ইউএসটিআর অ্যাম্বাসেডর জ্যামিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদাররা জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে মার্কিন শ্রমিকদের একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশে বৈশ্বিক বাজারে লড়তে হচ্ছে।”
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, ঝুঁকি কোথায়
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।
তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল এবং অন্যান্য সব ধরনের পণ্য মিলিয়ে বার্ষিক মোট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
এ অবস্থায় ইউএসটিআরের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করতে পারে।
যদি সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত বা মধ্য আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প গত এক দশকে শ্রম নিরাপত্তা, কারখানা পরিবেশ এবং শ্রম অধিকার ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের চাপের মুখে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান তদন্ত সরাসরি বাংলাদেশের কারখানায় জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশ কি অন্য দেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত কাঁচামাল বা পণ্য আমদানি ঠেকানোর জন্য কার্যকর আইন ও নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলা, সুতা এবং টেক্সটাইল কাঁচামালের উৎস শনাক্তকরণ এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের তুলা ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম এ প্রস্তাবকে ‘হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
“ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর এমন সিদ্ধান্ত আরও বিস্ময়কর। বিশেষ করে তদন্তে বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি,” বলেছেন তিনি।
জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা সরকারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আপিল করার আহ্বান জানাই, যাতে দেখানো যায় যে বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমমুক্ত দেশ।”
চুক্তির বাইরে যেসব পণ্য ও করণীয়
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কয়েকটি পণ্যকে এই শুল্কের বাইরে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে ইউএসটিআর।
এর মধ্যে রাখা হতে পারে জ্বালানি পণ্য, বিরল খনিজ, কিছু ধাতু, গরুর মাংস, কফি, কিছু ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক ও বিমান যন্ত্রাংশ।
এ ছাড়া ইউএসটিআর পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থারও প্রস্তাব করেছে, যার আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
যদিও সেই কোটা বা শুল্কহার এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সবমিলে তাই পুরো বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর বাণিজ্য কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যখন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে।
শোভন ইসলামের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে শুধু শ্রম অধিকার ইস্যু হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
“সেকশন থ্রি জিরো ওয়ান-এর অধীনে নতুন এই পদক্ষেপকে সেই বৃহত্তর বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে।”
এ জন্য বাংলাদেশের জন্য শুধু নিজের দেশে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য নিষিদ্ধ করলেই হবে না; অন্য দেশ থেকেও এমন পণ্য আমদানি বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
“বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমমুক্ত দেশ। তাই যথাযথ প্রক্রিয়ায় আপিল ও আলোচনার মাধ্যমে অতিরিক্ত শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে হবে,” বলেছেন এই ব্যবসায়ী।
বিষয়: