মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনা ছিলো না। পাইলটের প্রশিক্ষণ ঘাটতি, ভবনের নিরাপত্তা ত্রুটি, অনুমোদনহীন নির্মাণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা মিলেই তৈরি হয়েছিলো এই বিপর্যয়।
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৬ পিএমআপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে সতর্কতা ছিলো, কিন্তু পদক্ষেপ ছিলো না। নিয়ম ছিলো, কিন্তু প্রয়োগ ছিলো না। তদন্ত ছিলো, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন ছিলো না। আর সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয়েছে শিশু, শিক্ষক, অভিভাবক এবং একজন পাইলটের জীবন দিয়ে।
বিমানটি যখন মাইলস্টোন স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছিলো, তখনও কেউ বুঝতে পারেনি যে, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড়ান পরিণত হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায়।
২০২৫ সালের ২১এ জুলাই দুপুর। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি সেভেন বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড্ডয়নে ছিলো। হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে উচ্চতা হারাতে শুরু করে বিমানটি।
গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে আসে একের পর এক সতর্কবার্তা। পাইলটকে 'ইজেক্ট' করার নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বিমানটি শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয় উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি প্রশিক্ষণ উড়ান পরিণত হয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। প্রাণ যায় ৩৬ জনের। তাদের ২৮ জনই শিক্ষার্থী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।
এক বছর পর তদন্তের তথ্য, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মাইলস্টোনের ট্র্যাজেডি কোনো একক ভুল বা আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল ছিলো না।
পাইলটের প্রশিক্ষণ ঘাটতি, দুর্বল তদারকি, ভবনের নকশাগত ত্রুটি, অনুমোদনহীন নির্মাণ, নগর পরিকল্পনায় অনিয়ম এবং বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিলো একটি ভয়াবহ ঝুঁকির পরিবেশ।
কয়েক সেকেন্ডেই বিভীষিকা
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আগুনের শিখা ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে ওঠে।
প্রথম বিস্ফোরণের তিন থেকে চার মিনিট পর ঘটে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। তখন আগুনের গোলা উঠে যায় আরো উপরে।
বিমানটি আছড়ে পড়ার পর মাটিতে তৈরি হয় বড় গর্ত। বিমানের একটি অংশ ঢুকে যায় হায়দার আলী ভবনের বেইসমেন্টে।
সেই সময় ভবনের ভেতরে ক্লাস চলছিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি স্কুল ভবন পরিণত হয় আগুন, ধোঁয়া ও আতঙ্কের কেন্দ্রে।
প্রশিক্ষণ ঘাটতি, পাইলটের ভুল
গেলো বছরের ১১ই অক্টোবরে জমা পড়া বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিলো। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি ছিলো। কমান্ডিং অফিসার ও গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের তদারকিও যথেষ্ট ছিলো না। তাই ওড়ার সময় নির্ধারিত প্যারামিটার বজায় রাখতে ব্যর্থ হন পাইলট।
সংকটের মুহূর্তে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাতে না পারায় বিমানটি হঠাৎ ‘স্টলিং কন্ডিশনে’ চলে যায়। অর্থাৎ, বিমানের ডানা পর্যাপ্ত উত্তোলন শক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এরপর চেষ্টা করেও বিমানটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারেননি পাইলট।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, পাখি বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু বিমানের উইন্ডশিল্ডে আঘাত করে থাকতে পারে, যা দুর্ঘটনায় পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলো।
তবে তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগে বিমানের ইঞ্জিন বা হাইড্রোলিক সিস্টেমে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির আভাস পাওয়া যায়নি।
চূড়ান্ত বাঁক নেওয়ার সময় বিমানের ‘অ্যাংগেল অব অ্যাটাক’ নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছিলো। কিন্তু সেই সংকটময় মুহূর্তে বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
কমিশনের তথ্য বলছে, পাইলটের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিলো। নির্ধারিত ফ্লাইট প্রোফাইলও পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। বরং প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে তাকে আবার ‘ইনিশিয়ালে’ ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।
আকাশে যে ভুলটি ঘটেছিলো, তার পেছনে মাটিতে তৈরি হওয়া একাধিক ব্যবস্থাগত ঘাটতির ছাপও ছিলো।
ভবনটি ছিলো মৃত্যুফাঁদ
হায়দার আলী ভবনটি ছিলো তিনতলা। অথচ ভবনটিতে ছিলো মাত্র একটি সিঁড়ি।
ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিশনকে জানিয়েছে, ভবনের আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুযায়ী সেখানে অন্তত তিনটি জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি থাকা উচিত ছিলো। অর্থাৎ আগুন লাগার পর শত শত শিক্ষার্থীর জন্য কার্যত একটি পথই খোলা ছিলো।
বিমানটি ভবনের সামনে আছড়ে পড়ার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া, আতঙ্ক আর বিস্ফোরণের মধ্যে সেই একমাত্র সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থী ও অন্যরা।
অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনে পর্যাপ্ত বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব ছিলো।
কিন্তু ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিলো আরও বিস্তৃত।
তদন্ত কমিশনের কাছে ভবনটির নির্মাণ অনুমোদনের কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিলো, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সেই দাবির পক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের মোট ১৭টি ভবনের মধ্যে অনুমোদন ছিলো মাত্র সাতটির। অর্থাৎ, বাকি ভবনগুলো নির্মাণ বা ব্যবহার করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই।
একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিলো। কিন্তু যে ভবনের সামনে সেটি আছড়ে পড়েছিলো, সেই ভবনটি আগুন বা অন্য কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছিলো।
৬৩০ ভবনের উচ্চতা নিয়ে অনিয়ম, ব্যবস্থা সীমিত
মাইলস্টোনের ঘটনাটি শুধু একটি স্কুল ভবনের সমস্যা নয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও বড় একটি চিত্র।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) পরিবর্তনের মাধ্যমে জলাভূমি ও সংরক্ষিত এলাকাকে বসতি ও স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় ৬৩০টি ভবনের উচ্চতাসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একাধিকবার রাজউককে জানিয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাস ‘অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস’ (ওএলএস) এলাকার মধ্যে পড়ে। এই এলাকায় ১৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু মাইলস্টোন ক্যাম্পাস সেই বিধি লঙ্ঘন করেছে কি না, তা রাজউকও নিশ্চিতভাবে জানে না।
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রাজউকের উত্তরা এলাকার এক কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়।”
উচ্চতা লঙ্ঘনকারী ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, কিছু ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ভবন ভাঙার অনুমতির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব আসেনি।
ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ওই এলাকায় আগে থেকেই স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো তদন্ত কমিটির সুপারিশে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তার মতে, দুর্ঘটনার পর কিছুদিন প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি হারিয়ে যায়।
ঝুলে আছে ক্ষতিপূরণ, বিচারও অধরা
মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, একজন নারী কর্মচারী ও তিনজন অভিভাবকসহ ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন ৬৪ জন। নিহত হন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।
অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো।
কিন্তু পরিবারগুলো সেই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে।
তদন্ত কমিশন নিহত শিশুদের পরিবারকে এক কোটি টাকা, প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা এবং দগ্ধদের জন্য ১৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার সুপারিশ করেছিলো।
সেই সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক সদস্য আলাপ-কে বলেন, “আমরা নিহত ও আহতদের জন্য যে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিলোাম, তা ভুক্তভোগীদের ট্রমার কাছে কিছুই না। আগুনে দগ্ধদের দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান রাজনৈতিক সরকারও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।”
নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাবির ফারহানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, “আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার। বারবার দেখা করতে চেয়েও পারিনি। বর্তমান সরকারও এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি।”
পরিবারগুলোর জন্য এক বছর পরও ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
৩০ সুপারিশের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত
দুর্ঘটনার পর ২৭এ জুলাই কারণ ও দায়দায়িত্ব চিহ্নিত করতে সাবেক সচিব একেএম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। পাশাপাশি তখনকার সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে প্রধান করে গঠন করা হয় একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি।
কারিগরি তদন্ত কমিটি ৫ই নভেম্বর অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কিন্তু এক বছর পরও প্রতিবেদনটি পুরোপুরি প্রকাশ বা এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কমিশনের ৩০টি সুপারিশের মধ্যে ছিলো:
বিমানবন্দরের আশপাশে পাখি, ড্রোন বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
বিমানবন্দর নিরাপত্তা অঞ্চলে শুধু ভবনের উচ্চতা নয়, ভবনের ব্যবহারও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা।
'অ্যাপ্রোচ সারফেসের' প্রথম ও দ্বিতীয় জোনে নতুন স্কুল, হাসপাতালসহ জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনার অনুমতি বন্ধ করা।
ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া।
ঢাকার বাইরে ঘনবসতি থেকে দূরে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা।
কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের গতি একেবারেই কম।
একটি দুর্ঘটনা, বহু বছরের ব্যর্থতা
মাইলস্টোনে সেদিন একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিলো। কিন্তু ৩৬ জনের মৃত্যু শুধু সেই বিমানটির কারণে ঘটেনি।
পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ছিলো। তদারকিতে দুর্বলতা ছিলো। একটি ভবনে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ছিলো না। নির্মাণ অনুমোদনের নথি ছিলো না। বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর উচ্চতা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে অন্যকে সতর্ক করেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
২১এ জুলাইয়ের বিস্ফোরণটি ছিলো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের পেছনে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিলো বহু বছর ধরে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে সতর্কতা ছিলো, কিন্তু পদক্ষেপ ছিলো না। নিয়ম ছিলো, কিন্তু প্রয়োগ ছিলো না। তদন্ত ছিলো, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন ছিলো না।
আর সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয়েছে শিশু, শিক্ষক, অভিভাবক এবং একজন পাইলটের জীবন দিয়ে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: দুর্ঘটনার চেয়েও বড় ব্যর্থতার গল্প
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনা ছিলো না। পাইলটের প্রশিক্ষণ ঘাটতি, ভবনের নিরাপত্তা ত্রুটি, অনুমোদনহীন নির্মাণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা মিলেই তৈরি হয়েছিলো এই বিপর্যয়।
বিমানটি যখন মাইলস্টোন স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছিলো, তখনও কেউ বুঝতে পারেনি যে, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড়ান পরিণত হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায়।
২০২৫ সালের ২১এ জুলাই দুপুর। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি সেভেন বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ উড্ডয়নে ছিলো। হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে উচ্চতা হারাতে শুরু করে বিমানটি।
গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে আসে একের পর এক সতর্কবার্তা। পাইলটকে 'ইজেক্ট' করার নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বিমানটি শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয় উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি প্রশিক্ষণ উড়ান পরিণত হয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। প্রাণ যায় ৩৬ জনের। তাদের ২৮ জনই শিক্ষার্থী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।
এক বছর পর তদন্তের তথ্য, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মাইলস্টোনের ট্র্যাজেডি কোনো একক ভুল বা আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল ছিলো না।
পাইলটের প্রশিক্ষণ ঘাটতি, দুর্বল তদারকি, ভবনের নকশাগত ত্রুটি, অনুমোদনহীন নির্মাণ, নগর পরিকল্পনায় অনিয়ম এবং বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিলো একটি ভয়াবহ ঝুঁকির পরিবেশ।
কয়েক সেকেন্ডেই বিভীষিকা
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আগুনের শিখা ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে ওঠে।
প্রথম বিস্ফোরণের তিন থেকে চার মিনিট পর ঘটে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। তখন আগুনের গোলা উঠে যায় আরো উপরে।
বিমানটি আছড়ে পড়ার পর মাটিতে তৈরি হয় বড় গর্ত। বিমানের একটি অংশ ঢুকে যায় হায়দার আলী ভবনের বেইসমেন্টে।
সেই সময় ভবনের ভেতরে ক্লাস চলছিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি স্কুল ভবন পরিণত হয় আগুন, ধোঁয়া ও আতঙ্কের কেন্দ্রে।
প্রশিক্ষণ ঘাটতি, পাইলটের ভুল
গেলো বছরের ১১ই অক্টোবরে জমা পড়া বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিলো। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি ছিলো। কমান্ডিং অফিসার ও গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের তদারকিও যথেষ্ট ছিলো না। তাই ওড়ার সময় নির্ধারিত প্যারামিটার বজায় রাখতে ব্যর্থ হন পাইলট।
সংকটের মুহূর্তে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাতে না পারায় বিমানটি হঠাৎ ‘স্টলিং কন্ডিশনে’ চলে যায়। অর্থাৎ, বিমানের ডানা পর্যাপ্ত উত্তোলন শক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এরপর চেষ্টা করেও বিমানটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে পারেননি পাইলট।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, পাখি বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু বিমানের উইন্ডশিল্ডে আঘাত করে থাকতে পারে, যা দুর্ঘটনায় পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলো।
তবে তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগে বিমানের ইঞ্জিন বা হাইড্রোলিক সিস্টেমে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির আভাস পাওয়া যায়নি।
চূড়ান্ত বাঁক নেওয়ার সময় বিমানের ‘অ্যাংগেল অব অ্যাটাক’ নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছিলো। কিন্তু সেই সংকটময় মুহূর্তে বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
কমিশনের তথ্য বলছে, পাইলটের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিলো। নির্ধারিত ফ্লাইট প্রোফাইলও পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। বরং প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে তাকে আবার ‘ইনিশিয়ালে’ ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।
আকাশে যে ভুলটি ঘটেছিলো, তার পেছনে মাটিতে তৈরি হওয়া একাধিক ব্যবস্থাগত ঘাটতির ছাপও ছিলো।
ভবনটি ছিলো মৃত্যুফাঁদ
হায়দার আলী ভবনটি ছিলো তিনতলা। অথচ ভবনটিতে ছিলো মাত্র একটি সিঁড়ি।
ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিশনকে জানিয়েছে, ভবনের আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুযায়ী সেখানে অন্তত তিনটি জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি থাকা উচিত ছিলো। অর্থাৎ আগুন লাগার পর শত শত শিক্ষার্থীর জন্য কার্যত একটি পথই খোলা ছিলো।
বিমানটি ভবনের সামনে আছড়ে পড়ার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া, আতঙ্ক আর বিস্ফোরণের মধ্যে সেই একমাত্র সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থী ও অন্যরা।
অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনে পর্যাপ্ত বিকল্প বহির্গমন ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব ছিলো।
কিন্তু ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিলো আরও বিস্তৃত।
তদন্ত কমিশনের কাছে ভবনটির নির্মাণ অনুমোদনের কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিলো, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সেই দাবির পক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের মোট ১৭টি ভবনের মধ্যে অনুমোদন ছিলো মাত্র সাতটির। অর্থাৎ, বাকি ভবনগুলো নির্মাণ বা ব্যবহার করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই।
একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিলো। কিন্তু যে ভবনের সামনে সেটি আছড়ে পড়েছিলো, সেই ভবনটি আগুন বা অন্য কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছিলো।
৬৩০ ভবনের উচ্চতা নিয়ে অনিয়ম, ব্যবস্থা সীমিত
মাইলস্টোনের ঘটনাটি শুধু একটি স্কুল ভবনের সমস্যা নয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও বড় একটি চিত্র।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) পরিবর্তনের মাধ্যমে জলাভূমি ও সংরক্ষিত এলাকাকে বসতি ও স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় ৬৩০টি ভবনের উচ্চতাসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একাধিকবার রাজউককে জানিয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, মাইলস্টোন ক্যাম্পাস ‘অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস’ (ওএলএস) এলাকার মধ্যে পড়ে। এই এলাকায় ১৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ।
কিন্তু মাইলস্টোন ক্যাম্পাস সেই বিধি লঙ্ঘন করেছে কি না, তা রাজউকও নিশ্চিতভাবে জানে না।
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রাজউকের উত্তরা এলাকার এক কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়।”
উচ্চতা লঙ্ঘনকারী ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, কিছু ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ভবন ভাঙার অনুমতির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব আসেনি।
বেবিচক সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম আলাপ-কে বলেন, “সিভিল এভিয়েশন (বেবিচক) রাজউককে অবৈধ উচ্চতার ভবনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে।”
ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ওই এলাকায় আগে থেকেই স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো তদন্ত কমিটির সুপারিশে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তার মতে, দুর্ঘটনার পর কিছুদিন প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি হারিয়ে যায়।
ঝুলে আছে ক্ষতিপূরণ, বিচারও অধরা
মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, একজন নারী কর্মচারী ও তিনজন অভিভাবকসহ ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন ৬৪ জন। নিহত হন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।
অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো।
কিন্তু পরিবারগুলো সেই ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে।
তদন্ত কমিশন নিহত শিশুদের পরিবারকে এক কোটি টাকা, প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা এবং দগ্ধদের জন্য ১৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার সুপারিশ করেছিলো।
সেই সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক সদস্য আলাপ-কে বলেন, “আমরা নিহত ও আহতদের জন্য যে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিলোাম, তা ভুক্তভোগীদের ট্রমার কাছে কিছুই না। আগুনে দগ্ধদের দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান রাজনৈতিক সরকারও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।”
নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাবির ফারহানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, “আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার। বারবার দেখা করতে চেয়েও পারিনি। বর্তমান সরকারও এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি।”
পরিবারগুলোর জন্য এক বছর পরও ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
৩০ সুপারিশের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত
দুর্ঘটনার পর ২৭এ জুলাই কারণ ও দায়দায়িত্ব চিহ্নিত করতে সাবেক সচিব একেএম জাফর উল্লা খানকে প্রধান করে নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। পাশাপাশি তখনকার সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে প্রধান করে গঠন করা হয় একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি।
কারিগরি তদন্ত কমিটি ৫ই নভেম্বর অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কিন্তু এক বছর পরও প্রতিবেদনটি পুরোপুরি প্রকাশ বা এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কমিশনের ৩০টি সুপারিশের মধ্যে ছিলো:
কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের গতি একেবারেই কম।
একটি দুর্ঘটনা, বহু বছরের ব্যর্থতা
মাইলস্টোনে সেদিন একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিলো। কিন্তু ৩৬ জনের মৃত্যু শুধু সেই বিমানটির কারণে ঘটেনি।
পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি ছিলো। তদারকিতে দুর্বলতা ছিলো। একটি ভবনে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ছিলো না। নির্মাণ অনুমোদনের নথি ছিলো না। বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর উচ্চতা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে অন্যকে সতর্ক করেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
২১এ জুলাইয়ের বিস্ফোরণটি ছিলো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের পেছনে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিলো বহু বছর ধরে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি একটি ব্যবস্থার গল্প, যেখানে সতর্কতা ছিলো, কিন্তু পদক্ষেপ ছিলো না। নিয়ম ছিলো, কিন্তু প্রয়োগ ছিলো না। তদন্ত ছিলো, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন ছিলো না।
আর সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয়েছে শিশু, শিক্ষক, অভিভাবক এবং একজন পাইলটের জীবন দিয়ে।
বিষয়: