সকালে পিয়াৎজেল রোমা থেকে লিডো দ্বীপে যাবো। দেখি আকাশে ঘন অন্ধকার করে মেঘ জমেছে। মনে হচ্ছে যেন আকাশ বিশাল সাগরে পরিণত হয়েছে, আর মেঘগুলো হয়ে গেছে বিশালাকৃতির ঢেউ। দ্রুত ঘাটের কাছে বাংলাদেশি মুদি দোকানটি থেকে একটা ছাতা কিনে পল্টুনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম বিশাল ঝড় ধেয়ে আসছে ভেনিসে। যত ঝড়ই আসুক লিডো দ্বীপে তো যেতেই হবে। উৎসবের আজ অষ্টম দিন। সোয়া এগারোটায় শুরু হবে ছবি। তো লঞ্চে ওঠার পাঁচ মিনিটের ভেতর শুরু হলো বৃষ্টি। যেন তেন নয়, একেবারে দৃষ্টি ঝাপসা করে দেওয়া বৃষ্টি। এমন বারিধারায় বাঙালির মনে রবীন্দ্রনাথ আসতে বাধ্য—“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে” অথবা “এমন দিনে তারে বলা যায় এমন ঘনঘোর বরিষায়”।
রবীন্দ্রনাথ ভেনিসে এসেছিলেন ১৯২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি। ভেনিসে ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ শুনতে পান স্লোগান: ভিভা ইল পোয়েতা ইন্ডিয়ানো (ভারতের কবি দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ট্যাগোর (ট্যাগোর দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ইল পোয়েটা ডেল আমোরে আর ডেলা পেস (প্রেম ও শান্তির কবি দীর্ঘজীবী হোন) ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ভেনিসের গ্র্যান্ড হোটেলে তিনতলার স্যুইটে ছিলেন। তিনি উপহ্রদ ঘুরে দেখেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও ছাত্রছাত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৩১ জানুয়ারি ‘ইল গ্যাজেটিনো ডি ভেনেৎসিয়া’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সফর, তার দর্শন ও ভেনিস নিয়ে তার ভাবনা প্রকাশ পায়। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ভেনিস সম্পর্কে বলছেন—“ভেনিস অনেকটা বারাণসীর মতো নির্মল ও স্বচ্ছ শহর যার একটা বিশেষ চরিত্র রয়েছে। যেখানে জীবন ও ইতিহাস পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত। বারাণসীর চরিত্রে এক ধরনের অতীন্দ্রিয়, ধর্মীয় এবং দার্শনিক প্রকৃতি রয়েছে। ভেনিসের চরিত্রে আছে জীবন ও শিল্প। এ যেন সমুদ্রের ওপর অত্যাশ্চর্য আধিপত্য। অ্যাড্রিয়াটিকের রাণী।”
ভেনিসকে রবীন্দ্রনাথ অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের রাণী হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। সেই রাণীর আতিথেয়তায় গভীর রাতে গ্র্যান্ড ক্যানালে ভাসমান গন্ডোলা থেকে নারীকণ্ঠে সঙ্গীত শুনে আপ্লুত হয়েছিলেন কবি। ৩১ জানুয়ারি কবি সদলবলে (কবির পুত্র, পুত্রবধূ, তাদের পালিতা কন্যা, ভারতীয় চিত্রশিল্পী, ইতালীয় অধ্যাপক প্রমুখ) বিভিন্ন দ্বীপ ঘুরে ঘুরে দেখেন। ভেনিসে দিন তিনেকের মতো থেকে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ শেষে ২ ফেব্রুয়ারি কবি ভেনিস থেকে স্টিমারে ব্রিন্দিসি রওনা হন, বোম্বাইগামী জাহাজ ধরার জন্য।

ভেনিস তথা ইতালি ছাড়ার আগে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন সাংবাদিকদের কাছে। যা পরের দিন ৩ ফেব্রুয়ারি ছাপা হয় ‘কুরিয়ের দেলা সেরা’ পত্রিকায়। ইতালিতে তিনি শিগগিরই ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। আঠারো মাসের মাথায় তিনি দ্বিতীয় ও শেষবারের মতোই এসেওছিলেন, ১৯২৬ সালে।
যাক সে আলাপ ভিন্ন। আমি একদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি সৌভাগ্যবান, তিনি অ্যাড্রিয়াটিকের রাণীর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিন দিন। আর আমার এখানে থাকতে হচ্ছে চৌদ্দ দিন। প্রায় পাঁচগুণ বেশি সৌভাগ্যবান বলা যেতে পারে। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যা মিলিয়ে গ্র্যান্ড ক্যানালের দুই পারের সৌন্দর্য দুবার করে উপভোগ করছি। তখন মনে হয় এখানে এপার্টমেন্টটা একটু দূরে হয়ে ভালোই হয়েছে। শাপে বর।
লিডো দ্বীপে যখন নামলাম তখন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে অবশ্য। তাতে ছাতা মেলার দরকার হয়নি। সকালে যেহেতু নাস্তা করিনি তাই সোজা চলে গেলাম পালাৎজো দেল ক্যাসিনোতে। সেখানকার রেস্তোরাঁয় দেখি বিভিন্ন পদের খোয়াজো আর কলা ছাড়া আর কিছুই নেই। ফরাসি আর ইতালিয়রা খোয়াজো আর কফি দিয়ে তাদের সকালের নাস্তা সাড়ে। আমারও আজ তাই করতে হলো। এরপর সোজা ‘সালা গ্রান্ডে’র ভেতর ঢুকে গেলাম। শুরু হলো ফরাসি পরিচালক স্তেফানি ব্রিজে নির্মিত ছবি ‘আ গুড লিটল সোলজার’।
৪৩ বছর বয়সী কার্লা কর্পোরেট দুনিয়ার এক নিবেদিত নির্বাহী কর্মকর্তা। জানপ্রাণ দিয়ে সে অফিসের জন্য কাজ করে। বেশ দক্ষ, চৌকশ, আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনিরাপদ বোধ করে সে। কোথায় যেন কিছুটা শঙ্কাও কাজ করে। কর্পোরেট দুনিয়ায় সময় দিতে দিতে হারিয়ে ফেলে ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন। কিছুদিন হলো কার্লা একটি বড় কর্পোরেশনের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ পায়। সেখানে তার দায়িত্ব হলো কর্মীদের উজ্জীবিত রাখা, পাশাপাশি কর্পোরেশনের লক্ষ্য বজায় রাখা। ঊর্ধ্বতন কমকর্তা বলতে গেলে বেশ চাপেই রাখেন সকলকে। অফিসের পরিবেশ টক্সিক হয়ে ওঠে। তার ভেতরেই কার্লা নিজেকে সামলে নেয়। দক্ষ প্রমাণ করে নিজেকে। আর অনুভব করে তার আরো বেশি সময় পরিবারকে দেওয়া প্রয়োজন।
ছবিটি আসলে বর্তমান কর্পোরেট দুনিয়া মানুষকে যে যন্ত্রে পরিণত করে ফেলে, মানুষকে যে মানবিক জায়গা থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়, সেই বার্তাই বহন করে। ফরাসি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিশ্লেষক ক্রিস্তফ দ্যজুর তাঁর গবেষণায় এটাই দেখিয়েছেন যে কর্পোরেট জগতে অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকার করতে করতে একটা মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতে, কর্মক্ষেত্র এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা পুরুষতান্ত্রিক নিয়মকানুন দিয়ে ঠাসা। এই ছবিতে কার্লাও সেই কর্পোরেট অফিসের পুরুষতন্ত্রের শিকার। তবে এই সত্য সে অনুধাবন করতে পারে শেষ পর্যন্ত। এই ছবিটি মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে রয়েছে।
ছবি শেষ করে বেরিয়েই কিছু প্রয়োজনীয় ফোন সেরে নিলাম। পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছেন সিনেমা চলার সময়ে। তো বেরিয়ে আগে তার সাথে কথা সারলাম। বাসায় ফোন দিলাম। বাচ্চাদের সাথে কথা বললাম। একটু পরই দেশ থেকে ফোন দিলেন ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল। জানতে চাইলেন ঘটনাবহুল ভেনিসের কী অবস্থা। বললাম গত কয়েকদিন বেশ টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই গেলো আসলে। কথা বলতে বলতেই দুপুরের খাবার সেরে, একটা আইসক্রিম কিনে নিলাম। খেতে খেতে এগোলাম ‘পালাবিয়েনালে’র দিকে। সেখানে দেখাবে ‘আ কমন স্টোরি’, পরিচালক ইতালির আন্না ফগলিয়েত্তা। ছবিটি প্রতিযোগিতা করছে ওরিৎজন্তি বিভাগে।
আইসক্রিম শেষ করে ঢুকলাম ভেতরে। প্রবেশ করলাম এরিকা ও মাউরোর গল্পে। একটি ছোট গ্রামে থাকে তারা। সহজ সরল জীবনযাপন। নিত্যদিনের টুকিটাকি কাজ, রান্নাবান্না, গল্পটল্প করে দিন কেটে যায়। তাদের মেয়ে লেখাপড়ার জন্য অন্য শহরে চলে গেছে। বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যায় এরিকা ও মাউরো দম্পতির জন্য। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে থাকে পরিবারের একটি সদস্য না থাকায় শূন্যতা পেয়ে বসছে তাদের। মাউরো নিজের মতো করে সময় কাটানোর চেষ্টা করে। এরিকা ঘরকন্না সামলায়। তারপরও কী যেন নেই। কোথায় যেন তারা নিজেদের হারিয়ে ফেলে— “হৃদয় আমার ওই বুঝি বেড়ায় হারিয়ে”। নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার ফিরে পাওয়ার একটা আনন্দ আছে। সেই আনন্দের গল্পটাই বলে এই চলচ্চিত্র।
পরিচালক আন্না ছবিটি সম্পর্কে বলেন, “আমি সম্পর্ক নিয়ে একটি ছবি বানাতে চেয়েছিলাম, যেখানে প্রকৃত নায়ক হবে মানুষের আত্মা। এমন একটি ছবি বানাবো, যেখানে অপেক্ষা থাকবে, সারাদিনের টুকিটাকি কাজের দৃশ্য থাকবে। এর ভেতরেই চরিত্রগুলোর ভঙ্গুর দশা আমি দেখিয়েছি। আর বলতে চেয়েছি তাদের উদ্বেগের কথা। এখানেই উঠে আসে ছবিটির মৌলিক প্রশ্ন: আমরা কি এখনও আকাঙ্ক্ষা করতে জানি?”
ছবিটার ভেতর একটি দীর্ঘ দৃশ্য রয়েছে, যেখানে এরিকা ও মাউরো নিজেদের অসহায় করে দাঁড় করিয়ে দেয় একে অপরের সামনে। নিরাভরণ সেই স্বীকারোক্তিতে দুজনই দুজনার দুর্বলতার কথা বলে। তারা এটাও বুঝতে পারে এই অপূর্ণ জীবনে পূর্ণতা আনতে তাদের পরস্পরকে প্রয়োজন। এই দৃশ্যে দুটি চরিত্রকে স্প্লিট স্ক্রিনে দেখা যায়। এতে করে দর্শক দুজনের মুখমণ্ডলের আবেগকেই ধরতে পারে। পরিচালক এখানে প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। এই দৃশ্যটির পরই দেখা যায় এরিকা ও মাউরো আবার সাংসারিক কাজে ডুবে গেছে। তবে এবার আর আগের মতো বিষণ্ণভাব নেই। আছে নির্ভার আর সুখী মনের ছাপ।
ছবি শেষ হলো বিকাল সাড়ে ৪টায়। আমি লঞ্চঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলাম। দেখলাম অ্যাড্রিয়াটিকের রাণী এখনো কিছুটা মন ভার করে আছে। তবে সকালের মতো নয়। ভাবলাম এত তাড়াতাড়ি ফিরে কী করবো, তারচেয়ে আজ বরং বইয়ের দোকান খুঁজে বের করা যাক। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বের করে ফেললাম দুইখানা বইয়ের দোকানের ঠিকানা। একটি লিব্রেরিয়া মার্কো পোলো আর অপরটি তাদেরই দোকান তবে পুরোনো বইয়ের। দুটোতেই ইতালিয়ান ভাষার বই বেশি। ইংরেজি যৎসামান্য বই আছে। তবে অল্প হলেও সংগ্রহের ভার আছে। কার্ল মার্কস, হানা আরেন্ট, ফ্রানৎস ফানোঁ, অ্যামে সেজার প্রমুখ চিন্তাবিদ ও দার্শনিকের বই। তাছাড়া পুঁজিবাদ ও নারীবাদের উপর অনেকগুলো চমৎকার বইও দেখলাম। ফিকশন সেকশনেও ভালো ভালো কিছু ইংরেজি বই রাখা আছে। ননফিকশন বইয়ের সংগ্রহে যা আছে ওদের তার অধিকাংশই আমার কাছে আছে এবং সেগুলো পঠিত। সিনেমার উপর বইগুলো দেখে অনেক আফসোস লাগছিল। বিষয় তো বুঝতে পারছি, কিন্তু ইতালিয়ান ভাষা তো জানি না। যাহোক, এখানে আসার পথে একটা কমিক বইয়ের দোকানও দেখেছি।
লঞ্চ থেকে নেমে পিয়াৎজেল রোমা থেকে এখানে আসতে বারো মিনিটের মতো লাগে। তবে এই আসা-যাওয়ার রাস্তাটি বড় মজার। ছোট ছোট গলি, সরু রাস্তা। অনেক পুরোনো দেয়াল। মাঝে মাঝে পেরুতে হচ্ছে সাঁকো। কারণ নিচে খালের শাখা-প্রশাখা। সেটি দিয়ে চলে যাচ্ছে গন্ডোলা। আর একটু পরপরই খোলা চত্বর। তার চারপাশে খাবার ও বাহারি জিনিসের দোকান। চত্বরের খোলা জায়গায় বাচ্চারা খেলছে। গির্জাও দেখলাম। সন্ধ্যার ঘন্টা বেজে উঠলো। ঢং-ঢং-ঢং। পাখিরা নীড়ে ফেরার আয়োজন করছে। ঝলমলে আলোতে ভেনিস হয়ে উঠছে আরো আকর্ষণীয়। আমি কিছু কেনাকাটা করে বাসার দিকে রওনা দিলাম। বাস স্টেশনে গিয়ে দেখি বাস দাঁড়িয়ে, যেন আমার জন্যই।



