চলচ্চিত্রে যখন রাজনীতি থাকে রূপকে

ধীর পায়ে উৎসব অঞ্চলে প্রবেশ করলাম। বেশ একটা আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। সবদিকেই কেমন ব্যস্ততা। উৎসবে আসা মানুষ, উৎসবকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যেকেই যেন আনন্দকে জ্বালানি করে ছুটোছুটি করছে এদিক-সেদিক। 

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

ভেনিসকে যদি উভচর শহর বলা হয়, তাহলে খুব একটা ভুল বলা হবে না। এখানকার অধিবাসীদের এক রকম স্থলে ও জলের মাঝেই বসবাস। শহরটির লিডো দ্বীপে ৮৩ বারের মতো আয়োজিত ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিনের চলচ্চিত্র দেখতে তাই আমাকেও কিছু পথ বাসে আর খানিকটা জলযানে যেতে হয়েছে। জলযানগুলোর নাম ভ্যাপোরেত্তো। সকাল সকাল উঠে ভিয়া তোসকানা থেকে সাত নম্বর বাসে চড়লাম। গন্তব্য শেষ স্টপেজ পিয়াৎজেল রোমা। তো বাসের ভেতরেই পরিচয় হলো নোয়াখালির এক প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে। তিনি প্রায় এগারো বছর ধরে এখানকার বাসিন্দা। বর্তমানে একটি পত্রিকার দোকান চালান। ঠিক যেমনটা ঢাকা শহরে আগে দেখা যেতো পত্রিকার দোকানগুলো। শুধু পত্রিকা নয়, সেবা প্রকাশনীর বইসহ আরো কিছু জিনিসপত্র রাখা থাকতো তাতে। ভেনিসেও তাই। পত্রিকার পাশাপাশি স্মারক বস্তু, ছোট ছোট বাহারি জিনিস বিক্রি হয় এসব দোকানে। আলাপে আলাপে জানলাম, ভেনিসের অধিকাংশ পত্রিকার দোকানেই কাজ করেন বাংলাদেশিরা। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পর পিয়াৎজেল রোমা চলে এলো। আমি বিদায় নিলাম নোয়াখালির বাচ্চু খানের কাছ থেকে। ভদ্রলোক বললেন, তার দোকান আরেকটু দূরে। চায়ের দাওয়াত দিয়ে গেলেন।

ভেনিশীয় লেগুনের পাড় ধরে হাঁটছি। দেখি কিছুদূর পরপর জলযানগুলোর থামার পোস্ট। নাম্বার দেওয়া। একেকটি ভ্যাপোরেত্তো একেক দ্বীপে যাবে। আমি যাবো লিডো দ্বীপে। সবচেয়ে দূরের দ্বীপগুলোর একটি। এক, দুই ও পাঁচ দশমিক দুই—এই তিনটি জলযান লিডো দ্বীপে যায়। নিজেকে অনেকটা ইউলিসিসের মতো মনে হচ্ছে। যেন যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, কখন ফিরবো জানি না। তো ৫.২ নম্বর জলের বাসে ওঠা গেলো। রোদের কণা আছড়ে পড়ছে ভেনিসের উপহ্রদে। গাঙচিলগুলো ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে জলের উপর বসে আছে চুপ করে। আবার হুট করেই পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে। পাড়ে গড়ে ওঠা শহর। যেন জলের ভেতর থেকে উঠে এসেছে শহরের দালানকোঠা। যাত্রাপথে দুইকূলের রেস্তোরাঁ আর দৃষ্টিনন্দন ভবন দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। লিডো দ্বীপে নেমে ফের বাস, এবারের নম্বর ভি, গন্তব্য এল. মার্কনি। তবে দেখলাম ওরা উৎসবের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করেছে। তেমনি একটা এলে চড়লাম। মিনিট দশেকের ভেতর পৌঁছে দিলো ভেন্যুতে।

ধীর পায়ে উৎসব অঞ্চলে প্রবেশ করলাম। বেশ একটা আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। সবদিকেই কেমন ব্যস্ততা। উৎসবে আসা মানুষ, উৎসবকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী প্রত্যেকেই যেন আনন্দকে জ্বালানি করে ছুটোছুটি করছে এদিক-সেদিক। পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে একটু ঘুরেটুরে ঢুকে গেলাম ‘সালা দারসেনা’ নামের প্রেক্ষাগৃহে। ঢুকে দেখলাম, ইউরোপের অন্য শহরের মতোই এই প্রেক্ষাগৃহটিও বিশাল। ধারণ ক্ষমতা একশ কম দেড় হাজার। একটি আসনও ফাঁকা থাকলো না। ছবি শুরু হলো। ড্যানি বয়েলের ‘ইংক’।

পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছিল ছবিটি নাকি মিডিয়া ব্যবসায়ী রুপার্ট মারডককে নিয়ে। কিন্তু ছবি দেখলে যে কেউ বলবে এটি আসলে সাংবাদিক ও সম্পাদক ল্যারি ল্যাম্বের জীবনী। রুপার্ট অবশ্য এখানে বেশ জোরালোভাবেই আছেন। ল্যারি ল্যাম্বের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যাক ও’কনেল। এর আগে তিনি অভিনয় করেছিলেন ‘সিনার্সে’ ভ্যাম্পায়ারের চরিত্রে। ‘ইংকে’ও তিনি এক অর্থে রক্তলোলুপ বলা যেতে পারে। এই রক্তের নাম অর্থ, খ্যাতি ও যশ। এই তিনের মোহে ল্যারি ডুবন্ত ‘দ্য সান’কে আকাশে উদিত করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন সফল ট্যাবলয়েড পত্রিকা হিসেবে। এক নম্বর ট্যাবলয়েড বানাতে গিয়ে ল্যারি বারবার ফিরে গেছেন স্বস্তা জনপ্রিয়তা, যৌনতা, রগরগে গল্প, এমনকি নগ্নতা বিক্রির দিকে। পত্রিকার মালিক রুপার্ট মারডককেও খবর হিসেবে বেঁচে দিতে চান তিনি। উত্তেজনায় ঠাসা খবরে পরিণত করেন তাদের নিজেদের অফিসেরই এক সহকর্মীর স্ত্রীর অপহরণ ও মৃত্যুর খবরকে।

ছবিটি এমন এক সময়ে ভেনিস মুক্তি পেলো, যখন সারা দুনিয়াই আসলে খবরের উত্তেজনার পেছনে ছুটছে। যেন উন্মাদ এক লাগামহীন ঘোড়া। সবাই উত্তেজনা চায়, ক্ষণে ক্ষণে। সেই চরম ক্ষুধার মুখে অনবরত খাবার জোগানোর এক যন্ত্রই তৈরি করেছিলেন ল্যারি। কিছুটা বৈশ্বিক রাজনীতির দিকেও ইঙ্গিত আছে ছবিটিতে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক, চলচ্চিত্র সমালোচক আলবের্তো বারবেরা অবশ্য সবসময়ই রাজনীতি সচেতন। ভেনিসে তাই বিগত আসরেও রাজনীতি-সচেতন ছবি স্থান পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এবার যেন আরো এক কাঠি ওপরে। কারণ এ বছরের কান ছিলো অতর পরিচালকদের মেলা। ভেনিসও কম যাবে কেন? আলবের্তো যেন পাল্লা দিয়ে এবারের আয়োজনে নিয়ে এসেছেন ভিম ভেন্ডার্স, ভারনার হেরজগ, হিরোকাজু কোরিয়েদা, লাভ দিয়াজ প্রমুখ অতর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নতুন ছবি।

‘ইংক’ ভালোই লাগলো। সিনেমাটোগ্রাফি ভালো ছিলো। মন্তাজটাও পরিকল্পিত ও ভাবনাপ্রসূত। যেমন অনেকবারই ডাচ অ্যাঙ্গেল দেখা গেছে। আর এই ক্যামেরাকোণ ছবির গল্পকে আরো অর্থপূর্ণ করে তুলেছে। ছবিটি ‘ভেনেজিয় ৮৩’ প্রতিযোগিতা বিভাগে রয়েছে। পুরস্কার পাবে বলে মনে হচ্ছে। ছবি দেখা শেষ বের হচ্ছি, দেখি আমার বন্ধুসম ইতালির চলচ্চিত্র সমালোচক পাওলা ক্যাসেলা। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। ছবি নিয়ে কথা বলবো কী, কুশল বিনিময় করেই বিদায় জানাতে হলো। ফিপ্রেসি, চলচ্চিত্র সমালোচকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি পাওলার মিটিং আছে ভেনিসে আসা ক্রিটিক জুরিদের সাথে। আর আমার আছে পরের স্ক্রিনিং।

পালাৎজো দেল ক্যাসিনোর ভেতরে অনেকগুলো প্রেক্ষাগৃহ। তার মধ্যে আমার স্ক্রিনিং ‘সালা পেরলা’তে। মেক্সিকান চলচ্চিত্র পরিচালক নাতালিয়া এশেভেদো পরিচালিত ছবি ‘সালোঁ দে বেল্লেজা’। ছবিটি ‘জরনাতে দেল্লে অতোরো’ (অতরের দিনলিপি) বিভাগে স্থান পেয়েছে। একটু ভিন্ন ধরনের ছবি। একে তো মেক্সিকান ছবি। লাতিন আমেরিকার ছবি মানেই সেখানে জাদুবাস্তবতা, গভীর জীবনবোধ, দর্শনের একটা বড় জায়গা থাকে। এই ছবিতে জাদুবাস্তবতা নেই, তবে যা আছে তা কোনো অর্থ আরোপ করে না। বরং এমন এক স্থানিক ও কালিক আবেদন হাজির করে যার ভেতর দিয়ে জীবন ও মৃত্যুর যোগ আবিষ্কারের প্রয়াস নজরে আসে।

পরিচালক নাতালিয়া ছবিটি সম্পর্কে বলছেন, তিনি মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে চেয়েছেন, ভাবাতে চেয়েছেন। তিনি জানতে চান, আমরা কেন এই তিনভাগ জলের পৃথিবীতে আছি এবং কেন আমাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়। আত্মাকে ধারণ করা শরীর কিভাবে স্থান ও কালের ভেতর বিরাজ করে। এ ছবির মধ্য দিয়ে পরিচালক কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করতে চান আমাদের সংকটাপন্ন সমাজ নিয়ে, বিভাজিত মানবতা নিয়ে। ছবিতে দেখা যায় অনামা এক শহরে এক বৃদ্ধ মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা করেন। নিঃস্বার্থভাবে। তিনি অ্যাকুরিয়ামে মাছ পালেন। আর মৃত্যুর জন্য দিন গুনতে থাকা মানুষদের পাশে থাকেন। আর কামনা-বাসনার শরীরের ভেতর নিজেকে খুঁজে ফেরেন। যে স্থান আগে ছিল বিউটি সেলুন, সেটিই কালান্তরে পরিণত হয় এক মৃত্যুপথযাত্রী আশ্রয়কেন্দ্রে। মানুষ তাদের আপনজনদের এখানে রেখে যান। তারা জানেন, তাদের স্বজন আর ফিরে আসবে না।

ছবিটি শুরুর পর থেকেই দেখলাম অনেকেই হল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা বিশাল অংশ ছবিটি দেখেছে। অস্তিত্ববাদী ছবি, যেখানে পুরুষের সমকামিতা রয়েছে। রয়েছে মৃত্যুকে বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা। আমার ভালো লেগেছে বলবো না। তবে মন্দও লাগেনি। একটা চেষ্টা ছিলো ছবিটিকে দার্শনিক করে তোলার। আমি বলবো সৎ চেষ্টা। তবে কিছু দৃশ্য নিষ্প্রয়োজন লেগেছে। এটুকুই। পরের স্ক্রিনিংয়ে ছিল ইরানের মোহসেন ঘরাই পরিচালিত ছবি ‘ফলিং হাউজ’ (মোরাগেব)। ‘সালা ক্যাসিনো’তে ঢুকতেই চমৎকৃত হলাম। দেখি বসে আছেন অনুরাগ কশ্যপ। আমার সঙ্গে আগের বছরই বার্লিনালে দেখা হয়েছিল। আবারো পরিচয় দিয়ে কথা বললাম। বাংলাদেশের নাম শুনেই বললেন ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে’র কথা। আর বললেন বাঁধনের (আজমেরী হক বাঁধন) কথা। আমি বললাম, উনি আছেন, তবে মূল চরিত্রে নয়। অনুরাগও বললেন, তিনি জানেন। দেখলাম ছবির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনকে তিনি চেনেন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ দিয়ে। ভেনিসে ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে’র টিকিট এরই ভেতর পেয়েছেন বলে জানালেন। রুবাইয়াতের ছবিটি নিয়েই যেহেতু আমার সম্পাদিত পত্রিকা ‘কাট টু সিনেমা’র প্রচ্ছদ, তাই একখানা কপি অনুরাগকে দিলাম। বেশ উৎসাহের সঙ্গেই তিনি গ্রহণ করলেন। আমি পেছনে গিয়ে বসলাম।

ইরানি ছবি 'ফলিং হাউজ'

শুরু হলো ছবি। রশিদ নামের এক জেলের দারোয়ান ও তার পরিবারকে কেন্দ্র করে ছবি এগুতে থাকে। রশিদ দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারায়। এরই ভেতর সে জানতে পারে বড় মেয়ে এনসি মডেলিং করতে তুরস্ক যাওয়ার সকল ব্যবস্থা করে ফেলেছে। এদিকে এনসি যে ক্যান্সারাক্রান্ত সে খবর সে পরিবারের কাউকে জানায় না। বাবা এই দুই খবরের ভেতর জানতে পারে কেবল একটি খবর, আদরের মেয়ে মডেলিং করতে বিদেশ চলে যাচ্ছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই মেয়েকে যেতে দেবে না। এনসির মা ও ছোট বোনও চলে যায় বাবার বিপক্ষে। রশিদ বাধ্য হয়ে ওদের সবাইকে ঘরে আটকে রাখে। পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলতে চায়। তাদের ভাড়া বাড়িটি আবার হাইওয়ে সড়ক নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করেছে সরকার। কাজেই বাড়িটি ভেঙে ফেলার চাপ আসতে থাকে। রশিদ একদিকে নিজের ঘরকে বানিয়ে জেলখানা। সেখানে বন্দী তার পরিবারেরই আপনজনেরা। অন্যদিকে, নিজেদের পিতার এমন আচরণে অত্যন্ত মর্মাহত হয় কন্যারা। তারা রীতিমতো বন্দীদশার ভেতর পড়ে যায়। কিন্তু শেষে যখন রশিদ জানতে পারে এনসির ক্যান্সার, সকল জেদ ও পুরুষতান্ত্রিক জোরজবরদস্তি ভেঙে পড়ে। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় রশিদ।

ছবিটি ইরানি সমাজের নারীর অবস্থান এবং খোদ সমাজের বন্দীত্বকে তুলে ধরে। আমার দেখতে দেখতে অনেকটা ‘জীবন থেকে নেয়া’র কথা মনে হচ্ছিল। রূপকের কী অসাধারণ ব্যবহার! এ ছবিটিও যথেষ্ট শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য বহন করছে। ছবির শেষ সকলেই করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানালো। ‘মোরাগেব’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ‘হরাইজন’ বিভাগে প্রতিযোগিতা করছে।

এই ফাঁকে একটু বলে নিই কোন বিভাগ কেমন, তাদের বৈশিষ্ট্যই বা কী।

মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের নাম ‘ভেনেজিয়া ৮৩’। এটি উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা বিভাগ। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ও নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এখানে গোল্ডেন লায়নসহ বিভিন্ন পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগিতা করে। সাধারণত এ বিভাগেই সমকালীন বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলো দেখা যায়।

এর পর রয়েছে ‘আউট অব কম্পিটিশন’। মূল প্রতিযোগিতায় না থাকা, কিন্তু শিল্পমূল্য বা নির্মাণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলো এই বিভাগে প্রদর্শিত হয়। প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের নতুন ছবি, বিশেষ ধরনের চলচ্চিত্র, নন-ন্যারেটিভ কাজ এবং কখনো সিরিজ বা মিনিসিরিজও এখানে জায়গা পায়।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের নাম ‘অরিজন্তি’ বা হরাইজন। এটি নতুন নির্মাতা ও নতুন সিনেমার ভাষার বিভাগ। সমকালীন বিশ্ব সিনেমার নতুন প্রবণতা, নান্দনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন চলচ্চিত্রভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। নবাগত নির্মাতা, স্বাধীন সিনেমা এবং তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত দেশের চলচ্চিত্রের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ বিভাগে পূর্ণদৈর্ঘ্যের পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতাও থাকে।

‘ভেনিস স্পটলাইট’ হলো জঁর ও দর্শকবান্ধব চলচ্চিত্রের বিভাগ। বিভিন্ন ধরনের জঁরের চলচ্চিত্র এখানে নির্বাচিত হয়, তবে সেগুলোর মধ্যে সমকালীন বিষয় ও নির্মাণশৈলীতে নতুনত্ব থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। মূল প্রতিযোগিতার তুলনায় ছোট এই বিভাগটি নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও দর্শকের সরাসরি যোগাযোগের ওপরও জোর দেয়।

ধ্রুপদি ও পুনরুদ্ধার করা চলচ্চিত্রের বিভাগের নাম ‘ভেনিস ক্লাসিকস’। বিশ্ব চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো চলচ্চিত্রগুলোর নতুন করে রেস্টোরেশন বা পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ এখানে প্রদর্শিত হয়। বিখ্যাত মাস্টারপিসের পাশাপাশি অবহেলিত বা বিস্মৃত চলচ্চিত্রও নতুনভাবে দর্শকের সামনে নিয়ে আসা হয়। চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও সংরক্ষণের দিক থেকে এটি উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ।

‘ভেনিস ইমার্সিভ’ একেবারেই ভিন্নধর্মী বিভাগ। এখানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, মিক্সড রিয়েলিটি এবং অন্যান্য ইমার্সিভ মিডিয়ার কাজ এখানে প্রদর্শিত হয়। প্রচলিত পর্দার বাইরে দর্শককে গল্পের ভেতরে যুক্ত করার নতুন প্রযুক্তি ও চলচ্চিত্রভাষা এই বিভাগের মূল আকর্ষণ।

উৎসবের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন বিভাগ রয়েছে। একটি হলো ‘ভেনিস ক্রিটিকস উইক’। চলচ্চিত্র সমালোচকদের উদ্যোগে পরিচালিত এই স্বাধীন বিভাগটি মূলত নতুন নির্মাতা ও প্রথম চলচ্চিত্র আবিষ্কারের জন্য পরিচিত। বিশ্ব সিনেমার ভবিষ্যৎ প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে এটি ভেনিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

আরেকটি স্বাধীন বিভাগ হলো ‘জরনাতে দেল্লে অতোরো’ (অতরের দিনলিপি)। এখানে অতর বা নির্মাতাকেন্দ্রিক সিনেমা, নতুন চিন্তা এবং সাহসী চলচ্চিত্রভাষা বিশেষ গুরুত্ব পায়। এখানে দেখানো হয় প্রতিষ্ঠিত ও নতুন নির্মাতাদের ব্যক্তিগত ও সৃজনশীল চলচ্চিত্র।

তো সব বিভাগ থেকেই ছবি দেখবো, নজর থাকবে দিগন্তে, অর্থাৎ ‘হরাইজনে’। যেহেতু বাংলাদেশের ছবি আছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে এড্রিয়াটিক সাগরের দিগন্ত দেখা যায়। কারণ লিডো দ্বীপের একদিকে সাগর, অপরদিকে ভেনিসের উপহ্রদ। আমি চাই বাংলাদেশের সিনেমা বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এবার ভেনিসের উপকূলে লিডো দ্বীপে জয়ের পতাকা ওড়াক।