বন্দরের ভাঙ্গারি যেভাবে রাস্তায় মার্সিডিজ-বিএমডব্লিউ

২০০৫ সালে একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও টয়োটা করোলা বাংলাদেশে ঢুকেছিল স্ক্র্যাপ মেটাল হিসেবে। ২০১২ সালে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি এসেছিল যাত্রীবাহী লিফটের ঘোষণায়। পরে কখনো গাড়ির মডেল, কখনো ইঞ্জিন ক্ষমতা, কখনো হাইব্রিড পরিচয় বদলে শুল্ক কমানোর অভিযোগ উঠেছে। হরেক রকম ঘোষণায় আমদানির পর পরিচয় বদলে যায়। হয় নিবন্ধনও।

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

একটা মার্সিডিজ-বেঞ্জ। একটা টয়োটা করোলা। দুটো গাড়িই ঢুকেছিল বাংলাদেশে। কিন্তু কাগজে গাড়ি ছিলো না। আমদানিকারক ‘স্টিল ট্রেডিং’ ঘোষণা দিয়েছিল ৪০ ফুটের সেই কনটেইনারে রয়েছে লোহার স্ক্র্যাপ বা লোহার ভাঙ্গারি।

মজার বিষয়, আমদানিকারকের কাছে পণ্য জাহাজে aতোলার আগের পরিদর্শনের সনদও ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিলও রয়েছে।

কিন্তু কনটেইনার বাংলাদেশে আসার পর এনবিআরের কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে, চলে তল্লাশি। তাতেই বেরিয়ে আসে বিলাসবহুল মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও টয়োটা করোলা। সঙ্গে ছিলো টেলিভিশন, ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনারও।

বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। পরে হাইকোর্টের নির্দেশের পর ২০০৫ সালের ২৫এ এপ্রিল কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে শত শত মানুষের সামনে গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে সত্যিই সত্যিই স্ক্র্যাপ বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিলাসবহুল সেই গাড়ি দুটিকে।

তৎকালীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান চৌধুরী সেদিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, “গাড়ি দুটি থেকে ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত শুল্ক আদায় করা সম্ভব ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়, সে জন্য গাড়ি দুটিকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেছিলেন, তারা স্ক্র্যাপ মেটাল আনার কথা বলে কর্তৃপক্ষকে বোকা বানাতে চেয়েছিল, তাই তাদের আনা গাড়িকেই স্ক্র্যাপ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এনবিআরে এমন দৃষ্টান্তমূলক ঘটনার পর অবৈধ ঘোষণায় আনা গাড়ি আনা কি বন্ধ হয়েছে? এখানেই গল্পের আসল জায়গা। কারণ ২১ বছরও পরও সেই গল্প বদলায়নি এতটুকুও। বদলেছে কেবল কৌশল।

আর সে সব গাড়ি রাস্তায় নেমেছে আরো বুদ্ধিদীপ্ত সব আইডিয়ায়।

নতুন কৌশল

দুই দশকে কৌশলটা বদলেছে ধাপে ধাপে। কখনো গাড়িকে অন্য পণ্যের নামে আনা হয়েছে। পরে বদলেছে গাড়ির মডেল, ইঞ্জিন, দাম কিংবা প্রযুক্তির পরিচয়। আর এখন গাড়ির বড় অংশকেই দেখানো হচ্ছে কার পার্টস হিসেবে।

২০২৬ সালের অগাস্টে এমনই এক অবৈধ ঘোষণায় আনা গাড়ির রহস্য উন্মোচন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

মোংলা বন্দর দিয়ে আসা এমনই একটি চালান আটকে দিয়েছে তারা।

চালানটিতে কাগজে ছিল ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। কিন্তু পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, গাড়ি চারটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা হলেও এর শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে ১০ লাখ টাকারও কম।

চারটি গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে দামি লেক্সাস এলএক্স-৫৭০। ২০১৬ সালের এই গাড়িটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বা তারও বেশি।

বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা ঘোষণায় আসা বিভিন্ন গাড়ি।

২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগের সম্ভাব্য দাম ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

বিএমডব্লিউ ৬৫০আই প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।

আর টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলিটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

কাস্টমস এখনো বলেনি যে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ঠিক কত।

কারণ গাড়িকে স্ক্র্যাপ যেমন বলা হয়নি, তেমনি এসকেডি বা খণ্ডিত গাড়িও বলা হয়নি। বলা হয়েছে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ। যে ঘোষণায় ১৪ ধরনের পণ্য এবং ১৬৪টি প্যাকেজে আনা হয় গাড়ি চারটি।

বিষয়টি সহজ করে বুঝতে চাইলে এনবিআরের নাম প্রকাশে এক কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “ধরুন একটি গাড়ির বাম্পার আলাদা করে আমদানি করা হলো। সেটি যদি সত্যিই বাম্পার হয় এবং কাস্টমস সেটিকে বাম্পার হিসেবেই শ্রেণিবিন্যাস করে, তাহলে সেটি এক ধরনের এইচএস কোডের আওতায় যাবে।

কিন্তু একই চালানে যদি গাড়ির কাঠামোর বড় অংশ, ইঞ্জিন, তারের ব্যবস্থা, সেন্সর, সামনের-পেছনের কাঠামোসহ এমন সব অংশ থাকে, যেগুলো একসঙ্গে একটি গাড়ির মৌলিক বৈশিষ্ট্য বহন করে, তখন কাস্টমস বলতে পারে এটা আর সাধারণ ‘কার পার্টস’ নয়; এটা আসলে একটি অসম্পূর্ণ বা খণ্ডিত গাড়ি। তখন সেটা এসকেডি হিসাবে শুল্কায়ন হবে।”

অর্থাৎ দুই দশকের ব্যবধানে বদলেছে কৌশল। যার উদাহরণ রয়েছে আরও।

২০০৫-এর মার্সিডিজ থেকে ২০২৬-এর রেঞ্জ রোভার

দুই দশকের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের বাজারে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির কৌশল বদলের একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। শুরুতে পুরো গাড়িকেই অন্য কোনো পণ্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।

পরে গাড়ি একই থেকেছে, বদলেছে তার মডেল, ইঞ্জিন বা জ্বালানি ব্যবস্থার পরিচয়। আর এখন গাড়িকে বড় বড় অংশে কেটে সেই অংশকেই ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠছে।

এখন গাড়িকে বড় বড় অংশে কেটে সেই অংশকেই ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠছে।

গল্পটা শুরু করা যায় ২০০৫ সালের সেই ঘটনা দিয়ে। তখন কৌশল ছিলো খুব সরাসরি গাড়িকে অন্য পণ্য বানিয়ে ফেলা।

এর সাত বছর পর আরেক ঘটনা। ২০১২ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসের হাতে ধরা পড়ে আরেকটি চালান। 

এবারও কনটেইনারে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি একটি লেক্সাস, একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও একটি পোর্শে। কিন্তু কাগজে সেগুলো গাড়ি নয়। পণ্যের ঘোষণায় ছিলো যাত্রী বহনের লিফট।

অর্থাৎ ২০০৫ সালের ‘স্ক্র্যাপ’ বদলে এবার হলো ‘লিফট’। আমদানীর কাগজ বলছে এক জিনিস, কিন্তু কন্টেইনারের ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন।

এরপর কৌশল আরও সূক্ষ্ম হতে শুরু করে। পুরো গাড়িকে আর অন্য কোনো পণ্যের নামে চালানোর প্রয়োজন হলো না। গাড়ি গাড়িই থাকল, কিন্তু কাগজে বদলে দেওয়া হলো তার পরিচয়।

এর একটি বড় উদাহরণ ২০১৬ সালের। ওই বছর ঢাকার বনানী থেকে কাস্টমস গোয়েন্দারা একটি অডি আর৮ আটক করেন। গাড়িটির ইঞ্জিন ছিল ৫২০০ সিসির। কিন্তু মোংলা বন্দরে সেটি খালাস হয়েছিলো ২৫০০ সিসির অডি টিটি হিসেবে।

অর্থাৎ গাড়িটি যে মডেলের, কাগজে সেটি অন্য মডেল; ইঞ্জিন যত বড়, কাগজে তার চেয়ে অনেক ছোট। কাস্টমসের হিসাবে এতে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিলো।

এবার আর গাড়িকে স্ক্র্যাপ বানাতে হয়নি, লিফটও বানাতে হয়নি। গাড়িটা গাড়িই ছিল, শুধু কাগজে তার সক্ষমতা বদলে ফেলা হয়েছিলো।

২০২৪ সালে কৌশলটি আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। একটি রেঞ্জ রোভার ও একটি বিএমডব্লিউ এক্স৭’এর মতো নন হাইব্রিড গাড়িকে মাইল্ড হাইব্রিড গাড়ি হিসেবে ঘোষণা করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ ওঠে।

জানা যায়, ২,৯৯৬ সিসির হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে মোট শুল্ক প্রায় ২২১%, যেখানে নন-হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে সেটা ৪৩০% হতে পারে।

মাইল্ড হাইব্রিড হলো এমন গাড়ি, যেখানে পেট্রোল/ডিজেল ইঞ্জিনের সঙ্গে একটি ছোট বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারি থাকে। তবে এটি সাধারণ হাইব্রিডের মতো শুধু বৈদ্যুতিক মোটরে গাড়ি চালাতে পারে না বা খুব সীমিতভাবে পারে। 

অর্থাৎ গাড়ির মডেল বদলানোর পর এবার প্রযুক্তির পরিচয়ও বদলে গেলো।

কাস্টমসের হিসাবে এতে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা শুল্ক এড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল। এ ঘটনায় অটো মিউজিয়ামকে ১৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

২০২৬-এর অগাস্টে গাড়ির বড় বড় অংশ হয়ে গেলো ব্যবহৃত কার পার্টস।

কিন্তু গাড়ির পরিচয় বদলে বন্দরে ঢোকানোই শেষ নয়, এরপর আসে খালাসের পালা।

অগাস্টের শেষ সপ্তাহে আরেকটি ঘটনায় সেই চেষ্টার অন্য একটি দিক সামনে আসে। 

জাপান থেকে আসা একটি চালানে কাগজে ছিল ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ ও গিয়ারবক্সসহ ব্যবহৃত ইঞ্জিন। ১৬৭ প্যাকেজের ওই চালান ১০এ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালেও প্রায় এক মাস বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি।

পরে নিলামের মাধ্যমে খালাসের চেষ্টা হচ্ছিল বলে কাস্টমস গোয়েন্দারা জানতে পারেন। পরীক্ষা করে তারা পান লেক্সাস এএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ -এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এভাবেই নানানভাবে কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় গাড়ি।

বন্দরে অবৈধ, রাস্তায় বৈধ যেভাবে

তবে গাড়ি বন্দর থেকে খালাস হওয়ার পরই গল্পটা শেষ হয় না। কারণ সেটি রাস্তায় তুলতে লাগবে নানান কাগজ। আসল প্রশ্ন তখনই- যে গাড়ি মিথ্যা ঘোষণায় দেশে ঢুকল, সেটি রাস্তায় চলার কাগজ পাচ্ছে কীভাবে?

কারণ একটা গাড়ি রাস্তায় নামাতে হলে শুধু গাড়ি থাকলেই হয় না। দরকার আমদানির কাগজ, শুল্ক-কর পরিশোধের প্রমাণ, তারপর বিআরটিএর নিবন্ধন।

গত দুই দশকের কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, অবৈধভাবে দেশে আসা গাড়ির ক্ষেত্রে এই কাগজের বিষয়টিই হয়ে উঠেছে আরেকটি বড় ফাঁকির জায়গা। 

এ নিয়ে কাস্টমস ও বিআরটিএর বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ করে উঠে আসে নানান উদ্ভাবনী সব উদাহরণ।

অবৈধভাবে দেশে আসা গাড়ির নিবন্ধন হয়ে উঠেছে আরেকটি বড় ফাঁকির জায়গা।

চট্টগ্রাম বিআরটিএর এক কর্মকর্তা জানান ভুয়া ঘোষণায় আনা গাড়ি সাধারণত রেজিস্ট্রেশন করার কথা না। তবে বিভিন্ন সময় এমন অনেক গাড়ি পাওয়া গেছে যা বিভিন্নভাবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে।

“সাধারণত আগের কোনো গাড়ির কাগজ ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার করা হয়। অনেক সময় বিআরটিএর কর্মকর্তাদের যোগসাজসেই এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে,” নাম গোপন রাখার শর্তে আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

২০১৫ সালের একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জের ঘটনা তার এমন দাবির বড় উদাহরণ।

কাস্টমস গোয়েন্দারা যখন গাড়িটি আটক করেন, তখন সেটি নতুন করে দেশে ঢোকেনি। বরং বহু বছর ধরে ঢাকার রাস্তায় চলছিল। গাড়িটির নিবন্ধন হয়েছিল ২০০৯ সালে। শুধু নিবন্ধনই নয়, প্রতিবছর সেই নিবন্ধন নবায়নও হয়েছে। অর্থাৎ গাড়িটি একটি স্বাভাবিক, নিবন্ধিত গাড়ি।

কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দারা যখন গাড়িটির আমদানির কাগজ খুঁজতে গেলেন, তখন বেরিয়ে আসে অন্য ঘটনা।

তদন্তে অভিযোগ ওঠে, নিবন্ধনের সময় যে আমদানি বিল ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি আসলে ওই গাড়ির আমদানি বিল-ই নয়। 

অর্থাৎ গাড়িটির বৈধ আমদানি কাগজের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছিল অন্য একটি গাড়ির পরিচয়। আর সেই কাগজের ওপর ভর করেই গাড়িটি নিবন্ধন পেয়েছিল।

ওই ঘটনায় প্রায় ৩ কোটি টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির অভিযোগ ওঠে।

এর পরের বছর সামনে আসে আরও একটি ঘটনা। এবার একটি বিএমডব্লিউ এক্স৫। গাড়িটি বাংলাদেশে এসেছিল ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ সুবিধায়।

এই ব্যবস্থায় বিদেশি গাড়ি সাময়িকভাবে শুল্ক না দিয়ে দেশে আনা যায়। তবে শর্ত থাকে, নির্ধারিত সময় শেষে গাড়িটি আবার দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু এই গাড়িটি আর ফেরত যায়নি। বাংলাদেশেই থেকে যায়। শুধু থেকেই গেল না, পরে নিবন্ধনও পেলো। গাড়িটির নম্বর ছিলো ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৪-০৩৪৩। বিআরটিএর সিস্টেমে সেই নম্বরের এন্ট্রিও ছিলো। গাড়িতে নম্বর প্লেটও ছিলো। কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দারা যখন এর মূল কাগজ খুঁজলেন, তখন নিবন্ধন ফাইলটাই আর পাওয়া গেলো না।

সমস্যা ছিল গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর নিয়েও। নিবন্ধনের সময় যে ইঞ্জিন নম্বর দেওয়া হয়েছিল, মূল নথিতে পাওয়া যায় আরেক নম্বর।

অর্থাৎ রাস্তায় চলার জন্য গাড়িটির একটি নিবন্ধিত পরিচয় ছিলো। কিন্তু সেই পরিচয়ের পেছনে থাকা মূল নথিপত্র ছিলো আলাদা আরেকটি গাড়ির।

পরে ২০১৭ সালে, একই ধরনের আরেকটি ঘটনা সামনে আসে, একটি রেঞ্জ রোভারকে ঘিরে। গাড়িটি ২০১০ সালে যুক্তরাজ্য থেকে কার্নেট সুবিধায় বাংলাদেশে এসেছিল। ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও সেটিআর ফেরত যায়নি। বরং বড় শহর এড়িয়ে সেটির নিবন্ধিত নেওয়া হয়েছিলো ভোলা বিআরটিএ থেকে।

কাগজে দেখানো হয়েছিল, প্রায় ১৭ লাখ টাকা শুল্কও দেওয়া হয়েছে। শুনলে মনে হবে সব ঠিকঠাক। 

কিন্তু কাস্টমস সেই শুল্ক পরিশোধের আমদানি বিল খুঁজতে গিয়ে দেখে, চট্টগ্রাম কাস্টমসের রেকর্ডে ওই বিলই নেই। 

এমনকি গাড়িটির রঙ নিয়েও ছিল তিন রকম তথ্য। কাস্টমসের নথিতে রুপালি। বিআরটিএর নথিতে সাদা। আর তদন্তে মেলে গাড়িটি আসলে কালো রঙের।

অর্থাৎ সবগুলো কাগজ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সাজিয়ে মূল কাগজ করা হয়েছিলো।

২০২৪ সালে একটি রেঞ্জ রোভার ও একটি বিএমডব্লিউ এক্স৭কে মাইল্ড-হাইব্রিড হিসেবে ঘোষণার অভিযোগ ওঠে। কাস্টমস পরীক্ষায় সেগুলো হাইব্রিড নয় বলে ধরা পড়ে।

কাস্টমসের হিসাবে, এতে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা শুল্ক এড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল।

অর্থাৎ পুরো পথটা দেখলে কৌশলগুলো এক জায়গায় এসে মেলে। কখনো গাড়ি দেশে ঢুকেছে স্ক্র্যাপ হয়ে। কখনো লিফট হয়ে। কখনো অন্য মডেলের গাড়ি হয়ে। কখনো কম সিসির গাড়ি হয়ে। কখনোবা হাইব্রিড হয়ে।

আর এখন? গাড়ি ঢুকছে কার পার্টস হয়ে। কিন্তু বন্দরের গেট পেরোনোর পরও গল্প শেষ হচ্ছে না। কারণ একটি গাড়ি অবৈধভাবে দেশে ঢোকা আর সেটিকে বৈধভাবে রাস্তায় চালানো দুটি আলাদা ধাপ।

 সময় বদলেছে। গাড়ি বদলেছে। বদলেছে কৌশলও।

শুল্ক ফাঁকি থেকে বৈধ

তার মানে বন্দরে গাড়ির পরিচয় বদলালেই শেষ হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্নটা হলো গাড়িটা কী পরিচয়ে দেশে ঢুকল? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন, কোন কাগজের ভিত্তিতে সেটি রাস্তায় নামল?

ভুল তথ্যে বাজারে আসা একটি গাড়ি কীভাবে নিবন্ধন নেয়, সেই গল্প যেনো দিন দিন আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠছে।

কারণ একবার ভুল বা ভুয়া কাগজের ভিত্তিতে নিবন্ধন হয়ে গেলেও সময়ের সঙ্গে গাড়িটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কারণ নম্বর প্লেট থাকে। নিবন্ধন থাকে। প্রতিবছর নবায়ন হয়। গাড়ি রাস্তায় চলে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায়ও থাকে না, কয়েক বছর আগে বন্দরে ঢোকার সময় কাগজে গাড়িটির আসল পরিচয় কী ছিলো।

আর এখানেই ২০০৫-এর মার্সিডিজ-বেঞ্জ থেকে ২০২৬-এর রেঞ্জ রোভার দুই দশকের গল্পটা এসে মিলে যায় এক কাতারে।

আসলে সময় বদলেছে। গাড়ি বদলেছে। কৌশলও বদলেছে। কিন্তু মূল প্রশ্নটা বদলায়নি, গাড়িটা কিভাবে বন্দরে এলো আর কীভাবে সেটা রাস্তায় উঠলো?

তাই এই গল্প শুধু শুল্ক ফাঁকির গল্প নয়। এটা আসলে একটি গাড়ির পরিচয় বদলে যাওয়ার গল্প।