ভিম ভেন্ডার্সকে বললাম ‘মেজমারাইজিং’

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পঞ্চম দিনটা ছিলো এক সিনেমা থেকে আরেক সিনেমায়, এক বাস্তবতা থেকে আরেক বাস্তবতায় হাঁটার দিন। যুদ্ধের পর নারীর শরীর ও পরিচয়ের লড়াই, ভিম ভেন্ডার্সের চোখে ঘর ও স্থাপত্যের দর্শন, তারপর থাই পুরাণ আর রাজনীতির অন্ধকার জগৎ।

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ পিএম

ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই লিখছিলাম। লেখার যন্ত্রে চলছে ভৈরবী রাগ। ধীরে ধীরে ভেনিসের আকাশে আলো ফুটতে শুরু করলো। দূরে কোথাও ঘুঘু পাখি ডেকে চলেছে। আমি প্রতিদিনের জার্নাল শেষ করে তৈরি হয়ে বের হলাম। কানে তখন সুরসূধা ঢালছে পুরোনো বাংলা গান। মাঝে মহীনের ঘোড়াগুলিও ডেকে গেলো। জলেস্থলে দোলা দিতে দিতে বাহনগুলো আমাকে উৎসবে পৌঁছে দিল। ‘পারফেক্ট ডেইজ’ থেকে উঠে আসা একটা দিন যেন।

উৎসবের পঞ্চম দিন। ফেস্টিভাল ভিলেজে ঢুকে নাস্তা সারবো ভেবেই এসেছি আজ। নিয়মিত দোকানে গিয়ে আজ সেদ্ধ ডিম আর স্যামন মাছসহ সবুজ সালাদ নিলাম। এই ক’দিন স্যান্ডুইচ আর রুটি জাতীয় খাবার খেতে খেতে পেটে চড়া পড়ে যাওয়ার দশা। খাবার নিয়ে বাইরের টেবিলে বসে বসে খাচ্ছি আর রোদ পোহাচ্ছি। দেখি অনুরাগ কশ্যপও এসেছেন, হাতে খাবার। সঙ্গে এক ভদ্রমহিলা। কুশল বিনিময় করলাম। আমি আমার খাবার শেষ করে চলে গেলাম ‘সালা গ্রান্দে’তে। মেই এল-টুখি পরিচালিত মূল প্রতিযোগিতায় থাকা ডেনমার্কের ছবি ‘উইম্যান আননোউন’ দেখব আজ।

ছবি শুরু হলো ‘উইচ হান্টিং’য়ের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পর বিভিন্ন দেশে নারীর যে শারীরিক ও মানসিক নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার খোঁজ ক’জন রেখেছে। দখলদার সেনাবাহিনী শুধু দেশ দখল করে না, তারা নারীর শরীরকে কর্ষণযোগ্য জমিন ভাবে। আর তাদের বিষাক্ত বীজের ভার নারীকে বহন করতে হয়। তেমনি এক নারীর গল্প আমরা দেখি এই ছবিতে। মূল চরিত্রের নাম মারি। বাড়ি ফেরার পথে সে একদিন দেখতে পায় রাস্তায় এক নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অভিযোগ—জার্মান সেনার রক্ষিতা ছিলো নারীটি। প্রচণ্ড ঘাবড়ে যায় মারি। ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ ক্রিস্টিয়ানের বাড়িতে ন্যানির কাজ করে সে। কিন্তু সম্প্রতি বাড়ির মালিক ক্রিস্টিয়ান তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। বিয়ের আগে অবশ্য মারির গর্ভে ক্রিস্টিয়ানের সন্তান চলে এসেছিল। সেই সন্তানকে নষ্ট করতে হয়।

এই বিয়ের প্রস্তুতির ভেতরেই কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে যায় মারির স্কুলের এক সহপাঠীর সাথে। সেই ছেলে এখন কে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ছিলো সেটি খুঁজে বের করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। মূলত সে বাউণ্ডুলে ও বেকার। টোকাই বলা যেতে পারে। তো সেই টোকাই গায়ে পড়ে মারির বাড়ি পর্যন্ত চলে আসে এবং তার অতীত ফাঁস করে দেওয়ার কথা বলে হুমকি দিতে থাকে। যুদ্ধের সময় মারিও জার্মান সেনাদের ক্যাম্পে ছিল এবং তখন তার গর্ভে একটি সন্তান এসেছিল। শিশুটে বেঁচে নেই। কিন্তু এই টোকাই প্রতিহিংসা থেকে এক রাতে মারির মালিকের বাড়ির সদর দরজায় ফ্যাসিবাদী হিটলারের স্বস্তিকা এঁকে দিয়ে আসে। তারা এভাবেই ‘উইচ হান্ট’ করতো।

ডেনমার্কে সেরকম এক তুমুল অস্থির সময়ে মারি মরিয়া হয়ে নিজের সত্যকে গোপন করে। সে নতুন পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়। সে নতুন নিশ্চিত জীবন চায়। সেটার জন্য যত দূর যাওয়া সম্ভব মারি ততটুকুই যায়। ছবিটি মনে করিয়ে দেয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। যুদ্ধশিশু ও নির্যাতিতা নারী, বীরাঙ্গনাদের কথা। বেলারুশের লেখক স্বেতলানা আলেক্সেইভিচ তার ‘দি আনউইম্যানলি ফেইস অব ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন “যুদ্ধে নারীর কোনো মুখাবয়ব হয় না।” এই ছবিতেও আমরা দেখি মারি যেন নিরবে নিভৃতে থাকা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় নির্যাতিত সত্তা। যুদ্ধকালে শত্রুসেনা তার শরীর চায়। যুদ্ধের পর চাকরিদাতা তার শরীর চায়। আর সুযোগ সন্ধানীরা নারীর শরীর সম্ভোগ করতে পারে না, আর পারে না বলে নারীকে ঘৃণা ও হিংসা করতে থাকে। নারীর শরীর যে এভাবে এক ভিন্ন যুদ্ধের ময়দান হয়ে উঠতে পারে তা চমৎকার বয়ানে দেখিয়েছেন পরিচালক। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে ছবিটি।

ছবিতে একটা জায়গার সংলাপ তো দুর্দান্ত। মারি ও ক্রিস্টিয়ান কথা বলছে। মারি প্রশ্ন করছে, “যুদ্ধের সময় যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী ছিল তারা যদি অপরাধী হয়, তাহলে তিনি তো সেই সময়ে ব্যবসা করেছেন, জার্মান সেনাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন, তাহলে তার সেই উপার্জিত অর্থ কেন নির্দোষ থাকবে?” ক্রিস্টিয়ান এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেনি। কারণ অর্থের আগমনকে খুব কম লোকই নৈতিকতার মানদণ্ডে ফেলে বিচার করে। পয়সা এলেই হলো। সেটা দুর্নীতি করেই হোক, আরে লুট করেই হোক।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পঞ্চম দিনে উৎসব প্রাঙ্গণের সিনেমাময় আবহ। ছবি: বিধান রিবেরু

ছবিটি যে কোনো দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে বাধ্য। যাক! আজ প্রথমেই একটা ভালো ছবি দেখলাম। ঘড়িতে দেড়টা বাজে। একই প্রেক্ষাগৃহে দুপুর দুটায় আরেকটা ছবি আছে এবং সেটি বিশ্বখ্যাত জার্মান পরিচালক ভিম ভেন্ডার্সের ‘ফ্রম ইনসাইড আউট-দ্য আর্কিটেকচার অব পিটার জুমথর।’ তো আমি বাইরে খাবারের সন্ধান করে আবার ঢুকতেই জানতে পারলাম ছবিটি স্বয়ং ভিম ভেন্ডার্সও দেখবেন আমাদের সাথে বসে। এবং তিনি আসছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম, এরকম একজন কিংবদন্তিকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ হবে। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম হলের বাইরে। প্রায় মিনিট পনেরো পরে ছবির সবাইকে নিয়ে গ্র্যান্ড হলের ভেতরে লাল গালিচায় হেঁটে হেঁটে ভিম ভেতরে ঢুকলেন। পরনে সাদা পোশাক। বেশ উৎফুল্ল মনে হলো তাকে। ততক্ষণে ভেতরে অনেক দর্শক ঢুকে আসনে বসে পড়েছে। আমি ভাবছি, ভিমের আসা ভিডিও করতে গিয়ে আজ এত দেরিতে ঢুকছি, নিশ্চয় ভেতরে সামনের দিকে পঁচা সিট পাবো। যাক, সমস্যা নেই, কাছ থেকে তো ভেন্ডার্সকে দেখা গেল। কিন্তু আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য।

হলের ভেতরে ঢোকার মুখে দ্বাররক্ষী আমাকে বলে দিলো আমি যেন উপরে ব্যালকনিতে চলে যাই। তার মানে ওরা প্রথম আসা ভিড়কে নিচে বসিয়েছে। হলে ঢুকে দেখি ব্যালকনিতে আসন রাখা হয়েছে পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের জন্য। আর আমি সেখানেই বসবো। এত কাছাকাছি বসে এই মায়েস্ত্রোর ছবি দেখবো এই অনুভূতিটাও দারুণ। ছবি শুরু হলো। ছবিটি উন্নত প্রযুক্তির থ্রিডি ছবি। তাই সবার হাতেই একটা করে কালো চশমা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ছবি শুরুর ঠিক পাঁচ মিনিট পর ভিম দাঁড়িয়ে গেলেন, ছবি বন্ধ করালেন। বললেন, ছবিটির অনুপাত বা পর্দার কোথায় কি যেন ঝামেলা হচ্ছে। ক্ষমা চাইলেন। প্রজেকশন রুমকে বললেন ছবিটা ঠিকঠাক করে আবার চালু করতে। ছবি শুরু হলো আবার।

এই বুড়ো বয়সে এসে কেন ত্রিমাত্রিক ছবি বানাতে গেলেন ভিম, সেটির উত্তর ছবির ভেতরেই রয়েছে। তিনি চেয়েছেন প্রিটজকার পুরস্কারজয়ী, বিশ্বখ্যাত সুইস স্থপতি পিটার জুমথরের যে স্থাপত্য শৈলী সেটার ভেতরে যেন দর্শক প্রবেশ করতে পারে। অনুভূতি দিয়ে। আবেগ দিয়ে। প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা এই প্রামাণ্যচিত্রে ভিম জুমথরের স্থাপত্যকলা ও ভাবনার ভেতর দিয়ে মানবসভ্যতার যে আশ্রয় বা বাড়ির ধারণা সেটিকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। আবাসের ভেতর কেবল মানুষ থাকে না, স্থান ও কালও থাকে। চৌদ্দ বছর ধরে জুমথরের কাজ অনুসরণ করেছেন এবং করেছেন দার্শনিক অনুসন্ধান। তার ফল এই ‘ফ্রম ইনসাইড আউট’। 

জুমথর যে বাড়িতে থাকেন, সেই বাড়ি নকশার পেছনের দর্শনভাবনা যেমন দর্শক জানতে পারে, তেমনি তারা জানতে পারে লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশাল অ্যামিবা আকৃতির ডেভিড গেফেন গ্যালারি নির্মাণের পেছনের গল্প। বরাবরই জুমথর প্রকৃতির কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কাজ করেছেন। প্রকৃতির সাথে মিলমিশে মানুষের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। ভেন্ডার্স এই ছবিতে দেখান, স্থাপত্য কেবল ইটকাঠের তৈরি ভবন নির্মাণ নয়, এটির সাথে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্মৃতি আর প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধনের চেষ্টা।

স্থপতি পিটার জুমথর (বামে) ও জার্মান চলচ্চিত্রকার ভিম ভেন্ডার্স। ছবি: বিধান রিবেরু

ভেন্ডার্স তাই বলেন, “আমরা সবাই বাড়িতে বাস করি। আমরা সেগুলোকে ‘ঘর’ বলি, কারণ সেগুলো আমাদের সুরক্ষা দেয় এবং আমাদের পরিবার ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রাখে। আমাদের স্মৃতিগুলোও সেখানে সঞ্চিত হয়। তারা আমাদের জীবনের কাহিনি নির্মাণে, আমাদের পরিচয় গঠনে সাহায্য করে। আমরা ঘরে খাই, ঘুমাই ও স্বপ্ন দেখি; সেখানেই বড় হয়ে উঠি এবং আমাদের সন্তানদেরও বড় করে তুলি। আমরা অফিসে কাজ করতে যাই, জাদুঘরে শিল্প উপভোগ করি এবং গির্জায় প্রার্থনা করি। আমাদের জীবনের অনেকটা সময় আমরা ঘরের ভেতরেই কাটাই। ঘর আমাদের জীবনের পরিসর ও শর্ত নির্ধারণ করে। অথচ আমাদের অধিকাংশই ভবন, বাড়ি বা ঘর সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না, ‘স্থাপত্য’ সম্পর্কে তো আরও কম জানি। আমরা সাধারণত এগুলোকে খুব একটা নজরে নেই না। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমি সেই দিকটাতেই নজর ঘুরাতে চেয়েছি।”

এই নজর ঘোরানোর জন্যই ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দর্শকের অনুভূতিকে তিনি বাস্তবের আরো কাছাকাছি নিয়ে যেতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন একটি চিন্তাশীল স্থাপত্য কেমন করে মানুষকে প্রভাবিত করে। পিটার জুমথর বেশ বাছাই করে কাজ করেন। সময় নিয়ে কাজ করেন। তিনি আজকের বিশ্বে এক বিস্ময়কর স্থপতি। এমন নামকরা মানুষের কাজকে তুলে ধরছেন আরেকজন মাস্টার। এবং এই দুজনই আবার ছবিটা দেখার জন্য উপস্থিত এই ভেনিসে। আমাদের চোখের সামনে। ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আর কী বলবো, এরকম শক্তিশালী প্রামাণ্যচিত্র বহুদিন পর দেখলাম। আর ত্রিমাত্রিক প্রামাণ্যচিত্র এবারই প্রথম দেখলাম। ছবি শেষ হওয়ার পর সকলে দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করলো। কুড়ি মিনিট ধরে চলল অভিনন্দন জানানো। আমি যেহেতু অনেক কাছেই ছিলাম, প্রচুর ছবি তুললাম। ভাবলাম একবার উনার সাথে করমর্দন করে ছবিটার জন্য ধন্যবাদ না জানালে অন্যায় হবে।

সব দর্শক একটা সময় ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করল। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছি, কখন ভেন্ডার্স বের হবেন। তো সেই সুযোগ এলো আমার সামনে। ভেন্ডার্স একেবারে আমার সামনে এসেই দাঁড়ালেন। আমি সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে পরিচয় দিলাম। একবার আমার হাত ধরে ফেলায় দেহরক্ষীরা আর কিছু বললেন না। আমি ভেন্ডার্সকে বললাম, “দেখুন আমি সুদূর বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আপনি আজ যে ছবিটি উপহার দিলেন সেটি মেজমারাইজিং। আপনাকে অত্যন্ত ধন্যবাদ।” ভেন্ডার্স অমায়িকভাবে হেসে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি আপনার সাথে একটা ছবি তুলতে পারি?” উনি সানন্দে অনুমতি দিলেন। আমি দ্রুত দুটি ছবি তুললাম, যাকে বলে সেলফি।

মনটাই ভালো হয়ে গেলো। আমার বাসনার ডানা যেন দুপাশে প্রসারিত হয়ে গেছে, আর আমি উড়তে শুরু করেছি। হল থেকে বেরিয়ে এসে ভাবলাম এবার দানাপানি দরকার। বিকাল সোয়া চারটা বাজে। কিছু একটা খেয়ে প্রেস এরিয়ায় গিয়ে বসলাম। লিখলাম। ফোনে জরুরি কথা সারলাম। পরের ছবি ওরিৎজন্তি বিভাগে থাকা থাইল্যান্ডের ছবি ‘দি বার্নিং জায়ান্টস’, পরিচালনা করেছেন ফুত্তিফং আরুনফেং।

ছবিটি থাইল্যান্ডের রাজনীতি, লোকশ্রুতি, পুরাণ ও সামাজিক গল্পের এক মিশেল। এতে দেখানো হয় পশ্চিম থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলে রহস্যময় ধোয়ার কারণে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সংক্রামক রোগ। এজন্য বনরক্ষীরা সন্দেহ হলেই সব পুড়িয়ে দিচ্ছে, যেন রোগের জীবানু ছড়াতে না পারে। কাউকে কাউকে রাখছে আলাদা ঘরে। তেমনি এক সন্দেহভাজন পাহাড়িকে তারা আটক করে। এক পর্যায়ে তাকে বনরক্ষীরা গুলি করে মেরে ফেলে। এই পাহাড়ি লোকটার স্ত্রীও মারা পড়ে তারই বোনের প্রেমিক, সেও বনরক্ষী, তার গুলিতে। আর এখান থেকেই ছবি চলে যায় ভিন্ন জগতে। দেখা যায় ধোঁয়ার উৎস গভীর বনের ভেতর থাকা এক পরিত্যক্ত রঙ্গশালা। যেখানে মঞ্চস্থ হচ্ছে সীতাকে অপহরণের পর রাম ও রাবণের যুদ্ধ। তো সুর ও অসুরের সেই লড়াই থেকে এক অসুর পালিয়ে, বন-পাহাড় ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। মিশে যায় মানুষের ভিড়ে।

থাইল্যান্ডে প্রায়ই গুম হয়ে যাওয়া মানুষ ও রাজনীতিকে মাথায় রেখে পরিচালক শেষ পর্যন্ত বলতে চান, “মানুষেরই মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!” দুনিয়াতে অসুরদের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করতে করতে নিজেরাও অসুর হয়ে যাচ্ছে। খুবই আগ্রহব্যঞ্জক চলচ্চিত্র।

তো লিডো দ্বীপ থেকে মিরানিসের পিয়ামন্তে পর্যন্ত যাত্রার কথা আর না বলি। শুধু বলি, এদিন রাতে এক বাংলাদেশি দোকান আবিষ্কার করেছি। অ্যাপার্টমেন্টের অদূরেই। পুরান ঢাকার মানুষ, নাম রাসেল। ইতালিতে আছেন প্রায় ২৪ বছর। তার ভেতর ১৮ বছর কাটিয়েছেন সেই লিডো দ্বীপেই। ওখানে পিৎজা বানাতেন। কাজেই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে তিনি বেশ ভালো করেই জানেন। দেখলাম কে কবে কোনদিন আসছেন উৎসবে সেসব খোঁজখবরও রাখেন। উনার দোকান থেকে রাতের খাবার কিনলাম। বললেন, “একদিন সময় করে আসবেন ভাই, কফির দাওয়াত রইল।” আমি দাওয়াত গ্রহণ করবো বলে বিদায় নিলাম।