উৎসবে এসে এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর প্রিমিয়ার, রুবাইয়াত হোসেনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে আলাপ, ফিলিস্তিনের গল্প। সবকিছুর পর দিন শেষে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা উৎসবের অভিজ্ঞতাকেই বদলে দিলো।

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

“দেশের অবস্থা তো ভালো না। এখানে নিশ্চিন্তে আছি। দেশে তো কোনো কিছুর বিচার নাই। আমি তো পঁচিশ বছর ধইরা আছি এখানে, দেখছি কোনো আমলেই দেশ ভালো ছিল না।” কথাগুলো বলছিলেন এক প্রবাসী বাংলাদেশী। আমরা রাতের শেষ বাসের যাত্রী দুজন। উঠেছি পিয়াৎজেল রোমা থেকে। বাস বোঝাই যাত্রী দিয়ে। তার ভেতরেই গায়ে গা লেগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম দেশে যান না ভাই? উত্তরে তিনি এসব কথাই বলছিলেন। হতাশা আর হতাশা!

আমরা যারা দেশে থাকি, তাদের উভয় সঙ্কট। সত্যি, দেশে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। কোনো সভ্য দেশে অনবরত দিনেদুপুরে ব্যাংক থেকে টাকা চুরি, বাইরে ছিনতাই, খুন, কোপাকুপি, পুরো পরিবার সুদ্ধ হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে না। মব কালচার নেই। ধর্মীয় উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িক হামলা নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের উপর বলাৎকার নেই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যখন তখন বন্ধ করে দেওয়া নেই। রাস্তাঘাটে নারীদের উপর নীতি-পুলিশের ঝাপিয়ে পড়া নেই। মোটা দাগে জানমালের অনিরাপদ বোধ নেই। আপনি শুধু নিয়ম ভাঙবেন না। অন্যের সমস্যা বা ক্ষতি করবেন না। ব্যস! আর বিদেশে আপনার পরিবার-পরিজন নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব নেই। সবচেয়ে বড় কথা আমার ভাষা ও ভাষার আনুষাঙ্গিক সকল কিছুর উপস্থিতি নেই। কাজেই এ সত্যি উভয় সঙ্কট। দেশে সুখ আছে, কিন্তু শান্তি নেই। বিদেশে শান্তি আছে, কিন্তু সুখ নেই। এখন অবশ্য বিদেশেও মব কালচার শুরু হয়েছে এবং সেটার প্রবর্তকও বাংলাদেশিরাই।

উৎসবের ষষ্ঠ দিন আজ। লিডো দ্বীপে আসতে আসতে জানতে পারলাম অভিনয়শিল্পী আজমেরি হক বাঁধন আজ দ্বীপ ছেড়ে যাচ্ছেন। তবে থাকবেন ভেনিসেই। উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে আসবেন। বললাম, আলাপ ডট নিউজের জন্য একটা প্রতিক্রিয়া দিয়ে যান। এই যে প্রিমিয়ার হলো ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে’র। উনি সানন্দে রাজি হলেন। আমাকে ইন্টারভিউ দিয়েই লঞ্চে উঠবেন। আমি দ্বীপে নেমে জানালাম এসেছি। বাঁধন সব গুছিয়ে নিচে নামলেন। দেখি তিনি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের টিশার্ট পরে আছেন। হোটেলের সামনেই এক ক্যাফে শপে বসে ইন্টারভিউ সেরে নিলাম। তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে আমার দৌঁড়ানোর পালা। পৌনে এগারোটার বেশি বাজে। একটা বাস এলো বটে। অনেক মানুষ উঠল। ভেন্যুর কাছে নেমে জিমে জগিং করার অভ্যাসটি কাজে লাগালাম। পিঠে কমপক্ষে পাঁচ কেজি ওজন নিয়ে ‘সালা গ্রান্দে’ না আসা পর্যন্ত থামলাম না, দৌড় অব্যাহত রাখলাম। ঠিক এক মিনিট আগে হলে ঢুকলাম। দেখি এখনো হলে বাতি বন্ধ করা হয়নি। বসার সাথে সাথে দরদর করে ঘামতে থাকলাম।

শুরু হলো ‘লেস্ত্রানিয়া’ বা ‘দি স্পাইরাল’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ইতালির নির্মাতা পাওলো স্ত্রিপ্পোলি। মূল প্রতিযোগিতায় থাকা ছবিটি সত্যি সত্যি প্রতিযোগিতা করার মতো ছবি। আধভৌতিক ফ্যামিলি থ্রিলারের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ডার্ক কমেডি। ছবির মূল চরিত্র মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জেসমিন ত্রিংকা। অসাধারণ অভিনেত্রী। ইতালিয় এই অভিনেত্রীর আরো একটি ছবি উৎসবেই দেখলাম। খ্যাতিমান নির্মাতা ন্যান্নি মরেত্তি পরিচালিত ‘ইট উইল হ্যাপেন টুনাইট’ ছবিতে। দুজায়গাতেই অনবদ্য তিনি। জেসমিন ত্রিংকার প্রেমে পড়ে গেলাম। ‘দি স্পাইরালে’র ভেতরে জেসমিন মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। দেখা যায় তিনি তার পরিবারের সকলকে রক্ষা করতে চায় যমদূতের কাছ থেকে। যমদূত এখানে আবার একজন নারী। তো মৃত্যু নিয়ে দর কষাকষি করতে থাকে এই মা। এটি করতে করতে একসময় সে নিজেই নিহত হয়। করুণ মৃত্যু যাকে বলে। এরিস্টটলের ভাষায় ট্র্যাজেডি বলা যেতে পারে। কিন্তু ছবিতে গাঢ় কৌতুক বা ব্ল্যাক কমেডি ছিলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। একটা জিনিস দেখলাম ইতালীয় অনেক ছবিতেই এই কৌতুক বা হাস্যরস ব্যাপারটা থাকে, ছবি যত সিরিয়াস বিষয় নিয়েই হোক না কেন এরা জীবনের কৌতুক মুহুর্তটাকে ভোলে না। ফেদেরিকো ফেলিনির কথা মনে পড়ে গেলো।

ছবি শেষ হওয়ার সাথে সাথে বেরিয়ে এলাম হল থেকে। কল করলাম রুবাইয়াত হোসেনকে। দি ডিফিকাল্ট ব্রাইডে পরিচালক। আজ আমার সাথে বসার কথা। ইন্টারভিউ নেবো। ‘সালা জিয়ারদিনো’র সামনেই আছেন জানালেন। আমি গিয়ে দেখি তিনি একটি সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে আসা একাত্তর টিভিকে। আমি পাশেই একটা জায়গা ঠিক করলাম সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। রুবাইয়াত ওই সাক্ষাৎকার শেষ করে বসলেন আমার সামনে। আমি একে একে তার কাছ থেকে চলচ্চিত্রে ফিমেইল গেইজ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। পুরুষদের নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলাম। রুবাইয়াত গুছিয়ে সবগুলোর উত্তর দিলেন।

দিন যত গড়াচ্ছে তিনি নারীদের সাথেই কাজ করতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এখন তার টিমে অধিকাংশই নারী। আর পুরুষদের ফিমেইল গেইজ বা নারীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে গেলে সেই মাত্রা অর্জন করতে হয় বলে মনে করেন রুবাইয়াত। আরো অনেক বিষয় নিয়ে কথা হলো। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ, ঋত্বিক। সাথে রুবাইয়াতের বোনও ছিলেন। কী ছবি দেখছি, কেমন লাগছে ইত্যাদি আলাপ। তারপর একটা সময় বললাম, আমার এবার যেতে হবে। ছবির স্ক্রিনিং আছে। রুবাইয়াত বললেন, ডিফিকাল্ট ব্রাইড নিয়ে যেন কিছু লিখি। উত্তরে বললাম, এরই মধ্যে আমার নিয়মিত জার্নালে লিখেছি ছবিটি নিয়ে। তবে আলাদা করেও লিখব।  

যেখানে সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। তার পাশের ‘সালা জিয়ারদিনো’তেই পরবর্তী ছবির প্রদর্শনী। ফিলিস্তিনি পরিচালক মুয়াইয়াদ আলাইয়ানের ছবি ‘কনভারসেশন উইদ দ্য সি’। ভেনিস স্পটলাইট বিভাগে থাকা ছবিটি রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত অত্যন্ত বলিষ্ঠ ছবি। এখানে দখলকৃত ফিলিস্তিনিদের প্রাত্যতিক যাতনার বিষয়টি পেছনে রেখে বলা হয়েছে এক পিতার কুড়ি বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজ করার গল্প। সে জানে ছেলেটি আর বেঁচে নেই, কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল সেটা তার জানা জরুরি। 

জেরুজালেমে ৬০ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি একজন মানুষ, নাম কামাল, তাকে একটি ইসরায়েলি আদালত ছেলে ওয়ায়েলের নামে বকেয়া থাকা বিপুল পরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তা ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ওয়ায়েল দুই দশক আগে লোহিত সাগরে ডুবে মারা যায়। তার মৃত্যুর কোনো সরকারি নথি খুঁজে না পাওয়া যাচ্ছিল না। পিতা হিসেবে কামাল বহুদিন পর অনুভব করে ছেলের মৃত্যুর রহস্য তার জানা দরকার। কামাল তাই মরিয়া হয়ে খুঁজতে থাকে সেই নারীকে, যার নাম রয়েছে এম্বুলেন্সে তোলা লাশের নথিতে।

এই ছবিতে ইসরাইরি ও ফিলিস্তিনি, দুই দিকেরই ভালো ও খারাপ মানুষ দেখানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বলিষ্ঠভাবে দেখানো হয়েছে দেয়াল আর অধিকৃত ভূমি। ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার আকুতি এই ছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। তাই অনেকটা জায়গা জুড়ে আমরা দেখি শহরের মাঝখান দিয়ে উঠে গেছে দখলের দেয়াল আর তাতে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার দেয়াল লিখন। এই ছবি যেন আমাদের দেয়ালে লেখা কথা পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।

এই ছবির কাহিনি মূলত পরিচালক আলাইয়ানের পারিবারিক ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নিজে লিখেছেন। আর তাতে মিশিয়ে দিয়েছেন জেরুজালেমের জটিল, দমবন্ধ করা অথচ সমৃদ্ধ জীবনের দৃশ্যপট।

পরিচালক ছবিটি নিয়ে বলেন, “জেরুজালেমে বড় হয়ে ওঠা সহজ ছিল না, কিন্তু এটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক অভিজ্ঞতা, যা জীবন এবং আমার চারপাশের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গভীর ভূমিকা রেখেছে। জেরুজালেম যেন ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে সবসময়। প্রতিদিনই সেখানে সৈন্য ও সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীদের মুখোমুখি হতে হয়। পবিত্র এই শহরে বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং মানুষকে নিজেদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা নিত্যদিনের দৃশ্য। আপনার চারপাশের মানুষজনকে ক্রমাগত গ্রেপ্তার, আহত ও নিহত হতে দেখবেন।

“পরিবেশটাই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সহিংসতা ও ভয়ের পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। তবু এখানকার জীবন যতই অন্ধকার হোক, সবাইকে বেঁচে থাকতে হয়, ভালোবাসতে হয়, শ্বাস নিতে হয়, সুখের সন্ধান করতে হয়, জীবিকা নিশ্চিত করতে হয় এবং সামনে তাকিয়ে থাকার মতো কোনো কিছুর খোঁজ করতে হয়।”

পরিচালক জেরুজালেমকে ভালোবাসেন। আর ভালোবাসেন বলেই মৃতপ্রায় শহরের জন্য এলিজি রচনা করেন। তিনি বলেন, “এই ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমার একমাত্র ঘর এবং একমাত্র শহরকে লেখা ভালোবাসা ও ঘৃণা মেশানো একটি চিঠি। জেরুজালেম একসময় যেমন ছিল, তার জন্য নস্টালজিয়া, আর তাকে জোর করে যে রূপ দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য শোক।”  

ছবি দেখা শেষ করে আজকের দিনটাতে একটু সময় পাওয়া গেছে। লিডো দ্বীপেরই একটি সুপারশপ থেকে খাবার কিনলাম। কিছু অলংকারও কেনা হলো। এরপর বাড়ি ফিরতে ফিরতেই দেখি এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেছে। অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধনের উপর হামলা হয়েছে। সে তার ভাইয়ের পরিবারের সাথে বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিল মেস্ত্রে অঞ্চলে।

বাঁধনকে সকালে লঞ্চে তুলে দিয়েছিলাম। আর এখন দেখি লাইভে এসে বাঁধন এসব বলছে। একটু পর দেখি অন্য আরো ভিডিও, তাকে হেনস্থা ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। বাঁধনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে আমার ও আপনার অনেক তফাৎ থাকতে পারে, কিন্তু কেউই তার উপর শারীরিক ও মানসিকভাবে এভাবে হামলা ও অপমান করতে পারে না। অত্যন্ত বিমর্ষ লাগলো। আমি মুন্নী সাহার উপর মবকে পছন্দ করিনি। আজমেরি হক বাঁধনের উপর মবকেও পছন্দ করছি না। আর কি বলবো, চলচ্চিত্র উৎসবে তো আরো বহুবার, বহু জায়গাতে গিয়েছি, কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন আচরণ এর আগে কখনো দেখিনি।

সকলের সুমতি হোক।