ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের রেড কার্পেট থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, মেস্ত্রের একটা পার্ক। সোমবার রাত। সেখানে হাঁটছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, তার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে, সঙ্গে ভাইয়ের ছোট্ট সন্তানও। কয়েক ঘন্টা আগেও তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অংশ, রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার টিমের সাথে; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে উৎসবটি অরিজোনতি ক্যাটাগরিতে।
আর সেই রাতেই পার্কে বাঁধনকে ঘিরে ধরে একদল মানুষ, যারা বাংলাতেই কথা বলছিলো, নিজের পরিচয় দিচ্ছিলো বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থক হিসাবে।
অভিনেত্রী বাঁধনের জন্য চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করাটা এবারই প্রথম না। ২০২১ সালে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দিয়ে কান ফেস্টিভ্যালে আঁ সেত্রাঁ রিগা ক্যাটাগরিতে জায়গা করে নিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অন্যতম মাইলফলকের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
এবারও ভেনিসে গিয়েছিলেন একই পরিচয়ে, বাংলাদেশের সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একজন প্রতিনিধি হিসেবে। ঠিক সেই পরিচয়টাকেই লক্ষ্য করেই যেন সোমবার রাতের ঘটনাটি ঘটানো হলো।
বাঁধনের সঙ্গে যা ঘটেছিলো

বাঁধনের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘিরে ধরা মানুষগুলো তার গায়ে পানি-কোক ছুঁড়ে মারে, তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে; কানের কাছে আঘাতও করা হয়। তাকে দিয়ে জোর করে “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” বলানো হয়–মোবাইল তাক করে লাইভ করার চেষ্টা করতে করতে।
সোমবার রাতের ঘটনার পরপরই ফেইসবুক লাইভে এসে বাঁধন বলেন, তাকে “দমানো সহজ নয়”।
“তারা আমার গায়েও হাত তুলেছে। আমার ফোন ফেলে দিয়েছে, আমার কানের এখানে বাড়ি মেরেছে।”
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল ব্যক্তি বাঁধনের দিকে পানি ছুঁড়ছে। তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণও করা হয়। সেসময় বাচ্চা কোলে এক ব্যক্তিকে আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।
ঘটনাস্থলে ওই ব্যক্তির স্ত্রীও ছিলেন, যিনি আক্রমণকারীকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। বাঁধন তার ফেইসবুক পোস্টে তাদেরকে তার ভাই ও তার পরিবার বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

আক্রমণকারীদের একজনকে বলতে শোনা যায়, “এই যে জুলাই জঙ্গি! যিনি দেশের বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে... এই যে দেখতেই পাচ্ছেন, ভেনিসে আছে। আমরা ভেনিস ছাত্রলীগ। এই ডিম আনো! ডিম আনো! …আমরা দেশদ্রোহী জঙ্গি, এই জঙ্গি; আমরা তাকে গোসল করিয়ে দিয়েছি।”
ওই ব্যক্তি বলতে থাকেন, “ওরা দেশটা ধ্বংস করছে! আজকে প্রত্যেকটা জায়গায় মানুষের লাশ পাওয়া যায় বাংলাদেশে! কোনো মানুষের শান্তি নাই!”
এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমরা ইতালির ছাত্রলীগ! আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক! বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে ওরা যাবে, আমরা তাদের প্রতিহত করব! জুলাই জঙ্গি! তুই জঙ্গি! জঙ্গি! ডলারে বিক্রি হয়েছিলো, ডলারে।”
‘এইটার শেষ আমি দেখে ছাড়বো’
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর পৌনে দুইটার দিকে ফেইসবুক লাইভে অভিনেত্রী বাঁধন জানিয়েছেন, তিনি হামলাকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করেছেন এবং বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও তার সাথে যোগযোগ করা হয়েছে।
“…আমাদের অ্যাম্বাসেডর সাহেব ফোন করেছিলেন। অ্যাম্বাসি থেকে লোক এসেছে, উনাদের সাথে আমি থানায় যাচ্ছি কেইস ফাইল করতে। অলরেডি অনেককে আইডেন্টিফাই করেছি। আমাদের প্রাইম মিনিস্টারের অফিস থেকেও যোগাযোগ করেছে।”
তার বিপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাঁধন বলেন, “আমি জুলাইয়ের গণঅভূত্থ্যানে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। যেটা আমি মনে করি যে, আমার জীবনে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি এবং আমি একজন গর্বিত জুলাইযোদ্ধা।”
তাকে “ভয় দেখানো, ভেঙে ফেলা এতো সহজ না”, মন্তব্য করেন তিনি বলেন, “শুধুমাত্র আমি, আমার ভাই, তার পরিবার, তার ছোট বাচ্চা, যেভাবে হ্যারাসড হয়েছে, সেইটার জন্য আমি মারাত্মকভাবে আসলে আপসেট।”
পুরো ঘটনাটিকে ‘ন্যক্কারজনক’ আখ্যা দিয়ে, বাঁধন বলেন, “কেইস ফাইল না করে ভেনিস থেকে আসছি না। এইটার শেষ আমি দেখে ছাড়বো।“
বাঁধনের ঘটনায় দুই রকম প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া এসেছে দুইটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বয়ানে। নেটিজেনদের একটা বড় অংশই নিন্দা, প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বাঁধনের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে বাঁধন সাহসের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন।
“দেশের মানুষের অধিকার ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের দাবিতে বাঁধন তাঁর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তাঁর ওপর হামলা প্রমাণ করে, পরাজিত সন্ত্রাসীশক্তি এখনো প্রতিশোধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি।”
এনসিপির আরেক নেতা সারজিস আলম তার পোস্টে বাঁধনকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, “আপনি এই দেশের জন্য লড়াই করেছেন, দেশের মানুষকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করেছেন।”
“আমরা সবাই আপনার সাথে আছি। পুরো বাংলাদেশ আপনার সাথে।”
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ভেনিসে অবস্থানরত বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলাকারীদের শনাক্ত ও খুঁজে বের করতে ইতালিয়ান পুলিশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন। বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সহযোগিতায় আগামীকাল (মঙ্গলবার) এই ঘটনায় মামলা করা হবে। বাংলাদেশের পক্ষের কোনো শক্তির ওপর যেখানেই আক্রমণ হোক না কেন, সেখানকার প্রচলিত আইন অনুযায়ী এর দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। সবার আগে বাংলাদেশ।”
যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে, তাতে হামলাকারীদের কাউকে কাউকে দেখা গেছে, গর্বের সঙ্গে নিজেদের ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ পরিচয় দিতে, বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ আখ্যা দিতে।
নেটিজেনদের একটা অংশ এই হামলাকে "উচিত শিক্ষা" বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও করছেন বাঁধনকে "বিশ্বাসঘাতক" তকমা দিয়ে।
দেশ ও দেশের বাইরের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকেই হামলাকারীদের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে হামলাকে সমর্থন করেছেন।

বাংলাদেশের সিনেমার জন্য যে রাতটা হতে পারতো গর্বের, সেই রাতেই হামলা হলো বাঁধনের ওপর।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সিনেমার বাংলাদেশকে চেনানোর কথা ছিলো একটা ‘ওয়ার্ক অব আর্ট’ হিসেবে, সেই একই দিনে বাংলাদেশেকে চেনা গেল আরেকভাবে; নিজেদের মধ্যে থাকা অমীমাংসিত রাজনৈতিক ক্ষত হিসেবে।
বাঁধনের ওপর এই হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিচ্ছবি, যা দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসেও একইরকম তীব্র। একদল মানুষ যাকে দেখছেন গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে, আরেক দল তাকেই দেখছেন শত্রু হিসেবে।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার গল্পটি একজন নারীর প্রতিরোধের গল্প। যে ছবির প্রচারণা হওয়ার কথা সমালোচকদের প্রশংসা দিয়ে, উৎসবের ফটোকল আর সাক্ষাৎকার দিয়ে। তার বদলে সেই প্রচারণার প্রথম পর্ব হতে যাচ্ছে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা দিয়ে।



