প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএমআপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম
বুধবার থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট কার্যকর হবে।
জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট।
বুধবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বাজেটে শেষ মুহূর্তে কর, ভ্যাট, বিনিয়োগ, শিক্ষা, শিল্প ও ব্যবসা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংসদে আলোচনার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে বেশকিছু সংশোধনী যুক্ত করে আগের দিনই পাস হয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থ বিল।
প্রস্তাবিত বাজেটের পর পাস হওয়া বাজেটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা, নতুন ব্যাংক হিসাব খোলা এবং জমির বণ্টননামা ও নামজারিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং দেশীয় শিল্পের কাঁচামালে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়।
মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম-এর সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়।
এর আগে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক সংশোধনী যুক্ত করে অর্থ বিল-২০২৬ সংসদে পাস করান।
বুধবার থেকে নতুন বাজেট কার্যকর হবে।
পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত আয়ের নতুন রূপরেখা
সংশোধিত অর্থ বিল অনুযায়ী, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য শুধু আগামী অর্থবছর নয়, পরবর্তী পাঁচ বছরের করমুক্ত আয়ের একটি রূপরেখাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাখা হলেও সংসদে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী অর্থবছরের করমুক্ত আয় সীমা-
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা
২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৫ লাখ টাকা
সরকার বলছে, আগাম এই রূপরেখা ঘোষণার ফলে করদাতারা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারবেন।
বাজেট ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়া প্রস্তাবগুলোর একটি ছিলো নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা। ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সাধারণ মানুষের আপত্তির পর সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফলে আগের মতোই ব্যক্তি পর্যায়ে টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে।
একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমির বণ্টননামা (পার্টিশন ডিড) এবং নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্যবসায় লাগবে বিআইএন
কর পরিপালন জোরদার এবং ব্যবসায়িক লেনদেনকে আরও সুশৃঙ্খল ও তথ্যনির্ভর করতে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বা বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংশোধিত অর্থ বিল অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া, মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মার্চেন্ট হিসাব পরিচালনা, প্রতিষ্ঠানের নামে মোটরযান নিবন্ধন এবং বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়নের ক্ষেত্রে বিআইএন থাকতে হবে।
সরকারের মতে, এর মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর পরিপালন সহজ হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য সমন্বয় এবং আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নজরদারিও আরও কার্যকর হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর অর্ধেকে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আয়কর কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ দাবি জানিয়ে আসছিল। সংশোধিত অর্থ বিলে সেই দাবি আংশিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
সরকারের আশা, এতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রদান বাড়বে, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন কমবে এবং কর পরিপালনও উৎসাহিত হবে।
স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারে নতুন ভ্যাট কাঠামো
সংশোধিত অর্থবিলে স্বর্ণের পাশাপাশি হীরা, প্লাটিনাম ও রুপার অলংকারের জন্যও একক (স্পেসিফিক) ভ্যাট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে স্বর্ণের অলংকারের ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিধান থাকলেও নতুন ব্যবস্থায় তা পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, স্বর্ণ ও প্লাটিনামের অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা, রুপার অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ১০০ টাকা এবং হীরা (ডায়মন্ড) ও ডায়মন্ডের তৈরি অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি গ্রামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট দিতে হবে।
এছাড়া স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকার কেনার সময় ক্রয়মূল্যের ওপর ০.৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
মাছ ও টেলিযোগাযোগ খাতে ভ্যাট অব্যাহতি
সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
শিল্পের কাঁচামালে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়
দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর কমানো কিংবা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চিংড়ি শিল্পে ব্যবহৃত খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানিকৃত মধুর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যার, ফায়ার ডোর তৈরির কোল্ড-রোলড শিট, কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড এবং ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক ও ভ্যাটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া অপরিশোধিত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের কাঁচামালের শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহ দিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহার
প্রকৃত বাজারমূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে অর্থ বিলে বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত একটি বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি এবং কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন সমালোচনার পর সরকার পুরো প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেছে।
কম লভ্যাংশে অতিরিক্ত কর
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও লিজিং কোম্পানি এ বিধানের বাইরে থাকবে।
নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বাধ্যতামূলক
যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রয় ১০ কোটি টাকার বেশি অথবা পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকার বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদেশি সেবার ভ্যাট আদায় করবে ব্যাংক
বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির জন্য পৃথক সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর ওপর কর আরোপ করা হবে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা সম্প্রসারণ
পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান করসুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়ের পাশাপাশি বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত সুবিধার আওতায় থাকবে।
তামাক খাতে শুল্ক প্রস্তাব শিথিল
অর্থবিলে শেষ মুহূর্তে তামাক খাতের কয়েকটি কর প্রস্তাবেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত অর্থবিল অনুযায়ী, সিগারেট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ফিল্টার ও ফিল্টার তৈরির উপকরণ (সেলুলোজ অ্যাসিটেট/অ্যাসিটেট টো) আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্রানুলস আমদানির সম্পূরক শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ এবং উৎপাদন পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে বৈধ সিগারেটের দাম বেড়ে অবৈধ বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে, এতে তামাক কোম্পানিগুলো লাভবান হবে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কর, ভ্যাট ও বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে পাস হলো বাজেট
বাড়লো করমুক্ত আয়সীমা, টিআইএন বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, শিল্পের কাঁচামালে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়।
জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট।
বুধবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বাজেটে শেষ মুহূর্তে কর, ভ্যাট, বিনিয়োগ, শিক্ষা, শিল্প ও ব্যবসা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংসদে আলোচনার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে বেশকিছু সংশোধনী যুক্ত করে আগের দিনই পাস হয় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থ বিল।
প্রস্তাবিত বাজেটের পর পাস হওয়া বাজেটে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা, নতুন ব্যাংক হিসাব খোলা এবং জমির বণ্টননামা ও নামজারিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং দেশীয় শিল্পের কাঁচামালে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়।
মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম-এর সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়।
এর আগে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক সংশোধনী যুক্ত করে অর্থ বিল-২০২৬ সংসদে পাস করান।
বুধবার থেকে নতুন বাজেট কার্যকর হবে।
পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত আয়ের নতুন রূপরেখা
সংশোধিত অর্থ বিল অনুযায়ী, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য শুধু আগামী অর্থবছর নয়, পরবর্তী পাঁচ বছরের করমুক্ত আয়ের একটি রূপরেখাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাখা হলেও সংসদে তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী অর্থবছরের করমুক্ত আয় সীমা-
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা
২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা
২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৫ লাখ টাকা
সরকার বলছে, আগাম এই রূপরেখা ঘোষণার ফলে করদাতারা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারবেন।
ব্যাংক হিসাব ও জমি নিবন্ধনে লাগবে না টিআইএন
বাজেট ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়া প্রস্তাবগুলোর একটি ছিলো নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা। ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সাধারণ মানুষের আপত্তির পর সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফলে আগের মতোই ব্যক্তি পর্যায়ে টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে।
একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমির বণ্টননামা (পার্টিশন ডিড) এবং নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্যবসায় লাগবে বিআইএন
কর পরিপালন জোরদার এবং ব্যবসায়িক লেনদেনকে আরও সুশৃঙ্খল ও তথ্যনির্ভর করতে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বা বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংশোধিত অর্থ বিল অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া, মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মার্চেন্ট হিসাব পরিচালনা, প্রতিষ্ঠানের নামে মোটরযান নিবন্ধন এবং বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়নের ক্ষেত্রে বিআইএন থাকতে হবে।
সরকারের মতে, এর মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর পরিপালন সহজ হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য সমন্বয় এবং আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নজরদারিও আরও কার্যকর হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর অর্ধেকে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আয়কর কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ দাবি জানিয়ে আসছিল। সংশোধিত অর্থ বিলে সেই দাবি আংশিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমে ৫ শতাংশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
সরকারের আশা, এতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রদান বাড়বে, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন কমবে এবং কর পরিপালনও উৎসাহিত হবে।
স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারে নতুন ভ্যাট কাঠামো
সংশোধিত অর্থবিলে স্বর্ণের পাশাপাশি হীরা, প্লাটিনাম ও রুপার অলংকারের জন্যও একক (স্পেসিফিক) ভ্যাট কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে স্বর্ণের অলংকারের ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিধান থাকলেও নতুন ব্যবস্থায় তা পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, স্বর্ণ ও প্লাটিনামের অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা, রুপার অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ১০০ টাকা এবং হীরা (ডায়মন্ড) ও ডায়মন্ডের তৈরি অলংকারের ক্ষেত্রে প্রতি গ্রামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট দিতে হবে।
এছাড়া স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকার কেনার সময় ক্রয়মূল্যের ওপর ০.৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
মাছ ও টেলিযোগাযোগ খাতে ভ্যাট অব্যাহতি
সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছ সরবরাহের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
শিল্পের কাঁচামালে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়
দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর কমানো কিংবা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চিংড়ি শিল্পে ব্যবহৃত খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানিকৃত মধুর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন্ড কপার ওয়্যার, ফায়ার ডোর তৈরির কোল্ড-রোলড শিট, কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড এবং ফায়ার ব্রিকের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক ও ভ্যাটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া অপরিশোধিত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের কাঁচামালের শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহ দিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিধান প্রত্যাহার
প্রকৃত বাজারমূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে অর্থ বিলে বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত একটি বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এটি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি এবং কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন সমালোচনার পর সরকার পুরো প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেছে।
কম লভ্যাংশে অতিরিক্ত কর
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির অংশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও লিজিং কোম্পানি এ বিধানের বাইরে থাকবে।
নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বাধ্যতামূলক
যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রয় ১০ কোটি টাকার বেশি অথবা পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকার বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদেশি সেবার ভ্যাট আদায় করবে ব্যাংক
বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির জন্য পৃথক সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে নতুন কর
যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনি প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর ওপর কর আরোপ করা হবে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা সম্প্রসারণ
পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান করসুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়ের পাশাপাশি বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত সুবিধার আওতায় থাকবে।
তামাক খাতে শুল্ক প্রস্তাব শিথিল
অর্থবিলে শেষ মুহূর্তে তামাক খাতের কয়েকটি কর প্রস্তাবেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত অর্থবিল অনুযায়ী, সিগারেট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ফিল্টার ও ফিল্টার তৈরির উপকরণ (সেলুলোজ অ্যাসিটেট/অ্যাসিটেট টো) আমদানির ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্রানুলস আমদানির সম্পূরক শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ এবং উৎপাদন পর্যায়ের সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে বৈধ সিগারেটের দাম বেড়ে অবৈধ বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে, এতে তামাক কোম্পানিগুলো লাভবান হবে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিষয়: