আইএমএফের নতুন ঋণ: অর্থনীতি বাঁচানোর ওষুধ, নাকি জনজীবনে নতুন চাপ?

আইএমএফের ঋণে থাকে সংস্কারের চাপ। নতুন করে ঋণ পাওয়া গেলে সেটা জনজীবনে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি আনবে বাড়তি চাপ?

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

আইএমএফের ঋণ কখনোই শুধু ঋণ নয়; এর সঙ্গে আসে একগুচ্ছ সংস্কার শর্ত। আর সেই সংস্কারের অনেকগুলোর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। 
বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হচ্ছে। সম্ভাব্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য সরকার ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ই জুন আইএমএফকে চিঠি পাঠিয়েছেন।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নতুন করে এই অর্থ এলে সঙ্গে নিয়ে আসবে সংস্কার শর্তও।

যেমন- জ্বালানি ভর্তুকি কমানো হলে বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়লে ব্যবসার খরচ বেড়ে তার চাপ ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।

অর্থাৎ অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘সংস্কার’ বলা হয়, সাধারণ মানুষের কাছে সেটি অনেক সময় বাড়তি খরচ, সংকুচিত ক্রয়ক্ষমতা এবং কঠিন জীবনযাত্রার আরেক নাম হয়ে দাঁড়ায়।

তাই আইএমএফের এই ঋণ আলোচনা শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৈঠককক্ষের বিষয় নয়। এর প্রভাব গিয়ে ঠেকতে পারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাজারে চাল-ডাল-সবজির দাম, বাসভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, ব্যবসার খরচ, এমনকি মাস শেষে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের হিসাব-নিকাশেও এর ছাপ পড়তে পারে।

এই প্রশ্নের পেছনে রয়েছে আইএমএফের সবশেষ ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া আইএমএফের আগের ঋণ কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ কয়েকটি কিস্তি পেলেও শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে আটকে যায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়। আর এর কারণ হিসাবে বিভিন্ন বিষয়গুলোতে প্রত্যাশিত সংস্কার অগ্রগতি হয়নি বলেই জানায় সংস্থাটি।

আওয়ামী লীগের সময় শুরু হওয়া সেই ঋণ কর্মসূচি এখনো চলমান কি না তা নিয়ে কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তাই এ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

এদিকে চলতি বছরের জুলাইয়ে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের দল ঢাকা সফরে আসছে। এসে নতুন কর্মসূচির কাঠামো, সংস্কার পরিকল্পনা এবং ঋণের সম্ভাব্য আকার নিয়ে আলোচনা করবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এসব সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু একজন চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক বা নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে বাস্তবতা অনেক সহজ।

তাদের কাছে প্রশ্ন একটাই- এই সংস্কারের ফলে মাস শেষে সংসার চালানো সহজ হবে, নাকি আরও কঠিন? সেই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আইএমএফের নতুন ঋণ দেশের জন্য কতটা স্বস্তির, আর কতটা উদ্বেগের।

ফলে নতুন ঋণের আবেদন দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্যও তা তাৎপর্যপূর্ণ।

নতুন ঋণের আবেদন তাই দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী মহলে দুটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: প্রথমত, অতীতে যে সব সংস্কার সরকার করতে পারেনি, এবার নতুন পরিস্থিতিতে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? দ্বিতীয়ত, এই দীর্ঘমেয়াদি ও ইতিবাচক সংস্কারগুলোর করতে গিয়ে মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষকে আরও কতটা চাপ নিতে হবে? কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা?

প্রশ্নটা তাই শুধু অর্থনীতির নয়, মানুষেরও-আইএমএফের নতুন ঋণ কি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে, নাকি সেই পথে হাঁটার খরচ হিসেবে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি মূল্য দিতে হবে?

পুরোনো ঋণ শেষ হয়নি, তবু নতুন কর্মসূচি কেন?

আইএমএফের ঋণ মানেই একগুচ্ছ কঠিন শর্ত ও কাঠামোগত সংস্কার। মূলত এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি আটকে আছে।

২০২৩ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের সময় আওয়ামী লীগ সরকার ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেলেও পঞ্চম কিস্তির পর থেকে আর অর্থ ছাড় হয়নি।
কারণ ছিল সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি।

আইএমএফের সঙ্গে আগের কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাংক খাতের সুশাসন ও সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছে আইএমএফ।

এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সরাসরিই বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ভালো করেনি।”

“আইএমএফ'র ঋণ কর্মসূচিতে তিনটি বিষয় রয়েছে। তা হলো- রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত পুনরুদ্ধার এবং বিনিময় হার সংস্কার। এখনো তার প্রতিটিতেই কাজ বাকি রয়েছে,” বলেছিলেন তিনি।

অর্থাৎ নতুন ঋণের আলোচনার পেছনে শুধু অর্থের প্রয়োজন নয়, আগের অসমাপ্ত সংস্কারগুলোর প্রশ্নও আসবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

“নতুন কর্মসূচিতেও পুরোনো বিষয়গুলোই ঘুরেফিরে আসবে। কারণ আইএমএফ হয়তো সময় দিতে পারে, কিন্তু সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো কম রাজস্ব আয়।

করজাল বাড়বে, নাকি মানুষের করের বোঝা?

আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো কম রাজস্ব আয়। যার প্রমাণ মিলেছে এই অর্থবছরেও। রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে শেষ হচ্ছে অর্থবছর।

এ ক্ষেত্রে নিজেদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন।

“বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার বিশ্বের সর্বনিম্নের মধ্যে একটি এবং গত তিন বছরে তা আরও কমেছে”, বলেছেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের এই পরিচালক।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে জানান, বর্তমানে দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশের ঘরে রয়েছে।

আইএমএফের ঋণ শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেলে তাই নতুন কর্মসূচিতেও ভ্যাট সংস্কার, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কর অব্যাহতি কমানো এবং করজাল সম্প্রসারণ নিয়ে পুরোনো শর্তগুলো থাকবেই।

নীতিগতভাবে এগুলো প্রয়োজনীয় এতে কোনো সন্দেহ না থাকলেও বাস্তবতার প্রশ্ন রয়েছে।

কারণ ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, করছাড় কমানো বা নতুন ভ্যাট আরোপ করা হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার শেষ গন্তব্য সাধারণ ভোক্তার পকেট।

আইএমএফের শর্ত মেনে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে গিয়ে সরকার যদি করের হার বাড়ায় বা করছাড় কমিয়ে দেয়, তবে সরাসরি উৎপাদন ও ব্যবসায়ী খরচ বাড়বে। এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে ভোক্তার পকেটে। করের আওতা বাড়ানোর নামে যদি প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক করজালের আওতায় আনা হয়, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় আরও কমে যাবে বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে ব্যাংক খাত

নতুন কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন।

দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশের ব্যাংক খাত আস্থার সংকটে রয়েছে। অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে, আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে।

ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনা এ খাতে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

যদিও অন্তবর্তীকালীন সরকার দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামো শক্তিশালী করার মতো কঠোর কিছু পরিকল্পনা করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাও আলোচনায় এসেছে।

দেশের সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার ও পুনর্গঠন করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে 'ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি করেছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হওয়ার সময় শেষ মুহূর্তে এই ১৮(ক) ধারাটি যুক্ত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ চুক্তির আলোচনায় ব্যাংক খাতের সুশাসন অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে আসবে। সে কারণে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারার ভবিষ্যৎও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

কারণ আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর না করে নতুন ঋণ নিলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না, বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যাবে।

এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “ব্যাংক রেজুলেশন আইন থেকে ১৮(ক) ধারা বাতিল হলে সেটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। তবে শুধু ধারা বাতিল নয়, এর পরিবর্তে কী বিধান আনা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংক খাত সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সুশাসন নিশ্চিত করা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা।”

জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বাড়ে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়, বাড়ে মূল্যস্ফীতিও।

জ্বালানির চাপে মূল্যস্ফীতি

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট-জ্বালানি খাত সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে।

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বেড়েছে। আইএমএফ সাধারণত চায় সরকার এই ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনুক এবং মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকা বাড়ুক।

সমস্যা হলো, জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভিত্তি।

ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর কারণ বড় প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে।

তাই নতুন কর্মসূচিতে যদি জ্বালানি ভর্তুকি আরও কমানোর শর্ত আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কারণ আগের ঋণ কর্মসূচি স্থগিত হওয়ার পেছনে জ্বালানি ভর্তুকিও অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তার ভাষায়, “জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব খাতের সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়াই হয়তো মূল বাধা ছিল।”

আইএমএফের ঋণ শুধু ঋণ নয়

অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন অর্থবছরে শুধু বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধেই ব্যয় হবে এক হাজার ২২৯ কোটি ডলারের বেশি। একই সময়ে সরকারকে বড় বাজেট বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্যও বিপুল অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের নতুন কর্মসূচিকে সরকার কেবল একটি ঋণ নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার একটি সুরক্ষা বলয় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

রিজার্ভ এখনও ‘স্বস্তিকর’ জায়গায় থাকলেও বাজেট বাস্তবায়নের বাড়তি ব্যয়ভার বহনের জন্য বৈদেশিক ঋণ না এলে সরকারকে চাপে পড়তে হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

তার ভাষায়, “আইএমএফের লোনটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, আইএমএফের ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় একটি আস্থার সনদ হিসেবে কাজ করে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, জাইকা এমনকি এআইআইবি’র মতো দাতা সংস্থাগুলোও বাজেট সাপোর্ট দেওয়ার আগে আইএমএফের কাছ থেকে পরামর্শ চায়। তাই আইএমএফের ঋণ এলে সুবিধা হবে।”

সবমিলে বাংলাদেশের সামনে বাস্তবতা কঠিন। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, রাজস্ব ঘাটতি বড়, ব্যাংক খাত দুর্বল, আর বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। এই অবস্থায় আইএমএফের নতুন ঋণ অর্থনীতিকে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই স্বস্তির বিনিময়ে সরকারকে নিতে হতে পারে এমন কিছু সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পরিবহন ভাড়া, বাজারের দাম এবং কর ব্যবস্থায়।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংস্কার ও জনস্বস্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে গিয়ে যদি জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে যায়, তাহলে সংস্কারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। আর যদি সরকার ধাপে ধাপে, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে এগোয়, তাহলে এই কঠিন সংস্কারই ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বড় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই আইএমএফের নতুন ঋণ অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে-নয়তো তা হয়ে উঠতে পারে সাধারণ মানুষের জন্য আরেক দফা ব্যয়ের চাপের সূচনা।