এনবিআরের ভবিষ্যত কোন পথে, কতটা ঝুঁকিতে সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন

‘এখন আর এনবিআর ভাঙা নিয়ে কেউ কথা বলবে না’ ,সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক সাবেক কর্মকর্তার এই আক্ষেপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাজস্ব খাতের সবচেয়ে বড় বিতর্ক। পাঁচ দশকের পুরনো এনবিআর কি সত্যিই ভেঙে যাবে? অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বহাল থাকলেও নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন।

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভেঙে দুটি আলাদা বিভাগ- ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ গঠনের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোর একটি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সংস্কার বাস্তবে এগোবে, নাকি আটকে থাকবে কাগজে-কলমেই?

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ, এনবিআর কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন আন্দোলন, আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ, প্রশাসনিক ক্যাডার ও রাজস্ব ক্যাডারের টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যত নিয়ে বড় এক নীতিগত বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

এর মধ্যেই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিষয়টিকে।

তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এনবিআর এমন একটি সমস্যা, যা আমাদের সমাধান করতে হবে। আমরা এটিকে দুই ভাগে ভাগ করতে যাচ্ছি। নীতি নির্ধারণের জন্য একটি আলাদা বডি এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি আলাদা বডি থাকবে।”

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এনবিআর ভাঙা কি সত্যিই প্রয়োজন? যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে কিভাবে এগোতে হবে? আর বাস্তবায়নে ঝুঁকিই বা কী?

কেন এই ভাঙন

বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক রাজস্ব প্রশাসনে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা থাকলেও গত পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন, কর আদায়, শুল্ক ব্যবস্থাপনা, ভ্যাট প্রশাসন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে এসেছে।

তবে এই নিয়ে আলোচনা জোরালো হয় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি ঘিরে। কারণ একই প্রতিষ্ঠান যখন নীতি বানায় এবং সেই নীতির বাস্তবায়নও করে, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তখন অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে এবং সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এই হার কমপক্ষে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

ব্যবসায়ী মহলের প্রসঙ্গ এনে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী মহলও অভিযোগ করে আসছে, রাজস্ব সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং করদাতার স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে।

নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও জানিয়েছেন একই কথা।

রবিবার তিনি বলেন, “দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণে দক্ষতা বাড়ানো এবং কর প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের বর্তমান কাঠামো নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সেই দুর্বলতাগুলো দূর করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।”

এনবিআর বিভাজন নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আনা সংস্কার কর্মসূচিতে।

আইএমএফের চাপ নাকি প্রয়োজন?

এনবিআর বিভাজনের বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আনা সংস্কার কর্মসূচিতে। স্বাভাবিকভাবেই তাই মনে করা হয় এনবিআর সংস্কার মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের চাপের ফল।

তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলছেন, বিষয়টি শুধু আইএমএফের একক চাওয়া ছিলো না।

“এনবিআর বিভক্তিকরণ প্রশাসনিকভাবে নয়, পেশাদারিভাবে করতে হবে। অত্যন্ত সতর্কতা ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। তবে এখানে কোনো দ্বিমত নেই, নীতি ও আদায়কে আলাদা করতেই হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

তার মতে, এটি বহুদিনের সংস্কার প্রস্তাব। বিভিন্ন শ্বেতপত্রে এর সুপারিশ ছিলো এবং গবেষকরাও দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলে আসছেন।

“আবার এটা যে শুধু আইএমএফের বিষয় সেটাও কিন্তু নয়, আমরা অনেক দিন ধরেই এনবিআরের দুটি বিভাগকে আলাদা করার জন্য বলে আসছিলাম,” বলেন তিনি।

অর্থাৎ বিতর্কটা এখন আর ‘ভাঙা উচিত কি-না’ সেখানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ‘কীভাবে ভাঙা হবে’ সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের সংস্কার ভাবনায় নতুন বিল

সরকারের বর্তমান অবস্থানও মূলত একই দিকে ইঙ্গিত করছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমান কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত দুর্বলতায় ভুগছে। এজন্য নীতি-নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক বাস্তবায়নকে পৃথক করতে হবে।

তার ভাষায়, “নীতি-নির্ধারণের জন্য আলাদা একটি বডি এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা একটি বডি থাকবে।”

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি নীতি প্রণয়নে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে কর বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার কথা বলেছেন।

এতে বোঝা যাচ্ছে, নতুন সরকার অন্তত নীতিগতভাবে এনবিআর বিভক্তির ধারণা থেকে সরে আসছে না।

বরং বিদ্যমান অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনা করে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির পথ খুঁজছে।

এরই অংশ হিসেবে এপ্রিল মাসে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, যারা বিদ্যমান অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে নতুন বিলের সুপারিশ দেবে।

গত ২৮এ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে সভাপতি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নয় সদস্যের কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

কমিটিকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ যাচাই-বাছাই করে আরও বাস্তবসম্মত করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। কমিটি প্রয়োজনে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। কমিটির সভা প্রয়োজন অনুসারে হবে।

প্রসঙ্গত, এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি বিভাগ করে ২০২৫ সালের ১২ই মে অধ্যাদেশ জারি করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার।

বিরোধিতা, বদলি ও চাকরিচ্যুতি

বিষয়টি এখানেই জটিল। এনবিআর ভাগের আলোচনা যত বাড়তে থাকে বাড়তে থাকে অসন্তোষ। আর অধ্যাদেশ জারির পর যা রূপ নেয় আনুষ্ঠানিক বিরোধে।

তবে কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ কখনোই সংস্কারের মূল ধারণার বিরোধিতা করেননি।

তাদের আপত্তি ছিলো সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। তাদের অভিযোগ, অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করে তড়িঘড়ি করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব বাড়ার আশংকাও ছিল তাদের অন্যতম উদ্বেগ।

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা 'এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ' ব্যানারে গত বছর টানা প্রায় দুই মাস (মে-জুন) কলম বিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে এনবিআরের বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারা।

সংস্কার নয়, আপত্তি ছিলো সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে।

কলম বিরতি থেকে শুরু করে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করা হয়। 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে।

পরে একাধিক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হন, কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় এবং কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন একজন সাবেক কর্মকর্তা, যাকে পরে বদলির করা হয়, আলাপ-কে বলেন, “সংস্কারের বিরোধিতা নয়, বরং ভালো সংস্কারের দাবিতেই আমরা আন্দোলন করেছিলেন।

“এখন আর এনবিআর নিয়ে কেউ কথা বলবে না। কারণ আমরা এটা চেয়েছিলাম দেশের স্বার্থে। সংস্কারটা ভালোভাবে হলে সেটা আসলে রাজস্ব খাতকেই শক্তিশালী করবে। কিন্তু এর জেরে যে পরিমাণ বদলা নেওয়া হয়েছে তাতে খুবই বাজে উদাহরণ তৈরি হয়েছে।”

তার দাবি, আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তীতে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে বদলি, সাময়িক বরখাস্ত বা প্রশাসনিক চাপে রাখা হয়েছে।

তার মতে, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের নীতিগত বিতর্কে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্দোলনের ঘটনায় যাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল তাদের প্রায় সবাইকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হচ্ছে বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

সংস্কারের ঝুঁকি কোথায়

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক কম থাকলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

“তাড়াহুড়োর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যাতে কোনো ফাঁকফোকর না রেখে এটি কার্যকর করা যায়। আগে অংশীজনদের সঙ্গে না রাখায় এ নিয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

তার মতে, এনবিআরের যারা আন্দোলন করেছিলেন, তারাও চেয়েছিলেন সংস্কার হোক; তবে তা যেন সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়েই হয়।

“এবারও সরকারকে এনবিআর নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে সব দল ও অংশীজনকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ এই সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে,” বলেন তিনি।

অর্থাৎ রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, রাজস্ব কর্মকর্তাদের সংগঠন, অর্থনীতিবিদ এবং প্রশাসনের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য ছাড়া এই সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

সংস্কারের সমালোচকেরা বলছেন, পরিকল্পনা দুর্বল হলে সমস্যাও বাড়তে পারে।

একদিকে নতুন দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসনিক দ্বৈততা ও অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক স্তর সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর ও শুল্ক কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী হবে, সেটি নিয়ে।

“যদি নতুন কাঠামোতে পেশাগত দক্ষতার পরিবর্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রাধান্য পায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে,” বলেছেন তৌফিকুল ইসলাম খান।

এ ছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো, ক্ষমতার সীমারেখা, জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং তথ্য বিনিময় কাঠামো পরিষ্কার না হলে বিভাজন নতুন জটিলতাও তৈরি করতে পারে মনে করেন এনবিআরের বিভিন্ন কর্মকর্তা।

বিভক্ত হলে কী সুবিধা হতে পারে

অর্থনীতিবিদ ও সংস্কারপন্থীদের মতে, এনবিআর বিভক্তির সম্ভাব্য সুবিধা কয়েকটি। বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি পয়েন্ট।

প্রথমত, করনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব আলাদা হলে স্বার্থের সংঘাত কমবে।

দ্বিতীয়ত, নীতি প্রণয়ন আরও তথ্যনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক হতে পারে। বর্তমানে রাজস্ব আহরণের দৈনন্দিন চাপের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কর সংস্কার অনেক সময় অগ্রাধিকার পায় না।

তৃতীয়ত, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়বে। নীতি ব্যর্থ হলে তার দায় এবং বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে তার দায় পৃথকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

চতুর্থত, বিনিয়োগকারীদের কাছে করব্যবস্থা আরও পূর্বানুমেয় ও স্বচ্ছ হতে পারে।

পঞ্চমত, প্রত্যক্ষ করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে।

এনবিআর ভাঙবে নাকি ভাঙবে না

এনবিআর ভাঙবে নাকি ভাঙবে না? এই প্রশ্ন এখন আর শুধু কাঠামোগত বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। 

এনবিআর বিভক্তির বিতর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের বড় অংশই নীতি নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের কাজ আলাদা করার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

কিন্তু গত এক বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু অধ্যাদেশ জারি করলেই সংস্কার বাস্তবায়ন সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন অংশীজনদের আস্থা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সমন্বয়। নয়তো তৈরি হয় নতুন জটিলতা ও গোলযোগ।

সেই অর্থে এখন প্রশ্নটি আর শুধু ‘এনবিআর ভাঙবে কি ভাঙবে না’ নয়। বরং মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি আধুনিক রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে পেশাদার নীতিনির্ধারণ, দক্ষ প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক করব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করবে, এবং একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ কমাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের রাজস্ব প্রশাসনের আগামী কয়েক দশকের পথচলা।