যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আদালত ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে শিশুদের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর কর্মপদ্ধতিও পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সামাজিক মাধ্যম জগতে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে চলা এই মামলার দ্বিতীয় ধাপে বৃহস্পতিবার এই রায়টি আসে।
এর আগে মার্চে জুরি সদস্যরা রায়ে বলেছিলেন, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে তাদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নিরাপত্তার বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। যা রাজ্যের ভোক্তা অধিকারকে লঙ্ঘন করেছে।
বছরের শুরুর দিকে জুরি বোর্ড ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছিল। নতুন রায়ের পর কোম্পানিটির মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ালো ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবার রায় দেন নিউ মেক্সিকোর বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড। তিনি বলেন, মেটা ‘জনদুর্ভোগ’ সৃষ্টি করেছে।
বিচারক তার মন্তব্যে বলেন, এই দুর্ভোগের প্রভাব বায়ুদূষণের মতোই ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে।
এছাড়াও বিচারক জরিমানার অর্থ দিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। যে তহবিল ভবিষ্যতে শিশুদের ক্ষতি কমাতে ব্যবহার করা হবে।
‘কারখানার দূষণের মতো ক্ষতি’
রায়ে বিচারক মেটার সঙ্গে একটি কারখানার তুলনা করে বলেন, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট হলো মেটার উৎপাদিত পণ্য। আর শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হলো সেই উৎপাদনের দূষণ। এই দূষণ প্রতিরোধ করা জরুরি।
তবে মেটা রায়ের সঙ্গে একমত নয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা আপিল করবে।
মেটার এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, “আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ রাখতে কাজ করছি। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও কনটেন্ট শনাক্ত এবং অপসারণে যে চ্যালেঞ্জ আছে- সে বিষয়ে আমরা সবসময় স্বচ্ছ ছিলাম। অনলাইনে কিশোরদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা অভিযোগের বিরুদ্ধে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো।”
কেন এই মামলা
২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে এই মামলা করেন।
অভিযোগ ছিলো, মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম শিশুদের যৌন হয়রানির ঝুঁকি তৈরি করছে। একইসঙ্গে যৌন অপরাধীদেরও সুযোগ করে দিচ্ছে। অনেকেই সহজেই যৌন কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার সুযোগও পাচ্ছেন।
মামলার প্রথম ধাপে আদালত রায় দেন, মেটা বারবার নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ লঙ্ঘন করেছে। আদালতের মতে, মেটার রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের নিয়ে গেছে ক্ষতিকর কনটেন্টের দিকে। একই সঙ্গে তাদের বিপজ্জনক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তৈরি করেছে।
‘জনদুর্ভোগ’ হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি
মামলার দ্বিতীয় ধাপের রায়ে বিচারক বলেন, মেটার কার্যক্রম এখন জনদুর্ভোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর অর্থ এটি এখন শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার একটি বড় ইস্যু।
শিশু সুরক্ষার ঘটনায় মেটার বিরুদ্ধে এটিই সবচেয়ে বড় জরিমানা। একইসঙ্গে কোনো সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে আদালত ‘জনদুর্ভোগ’ হিসেবে ঘোষণা করলো এবারই প্রথম।
রায়ে বিচারক লিখেছেন, একটি কারখানার দূষণ যেমন কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর প্রভাবও অনলাইনে আটকে থাকে না।
তিনি বলেন, এর প্রভাব পুরো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা বাস্তব জীবনেও পৌঁছে যায়। এর বোঝা বহন করতে হয় শিশু, পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও।
জরিমানার অর্থ কোথায় যাবে
আদালত মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে।
এই অর্থ দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। আচরণগত চিকিৎসা কর্মসূচিও পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞদেরও নিয়োগ দেওয়া হবে।
অর্থের আরেকটি অংশ ব্যয় হবে সচেতনতা বৃদ্ধিতে।
শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তারা যেন শিশুদের ওপর সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেটাকে আদালত যেসব নির্দেশনা দিলো
আদালত শিশুদের সুরক্ষায় কয়েকটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিতে মেটাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারক নির্দেশে বলেছেন, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে ‘রেকমেন্ড’ হিসেবে যাবে না। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীও অপ্রাপ্তবয়স্ককে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাতে পারবেন না।
এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নগ্ন ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করতে হবে। শিশু যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান-স্ট্রাইক’ নীতি চালু করতে হবে। অর্থাৎ, একবার অপরাধ প্রমাণিত হলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের লাইক সংখ্যা দেখানো যাবে না। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত তাদের কাছে পুশ নোটিফিকেশন পাঠানোও বন্ধ রাখতে হবে।
শিক্ষাবর্ষ চলাকালে সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্তও পুশ নোটিফিকেশন পাঠানো যাবে না। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক মিলিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মাসিক ব্যবহারসীমা ৯০ ঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ, তারা দিনে গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা প্ল্যাটফর্ম দুটি ব্যবহার করতে পারবে।
বিবিসি বলছে, এ মাসেই ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন ডজন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল মামলা করেছেন। অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের গোপনীয়তা-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছে।



