শিশুদের নিরাপত্তা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। বাড়ির আঙিনা কিংবা খেলার মাঠে- কোথাও আমাদের শিশুরা নিরাপদ নয়। একসময় শিশুরা নিশ্চিন্তে বিকেলে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতো এবং সন্ধ্যায় নিরাপদে বাড়ি ফিরতো, বাবা-মা এই নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো না। কিন্তু বর্তমান সময়ে সন্তানদের সেই নির্ভাবনার বিকেলগুলো অভিভাবকদের কাছে চরম ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক মাসে কিছু ঘটনায় প্রতিবেশী, বন্ধুরাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠছে। আজ সময় এসেছে সময় ও সম্পর্ককে ভিন্ন লেন্সে দেখার।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ধরন কতটা নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে সমবয়সীদের হাতে খুন হয়। লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।
ক’দিন আগেই আমরা দেখেছি ঢাকার পল্লবীতে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু রামিসাকে বাবার বয়সী প্রতিবেশী ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে।
একইভাবে সিলেটের কানাইঘাটে প্রতিবেশীদের আক্রোশের শিকার হয়ে প্রাণ হারায় মাত্র ছয় বছরের শিশু মুনতাহা।
পূর্বশত্রুতা ও মুক্তিপণের লোভে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী তানজিনাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। সামান্য লোভ, শত্রুতা ও বিকৃত মানসিকতার কারণে আজ শিশুদের নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।
এসব পৈশাচিকতার মধ্যে কেবল রামিসা হত্যা মামলার রায় দ্রুত ঘোষিত হলেও আইনি জটিলতায় তার বাস্তবায়ন ঝুলে রয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলেই আগের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো ঢাকা পড়ে যায়। রাজপথে জনদাবি বা আন্দোলন না থাকলে বিচারপ্রার্থীদের নথি ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে থাকে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে, গত ৮ মাসেই নানা সহিংসতায় ১৫৫ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার হয় নিখোঁজ হওয়ার পর।
দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই শিশু হলেও তাদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। এর বড় একটি প্রমাণ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থাকলেও শিশুদের জন্য নিবেদিত কোনো পৃথক অধিদপ্তর নেই।
আমি ২০২১ সাল থেকে ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে শিশু সুরক্ষার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা ও সমন্বয়হীনতা দেখেছি। তবে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘প্রিভেনশন অব ভায়োলেন্স অ্যান্ড হার্মফুল প্র্যাকটিসেস এগেইনস্ট চিলড্রেন অ্যান্ড উইমেন ইন বাংলাদেশ’ (পিভিএইচপি) প্রকল্পে শিশু অধিকার কর্মকর্তা হিসেবে মৌলভীবাজারে জেলায় দায়িত্ব পালন করছি। এখানে পিছিয়ে থাকা চা-শ্রমিকদের শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা, শোষণ, অবহেলা ও অপব্যবহারের মত খারাপ অভ্যাস দূরীকরণে কাজ করছি।
সারাদেশে এরকম আড়াই হাজার শিশু সুরক্ষা কমিউনিটি হাব ও বিশেষ ২২টি হাবের মাধ্যমে প্রকল্পটি এপ্রিল ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৯ পর্যন্ত কাজ করবে। আশার কথা এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ লাখ শিশু ও অভিভাবককে সুরক্ষা সেবা দেওয়া হবে। ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী ও কর্মকর্তা মাঠে সক্রিয় আছেন, যাদের মাধ্যমে ৫ হাজার বাল্যবিয়ে বন্ধ, ৫ হাজার শিশুকে শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করা, এবং ৩ লাখ অভিভাবককে ইতিবাচক সন্তান লালন-পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তবে সাময়িক প্রকল্পের ওপর নির্ভর না করে শিশুদের সুরক্ষায় একটি স্থায়ী প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
শিশুদের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, পূর্ণাঙ্গ শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর গঠন: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী শিশু অধিকার/সুরক্ষা কর্মকর্তা পদায়ন করে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল (কুইক রেসপন্স টিম), ১০৯ এবং চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সমন্বয়ে প্রতিটি জেলা ও থানায় পুলিশ ও সমাজসেবা বিভাগের যৌথ সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক কুইক রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে।
তৃতীয়ত, দ্রুত বিচার ও আইনি সহায়তা: শিশু আইন, ২০১৩-এর অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে শিশু নির্যাতনের বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগী শিশুদের আইনি ও মানসিক (সাইকোলজিক্যাল) সহায়তা প্রদান জরুরি।
চতুর্থত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাইবার নিরাপত্তা: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাইবার স্পেসে পর্নোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইলিং ও সাইবার বুলিং বন্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা: ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় করা, অভিভাবকদের পজিটিভ প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সাহায্যে মূল্যবোধ পুনর্গঠনে জাতীয় অভিযান চালাতে হবে।
শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই আইনি সংস্কার, স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও সামাজিক প্রতিরোধের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক: শিশু অধিকার কর্মকর্তা, মৌলভীবাজার জেলা; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (পিভিএইচপি প্রকল্প)।
[মতামত লেখকের নিজস্ব]



