আমেরিকার মিডটার্ম: রঙ্গভরা ভোট, নাম নিয়ে যত ঘোঁট

‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ প্রচারটি কতিপয় ‘মগা’র (বোকা অর্থে) আক্ষেপে গিয়ে ঠেকেছে। ফল বেরোতেই শুরু হয়েছে আরেক প্রতিযোগিতা: পরাজয়ের দায় কার? একটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পরাজয়ের দায় স্রেফ প্রার্থীর নামের। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নাম একই বা প্রায় একই। এই নামের কারণে আমেরিকায় নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়েছে এমন নজির আছে অনেক। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল এমন নাম বিভ্রাট - ঢাকা ১২ আসনে তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর নামই ছিল সাইফুল।  রংপুরের একটি আসনেও দুইজন প্রার্থীর নামই ছিল রব্বানী। 

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম

এবার মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান পড়েছেন এক অদ্ভুত ফাঁদে। প্রতিপক্ষ শুধু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নন, ব্যালটে আছেন আরেকজন ড্যান সুলিভানও। এ নিয়ে হাসির খোরাকও কম জোটেনি। সে গল্পে আমরা ফিরবো। তার আগে দেখে আসি, মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসলে হলো কী।

ইরানে যুদ্ধ, ঘরে ধাক্কা

ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেইনি ও তার শাসনব্যবস্থা পাল্টাতে গিয়ে ‘রেজিম’ বদলের ধাক্কা লাগলো নিজের ঘরেই। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিদেশে যুদ্ধের অঙ্ক কষতে কষতে ঘরের ভোটের অঙ্কে বড় ধাক্কা খেলেন। 

প্রেসিডেন্টের চেয়ার অবশ্য অক্ষত আছে, ভেঙেছে কংগ্রেসে তার দলের নিয়ন্ত্রণ। ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ প্রচারটি কতিপয় ‘মগা’র (মানে বোকা) আক্ষেপে গিয়ে ঠেকেছে। ফল বেরোতেই শুরু হয়েছে আরেক প্রতিযোগিতা: পরাজয়ের দায় কার?

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স সরাসরি যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। ট্রাম্প যুদ্ধের ভূমিকা মেনেও সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড়। 

তার আরেকটি বক্তব্য, নিজে ব্যালটে থাকলে জিততেন, কিন্তু বিভিন্ন সমাবেশ থেকে যে সাড়া পেয়েছেন তা নিজের দলের প্রার্থীদের ভোটে বদলানো যায়নি। এক পর্যায়ে তিনি জানিয়েছেন, কাউকে দোষ দিচ্ছেন না!

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ৫৪টি আসন নিশ্চিত হয়েছে, আর রিপাবলিকানদের সাতটি আসন হাতবদল হয়েছে। 

প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত। ৪ঠা নভেম্বর ভোরে ব্যালটপিডিয়ার হিসাবে তাদের ২৩১ ও রিপাবলিকানদের ১৪১ আসনের ফল নির্ধারিত হয়েছিল, বাকিগুলোর গণনা তখনো চলছিল। এটি চূড়ান্ত আসনবণ্টন নয়।

২০২৩ সালে প্রতিনিধি পরিষদ এবং ২০২৫ সালে সিনেট হারানোর পর ডেমোক্র্যাটরা আবার কংগ্রেসের দুই কক্ষই হাতে পেতে যাচ্ছেন। 

সিনেট ও সিন্ডিকেট একসঙ্গে হারালে কী হয়

যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট মানে কংগ্রেসের দুই কক্ষ- সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ। সিনেটে ভোটাধিকারসম্পন্ন সদস্য ১০০ জন, প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫ জন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল একটি কক্ষ হারানোর নজির আছে অনেক। ২০২২ সালে জো বাইডেনের, ২০১৮ সালে ট্রাম্পের এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার আমলে হাতবদল হয়েছিল প্রতিনিধি পরিষদ। ২০১৪ সালে ওবামার দল সিনেটও হারায়, তবে তখন প্রতিনিধি পরিষদ আগে থেকেই বিরোধীদের দখলে। 

এক নির্বাচনেই দুই কক্ষ হারানোর নজির শুধুমাত্র ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ, ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ১৯৫৪ সালে ডোয়াইট আইজেনহাওয়ারের।

একটি কক্ষ হারালেই বিরোধীরা প্রেসিডেন্টের আইন ও বাজেট আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পায়। প্রতিনিধি পরিষদ হারালে বাড়ে তদন্তের চাপ, সিনেট হারালে বাধা আসে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে। দুই কক্ষ গেলে এই সব বাধা একসঙ্গে আসে, তবে প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা আর ভিটো থেকেই যায়।

জর্জ ডব্লিউ বুশ

বুশের উদাহরণ মনে করা যায়। ২০০৬ সালের পরের বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসীর শর্তসাপেক্ষে বৈধ হওয়ার পথ তৈরির উদ্যোগ আটকে যায়। বিরোধীদের একাংশের পাশাপাশি নিজের দলের অধিকাংশ সিনেটরও তাকে সমর্থন করেননি। অর্থাৎ চেয়ার থাকলেও কংগ্রেসে ভোট না থাকলে পরিকল্পনা কাগজেই থেকে যায়।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নতুন করছাড়, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমানো কিংবা অভিবাসন কঠোর করার নতুন আইন বিরোধীরা আটকে দিতে পারবেন। যুদ্ধ বা অভিবাসন অভিযানের বাড়তি অর্থ চাইলে বাজেটে শর্ত জুড়ে দেওয়াও সম্ভব। 

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনোনয়নও আটকে যেতে পারে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, অভিবাসন অভিযান ও ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা নিয়ে তদন্তের চাপ বাড়বে। 

তবে তার সব শুল্ক বা নির্বাহী আদেশ আপনা-আপনি বাতিল হবে না। সেগুলো পাল্টাতে আইন হলেও ট্রাম্প তাতে ভিটো দিতে পারবেন। 

মোদ্দা কথা, নতুন আইন, বাড়তি টাকা আর পছন্দের লোক নিয়োগে বাধা বাড়বে, কিন্তু প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া মার্কিন আইন অনুযায়ীই সম্ভব নয়।

ভোটরঙ্গ

এসব সিরিয়াস খবর ঘাঁটতে গিয়ে খুঁজছিলাম সবচেয়ে মজার খবরটা। পেয়ে গেলাম ‘নামের বিভ্রাট’।

ঘটনাটা এমন, আলাস্কার রিপাবলিকান প্রার্থী ড্যান এস সুলিভান ২০১৫ সাল থেকে সেনেটর, আগে ছিলেন রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল। পরিচিত মুখ, পরিচিত নাম, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক জীবন। 

ড্যানিয়েল জে সুলিভান এবং ড্যান এস সুলিভান

ওদিকে নির্দলীয় প্রার্থী ড্যানিয়েল জে সুলিভান জুনিয়র অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। চলতি নামে তিনিও ড্যান সুলিভান। 

একজন নিজের পরিচিতি নিয়ে প্রচারে নামলেন, আর দেখলেন, সেই পরিচয়ের শব্দগুলো হুবহু আরেকজনের নামেও বসে আছে।

৪ঠা নভেম্বরের প্রথম দিকের প্রকাশিত হিসাবে সেনেটর সুলিভানের ভোট ১ লাখ ২ হাজার ৭৫, ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলার ১ লাখ ২ হাজার ৭০১ আর শিক্ষক সুলিভানের ৩ হাজার ৫৮৩। পেলটোলা ও সেনেটরের ব্যবধান ৬২৬, অথচ অন্য ড্যান পেয়েছেন সাড়ে ৩ হাজারের বেশি। রিপাবলিকানদের চোখ তাই আটকে গেছে ব্যালটের ওই একটি নামে।

অভিযোগ, ভোটারদের বিভ্রান্ত করে সেনেটরের ভোট কমাতেই শিক্ষককে দাঁড় করানো হয়েছে। পেলটোলার প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তাকে প্রার্থী করানোর চেষ্টায় ভূমিকা নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনও এসেছে। পেলটোলা সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। শিক্ষকও তার প্রচারশিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেছেন। কাজেই অভিযোগটিকে প্রমাণিত বলে লেখা যাবে না। 

ট্রাম্পের বিচার বিভাগ চেয়েছিল, সেনেটর হারলে সম্ভাব্য বিভ্রান্তির তদন্তের জন্য ফল প্রত্যয়ন আটকে রাখা হোক। বিচারক আবেদন খারিজ করেছেন, তবে আপিল হয়েছে। আদালতের সামনে একটা প্রশ্নও ছিল- গোপন ব্যালটের দিকে তাকিয়ে কে ভুল ড্যানকে ভোট দিয়েছেন, তা বোঝা যাবে কীভাবে? 

গল্পে আরেক মোড় আছে। আলাস্কায় ভোটাররা প্রার্থীদের পছন্দের ক্রমে সাজাতে পারেন। প্রথম পছন্দে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা প্রার্থী বাদ পড়েন, আর তার ভোটারদের পরবর্তী পছন্দ গোনা হয়। 

প্রাথমিক ব্যালট বিশ্লেষণে অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীর পরবর্তী পছন্দ থেকে সেনেটর সুলিভানের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। 

সুতরাং ড্যানের সঙ্গে ড্যান যোগ করে এখনই বিজয়মালা কেনা যাচ্ছে না। অঙ্কে যোগ করা সহজ, ব্যালটে ভোটারের পছন্দ যোগ করা অত সহজ নয়।

নামের জোরে আরেক কেসির জয়

ড্যানদের এই দুর্দশা দেখে পেনসিলভেনিয়ার ইতিহাস বলতেই পারে, আপনারা তো মাত্র শুরু করলেন!

সেখানকার পরিচিত ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক ছিলেন রবার্ট পি. কেসি, তখন রাজ্যের অডিটর জেনারেল।

১৯৭৬ সালে ট্রেজারার পদে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়নপ্রার্থী হলেন তুলনামূলক অপরিচিত রবার্ট ই. কেসি। নামের মাঝখানে একটি অক্ষরের তফাৎ। ভোটারদের একাংশ সে তফাৎ ধরেননি।

তারা ভেবেছিলেন পরিচিত অডিটর জেনারেলকেই ভোট দিচ্ছেন। প্রায় কোনো প্রচার ও অর্থ ব্যয় ছাড়াই অন্য কেসি প্রাইমারি ও মূল নির্বাচন, দুটোই জিতে যান।

১৯৭৮ সালে এলেন আরেক রবার্ট কেসি, পেশায় শিক্ষক, খণ্ডকালীন আইসক্রিম বিক্রেতা। 

তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেন। একই বছর গভর্নর পদের প্রাইমারিতে হারলেন পরিচিত রাজনীতিক কেসি। শিক্ষক কেসি অবশ্য মূল নির্বাচনে হেরে যান। তবে পরিচিত কেসির শিক্ষা হয়েছিল যথেষ্ট। ১৯৮৬ সালে গভর্নর নির্বাচনে তার সফল প্রচারের পরিচয়ই হয়ে দাঁড়ালো ‘দ্য রিয়েল বব কেসি’। 

রাজনীতিতে সাধারণত বলতে হয়, ‘আমিই যোগ্য’। এখানে বলতে হয়েছে, ‘আমিই আমি’।

রদ্রিগেজের পাশে রদ্রিগেজ, ব্যবধান ৩২

নামের এই খেলা সব সময় হালকা রসিকতা থাকে না। ফ্লোরিডার ২০২০ সালের স্টেট সিনেট নির্বাচন তার প্রমাণ। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হোসে হাভিয়ের রদ্রিগেজের আসনে দাঁড়ালেন নির্দলীয় অ্যালেক্স রদ্রিগেজ। অ্যালেক্স পেলেন ৬ হাজার ৩৮২ ভোট। হোসে রিপাবলিকান প্রার্থী ইলিয়ানা গার্সিয়ার কাছে হারলেন মাত্র ৩২ ভোটে।

পরে অ্যালেক্স নির্বাচনি অর্থায়নসংক্রান্ত অপরাধে দোষ স্বীকার করেন। তাকে অর্থ দিয়ে প্রার্থী করার ঘটনায় সাবেক রিপাবলিকান স্টেট সিনেটর ফ্র্যাঙ্ক আরটিলেসও ২০২৪ সালে দোষী সাব্যস্ত হন, পরে তিনি আপিল করেন। গার্সিয়া সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। অ্যালেক্সের সব ভোট হোসে পেতেন, এমন প্রমাণ নেই। তবে একই পদবি ব্যবহার করে ভোট কাটার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের ঘটনা সামনে এসেছে। 

কেউ নির্বাচনে দাঁড়ান জেতার জন্য, কেউ আবার অন্যকে হারানোর জন্য। দ্বিতীয় কাজে নিজের জামানত গেলেও পরিকল্পনাকারীর লাভ থেকে যেতে পারে।

নাম নয়, চেহারাও ‘কপি’

আমেরিকা-রাশিয়া দুই শত্রুভাবাপন্ন দেশ। কিন্তু ভোট রঙ্গে যেন দারুণ মিল। 

২০২১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে ইয়াবলোকো দলের বিরোধী রাজনীতিক বরিস ভিশনেভস্কি দেখলেন, তার বিরুদ্ধে আরও দুজন বরিস ভিশনেভস্কি প্রার্থী হয়েছেন। 

তার অভিযোগ, নাম বদলানোর পাশাপাশি নির্বাচনি ছবিতেও তারা চেহারা বানিয়েছেন তারই মতো। তিনজনেরই টাকমাথা, ধূসর দাড়ি, কাছাকাছি অবয়ব।

নাম দেখে চিনতে অসুবিধা। ছবি দেখে চিনতেও অসুবিধা। ভোট দিতে এসে ভোটার যেন ‘দুই ছবির পার্থক্য খুঁজুন’ পরীক্ষায় বসে পড়েছেন।

কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধানও ঘটনার নিন্দা করেন, কিন্তু প্রার্থিতা বহালই থাকে। পিতৃপরিচয়ভিত্তিক মধ্যনাম দিয়ে অবশ্য তিনজনকে আলাদা করা যাচ্ছিল। একজনের অভিযোগ, তাকে হারাতেই এই আয়োজন। অন্য দুজনের প্রতিক্রিয়া সংবাদমাধ্যম পায়নি। তবু ভোটারের সামনে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি যে পরিচয় শনাক্ত করার বাড়তি কাজ এসে গিয়েছিল, তা বোঝাই যায়।

এক সাহুর এত সাহু

ভারতের ছত্তিশগড়ের মহাসমুন্দে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী চান্দু লাল সাহুও পড়েছিলেন নাম নিয়ে দুশ্চিন্তায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হিসাবে একই আসনে আরও ১০ জনের নাম ছিল তার নামের মতো বা কাছাকাছি। তারা মিলে পান ৭০ হাজারের বেশি ভোট। বিজেপির সাহু কংগ্রেসের অজিত যোগীকে হারান মাত্র ১ হাজার ২১৭ ভোটে।

চান্দু লাল সাহুকে ভোট দিতে এসে ভোটার দেখছেন, সাহুর অভাব নেই। প্রার্থী তালিকা যেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে নামের পুনর্মিলনীও আয়োজন করেছে। অন্য সাহুদের সব ভোট বিজেপির সাহুর পাওয়ার কথা ছিল, এমন দাবি করা যায় না। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়ার পাশাপাশি নিজের নামের এতগুলো সংস্করণের ভিড়ে তাকে আলাদা হয়েও উঠতে হয়েছিল।

একটি শব্দের বানানে ১০ হাজার ভোট

ব্রিটেনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রিচার্ড হাগেট অন্যের নাম ধার করার ঝামেলায় যাননি। ১৯৯৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের পরিচয় লিখলেন- ‘Literal Democrat’। প্রতিষ্ঠিত দলের নাম ‘Liberal Democrat’। চোখ একটু তাড়াহুড়ো করলে দুই শব্দের ফারাক এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নথি অনুযায়ী, প্রচার না করেও হাগেট পান ১০ হাজার ২০৩ ভোট। লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের প্রকৃত প্রার্থী কনজারভেটিভ প্রার্থীর কাছে হারেন প্রায় ৭০০ ভোটে। বিষয়টি গড়ায় আদালত ও পার্লামেন্ট পর্যন্ত। 

ভাষার শিক্ষক বলবেন, বানানে খেয়াল রাখো। এই নির্বাচন বলছে, বানানে খেয়াল না রাখলে রাজনৈতিক মানচিত্রেও দাগ পড়ে যেতে পারে।

দুই রব্বানী, তিন সাইফুল

আমেরিকায় ড্যানের পাশে ড্যান, রাশিয়ায় বরিসের পাশে বরিস। ভারত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফিরলে দেখা যায়, এখানেও নামের মিল বসে আছে। জায়গাটা রংপুরের মিঠাপুকুর।

২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. গোলাম রব্বানীর বিপক্ষে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. গোলাম রব্বানী। দুজনই শিক্ষক। 

এখানে অবশ্য কাউকে অন্যজনের ভোট কাটতে দাঁড় করানোর প্রমাণ নেই। দুজনই নিজ নিজ দলের রাজনীতিক। বরং বিএনপির রব্বানী মনোনয়ন পাওয়ার পর জামায়াতের রব্বানী তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। একই নাম আর একই শিক্ষকতার পরিচয়ের মধ্যে ভোটারকে পথ দেখিয়েছে আলাদা প্রতীক: একজনের ধানের শীষ, অন্যজনের দাঁড়িপাল্লা। জয়ী হন জামায়াতের রব্বানী। 

একই নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী হন তিনজন সাইফুল।  শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সাইফুল আলম বিএনপি জোট সমর্থিত সাইফুল হককে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র নির্বাচন করা সাইফুল আলম নিরব হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে থেকে তৃতীয় হন।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও একই নামের প্রার্থী থাকলে বাবা, মা বা স্বামীর নাম বিবেচনায় নিয়ে তালিকায় তাদের আলাদা করার নির্দেশনা দিয়েছে। 

দেশ আলাদা, ভাষা আলাদা, ভোটের পদ্ধতিও আলাদা। কোথাও নামের মিল কাকতাল, কোথাও পরিকল্পনার অভিযোগ, কোথাও অর্থায়নের অপরাধও প্রমাণিত। সব ঘটনাকে এক পাল্লায় মাপার উপায় নেই।

তবু আলাস্কা থেকে ঢাকা হয়ে মিঠাপুকুর পর্যন্ত ভোটারের একটি কাজ প্রায় এক - পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আগে নিশ্চিত হওয়া, মানুষটি আসলেই সেই মানুষ তো?