সেই ২০০৪ সালের কথা বলছি। আমি তখন রানা মামার সাথে কোক আর চিপস নিয়ে খেলা দেখার পাঁয়তারা করতাম। ঠিক আগের বিশ্বকাপেই ব্রাজিলকে সমর্থন দেওয়া শুরু করি। তখন আবার ডেভিড বেকহামকে দেখে লাল জার্সি পছন্দ ছিল।
সেই থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড! আর ইএসপিএনে প্রিমিয়ার লিগে ইউনাইটেডের খেলা মানেই একটু পরপর একটা হ্যাংলা লম্বা ছেলের স্তুতি আর প্রশংসা।
‘রোনালদো দিস, রোনালদো দ্যাট!’
মানে বেকহামকে রিপ্লেস করতেই তাকে নিয়ে আসা। বেকহামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এন্তার। স্যার এলেক্স ফার্গুসনের মতে বেকহাম ছিলেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ইউনাইটেডের মতো দলের ঐক্যের জন্য খারাপ।
একবার তো রেগে গিয়ে জুতায় লাথি মেরেছিলেন স্যার এলেক্স। সেটা গিয়ে লাগে বেকহামের কপালে, মাথায় চোটের দাগ নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন বেকহাম।
জার্সি নাম্বার সাত, ইউনাইটেডে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, ট্রেবল, চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং শেষ দৃশ্যে রেয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া। সব মিলিয়েই বেকহাম যে সিনেমাটা শুরু করেছিলেন রোনালদো হলেন সেটার ‘হ্যাপিলি এভার আফটার’ ভার্সন।
আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চেও দেখেছিলাম দুজনের কান্না, সেই পর্তুগালে ফিগো ছিলেন নায়ক, রোনালদো নায়কের ছোট ভাই, ফিগো পরতেন ৭, রোনালদো ১৭।
২০০৪ সালের ইউরোতে রূপকথার গল্প লেখা গ্রীসের সাথে হেরে ১৭ নাম্বার জার্সি পরা রোনালদোর সে কী কান্না!
আজও চোখে ভাসে, ইউনাইটেডে খেলে, ৭ নাম্বার জার্সি পরে, ইউরোর ফাইনালের সহানুভূতি সব মিলিয়ে আমার শৈশব ছিল রোনালদোর পাঁড় ভক্ত হওয়ার একদম যথাযথ মঞ্চ।
এরপর আর ঠেকায় কে! তখনও ‘সিউউউউ’- এর আবিষ্কার হয়নি। রোনালদো তখনও ফেরারি, রকেটে পরিণত হননি।
ব্যালন ডি অর জিতছেন, সতীর্থদের মাইক কেড়ে নিচ্ছেন, ইংল্যান্ডের ফুটবলের সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে স্যুটেড হয়ে বলছেন- আমিই সেরা।
রোনালদো সর্বময়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাদোর আমেজ, প্রভাব এমনই ছিল ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলারের নাম হয়ে গেলো মানুষের কাছে ব্রাজিলের রোনালদো।
এরপর তিনি ছাড়লেন ঘর, ছাড়লেন ভালোবাসা, ছাড়লেন থিয়েটার অব ড্রিমস! আরেক স্বপ্নের খোঁজে।
লাল বিপ্লব ছেড়ে যেন শুভ্র আভিজাত্যের দুয়ারে পা রাখলেন, সান্তিয়াগো বার্নাব্যু তাকে কুর্নিশ করলেন।
তখন রোনালদো সিআর নাইন, বড় ভাই রাউলম্ব গঞ্জালেজকে অসম্মান করতে পারবে না মাদ্রিদ।
রাউল তখন রেয়ালের সমার্থক শব্দ। ওরে বাবা! সেই উন্মাদনা!
রোনালদো রেয়ালকে জেতানো শুরু করলেন তাদের বহু আরাধ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা, যেটা শেষ জিতেছিল ২০০২ সালে।
এরপর ২০১৪, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮!
একের পর এক রোনালদোময় রাত, দক্ষিণ এশিয়ায় বলা যায় মধ্যরাত।
আমরা যারা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আজীবন ফ্যান, আবার রোনালদোকেও ভালোবাসি, তারা তখন রেয়াল মাদ্রিদের খেলা এমনভাবে দেখতাম যেন জামায়তের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করছে এনসিপি।
রোনালদোর আনন্দে, আমাদের আনন্দ। রোনালদোর কান্নায়, আমাদের কান্না।
২০১৬ সালের ইউরোর রাত, ফ্রান্সকে হারিয়ে পর্তুগালের ইউরো জয়। রোনালদোর রেয়াল মাদ্রিদ ছাড়া, এরপর আবার নাটকীয়ভাবে চূড়ান্ত ফ্লপ এক ক্লাইম্যাক্সের আশায় কিংবা দুরাশায় আবার ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফিরে আসা।
এরমাঝে রোনালদো একটা জিনিস কেবল ভুলে জাননি, সেটা হলো গোল করা।
রোনালদো এখন হাজারের আরও কাছে, রোনালদোকে হয়তো এসব সংখ্যা আনন্দ দেবে, কিন্তু আমাদের না, আমরা যারা রোনালদোকে ভালবেসেছি তার ক্ষুধা দেখে, তার স্পর্ধা দেখে, তার অহমিকা ও নিবেদন দেখে, আমাদের কাছে রোনালদোর হেরে যাওয়া মুখ গল্পটা শেষ হতে দেয় না।
কোথায় যেন একটা মেইজ তৈরি হয়ে আছে, কিংবা পাজলের শেষ একটা টুকরো, রোনালদোকে সেরা বলতে বাধা দিচ্ছে, সেখানেই আমাদের কান্না আর রোনালদোর কান্না মিলেমিশে একাকার হয়।
মাদেইরার ছোট ছেলেটা আজকে বিশ্বকে কাঁদাচ্ছে, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে অলরেডি ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ। তার নামে স্টেডিয়াম আছে, তার নামে বিমানবন্দর আছে, তার নামের পাশে আছে হাজার তরুণ-তরুণীর বদলে যাওয়ার গল্প, আর আমার হাতে সেই ২০১৬ সাল থেকে পরে আসা একটা রিস্টব্যান্ড- খোদাই করে লেখা ‘ক্রিশ্চিয়ান রোনালদো- সিআরসেভেন।’



