নির্বাচন হয়ে গেছে। নতুন সংসদ বসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতি দেখলে মাঝেমধ্যে মনে হয়, নির্বাচনটা যেন এখনো শেষ হয়নি। তারা আন্দোলন তো করছে, রাজনীতি কি করছে?
জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট গত ছয় মাসে বারবার সংসদ থেকে রাজপথে ফিরে গেছে। ওয়াকআউট হয়েছে। মানববন্ধন হয়েছে। মিছিল হয়েছে। অবস্থান কর্মসূচি হয়েছে। বিভাগীয় সমাবেশ হয়েছে। লংমার্চ হয়েছে। আবার বড় কর্মসূচির আলটিমেটাম এসেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে রাজনৈতিক সংঘাতের আশংকার কথাও বলা হয়েছে। এমনকি আট দফা এক দফায় পরিণত হতে পারে, এমন বক্তব্যও এসেছে।
এপ্রিলের শুরুতেই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছিলেন, সংসদে সমাধান না হলে তারা জনগণের কাছে ফিরে যাবেন। অর্থাৎ রাজপথে যাবেন। জুলাইতেও একই প্রশ্নে বিরোধীরা সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়। অগাস্টে সেই আন্দোলন গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের মতো ইস্যুতেও ছড়িয়ে পড়ে।
রাজপথে যাওয়া অপরাধ নয়। বরং গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হচ্ছে সরকারকে চাপে রাখা। বাংলাদেশের অতীত বিবেচনায় সংসদে থেকেও রাজপথে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু একটি দল যখন নির্বাচন করে সংসদে যায়, তখন তার রাজনীতির চরিত্রেও কিছু পরিবর্তন আসার কথা। আন্দোলনকারী দল তখন সম্ভাব্য সরকারও। সরকার কী ভুল করছে, সেটি বলার পাশাপাশি সে কীভাবে ভিন্নভাবে দেশ চালাবে, সেটিও দেখাতে হয়।
জামায়াত-এনসিপির ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় পরিচয়টি এখনো প্রথমটির চেয়ে দুর্বল মনে হচ্ছে। তাদের কোনো নীতিগত প্রস্তাব নেই, এমন কথা বলা যাবে না। এনসিপি জুনে ৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার একটি ছায়া বাজেট দিয়েছে। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, করব্যবস্থা এবং জ্বালানি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিলো। জামায়াতও ৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার বিকল্প বাজেট দিয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে।
সুতরাং সমস্যা নীতির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো, তাদের দৈনন্দিন রাজনীতির প্রধান পরিচয় হয়ে উঠছে কোনটি। ছায়া বাজেট, নাকি লংমার্চ? নীতি, নাকি আলটিমেটাম? সংসদ, নাকি প্রতিবার সংসদে মত না মিললে রাজপথ? এই জায়গাতেই গত ছয় মাসের একটা ধরন চোখে পড়ে।
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধীদের একটি মতবিরোধ আছে। বিরোধীরা মনে করে গণভোটের রায় অনুযায়ী আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদ বসতে হবে। সরকার বলছে, নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই সাংবিধানিক সংশোধন করা সম্ভব। বিরোধীরা সরকারের বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে যোগ দেয়নি। জুলাইয়ে কমিটি গঠনের সময় তারা ওয়াকআউট করে। অগাস্টে মানবাধিকার কমিশন ও গুমবিরোধী আইনসহ কয়েকটি বিলের ক্ষেত্রেও তারা একইভাবে খণ্ড খণ্ড সংস্কারের পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান করে বেরিয়ে গেছে।
আপনি যদি সংসদে থাকেন, কিন্তু নিজের পছন্দের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি না হলে সেই প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকেই লড়াই করতে না চান, তাহলে সংসদের প্রয়োজনটা কোথায়? সংসদ শুধু নিজের প্রস্তাব পাস করানোর জায়গা নয়। সংসদ এমন জায়গাও, যেখানে আপনি হারবেন। তর্ক করবেন। সংশোধনী দেবেন। কমিটিতে বসবেন, লড়বেন।
প্রতিটি মতবিরোধকে যদি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের প্রশ্নে পরিণত করতে হয়, তাহলে নির্বাচনি রাজনীতি আর আন্দোলনের রাজনীতির পার্থক্য খুব বেশি থাকে না। যেমন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের কথাই ধরা যাক। নতুন আইনে পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি, নানা-নানি ও তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগাধিকার রেখে দিতে পারবেন। আইনটির উদ্দেশ্যের পেছনে খুব পরিচিত একটি সামাজিক সমস্যা আছে। বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই সেই বাড়ি বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। আইনের ভাষায় আরও বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থাটি মুসলিম আইনের হেবা বা অন্য প্রচলিত হস্তান্তর-পদ্ধতি বাতিল করছে না।
এই আইন নিখুঁত কিনা, সেটি অবশ্যই আলোচনার বিষয়। নতুন আইন অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে কিনা, মালিকানা ও ভোগাধিকারের সম্পর্ক কী হবে, পরিবারে নতুন বিরোধ তৈরি হবে কিনা, এসব নিয়ে ভালো আইনি বিতর্ক হতে পারে। প্রবীণ বাবা-মাকে সুরক্ষা দেওয়ার আরও কার্যকর উপায় আছে কিনা, সেটিও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু জামায়াতের প্রধান আপত্তির ভাষা ছিলো অন্যরকম। শফিকুর রহমান সংসদে শরিয়তের সঙ্গে আইনের অসংগতির কথা বলেছেন। জামায়াতের এমপি নাজিবুর রহমান একে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বলেছেন। পরে জামায়াত আইনটি প্রত্যাহারের দাবিতে কর্মসূচি দিয়েছে এবং আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আমার আপত্তির জায়গা ধর্ম নয়। প্রশ্ন হলো, সামাজিক নীতির একটি সমস্যাকে আমরা কোন ভাষায় আলোচনা করবো? রাষ্ট্র একটি সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য আইন আনছে। বিরোধী দল বলতে পারে আইনটি কাজ করবে না। বলতে পারে এটি সম্পত্তির অধিকারে নতুন জটিলতা তৈরি করবে। বলতে পারে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য অন্য ব্যবস্থা দরকার। তারা বিকল্প বিলও দিতে পারে। কিন্তু আলোচনার প্রধান প্রশ্ন যদি হয়ে যায়, আইনটি কোরআন-সুন্নাহসম্মত কিনা, তাহলে জননীতির বিতর্ক খুব দ্রুত ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে পরিণত হয়। এই প্রবণতাটাই জামায়াতের বর্তমান রাজনীতির বড় একটি সীমাবদ্ধতা।
অর্থনীতি নিয়ে তাদের বক্তব্য আছে। কিন্তু অর্থনীতি নিয়েও ধর্মীয় কাঠামোর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। জুনে সংসদে জামায়াতের এমপি মুজিবুর রহমান বিদ্যমান সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা “কবর” দিয়ে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি এবং মদিনার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আলাদা জাকাত মন্ত্রণালয়েরও প্রস্তাব করেছেন। এগুলো আলোচনা করা যাবে না, এমন নয়। ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা ও তাত্ত্বিক আলোচনা আছে। কিন্তু একটা আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিকল্প যদি দেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কীভাবে চলবে। মুদ্রানীতি কী হবে। আন্তর্জাতিক ঋণ কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে। বেসরকারি ঋণবাজার কীভাবে কাজ করবে। বিনিয়োগে অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন কীভাবে হবে।
স্লোগান এবং শাসনকাঠামো এক জিনিস নয়। জামায়াত স্লোগান দিচ্ছে, শাসন কাঠামো দিচ্ছে কি? আর এখানে জামায়াত-এনসিপির মধ্যে একটা পার্থক্যও আছে, যদিও এই লেখায় আমি তাদের একটি বিরোধী ব্লক হিসেবেই দেখছি। এনসিপির ছায়া বাজেট তুলনামূলকভাবে প্রচলিত নীতিগত ভাষায় লেখা। যদিও জামাতের মতন তাদের নীতিগত কাজ বারবার আন্দোলনী ভাষার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
ক্যাম্পাসে রাজনীতির দিকে তাকানো যাক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের শেষ দিকে তিন শিক্ষার্থীকে কয়েক দফা মারধরের ঘটনায় রাকসু নেতা এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে। একটি ভিডিওতে আহত এক শিক্ষার্থীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে মারধরের ঘটনাও দেখা যায়। পরে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারসহ নয়জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয় এবং আদালত বিষয়টি পিবিআইকে তদন্ত করতে দেয়। এরপর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও “ব্যবস্থা” নেওয়ার হুমকির অভিযোগ আসে। জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াত আইনের শাসন চাচ্ছে। কিন্তু নিজেদের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র শিবিরের কর্মীদের ক্ষেত্রে কি সেই নীতি মানছেন?
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন নৈতিকতার প্রশ্ন আসে। জামায়াত তার রাজনীতিতে নৈতিকতার ওপর খুব বেশি জোর দেয়, কিন্তু তাদের সংসদ সদস্যরা কি তা মানছেন? যেমন, সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটি বিবেচনা করা যাক। তার ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জুলাইয়ে একটি ভিডিও নিয়ে বিতর্কের পর জামায়াত নিজেদের তদন্তে “নৈতিক স্খলন”-এর প্রমাণ পাওয়ার কথা বলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। সেপ্টেম্বরে তার ১৯ বছর বয়সী দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়। মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত গাজী নজরুলকে চার দিনের এবং তার প্রথম স্ত্রীকে এক দিনের রিমান্ড দিয়েছে।
এই প্রেক্ষিতে, রাজনৈতিক প্রশ্নটি থেকে যায়। যে দল অন্যদের সামনে নৈতিকতার মানদণ্ড দাঁড় করায়, তার নিজের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড কতটা কার্যকর? এখানে জামায়াত অন্তত গাজী নজরুলকে আগেই দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে তাদের আরও কয়েকজন এমপিকে নিয়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অসংগত বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আচরণের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ফলে “আমরা অন্যদের চেয়ে নৈতিকভাবে আলাদা” ধরনের রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই আরও কঠোরভাবে যাচাইয়ের মুখে পড়ে।
তারপর আসে ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু আর্কাইভে সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কয়েকটি ছবি ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক উপাদান প্রদর্শন নিয়ে বড় বিতর্ক হয়েছে। ডাকসুর যেসব শীর্ষ নেতা নির্বাচনে নিজেদের নির্দলীয় হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাদের কয়েকজন পরে ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই শিবির নেতাদের উদ্যোগ কি গণহত্যার পক্ষে ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রবণতা নয়? এর দায় কি জামায়াত এড়াতে পারে?
বাংলাদেশে ইতিহাস এখন আবার রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হচ্ছে। জিন্নাহ কে ছিলেন। পাকিস্তানের উত্তরাধিকারকে কীভাবে দেখা হবে। মুক্তিযুদ্ধের জায়গা কোথায়। জুলাই ২০২৪ কীভাবে ১৯৭১-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। কারা জুলাইয়ের “আসল” প্রতিনিধি। কোন ইতিহাস জাদুঘরে থাকবে। কোন ছবি আর্কাইভে থাকবে। এগুলো পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির খুব শক্তিশালী উপাদান। সমস্যা হচ্ছে, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তুলনামূলকভাবে সহজ। রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি কঠিন। একটি ছবি নিয়ে অবস্থান নেওয়া সহজ। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার করা কঠিন। ইতিহাসের কোনো চরিত্রকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা সহজ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন কীভাবে বদলাবে, সেটা বলা কঠিন। জুলাইয়ের মালিকানা দাবি করা সহজ। পাঁচ বছর পরে বেকারত্ব কমানোর পরিমাপযোগ্য পরিকল্পনা দেওয়া কঠিন।
আর জামায়াতের জন্য ১৯৭১-এর প্রশ্ন তো আরও গভীর ও প্রসঙ্গিক। সম্প্রতি প্রকাশিত দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর স্মৃতিকথা দেখাচ্ছে, দলের ভেতরে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য আনুষ্ঠানিক ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা একাধিকবার হয়েছিল। খসড়া হয়েছিল। আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। রাজ্জাক নিজেই লিখেছেন, পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন থেকে সরে না আসা ছিলো অনৈতিক এবং ইসলামবিরোধী। তার মতে, দলটির উচিত ছিলো ১৯৭১-এর ভূমিকার জন্য জাতির কাছে পরিষ্কারভাবে ক্ষমা চাওয়া। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পরে এটি আর শুধু ইতিহাসের প্রশ্ন নয়। কারণ জামায়াত এখন দেশের প্রধান সংসদীয় বিরোধী দল।
একটি দল যত প্রান্তিক থাকে, তার অতীত নিয়ে প্রশ্নও অনেক সময় প্রান্তিক থাকে। দলটি যখন রাষ্ট্রক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদার হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্নটা বদলে যায়। তখন মানুষ জানতে চায়, আপনার রাষ্ট্রচিন্তা কী? আপনি ১৯৭১-কে কীভাবে দেখেন? রাষ্ট্রের আইন কি নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে হবে, নাকি ধর্মীয় বৈধতার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে? নারীর অধিকার নিয়ে আপনার অবস্থান কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার ছাত্ররাজনীতি কেমন হবে? আপনি বিরোধী মতের মানুষের জন্য একই ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া চান কিনা? আপনার অর্থনৈতিক কাঠামো কী? আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনি কি শুধু ভালো বিরোধী দল হতে চান, নাকি নিজেকে সম্ভাব্য ভালো সরকার হিসেবেও প্রস্তুত করছেন?
জামায়াত-এনসিপির গত ছয় মাসের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। তাদের সবচেয়ে দৃশ্যমান বড় দুর্বলতা হলো তারা এখন আন্দোলনের ভাষায় সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। জুলাই। জনরায়। আন্দোলন। লংমার্চ। আলটিমেটাম। রাজপথ। ধর্ম। ইতিহাস। এই শব্দগুলোর রাজনৈতিক শক্তি আছে। কিন্তু সরকার চালাতে আরও কিছু শব্দ লাগে। সমঝোতা লাগে। প্রতিষ্ঠান লাগে। নীতি লাগে। সংখ্যার হিসাব লাগে। আইনের সূক্ষ্মতা লাগে। ভিন্নমত সহ্য করার অভ্যাস লাগে। নিজের সমর্থকদেরও আইনের অধীনে রাখার সক্ষমতা লাগে। একটি বিরোধী দলের আসল পরীক্ষা শুধু কত মানুষ নিয়ে লংমার্চ করতে পারে, তা নয়। পরীক্ষা হলো, মানুষ একদিন যদি তাদের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে দেয়, তখন তারা কী করবে এই বিকল্প মানুষের সামনে স্পষ্ট করা? গত ছয় মাসে জামায়াত-এনসিপি দেখিয়েছে, তারা আন্দোলন করতে জানে। এখন তাদের কঠিন কাজ হলো দেখানো, তারা আন্দোলনের বাইরেও রাজনীতি করতে জানে।
লেখক: ডক্টোরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র



