জুলাই, জিলোট ও মক্কা বিজয়: প্রতিরোধ থেকে রাষ্ট্রের পথে

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান এমন এক বাস্তবতা থেকে জন্ম নিয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করেছিল, প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে থেকে পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে রাজপথ হয়ে ওঠে তাদের রাজনৈতিক ভাষা। 

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। কিন্তু ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত একে অপরের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। ভিন্ন সময়, ভিন্ন ভূগোল এবং ভিন্ন ধর্মীয়-রাজনৈতিক বাস্তবতা সত্ত্বেও কিছু প্রশ্ন বারবার মানুষের সামনে দাঁড়ায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ কেন বিদ্রোহ করে? বিদ্রোহের নৈতিক সীমা কোথায়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিজয়ের পর কী হয়?

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বুঝতে গিয়ে আমার বারবার খ্রিস্টপূর্ব নয়, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর জুদিয়ার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে রোমান অধিকৃত সেই ভূখণ্ড, যেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় আবেগ এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ মিলেমিশে এক বিস্ফোরক বাস্তবতা তৈরি করেছিল। আবার মনে পড়ে মক্কা বিজয়ের কথাও, যেখানে দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় এসেছিল; কিন্তু বিজয়ের আসল মাহাত্ম্য প্রকাশ পেয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিজয়ের পর রাষ্ট্র ও সমাজকে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে।অবশ্যই এই তিনটি ঘটনাকে এক করে দেখা যাবে না। তাদের প্রেক্ষাপট, চরিত্র ও উদ্দেশ্য এক নয়। তবু ইতিহাসের গভীরে তাকালে একটি মিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রতিটি ঘটনাই মানুষকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছিল, প্রতিরোধের পরে কী?

রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে জুদিয়ার মানুষ শুধু বিদেশি শাসনের অধীন ছিলো না; তারা নিজেদের ধর্মীয় ও জাতীয় মর্যাদাকেও হুমকির মুখে পড়তে দেখছিল। এই পরিস্থিতি থেকে জন্ম নেয় বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া। কেউ আপসের পথ বেছে নেয়, কেউ ধর্মীয় সংস্কারের কথা বলে, কেউ নির্জন জীবনকে আদর্শ মনে করে, আবার একদল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে স্বাধীনতা কেবল সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমেই সম্ভব। ইতিহাসে এই গোষ্ঠীই ‘জিলোট’ নামে পরিচিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

জিলোটদের আবির্ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো না। তারা ছিলো দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অপমান ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার ফল। যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে বিদ্যমান ব্যবস্থা ন্যায়বিচার দিতে পারে, তখন প্রতিরোধের ভাষা জন্ম নেয়। এই সত্য শুধু জুদিয়ার নয়; ইতিহাসের প্রায় সব গণআন্দোলনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও এমন এক বাস্তবতা থেকে জন্ম নিয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করেছিল, প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে থেকে পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে রাজপথ হয়ে ওঠে তাদের রাজনৈতিক ভাষা। ইতিহাসে এমন মুহূর্ত বারবার এসেছে, যখন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা হারালে জনপথই রাজনৈতিক বৈধতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। প্রতিরোধের শক্তি যত বড়ই হোক, সেটি নিজে কখনো রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে না। প্রতিরোধ একটি দরজা খুলে দেয়; সেই দরজা দিয়ে কেমন রাষ্ট্র প্রবেশ করবে, সেটি নির্ধারণ করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নৈতিকতা এবং প্রতিষ্ঠান।

এই কারণেই মক্কা বিজয় ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা। দীর্ঘ নির্যাতন, নির্বাসন এবং সংঘাতের পর মুসলমানরা মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন বিজয়ী হিসেবে। সেই মুহূর্তটি প্রতিশোধের উৎসবে পরিণত হতে পারতো। কিন্তু ইসলামি ঐতিহ্যে আমরা দেখি, বিজয়ের পর গুরুত্ব পায় শৃঙ্খলা, ক্ষমা, সামাজিক পুনর্মিলন, জ্ঞানচর্চায় মনোযোগ এবং একটি নতুন নৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন। ইতিহাসের শিক্ষা এখানেই—বিজয় তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রতিশোধের ভাষা থেকে ন্যায়বিচারের ভাষায় উত্তরণ ঘটায়।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বুঝতে গিয়ে আমার বারবার খ্রিস্টপূর্ব নয়, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর জুদিয়ার কথা মনে পড়ে।

এই অভিজ্ঞতা শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের নয়; রাষ্ট্রচিন্তারও। কারণ একটি আন্দোলন বা বিপ্লবের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় তার বিজয়ের পরের আচরণে। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ন্যায়বিচারের কথা বলে, তারা ক্ষমতায় গিয়েও কি একই নীতির প্রতি অনুগত থাকে? যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ে, তারা কি নতুন বৈষম্য তৈরি করে না? যারা জবাবদিহির দাবি তোলে, তারা কি নিজেরাও জবাবদিহি মেনে নেয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করে কোনো আন্দোলন ইতিহাসে কী পরিচয়ে বেঁচে থাকবে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশও ঠিক এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আন্দোলনের আবেগ ধীরে ধীরে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। রাষ্ট্র চালাতে হয় আইন দিয়ে, প্রতিষ্ঠান দিয়ে, সমঝোতা দিয়ে। রাজপথে যে স্লোগান মানুষকে একত্র করে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই স্লোগানের পাশাপাশি প্রয়োজন সংবিধান, নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক আত্মসংযম।

ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা হলো, বিজয়ের পর সবচেয়ে বড় বিপদ বাইরে থেকে নয়; ভেতর থেকে আসে। আন্দোলনের সময় যে ঐক্য তৈরি হয়, ক্ষমতার প্রশ্ন সামনে আসতেই সেই ঐক্যে ফাটল দেখা দেয়। ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দলীয় প্রতিযোগিতা এবং মতাদর্শগত বিভাজন ধীরে ধীরে আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে আড়াল করে ফেলে। বহু বিপ্লবের ইতিহাসে এই দৃশ্য দেখা গেছে। তাই একটি সফল আন্দোলনের জন্য শুধু সাহসী কর্মী নয়, দূরদর্শী রাষ্ট্রনির্মাতাও প্রয়োজন।

জিলোটদের ইতিহাসও শেষ পর্যন্ত একটি সতর্কবার্তা বহন করে। প্রবল সাহস ও আত্মত্যাগ থাকা সত্ত্বেও তারা এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারতো। অন্যদিকে মক্কা বিজয়ের পর যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল, তার শক্তি ছিলো শুধু সামরিক সাফল্যে নয়; ন্যায়বিচার, চুক্তি, প্রশাসন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি নির্মাণে। দুটি ইতিহাসের ফল ভিন্ন হওয়ার পেছনে এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত আছে। কোনো গণঅভ্যুত্থানই নিজে শেষ লক্ষ্য নয়। এটি একটি সুযোগ—একটি জানালা, যার মাধ্যমে একটি জাতি নিজের রাষ্ট্রকে নতুনভাবে কল্পনা করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ ক্ষণস্থায়ী। যদি তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, প্রতিশোধ বা স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার হিসাবের মধ্যে আটকে যায়, তবে ইতিহাসের সেই জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।

ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থাকে, একটি জাতি কি শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছিল, নাকি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রও গড়েছিল?

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ করি, কিন্তু আন্দোলনের শিক্ষা সংরক্ষণ করি না। আমরা বিজয়ের দিনকে স্মরণ করি, কিন্তু বিজয়ের পর কী করা উচিত ছিলো, সেই আলোচনা খুব কম করি। ফলে এক প্রজন্মের অপূর্ণ স্বপ্ন আরেক প্রজন্মের আন্দোলনের স্লোগানে ফিরে আসে।

হয়তো এ কারণেই জুলাইকে বুঝতে গেলে শুধু জুলাইয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকলে হবে না। আমাদের তাকাতে হবে ইতিহাসের আরও দূরবর্তী আয়নাগুলোর দিকে। জুদিয়ার প্রতিরোধ আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কখনো নিঃশেষ হয় না। মক্কা বিজয় শেখায়, প্রতিরোধের চেয়েও কঠিন কাজ হলো ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ। আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে যদি প্রতিষ্ঠান, আইন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করা না যায়, তবে বিজয়ও একসময় স্মৃতিতে পরিণত হয়।

প্রতিটি প্রজন্মেরই একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব থাকে। কারও দায়িত্ব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কারও দায়িত্ব স্বাধীনতা অর্জন করা, আবার কারও দায়িত্ব সেই স্বাধীনতাকে টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া। জুলাইয়ের প্রজন্মের সামনে সম্ভবত এই তিনটি দায়িত্বই একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থাকে, একটি জাতি কি শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছিল, নাকি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রও গড়েছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও লেখা হচ্ছে। জুলাই তার একটি নির্দেশিকা অধ্যায়; সমাপ্তি নয়।

লেখক: সামান্তা শারমিন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক

[মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব]