ছাগলের রাজনীতি

একটি ছাগল কীভাবে হয়ে উঠতে পারে সাম্প্রদায়িকতা, উন্নয়ন, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার প্রতীক, বাংলাদেশের রাজনীতির গত কয়েক দশকের ছাগলকাণ্ডগুলো সেই গল্পই বলে।

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘ছাগলে কী না খায়, পাগলে কী না বলে।’ ছাগলের প্রতি প্রবাদের এই অপবাদ অবশ্য প্রাণিবিজ্ঞানসম্মত নয়। ছাগল বরং খাবার বাছাইয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রবাদটির হয়তো বাস্তবতা রয়েছে!

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘পাঁঠা’ কবিতায় লিখেছিলেন,

‘রসভরা রসময় রসের ছাগল।
তোমার কারণে আমি হয়েছি পাগল॥’

ঈশ্বরচন্দ্রের পাঁঠা ছিল রসনার বস্তু। দেড় শ বছরের বেশি সময় পর আমাদের ছাগল কখনো হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক স্মৃতির অংশ, কখনো উন্নয়ননীতির ঠাট্টা, কখনো দুর্নীতির সূত্র, আর শেষ পর্যন্ত আইনের অসহায়ত্বেরও এক অদ্ভুত প্রতীক।

ছাগলের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জীবনও কম বর্ণাঢ্য নয়। ব্রাজিলের ফোর্তালেজায় ১৯২২ সালে স্থানীয় রাজনীতিতে বিরক্ত মানুষ বোদে ইওইও নামের একটি ছাগলের নাম ব্যালটে লিখে প্রতীকী প্রতিবাদ করেছিল। ঘটনাটি এতটাই জনপ্রিয় স্মৃতি হয়ে আছে যে এক শতাব্দী পরও স্থানীয়ভাবে তার ‘নির্বাচন’ স্মরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও ক্লে হেনরি নামের ছাগল টেক্সাসের লাজিতাসে প্রতীকী মেয়র হয়েছে। কোথাও ছাগল মানুষের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

আমাদের উপমহাদেশে গল্পটি অনেক বেশি তিক্ত।

১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালিতে এসেছিলেন শান্তির বার্তা নিয়ে। তার খাদ্যতালিকায় ছাগলের দুধ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সময় তার জন্য রাখা একটি ছাগল চুরি করে খেয়ে ফেলার গল্প বহু বছর ধরে নোয়াখালিতে প্রচলিত।

এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর একটি আসে বিবিসির সাংবাদিক অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেডের কাছ থেকে। বিবিসিতে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করা হোয়াইটহেড ১৯৯৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ নিয়ে বিবিসি রেডিওর একটি সিরিজ তৈরির সময় নোয়াখালিতে যান। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তার প্রতিবেদনে আবদুল রউফ নামের এক বৃদ্ধ বলেন, তিনি নিজের চোখে গান্ধীকে গ্রামে যেতে দেখেছিলেন। তারই ভাষ্যে, কাছের আরেক গ্রামের স্থানীয় কয়েকজন মুসলমান গান্ধীর দুধের জন্য রাখা একটি ছাগল চুরি করে খেয়ে ফেলেছিল।

এটি প্রায় পঞ্চাশ বছর পর সংগৃহীত মৌখিক স্মৃতি, সমসাময়িক দলিল নয়। কিন্তু পরে গল্পটির চেহারা বদলেছে। ‘কাছের গ্রামের কয়েকজন’ ক্রমে হয়ে গেছে ‘নোয়াখালির মুসলমানেরা’। ব্যক্তি থেকে সম্প্রদায়, ঘটনা থেকে পরিচয়। হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি অনেক সময় এভাবেই কাজ করে। গান্ধী নোয়াখালিতে এসেছিলেন হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির বাণী নিয়ে। সামান্য একটি ছাগলের ঘটনাকে চড়িয়ে পরে সেটিকেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশেও ছাগল নিয়ে রাজনৈতিক শোরগোল থামেনি।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে, ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি প্রবল সমালোচনা ও হাসি-তামাশার মুখে পড়েছিল। বিষয়টি এমনভাবে প্রচারিত হয়েছিল যেন ছাগল দিয়েই সরকার দেশের দারিদ্র্য দূর করতে যাচ্ছে। বাস্তবে ধারণাটি অর্থনৈতিকভাবে একেবারে অবান্তর ছিল না। দরিদ্র গ্রামীণ পরিবার, বিশেষ করে নারীদের হাতে ছোট কিন্তু বংশবৃদ্ধি করতে পারে এমন উৎপাদনশীল সম্পদ দেওয়া উন্নয়ন অর্থনীতিতে পরিচিত পদ্ধতি। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বাংলাদেশের পরিবেশে বিশেষ উপযোগীও। ফলে এখানে প্রকল্পের অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক ঠাট্টাটাই বেশি দিন বেঁচে ছিলো।

এরপর ২০২৪ সালে আরেক ছাগল জাতীয় আলোচনায় আসে তার দাম দিয়ে। আলোচিত ১৫ লাখ টাকার ছাগলকে কেন্দ্র করে এনবিআরের তৎকালীন কর্মকর্তা মতিউর রহমানের পরিবারের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়। একটি ছাগল দেশব্যাপী সরকারি দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছাগলের গল্পটি সম্ভবত অন্যটি।

২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক আসিফ নজরুল পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, হেয়ার রোডের সরকারি বাসায় তার সাড়ে নয় বছরের মেয়ের জন্য একটি ছাগল রাখা হয়েছিল। নতুন পরিবেশে মেয়েটির তেমন বন্ধু ছিল না। ছাগলটি তার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। মেয়েটি স্কুলে গেলে প্রাণীটি তার ফেরার অপেক্ষায় থাকত। স্কুল থেকে ফিরে সে তার সঙ্গে খেলত। নিজের ফোনের ওয়ালপেপারেও মায়ের ছবির বদলে ছাগলটির গলা জড়িয়ে ধরে থাকা নিজের ছবি রেখেছিলো।

একদিন সেই ছাগলটি আর পাওয়া গেল না।

মেয়েটিকে বলা হয়েছিল, দরজা খোলা পেয়ে ছাগলটি পালিয়ে গেছে। আসিফ নজরুল পরে জানতে পারেন, সেটিকে নিয়ে গিয়ে জবাই করে খাওয়া হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, ছাগলটি হারানোর পর মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বমি করেছিলো, প্রায় দেড় দিন কিছু খেতে পারেনি। এখনও তাকে সত্যিটা বলা হয়নি।

এখানেই গল্পটি ছাগলের গল্প থাকা বন্ধ করে দেয়। এটি একটি শিশুর গল্প হয়ে যায়।

আর ঘটনাটির সঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর নাম জড়ানো নিয়ে গত এক বছরে তার নিজের বক্তব্যেও লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে।

২০২৫ সালের ২রা অক্টোবর নিউইয়র্কভিত্তিক বাংলা সংবাদমাধ্যম ‘ঠিকানা’র সঙ্গে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের এক সাক্ষাৎকারে পাটোয়ারী বলেছিলেন, তিনি ঘটনাটি ভালো করে বলতে পারবেন না, কারণ তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত নন। তার ভাষায়, ছাগলকাণ্ড নিয়ে তিনি ‘একটি গল্প শুনেছেন’। ছাগল রান্না করে খাওয়া হয়েছিল, এটিও তিনি শুনেছেন বলে জানিয়েছিলেন। এমনকি বলেছিলেন, তিনি মন্ত্রিপাড়ায় থাকেন না, পাড়া-প্রতিবেশী উপদেষ্টারা ভালো বলতে পারবেন।

কিন্তু গেলো ১৩ই সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে ভাষাটা আর ‘শুনেছি’-তে আটকে নেই।

সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, “আমি দেখেছি কারা কারা খাইছে, কী খাইছে।” একই বক্তব্যে বলেছেন, আসিফ নজরুলের দুটি ছাগলই খাওয়া উচিৎ ছিল এবং অন্যটিও খেতে বলেছেন।

অর্থাৎ, আগে জানা যাচ্ছিলো আসিফ নজরুলের একটি পোষা ছাগলের মর্মান্তিক পরিণতির কথা। এখন পাটোয়ারীর বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে, ছাগল ছিল দুটি। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আগে যিনি বলেছিলেন ঘটনাটি শুনেছেন এবং নিজে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, এখন তিনিই বলছেন কারা কী খেয়েছে তিনি দেখেছেন।

এই বদলে যাওয়া ভাষা তদন্তের বিষয় হতে পারে। ‘আমি দেখেছি’ মানেই অবশ্য কোনো অপরাধে অংশ নেওয়া নয়। ঘটনাস্থলে থাকা নিজে কোনো অপরাধও নয়। কিন্তু কে ছাগলটি নিয়েছিল, কার সিদ্ধান্তে জবাই হয়েছিল, কারা সহযোগিতা করেছিল এবং কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, কখনো যদি আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়, তাহলে প্রত্যক্ষদর্শীর এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এর চেয়েও বড় প্রশ্নটি রাজনৈতিক।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভাষার কেন্দ্রে ছিল মানুষের মর্যাদা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার অবসান। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় অসংবেদনশীলতার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভও সেই অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র নিজেদের ঘোষণাপত্রেও বিরোধী মত দমন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিপরীতে ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে।

সেই অভ্যুত্থানের একজন পরিচিত মুখ যখন একটি শিশুর পোষা প্রাণী মেরে খেয়ে ফেলার ঘটনা নিয়ে বলেন, অন্যটিও খাওয়া উচিত ছিল, তখন সমস্যাটি শুধু একটি কুরুচিপূর্ণ রসিকতা নয়। যে রাজনীতি নিষ্ঠুরতা ও অসংবেদনশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়ার দাবি করে, তার ভাষাতেই যখন অন্যের কষ্টের প্রতি একই ধরনের অসংবেদনশীলতা দেখা যায়, তখন তার নিজের নৈতিক ন্যারেটিভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আসিফ নজরুলকে ভালো মানুষ মনে করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তার রাজনৈতিক ভূমিকা, সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা, অবস্থান, সবকিছুর কঠোর সমালোচনা করা যায়। কিন্তু বাবার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে একটি সাড়ে নয় বছরের শিশুর ভালোবাসার হিসাব করা যায় না।

আর এই গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর আইরনি হচ্ছে, ঘটনাটি ঘটেছিলো এমন একজন মানুষের ঘরে, যিনি তখন দেশের আইন উপদেষ্টা।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৮ ধারায় মালিকের সম্মতি ছাড়া অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যের চলমান সম্পত্তি সরিয়ে নেওয়া চুরি। ধারাটির ব্যাখ্যায় প্রাণীকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে। ৪২৮ ও ৪২৯ ধারায় অন্যের প্রাণী ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা বা অক্ষম করার জন্য কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে; ৪২৯ ধারার ক্ষেত্রে সাজা পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আর কেউ অপরাধে প্ররোচনা দিলে, পরিকল্পনায় যুক্ত থাকলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করলে ১০৭ ও ১০৯ ধারার অধীনে সহায়তার দায়ও উঠতে পারে।

কাজেই একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে এ ঘটনায় কোনো অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি নিজে ছাগল চুরি বা হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন, শুধু বর্তমান বক্তব্য থেকে সেটিও বলা যায় না।

তবু ইতিহাস অদ্ভুত জিনিস।

এমনও হতে পারে, কোনো একদিন কেউ ঘটনাটিকে আর রাজনৈতিক কৌতুক হিসেবে নিলো না। তদন্ত হলো। কে নিয়ে গেল, কে জবাই করল, কে সাহায্য করল, কে সামনে ছিল, সব বের হলো। আর সেই তদন্তে যদি কখনো পাটোয়ারীর নিজের আইনি দায় প্রমাণিত হয়, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিচিত্র ফুটনোটগুলোর একটি লেখা হবে:

এত আন্দোলন, এত বক্তৃতা, এত বড় বড় রাজনৈতিক লড়াই নয়, সামান্য একটি ছাগলকাণ্ডে কোনো একদিন নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর আইনি সাজা হলো!

শুনতে হাস্যকর শোনাচ্ছে! এবার আবার মনে করিয়ে দিই বাংলা প্রবাদটা, ‘ছাগলে কী না খায়!’

দেখুন, সত্যিই মনে হবে প্রবাদটা ভুল নয়। কেননা, ছাগল ক্যারিয়ার, রাজনীতি… ইত্যাদি ইত্যাদি খেতেও পারে।


তন্ময় ইমরান একজন সংবাদকর্মী ও লেখক।

[মতামত লেখকের নিজস্ব]