করকমলে ডানা ভাঁজ করা সিংহ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

সকলেই গন্তব্যে পৌঁছুতে চায়। পৌঁছুতে হয়। তবে তার আগে যে যাত্রাপথ পাড়ি দিতে হয়, আমার কাছে তার আনন্দ অধিক। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর শুরু হয়েছিল ২ সেপ্টেম্বর। আর শেষ হলো ১২ সেপ্টেম্বর, পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে। এদিন সন্ধ্যায় সালা গ্রান্দে ভরে ওঠে চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক আর আমন্ত্রিত অতিথিদের দিয়ে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ইতালির প্রখ্যাত দুই অভিনয়শিল্পী: গ্রেটা স্ক্যারানো ও নিকোলাস ম্যুপাস। আর মূল প্রতিযোগিতা ভেনেজিয়া ৮৩-এর পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন ওই বিভাগের বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি, মার্কিন অভিনেত্রী ও নির্মাতা ম্যাগি গিলেনহাল।

অপেক্ষা করছিলাম কোন ছবিটি পাবে গোল্ডেন লায়ন। আগ্রহটা বাড়তিই ছিলো, কারণ এবার আমি অনেকগুলো মূল প্রতিযোগিতায় থাকা ছবি দেখেছি এবং যথেষ্ট ভালো লেগেছে। দেখলাম পুরস্কার পেল ডেনিশ নির্মাতা মে এল-তুখির ‘ওম্যান আননোন’। একটি নয়, ছবিটি আরো একটি পুরস্কার পেলো অভিনেত্রী ম্যাথিল্ড আরসেলের কারণে। তিনি হলেন এবারের আসরের সেরা অভিনেত্রী। সত্যি বলতে, সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার ম্যাথিল্ডেরই প্রাপ্য ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নারীর যে ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়, তার দেহটাই যে আরেক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়; সেটি শতভাগ চরিত্রের ভেতর থেকে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

   

মার্টিন ম্যাকডোনার নির্মিত ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইনে’ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান হলিউড তারকা জন মালকোভিচ। এই ছবিটি দেখার কথা ছিলো, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেখা যায়নি। তবে কে না জানে, মালকোভিচের অভিনয় দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ‘ডেঞ্জারাস লিয়াজোঁ’, ‘কন এয়ার’  এসব ছবি দিয়ে তার সাথে আমার পরিচয়। তো এবার তিনি সশরীরের এসেছিলেন ভেনিসে। কিন্তু পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি। অন্য একটি ছবির শুটিং থাকায় ইতালি ছেড়ে চলে যান। তাই ভিডিও বার্তাতেই জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা। 

এবারের উৎসবে একটি ছবি দেখে আমি ভূয়সী প্রশংসা করেছি, খরচ করেছি সবচেয়ে বেশি শব্দ। ছবিটি হলো ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’। তাদের আগের ছবিটি নিয়েও উচ্ছাস প্রকাশ করেছিলাম—নো আদার ল্যান্ড (২০২৪), এমনকি আমার সম্পাদিত ‘কাট টু সিনেমা’র প্রচ্ছদও করেছিলাম। ওই ছবিটি ছিলো ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দখলদারিত্ব, উচ্ছেদ ও গণহত্যা সংক্রান্ত। সেখানে তারা দেখিয়েছিলেন বাস্তবে কেমন করে আরব ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়। আর এই ছবিতে পরিচালকদ্বয় দেখিয়েছেন ইসরাইলি বাহিনী কিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে টার্গেট করা ব্যক্তির সাথে সাথে পরিবার পরিজন, এমনকি প্রতিবেশী সবাইকে হত্যা করে। ভয়ংকর এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় এই ছবি। বিস্তারিত আগেই লিখেছি, তাই এখানে আর কিছু লিখছি না। শুধু এটুকু বলবো ইসরাইলি আগ্রাসন ও বর্বরতা নিয়ে বিশ্ববাসীর মত পাল্টাচ্ছে। এটা ইতিবাচক।

মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান নির্মাতা লি চ্যাং-দংয়ের ‘পসিবল লাভ’। সেরা পরিচালকের সিলভার লায়ন পেয়েছেন ইলিয়া ক্রঝানভস্কি, ‘দাও’ ছবির জন্য। সেরা চিত্রনাট্য লেখার স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘আ গুড লিটল সোলজারে’র স্টেফান ব্রিজে, কোরালি আমেদেয়ো ও অলিভিয়ের গর্সে। তরুণ অভিনয়শিল্পীর জন্য দেওয়া মারচেলো মাস্ত্রোইয়ান্নি পুরস্কার পেয়েছেন ‘আ প্লেস টু হিলে’র মালু খেবিজি। প্রথম ছবি নির্মাতার জন্য দেওয়া লুইজি দে লরেন্তিস পুরস্কার পেয়েছে অগুস্ত বার্নার কুয়েমো ইয়াংহুর ‘হাউস অব দ্য উইন্ড’। দর্শকদের ভোটে আরমানি বিউটি অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে আলিনা শেরবানের ‘আই ম্যাটার’। এসব ছবির ভেতর আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল ‘আ গুড লিটল সোলজার’ ও ‘হাউজ অব দ্য উইন্ড’ ছবি দুটি।

এছাড়া বাংলাদেশের ছবি ‘দি ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ যে বিভাগে ছিল, সেই ওরিৎজন্তি বিভাগে পুরস্কার পাওয়া অনেকগুলো ছবিই আমি দেখেছি। প্রথমে একটু বলে নিই কোন ছবি কী পুরস্কার পেল।

সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে আন সিরো ও রাফায়েল বালবোনি পরিচালিত ‘ডায়ান ইন দ্য লুপ’। সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন জ্যাকলিন লেনজু, তাঁর চলচ্চিত্র ‘আ ডে ইন দ্য লাইফ অব জো: চ্যাপ্টার ফায়েদ্রা’র জন্য। বিশেষ জুরি পুরস্কার গেছে আগুস্ত বার্নার কুয়েমো ইয়াংহুর ‘হাউজ অব উইন্ডে’র ঝুলিতে। ‘ওরিৎজন্তি’ বিভাগ থেকে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন লালেহ মারজবান- ‘ফলিং হাউজ’ ইরানি ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য। সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন রিকার্দো স্কামারচো- ‘দ্য চিলড্রেন অব দ্য মাংকি’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য। এই ছবিটি আরো একটি পুরস্কার পেয়েছে এবার। সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার। ‘দ্য চিলড্রেন অব দ্য মাংকি’ ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন দুজন: তোম্মাসো লান্দুচ্চি ও দামিয়ানো ফেমফার্ট। অত্যন্ত উঁচু মানের চিত্রনাট্য। ছবিটি দেখে আমার চোখ সজল হয়েছিল। আর সর্বশেষ, সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারটি পেয়েছে ‘আ ফিউ মোমেন্টস অব হ্যাপিনেস’, পরিচালনা করেছেন শাদেন সাফিয়েদ্দিন তাজি। তো পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিগুলোর ভেতর ‘ফলিং হাউজ’ ও ‘দ্য চিলড্রেন অব দ্য মাংকি’ দুটো ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দুটোই মন কেড়ে নেওয়ার মতো কাজ হয়েছে। বাকি যেগুলো দেখেছি সেসব নিয়ে তো প্রতিক্রিয়া আগেই প্রকাশ করেছি পূর্ববর্তী লেখায়।

এবারের আয়োজনে ভেনিসে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন জর্জ ক্লুনি ও এলেন বার্স্টিন। এদের ভেতর জর্জ ক্লুনিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাকে অনেক প্রাণবন্ত আর সত্যিকারের তারকা মনে হয়েছে আমার। প্রায় কুড়ি মিনিট আমি তার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছিলাম। তিনি ‘সেরপেন্তি’ বলে একটি ছবির কলাকুশলীদের সাথে ছবি তুলছিলেন আর তাদের প্রশংসা করছিলেন।

পুরস্কার প্রদান তো সন্ধেবেলার ঘটনা। সারা সকাল কী করছিলাম তাহলে? সেটুকু সংক্ষেপে বলি। ভেনিস বিয়েনালে যেহেতু শিল্পকলার সকল ক্ষেত্রের একটি উৎসব, তাই এখানে চিত্রকলা, নৃত্য, নাটক, সঙ্গীত ইত্যাদির আয়োজনও থাকে। আমাকে ওরা, যেহেতু চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছি তাই, চিত্রকলা ও সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে। সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে থাকা সম্ভব নয়, কারণ ওটা শুরু হবে অক্টোবরে। কিন্তু চিত্রকলার অনুষ্ঠানে গেলাম চলচ্চিত্র উৎসবের অন্তিম দিনে। ৬১তম আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনীর এবারের মূলসুর হলো ‘মাইনর কিজ’। অনেক দেশের অনেক প্রতিভাবান শিল্পী অংশ নিয়েছেন। দুটো এলাকায় এই প্রদশর্নী হচ্ছে, জিয়ারদিনি ও আর্সেনালেতে। দুটোতেই আমি গেলাম। কী আর বলবো! এতো সুন্দর আর এত সৃজনশীল! এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে পারফর্মেটিভ আর্ট, ইন্সটলেশন আর্ট, আর পেইন্টিং ও মিক্সড মিডিয়াম তো আছেই। মাথা নষ্ট করার মতো দশা।

শিল্পী আই আরাকাওয়া নাশের শিল্পকর্মের একটি ছবি

শিল্পী আই আরাকাওয়া নাশের একটি ইন্সটলেশন আর্ট দেখলাম, শিরোনাম ‘গ্রাস বেবিজ, মুন বেবিজ’, আমি প্রথমে দেখে বিস্মিত হই, এরপর হই পুলকিত। ঘাসের বাগিচায়, গাছে এবং ভেতরে সর্বত্র বাচ্চাদের পুতুল আর দুধের ফিডার। ভেতরে রয়েছে ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশন। বাচ্চাদের যত আনুষাঙ্গিক জিনিস আছে সবই শিল্পী ব্যবহার করেছেন। বাবা-মা, বা যারা একা মা বা একা বাবা আছেন তাদের সাথে সন্তানের সম্পর্ক, তথা মানুষের শিশু হিসেবে পরিপূর্ণ মানুষের যে রসায়ন সেটা দেখানোই এই শিল্পকর্মের উদ্দেশ্য। এটা হচ্ছিল জিয়ারদিনির পার্কে। এখানেই আরেকটি কাজ দেখে অত্যন্ত ভালো লেগেছে, বেলজিয়ান শিল্পীদের, নাম ‘ইট নেভারেসসসট’। হ্যাঁ তিনটি ‘এস’ ব্যবহার করেছে ওরা। একটা ঘরের ভেতর, গোটা শিল্পকর্মের ভেতরেই ওরা দর্শককে প্রবেশ করতে দেয়। দর্শকও হয়ে যায় শিল্পের অংশ। এরপর প্লাস্টার করা বিভিন্ন ভাষার শব্দকে ওরা নেচে গেয়ে চিৎকার করে তাকে তাকে সাজাতে থাকে। ঘরটাকে শব্দ ঘর বললেই মনে হয় ভালো হয়। শব্দেরা যেন সর্বক্ষণ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে এখানে। ঘরটিতে প্রবেশ পথের বাইরেও শব্দ দিয়ে সাজানো। বাংলা শব্দও দেখলাম। এক কথায় বলা যায় এই শিল্পীরা ভাষার বন্দনা করেছে তাদের শিল্পকর্মে।

বিয়েনালে শিল্প প্রদর্শনীর একাংশ

আরেকটি শিল্পসমগ্র দেখলাম চীনের। আরসেনালের এক পরিত্যক্ত জাহাজ সারাইয়ের বড় কারখানার ভেতর। তাদের শিরোনাম ‘ড্রিম স্ট্রিম’। ঢুকতেই বিশাল স্ক্রিনে মাংকি কিংয়ের ভিডিও গেম, পাশে বানর-রাজার রেপ্লিকা। এরপর ঢুকলে আপনার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে। মানুষের প্রাচীন সভ্যতার সাথে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে শুধু নয়, তারা এই শিল্প প্রদর্শনীতে মিলিয়ে দিতে চেয়েছেন চীনা ইতিহাস ও সভ্যতাকে। মিনিয়েচার আর্ট, আলো আর রোবট দিয়ে এমন সব জিনিস তারা প্রদর্শন করেছে যা দেখলে মানতে বাধ্য যে চীনারা স্বতন্ত্র জাতি তো বটেই, তাদের চিন্তাধারাও অত্যন্ত পরিশীলিত এবং সূক্ষ্ম।

বানর রাজার ভাস্কর্যের সাথে বিধান রিবেরু

যাহোক, সব শিল্পকর্ম সম্পর্কে বললে আরো এগারো দিন লেগে যাবে। আমি এই দুটি জায়গা দেখা শেষ করে ওয়াটার বাসে উঠে চলে যাই এস. জাকারিয়া অঞ্চলে। সেন্ট মার্ক ব্যাসিলিকা ও স্কয়ার দেখাই আমার উদ্দেশ্য। তো ঘাটে নেমে দেখি মানুষের মাথা মানুষে খায়। এত ভিড়। স্রোতের সাথে ভেসে ভেসে গেলাম স্টেন্ট মার্কের খোলা চত্বরে। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। দেখলাম বাইজেন্টাইন স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত বিশালাকার সেন্ট মার্ক ব্যাসিলিকাকে। এর সাথে পরবর্তীকালে গথিক ও রেনেসাঁ শৈলীর মিশ্রণ ঘটেছিল। কোনো কারণে ব্যাসিলিকাটি আজ বন্ধ। বাইরেই যে শিল্প নিদর্শন রয়েছে, ভেতরে নিশ্চয় আরো বিস্ময়কর কিছু আছে। কিন্তু আমার কপাল খারাপ!

বাইরে অনেক রোদ আর উত্তাপ। বাড়াবাড়ি ভিড়ও ভালো লাগছিল না। তাই ভিড় এড়াতে পাশের গলিতে ঢুকে গেলাম। দেখি সে এক আলাদা রাজ্য। খালি খাওয়া-দাওয়া আর বাহারি জিনিসে ঠাসা দোকানপাট। ভালোই লাগে এসব দেখতে। কিছুক্ষণ থেকে উইন্ডো শপিং সেরে লঞ্চ ধরলাম পিয়াৎজেল রোমার। আজই ঘোরাঘুরি খতম। ১৩ সেপ্টেম্বর হবে আমার বিশ্রামবার। কম তো ছুটোছুটি হলো না। ঈশ্বর সকল কর্ম শেষে সপ্তমদিনে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। আমি নিলাম ত্রয়োদশ দিনে।