সাতাশ বছর পর ফের কেন ধনীদের থেকে ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ নিতে চায় সরকার?
পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৩ সালে সম্পদ করের ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেই করব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। পরে বিভিন্ন সময়ে এর কাঠামো ও হার পরিবর্তন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেই সম্পদ কর আইন বাতিল করা হয়। সাতাশ বছর পর বর্তমান বিএনপি সরকার ফের ভাবছে সেই সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স ফিরিয়ে আনার কথা।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ পিএমআপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
সম্পদ কর নিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে।
ধরুন, রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার সম্পদ আছে। জমি আছে। একটি বাড়ি আছে। কিছু শেয়ার আছে। ব্যাংকেও টাকা আছে। সব মিলিয়ে তার নিট সম্পদ ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছরে তার আয়কর দাঁড়ায় ২০ লাখ টাকা।
এখন রহমান সাহেবের জন্য একটা মজার হিসাব আছে। তার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের কারণে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ সম্পদ সারচার্জের আওতায় পড়বেন।
শুনে মনে হতে পারে, ১০০ কোটি টাকার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩৫ কোটি টাকা দিতে হবে।
আসলে তা নয়। এই ৩৫ শতাংশ হিসাব হবে তার আয়করের ওপর। ২০ লাখ টাকার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ সারচার্জ হবে ৭ লাখ টাকা।
এখানেই গল্পটা ঘুরে যায়।
কারণ সরকার এই অর্থবছরেই যে সম্পদ কর আনার কথা ভেবেছিলো, সেটি চালু হলে রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার সম্পদকে সরাসরি করের আওতায় আনা হতো। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী হিসাব করলে তার সম্পদ কর দাঁড়াতে পারত প্রায় ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থার ৭ লাখ টাকার জায়গায় প্রায় ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
পার্থক্য ৮৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
কেন এমন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে দুটি শব্দে, সম্পদ সারচার্জ আর সম্পদ কর এর ক্যালকুলেশনে।
সারচার্জ কোথায় বসে
রহমান সাহেবের মতো কারও সম্পদ যত বাড়ে, সম্পদ সারচার্জের হারও তত বাড়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর নির্দেশিকা ও অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, নিট সম্পদ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে সাধারণভাবে সারচার্জ নেই।
৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে আয়করের ওপর ১০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি হলে ২০ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটি হলে ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে ৩৫ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়।
কিন্তু একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদের পরিমাণ দিয়ে সারচার্জের হার নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু সারচার্জের টাকা হিসাব হয় আয়করের ওপর।
অর্থাৎ রহমান সাহেবের সম্পদ ১০০ কোটি টাকা বলে ১০০ কোটি টাকার ওপর ৩৫ শতাংশ কর বসছে না।
তার আয়কর যদি ২০ লাখ টাকা হয়, তাহলে সেই ২০ লাখের ওপর ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭ লাখ টাকার সারচার্জ বসছে।
এই ব্যবস্থায় একজন মানুষের সম্পদ অনেক বেশি হলেও তার আয় তুলনামূলক কম হলে সারচার্জও কম হতে পারে।
এই হিসাব বদলানো নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে। আলোচনায় আসে সম্পদ কর।
সম্পদের ওপর সরাসরি কর কিন্তু হিসাব পদ্ধতি কি
সরকারের চিন্তাটা ছিল সহজ। শুধু আয় নয়, একজন মানুষের মোট সম্পদও করের আওতায় আসুক।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত রাখার কথা ছিলো।
৪ থেকে ৬ কোটি টাকার অংশে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ, তার পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটি টাকার বেশি অংশে ১ শতাংশ হারে কর বসানোর প্রস্তাব ছিল।
রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার হিসাবটাও সেখান থেকে এবার আরেকটু সহজ করে বুঝি চলুন।
তার প্রথম ২ কোটি টাকার ওপর শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে কর বসলে হবে ৫০ হাজার টাকা।
পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে হবে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তার পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশে সম্পদ কর আসবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
আর বাকি ৮৪ কোটি টাকায় ১ শতাংশ হারে হবে ৮৪ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে সম্পদ কর হবে- ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ সম্পদ করের ক্ষেত্রে রহমান সাহেবের আয়কর কত, সেটা আর মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন তার নিট সম্পদ কত?
শুনতে ব্যাপারটা সহজ ও সরকারের জন্য ভালো আকর্ষণীয় মনে হলেও এই হিসাবটাই কঠিন।
ধরুন, রহমান সাহেবের ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা থাকলে হিসাব করা সহজ।
কিন্তু তার ৩০ কোটি টাকার জমি থাকলে? আরেকটি ২০ কোটি টাকার বাড়ি থাকলে? কিছু শেয়ার থাকলে? ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ব্যবসায় অংশীদারত্ব থাকলে?
তখন বের করতে হবে এই সব সম্পদের প্রকৃত মূল্য। আর এখানেই সমস্যা।
কারণ একটি জমির সরকারি মূল্য আর বাজারমূল্য এক নয়। পুরোনো বাড়ির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। আবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোনো কোম্পানির শেয়ারের দামও নির্ধারণ করা সহজ নয়।
আর এখানেই সম্পদ করের সবচেয়ে বড় জটিলতা। কর বসানোর আগে সরকারকে জানতে হবে, সম্পদটা আসলে কত টাকার।
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই বাংলাদেশ আগেও সমস্যায় পড়েছিলো।
অন্যান্য দেশে সম্পদ কর
বাংলাদেশে সম্পদ করের এই ধারণা নতুন নয়। আর বিশ্বের অনেক দেশেই একসময় সম্পদের ওপর সরাসরি কর ছিলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বেশিরভাগ দেশই সেই ব্যবস্থা বাদ দিয়েছে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ওইসিডি -এর তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে ১২টি ওইসিডি দেশে ব্যক্তিগত নিট সম্পদের ওপর নিয়মিত কর ছিলো। ২০১৭ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪টিতে।
পরে ফ্রান্সও পুরো সম্পদের ওপরের কর বাদ দিয়ে শুধু বড় মূল্যের আবাসিক ও অন্যান্য রিয়েল এস্টেটের ওপর কর রাখে।
এখন ইউরোপে ব্যাপক অর্থে ব্যক্তিগত নিট সম্পদের ওপর বার্ষিক কর আছে নরওয়ে, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে। তবে তিন দেশের নিয়ম আবার এক নয়।
নরওয়েতে একজন ব্যক্তির মোট সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট দায় বা ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদ হিসাব করা হয়। নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে সম্পদ কর দিতে হয়। করের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকার এবং একটি অংশ স্থানীয় সরকার পায়।
বাড়ির ক্ষেত্রেও বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতি আছে নিজের বসবাসের বাড়িকে বাজারমূল্যের পুরোটা ধরে কর হিসাব করা হয় না।
স্পেনে আবার ব্যবস্থা আরও প্রগতিশীল। নির্দিষ্ট সীমার বেশি নিট সম্পদের ওপর ধাপে ধাপে কর বাড়ে। মূল আবাসনের জন্য আলাদা ছাড়ও আছে। অর্থাৎ যার সম্পদ যত বেশি, করের হারও ধাপে ধাপে তত বেশি হতে পারে।
আর সুইজারল্যান্ডের মডেলটা আরও আলাদা।
সেখানে পুরো দেশের জন্য একটাই হার নয়। ক্যান্টন বা স্থানীয় প্রশাসন সম্পদ কর নির্ধারণ করে। ফলে কোথায় থাকছেন, তার ওপর করের হারও বদলে যেতে পারে। সাধারণভাবে জমি-বাড়ি, আর্থিক সম্পদসহ বিভিন্ন সম্পদ বিবেচনায় নিয়ে দায় বা ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদের ওপর কর বসে।
অর্থাৎ তিন দেশেই মূল ধারণাটা একই - আয় নয়, সম্পদ।
কিন্তু সম্পদের কোন অংশ করযোগ্য হবে, কতটা ছাড় থাকবে, কীভাবে মূল্য নির্ধারণ হবে এবং কত শতাংশ কর হবে সেটা দেশের কাঠামো অনুযায়ী আলাদা।
আর এখানেই বাংলাদেশের প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ যেসব দেশ সম্পদ কর ধরে রেখেছে, তাদেরও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সম্পদের মূল্য নির্ধারণ।
জমি বা বাড়ির বাজারমূল্য কত?
ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার শেয়ারের মূল্য কত?
কোন সম্পদে কত ছাড় থাকবে?
ঋণ কতটা বাদ যাবে?
বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব কীভাবে আসবে?
এসবের জন্য আলাদা তথ্যব্যবস্থা ও মূল্যায়ন কাঠামো দরকার।
ওইসিডি-ও বলছে, সম্পদ করের বড় বাস্তব সমস্যা হলো কিছু সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জটিলতা, আর্থিক সম্পদের দেশান্তর বা স্থানান্তরের সুযোগ এবং কর প্রশাসনের খরচ। এসব কারণেই অনেক দেশ একসময় সম্পদ কর বাতিল করেছে।
বাংলাদেশের ১৯৯৯ সালের গল্পটাও অনেকটা এখানেই এসে মিলে যায়।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেই সম্পদ কর আইন বাতিল করা হয়।
পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৩ সালে সম্পদ করের ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেই করব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। পরে বিভিন্ন সময়ে এর কাঠামো ও হার পরিবর্তন করা হয়।
এরপর কয়েক দফায় এর কাঠামো ও হার বদলেছে। ১৯৭৯ সালের একটি কাঠামোয় সর্বোচ্চ হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯৩ সালের কাঠামোয় প্রথম ২৫ লাখ টাকা ছিল করমুক্ত; এরপর বিভিন্ন ধাপে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হারে সম্পদ কর নেওয়া হতো। অর্থাৎ, একটা সময় বাংলাদেশে সম্পদের ওপর সরাসরি কর ছিলো।
১৯৯৯ সালে সম্পদ কর বাতিলের কারণ হিসেবে তখন সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জটিলতা, কর প্রশাসনে বাড়তি চাপ এবং এই খাত থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব না আসার বিষয়গুলো সামনে আসে।
ফলে সরাসরি সম্পদের ওপর কর আদায়ের বদলে নিট সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতে আয়করের ওপর সারচার্জ আরোপের ব্যবস্থা চালু করা হয়।
২৭ বছর পর চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির সময় বিএনপি সরকার আবার সরাসরি সম্পদ কর চালুর কথা ভেবেছিলো।
লক্ষ্য ছিল বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় এবং সম্পদের বৈষম্য কমানো।
তবে এবার আগের সমস্যার পুনরাবৃত্তি এড়াতে বাজারমূল্য ধরে সব সম্পদ নতুন করে মূল্যায়নের বদলে শুরুতে করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত নিট সম্পদের ওপর কর নির্ধারণের কথা ভাবা হয়। পরে ধীরে ধীরে সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।
তারপরও সমস্যা থেকেই গেল। কারণ প্রশ্নটা আবার ফিরে এল, করদাতা যে সম্পদ ঘোষণা করছেন, সেটাই কি তার পুরো সম্পদ? তাহলে আগে সম্পদ কর চালু হবে নাকি আগে সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে?
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে সরাসরি সম্পদ করের যুক্তিটা বেশ শক্ত।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সম্পদের বৈষম্য আছে। বর্তমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থায় সম্পদের ওপর সরাসরি কর বসে না। তাই ভালোভাবে কাঠামো তৈরি করা গেলে আলাদা সম্পদ করের যৌক্তিকতা রয়েছে।”
তার যুক্তিটা সহজ করে বললে, কারও সম্পদ যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, শুধু তার আয়কর কত সেটার দিকে তাকালে সম্পদের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
কিন্তু এখানেই পাল্টা প্রশ্ন তোলেন হিসাববিদ ও কর খাতের বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
“সম্পদ কর কাগজে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। বিশেষ করে জমি, বাড়ি কিংবা এমন ব্যবসার শেয়ারের মতো সম্পদের মূল্য নির্ধারণে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এর ফলে করদাতার খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপরও বাড়বে প্রশাসনিক চাপ,” আলাপ-কে বলেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সহজ করে বললে, ধরুন, রহমান সাহেবের ২০ কোটি টাকার একটি বাড়ি আছে। কিন্তু তিনি বাড়িটি বিক্রি করছেন না। সেখান থেকে বড় কোনো আয়ও হচ্ছে না। তবু সম্পদের ওপর কর দিতে হবে প্রতি বছর।
তাহলে তাকে কর দেওয়ার টাকা জোগাড় করতে কোথাও থেকে নগদ অর্থ বের করতে হবে।
এই কর বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, “এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সম্পদশালী মানুষকেও কখনো কখনো সম্পদের অংশ বিক্রি করে কর দেওয়ার পথে যেতে হতে পারে।”
সরকার ভাবলেও শেষ পর্যন্ত এই অর্থবছরে নতুন সম্পদ কর চালু হয়নি। কারণ এর পেছনে একটি বড় প্রশ্ন ছিলো- কর বসানোর আগে রাষ্ট্র কি একজন মানুষের মোট সম্পদের নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে পারবে?
অনলাইন রিটার্ন, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা থাকলেও জমি, বাড়ি, ব্যাংকের টাকা, শেয়ার কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার অংশীদারত্ব সব সম্পদের তথ্য এখনো পুরোপুরি এক জায়গায় নেই।
তার ওপর সম্পদের মূল্য নিয়ে বিরোধ হলে সেই মূল্যায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এর সঙ্গে ছিল আরেকটি হিসাব, আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে একজন ব্যক্তির মোট করের বোঝা কতটা দাঁড়াবে। নতুন সম্পদ কর চালু হলে বর্তমান সম্পদ সারচার্জ থাকবে কি না, সেটিও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা দরকার ছিলো।
ড. মোস্তাফিজুর রহমানও প্রস্তাবটির সামগ্রিক করের বোঝার প্রভাব আরও পর্যালোচনার প্রয়োজনের কথা বলেছেন।
তাই শেষ পর্যন্ত সরকার প্রস্তাবটি বাজেটে নেয়নি। তবে এটাকে শুধু ১৯৯৯ সালের পুরোনো অভিজ্ঞতার কারণে পিছু হটা বলা ঠিক হবে না। বরং ২০২৬ সালের প্রস্তাবটিও দেখিয়েছে, সম্পদ করের আসল চ্যালেঞ্জ করের হার নির্ধারণে নয়, কার কত সম্পদ আছে এবং সেই সম্পদের মূল্য কত? তা নির্ভুলভাবে বের করার সক্ষমতায়।
রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার গল্পে তাই শেষ প্রশ্নটা খুব সহজ সরকার কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে, তার সম্পদ সত্যিই ১০০ কোটি টাকা?
সেই উত্তর নিশ্চিত না হলে সম্পদের ওপর সরাসরি কর বসানো কাগজে যত সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। আর সেখানেই এবারও থেমে গেল সম্পদ কর।
সাতাশ বছর পর ফের কেন ধনীদের থেকে ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ নিতে চায় সরকার?
পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৩ সালে সম্পদ করের ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেই করব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। পরে বিভিন্ন সময়ে এর কাঠামো ও হার পরিবর্তন করা হয়। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেই সম্পদ কর আইন বাতিল করা হয়। সাতাশ বছর পর বর্তমান বিএনপি সরকার ফের ভাবছে সেই সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স ফিরিয়ে আনার কথা।
ধরুন, রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার সম্পদ আছে। জমি আছে। একটি বাড়ি আছে। কিছু শেয়ার আছে। ব্যাংকেও টাকা আছে। সব মিলিয়ে তার নিট সম্পদ ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছরে তার আয়কর দাঁড়ায় ২০ লাখ টাকা।
এখন রহমান সাহেবের জন্য একটা মজার হিসাব আছে। তার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের কারণে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ সম্পদ সারচার্জের আওতায় পড়বেন।
শুনে মনে হতে পারে, ১০০ কোটি টাকার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩৫ কোটি টাকা দিতে হবে।
আসলে তা নয়। এই ৩৫ শতাংশ হিসাব হবে তার আয়করের ওপর। ২০ লাখ টাকার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ সারচার্জ হবে ৭ লাখ টাকা।
এখানেই গল্পটা ঘুরে যায়।
কারণ সরকার এই অর্থবছরেই যে সম্পদ কর আনার কথা ভেবেছিলো, সেটি চালু হলে রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার সম্পদকে সরাসরি করের আওতায় আনা হতো। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী হিসাব করলে তার সম্পদ কর দাঁড়াতে পারত প্রায় ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থার ৭ লাখ টাকার জায়গায় প্রায় ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
পার্থক্য ৮৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
কেন এমন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে দুটি শব্দে, সম্পদ সারচার্জ আর সম্পদ কর এর ক্যালকুলেশনে।
সারচার্জ কোথায় বসে
রহমান সাহেবের মতো কারও সম্পদ যত বাড়ে, সম্পদ সারচার্জের হারও তত বাড়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর নির্দেশিকা ও অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, নিট সম্পদ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে সাধারণভাবে সারচার্জ নেই।
৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে আয়করের ওপর ১০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি হলে ২০ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটি হলে ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে ৩৫ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়।
কিন্তু একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদের পরিমাণ দিয়ে সারচার্জের হার নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু সারচার্জের টাকা হিসাব হয় আয়করের ওপর।
অর্থাৎ রহমান সাহেবের সম্পদ ১০০ কোটি টাকা বলে ১০০ কোটি টাকার ওপর ৩৫ শতাংশ কর বসছে না।
তার আয়কর যদি ২০ লাখ টাকা হয়, তাহলে সেই ২০ লাখের ওপর ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭ লাখ টাকার সারচার্জ বসছে।
এই ব্যবস্থায় একজন মানুষের সম্পদ অনেক বেশি হলেও তার আয় তুলনামূলক কম হলে সারচার্জও কম হতে পারে।
এই হিসাব বদলানো নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে। আলোচনায় আসে সম্পদ কর।
সম্পদের ওপর সরাসরি কর কিন্তু হিসাব পদ্ধতি কি
সরকারের চিন্তাটা ছিল সহজ। শুধু আয় নয়, একজন মানুষের মোট সম্পদও করের আওতায় আসুক।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত রাখার কথা ছিলো।
৪ থেকে ৬ কোটি টাকার অংশে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ, তার পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটি টাকার বেশি অংশে ১ শতাংশ হারে কর বসানোর প্রস্তাব ছিল।
রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার হিসাবটাও সেখান থেকে এবার আরেকটু সহজ করে বুঝি চলুন।
তার প্রথম ২ কোটি টাকার ওপর শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে কর বসলে হবে ৫০ হাজার টাকা।
পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে হবে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তার পরের ৫ কোটি টাকায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশে সম্পদ কর আসবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
আর বাকি ৮৪ কোটি টাকায় ১ শতাংশ হারে হবে ৮৪ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে সম্পদ কর হবে- ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অর্থাৎ সম্পদ করের ক্ষেত্রে রহমান সাহেবের আয়কর কত, সেটা আর মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন তার নিট সম্পদ কত?
শুনতে ব্যাপারটা সহজ ও সরকারের জন্য ভালো আকর্ষণীয় মনে হলেও এই হিসাবটাই কঠিন।
ধরুন, রহমান সাহেবের ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা থাকলে হিসাব করা সহজ।
কিন্তু তার ৩০ কোটি টাকার জমি থাকলে? আরেকটি ২০ কোটি টাকার বাড়ি থাকলে? কিছু শেয়ার থাকলে? ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ব্যবসায় অংশীদারত্ব থাকলে?
তখন বের করতে হবে এই সব সম্পদের প্রকৃত মূল্য। আর এখানেই সমস্যা।
কারণ একটি জমির সরকারি মূল্য আর বাজারমূল্য এক নয়। পুরোনো বাড়ির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। আবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোনো কোম্পানির শেয়ারের দামও নির্ধারণ করা সহজ নয়।
আর এখানেই সম্পদ করের সবচেয়ে বড় জটিলতা। কর বসানোর আগে সরকারকে জানতে হবে, সম্পদটা আসলে কত টাকার।
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই বাংলাদেশ আগেও সমস্যায় পড়েছিলো।
অন্যান্য দেশে সম্পদ কর
বাংলাদেশে সম্পদ করের এই ধারণা নতুন নয়। আর বিশ্বের অনেক দেশেই একসময় সম্পদের ওপর সরাসরি কর ছিলো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বেশিরভাগ দেশই সেই ব্যবস্থা বাদ দিয়েছে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ওইসিডি -এর তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে ১২টি ওইসিডি দেশে ব্যক্তিগত নিট সম্পদের ওপর নিয়মিত কর ছিলো। ২০১৭ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪টিতে।
পরে ফ্রান্সও পুরো সম্পদের ওপরের কর বাদ দিয়ে শুধু বড় মূল্যের আবাসিক ও অন্যান্য রিয়েল এস্টেটের ওপর কর রাখে।
এখন ইউরোপে ব্যাপক অর্থে ব্যক্তিগত নিট সম্পদের ওপর বার্ষিক কর আছে নরওয়ে, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে। তবে তিন দেশের নিয়ম আবার এক নয়।
নরওয়েতে একজন ব্যক্তির মোট সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট দায় বা ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদ হিসাব করা হয়। নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে সম্পদ কর দিতে হয়। করের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকার এবং একটি অংশ স্থানীয় সরকার পায়।
বাড়ির ক্ষেত্রেও বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতি আছে নিজের বসবাসের বাড়িকে বাজারমূল্যের পুরোটা ধরে কর হিসাব করা হয় না।
স্পেনে আবার ব্যবস্থা আরও প্রগতিশীল। নির্দিষ্ট সীমার বেশি নিট সম্পদের ওপর ধাপে ধাপে কর বাড়ে। মূল আবাসনের জন্য আলাদা ছাড়ও আছে। অর্থাৎ যার সম্পদ যত বেশি, করের হারও ধাপে ধাপে তত বেশি হতে পারে।
আর সুইজারল্যান্ডের মডেলটা আরও আলাদা।
সেখানে পুরো দেশের জন্য একটাই হার নয়। ক্যান্টন বা স্থানীয় প্রশাসন সম্পদ কর নির্ধারণ করে। ফলে কোথায় থাকছেন, তার ওপর করের হারও বদলে যেতে পারে। সাধারণভাবে জমি-বাড়ি, আর্থিক সম্পদসহ বিভিন্ন সম্পদ বিবেচনায় নিয়ে দায় বা ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদের ওপর কর বসে।
অর্থাৎ তিন দেশেই মূল ধারণাটা একই - আয় নয়, সম্পদ।
কিন্তু সম্পদের কোন অংশ করযোগ্য হবে, কতটা ছাড় থাকবে, কীভাবে মূল্য নির্ধারণ হবে এবং কত শতাংশ কর হবে সেটা দেশের কাঠামো অনুযায়ী আলাদা।
আর এখানেই বাংলাদেশের প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ যেসব দেশ সম্পদ কর ধরে রেখেছে, তাদেরও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সম্পদের মূল্য নির্ধারণ।
জমি বা বাড়ির বাজারমূল্য কত?
ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার শেয়ারের মূল্য কত?
কোন সম্পদে কত ছাড় থাকবে?
ঋণ কতটা বাদ যাবে?
বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব কীভাবে আসবে?
এসবের জন্য আলাদা তথ্যব্যবস্থা ও মূল্যায়ন কাঠামো দরকার।
ওইসিডি-ও বলছে, সম্পদ করের বড় বাস্তব সমস্যা হলো কিছু সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জটিলতা, আর্থিক সম্পদের দেশান্তর বা স্থানান্তরের সুযোগ এবং কর প্রশাসনের খরচ। এসব কারণেই অনেক দেশ একসময় সম্পদ কর বাতিল করেছে।
বাংলাদেশের ১৯৯৯ সালের গল্পটাও অনেকটা এখানেই এসে মিলে যায়।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেই সম্পদ কর আইন বাতিল করা হয়।
পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৩ সালে সম্পদ করের ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেই করব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। পরে বিভিন্ন সময়ে এর কাঠামো ও হার পরিবর্তন করা হয়।
এরপর কয়েক দফায় এর কাঠামো ও হার বদলেছে। ১৯৭৯ সালের একটি কাঠামোয় সর্বোচ্চ হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯৩ সালের কাঠামোয় প্রথম ২৫ লাখ টাকা ছিল করমুক্ত; এরপর বিভিন্ন ধাপে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হারে সম্পদ কর নেওয়া হতো। অর্থাৎ, একটা সময় বাংলাদেশে সম্পদের ওপর সরাসরি কর ছিলো।
১৯৯৯ সালে সম্পদ কর বাতিলের কারণ হিসেবে তখন সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জটিলতা, কর প্রশাসনে বাড়তি চাপ এবং এই খাত থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব না আসার বিষয়গুলো সামনে আসে।
ফলে সরাসরি সম্পদের ওপর কর আদায়ের বদলে নিট সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতে আয়করের ওপর সারচার্জ আরোপের ব্যবস্থা চালু করা হয়।
২৭ বছর পর চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির সময় বিএনপি সরকার আবার সরাসরি সম্পদ কর চালুর কথা ভেবেছিলো।
লক্ষ্য ছিল বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় এবং সম্পদের বৈষম্য কমানো।
তবে এবার আগের সমস্যার পুনরাবৃত্তি এড়াতে বাজারমূল্য ধরে সব সম্পদ নতুন করে মূল্যায়নের বদলে শুরুতে করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত নিট সম্পদের ওপর কর নির্ধারণের কথা ভাবা হয়। পরে ধীরে ধীরে সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।
তারপরও সমস্যা থেকেই গেল। কারণ প্রশ্নটা আবার ফিরে এল, করদাতা যে সম্পদ ঘোষণা করছেন, সেটাই কি তার পুরো সম্পদ? তাহলে আগে সম্পদ কর চালু হবে নাকি আগে সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে?
সম্পদ করের যুক্তি ও সতর্কতা
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে সরাসরি সম্পদ করের যুক্তিটা বেশ শক্ত।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সম্পদের বৈষম্য আছে। বর্তমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থায় সম্পদের ওপর সরাসরি কর বসে না। তাই ভালোভাবে কাঠামো তৈরি করা গেলে আলাদা সম্পদ করের যৌক্তিকতা রয়েছে।”
তার যুক্তিটা সহজ করে বললে, কারও সম্পদ যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, শুধু তার আয়কর কত সেটার দিকে তাকালে সম্পদের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
কিন্তু এখানেই পাল্টা প্রশ্ন তোলেন হিসাববিদ ও কর খাতের বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
“সম্পদ কর কাগজে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। বিশেষ করে জমি, বাড়ি কিংবা এমন ব্যবসার শেয়ারের মতো সম্পদের মূল্য নির্ধারণে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এর ফলে করদাতার খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপরও বাড়বে প্রশাসনিক চাপ,” আলাপ-কে বলেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সহজ করে বললে, ধরুন, রহমান সাহেবের ২০ কোটি টাকার একটি বাড়ি আছে। কিন্তু তিনি বাড়িটি বিক্রি করছেন না। সেখান থেকে বড় কোনো আয়ও হচ্ছে না। তবু সম্পদের ওপর কর দিতে হবে প্রতি বছর।
তাহলে তাকে কর দেওয়ার টাকা জোগাড় করতে কোথাও থেকে নগদ অর্থ বের করতে হবে।
এই কর বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, “এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সম্পদশালী মানুষকেও কখনো কখনো সম্পদের অংশ বিক্রি করে কর দেওয়ার পথে যেতে হতে পারে।”
আলোচনা হল, বাস্তবায়ন হলো না কেন?
সরকার ভাবলেও শেষ পর্যন্ত এই অর্থবছরে নতুন সম্পদ কর চালু হয়নি। কারণ এর পেছনে একটি বড় প্রশ্ন ছিলো- কর বসানোর আগে রাষ্ট্র কি একজন মানুষের মোট সম্পদের নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে পারবে?
অনলাইন রিটার্ন, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা থাকলেও জমি, বাড়ি, ব্যাংকের টাকা, শেয়ার কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার অংশীদারত্ব সব সম্পদের তথ্য এখনো পুরোপুরি এক জায়গায় নেই।
তার ওপর সম্পদের মূল্য নিয়ে বিরোধ হলে সেই মূল্যায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এর সঙ্গে ছিল আরেকটি হিসাব, আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে একজন ব্যক্তির মোট করের বোঝা কতটা দাঁড়াবে। নতুন সম্পদ কর চালু হলে বর্তমান সম্পদ সারচার্জ থাকবে কি না, সেটিও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা দরকার ছিলো।
ড. মোস্তাফিজুর রহমানও প্রস্তাবটির সামগ্রিক করের বোঝার প্রভাব আরও পর্যালোচনার প্রয়োজনের কথা বলেছেন।
তাই শেষ পর্যন্ত সরকার প্রস্তাবটি বাজেটে নেয়নি। তবে এটাকে শুধু ১৯৯৯ সালের পুরোনো অভিজ্ঞতার কারণে পিছু হটা বলা ঠিক হবে না। বরং ২০২৬ সালের প্রস্তাবটিও দেখিয়েছে, সম্পদ করের আসল চ্যালেঞ্জ করের হার নির্ধারণে নয়, কার কত সম্পদ আছে এবং সেই সম্পদের মূল্য কত? তা নির্ভুলভাবে বের করার সক্ষমতায়।
রহমান সাহেবের ১০০ কোটি টাকার গল্পে তাই শেষ প্রশ্নটা খুব সহজ সরকার কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে, তার সম্পদ সত্যিই ১০০ কোটি টাকা?
সেই উত্তর নিশ্চিত না হলে সম্পদের ওপর সরাসরি কর বসানো কাগজে যত সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। আর সেখানেই এবারও থেমে গেল সম্পদ কর।
বিষয়: