পে স্কেলের হিসাব: একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে চাপ

নতুন পে স্কেলের সুবিধাভোগী প্রায় ৩৩ লাখ। এটি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে লক্ষ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থের জোগান, সরকারি সেবার মান ও জবাবদিহিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতের ওপরও তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপের আশঙ্কা। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি আয় শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

২০তম গ্রেডে যে কর্মচারীর এখনকার প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা, নতুন স্কেলে তা হবে ২০ হাজার টাকা, প্রায় আড়াই গুণ। আর ১ম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা পাওয়া একজন সচিব এখন থেকে পাবেন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, পুরো দ্বিগুন।

সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে আসবে বাড়তি টাকা, অবসরপ্রাপ্তরাও পাবেন বাড়তি পেনশন। কিন্তু এই বাড়তি টাকার জোগান আসবে কোথা থেকে? আর বাজারে যখন সেই টাকা খরচ হবে, তখন দাম বাড়ার চাপটা সামলাবে কে?

সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে লক্ষ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। “এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এত টাকা কীভাবে আসবে? প্রথমত এ জন্য রাজস্ব বাড়াতে হবে। তবে এর কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দ্বিতীয়ত, ঋণ নিয়ে বেতন দিতে হবে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।  

তার আশঙ্কা, বিদেশি ঋণ নিয়ে এই ব্যয় মেটানো হলে বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়বে। আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থ পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। দুই পথের কোনোটিই সহজ নয়।

তাহলে প্রশ্নটা শুধু কার বেতন কত বাড়লো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই বেতন বৃদ্ধির টাকা আসবে কোথা থেকে, আর এর চাপটা গিয়ে পড়বে কোথায়?

সংখ্যায় নতুন পে স্কেল

নতুন কাঠামোয় অধিকাংশ গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, ১১তম গ্রেড পর্যন্ত বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। সবচেয়ে নিচের গ্রেডে বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ। সরকারের যুক্তি কম আয়ের কর্মচারীদের মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক বেশি।

মোট প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসবেন, প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী আর সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত ও অনান্য সুবিধাভোগী। এর পেছনে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের রেকর্ড বাজেটের প্রায় ১১.৩ শতাংশ।

বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে,  ২০২৬ সালের ১লা জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আরও ৩০ শতাংশ আর সেই বছরের জুলাইয়ে বাকি ৩০ শতাংশ। বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে।

সংখ্যায় নবম পে স্কেল

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলছেন, পুরো অর্থ একসঙ্গে লাগবে না, তিন বছরের হিসাব ধরেই এই অর্থের সংস্থান বিবেচনা করা হয়েছে, বেতন ধাপে ধাপে বাড়বে বলে আগামী দুই বছরেই পুরো অর্থের প্রয়োজন হবে না। 

সরকারের ভাষ্য, অতিরিক্ত ব্যয় মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটেই রাখা হয়েছে। 

কিন্তু অর্থনীতিবিদদের প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। বাজেটে রাখা আর সেই টাকার জোগান দেয়া এক বিষয় নয়। এটা সেই কাজীর গরুর মতো, কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। রাজস্ব আয় না বাড়ালে এই বিশাল অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো হবে কীভাবে, প্রশ্ন আহসান এইচ মনসুরের।

বেসরকারি চাকরিজীবীর পকেটে চাপ কতটা

নতুন পে স্কেলের সুবিধা সরাসরি পাবেন সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তরা। কিন্তু দেশের বড় একটি কর্মজীবী জনগোষ্ঠী বেসরকারি চাকরিজীবীরা এর বাইরে। তাদের বেতন বাড়বে কি না, সেটি নির্ভর করবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে একই বাজারে একদল মানুষের আয় বাড়বে, আরেক দলের থাকবে অপরিবর্তিত। কিন্তু দুজনকেই একই দামে বাজার করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারি বেতন বৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি খাতেই। “সরকারি বেতন বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে প্রাইভেট সেক্টরের মালিক ও চাকরিজীবীদের ওপর,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

তার ব্যাখ্যা, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ার পর বেসরকারি খাতের কর্মীরাও স্বাভাবিকভাবেই বেতন সমন্বয়ের দাবি তুলবেন। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান সেই বাড়তি ব্যয় বহন করতে পারবে না, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য এটি বড় চাপ ।

তখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি পথের একটি বেছে নিতে হতে পারে খরচ কমানো, নিয়োগ কমানো, বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়া কিংবা বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করা।

শেষের পথটি বেছে নিলে তার প্রভাব শুধু বেসরকারি চাকরিজীবীর ওপর থাকবে না।

দাম বাড়লে সেই বাড়তি দাম দেবেন সরকারি-বেসরকারি সবাই।

আর বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।

অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীর জন্য যে বেতন বৃদ্ধি স্বস্তির কারণ, সেটিই বাজারদর বাড়ার মাধ্যমে বেসরকারি চাকরিজীবীর জন্য নতুন চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এর বিপরীত সম্ভাবনাও আছে।

সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি টাকা গেলে তারা বেশি পণ্য ও সেবা কিনবেন। এতে ব্যবসার বিক্রি বাড়বে, উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।

তাই শেষ পর্যন্ত ফলটা নির্ভর করবে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে ব্যবসা ও উৎপাদন কতটা দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে পারে তার ওপর।

সোজা কথায়, সরকারি কর্মচারীর পকেটে টাকা বাড়ছে কিন্তু সেই টাকা যদি বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার বিলটা দিতে হবে বেসরকারি চাকরিজীবীকেও।

বেতন বাড়ল, জনগণ কী পাবে?

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে জনগণের টাকায়। তাই প্রশ্নটা শুধু কর্মচারীরা কত পেলেন তা নয়, এখানে জড়িয়ে আছে জনগনের বিষয়ও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি সেবার মান ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তার ভাষায়, “জনগণের টাকায় বেতন তো হলো, কিন্তু এ থেকে জনগণ কী পাবে?”

তার মতে, একজন নাগরিক সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন দিনের পর দিন ভুগতে না নয়। প্রাপ্য সম্মান যেন তারা পান। আর সেবা না পেলে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

অর্থাৎ বেতন বাড়ানোর সঙ্গে কর্মদক্ষতা ও সেবার মান বাড়ানোরও নিশ্চয়তা থাকা দরকার ছিলো। সরকারের পক্ষ থেকে এমন বার্তা দেওয়াটা জরুরী ছিলো বলেই মনে করেন তিনি।

কারণ সরকারি কর্মচারীর বেতন যতই বাড়ানো হোক, নাগরিক যদি আগের মতোই একটি সেবা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে থাকেন, তাহলে এই বাড়তি ব্যয়ের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আর এখানেই আসে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন ‘বেতন বাড়লে কি দুর্নীতি কমবে?’

আহসান এইচ মনসুরের আশঙ্কা, শুধু বেতন বাড়িয়ে অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করা যাবে না। জবাবদিহিতা না থাকলে বরং ঘুষের অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ঘুষের অঙ্কও বেড়েছে। এবারও বেতন বাড়লেও যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে একই প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

আইএমএফের এই সাবেক অর্থনীতিবিদের ভাষায়, “ট্যাক্স দিতে যেয়ে ঘুষ দিতে হয়। জমি কিনতে গেলে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এগুলো হয়তো আরও বাড়বে। আগে এক সময় পুলিশের নিয়োগে ঘুষ ছিলো ২ লাখ টাকা। হাসিনা সরকারের সময়ে প্রথম বার বেতন বৃদ্ধির পর সেটা হলো ৫ লাখ টাকা। এরপর আবার বৃদ্ধির পর হলো ১০ লাখ। এবার সেটা হয়তো ২০ লাখ টাকা হবে।”

অর্থাৎ পে স্কেলের সঙ্গে শুধু বেতন নয়, জবাবদিহিতার কাঠামোটাও শক্ত করতে হবে।

কারণ সরকারি চাকরিজীবীর বেতন জনগণের অর্থে দেওয়া হয়। সেই অর্থের বিনিময়ে দ্রুত, দক্ষ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাওয়া জনগণের অধিকার।

বাড়তি ক্রয়ক্ষমতায় মূল্যস্ফীতির ভীতি

বেতন বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে থাকা টাকায়।

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে যাদের প্রকৃত আয় কমেছে, নতুন বেতন কাঠামো তাদের সেই চাপ কিছুটা সামলাতে সাহায্য করতে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তাদের সক্ষমতা বাড়বে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মানুষের হাতে টাকা বাড়লে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে।

অর্থনীতির সহজ হিসাব হলো- চাহিদা বাড়ল, কিন্তু পণ্য একই থাকল, তাহলে দামের ওপর চাপ তৈরি হবেই।

সরকারি কর্মচারীরা বেশি কেনাকাটা করলে দোকান, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, পোশাক কিংবা অন্যান্য ব্যবসায় বিক্রি বাড়তে পারে। অর্থনীতিতে গতি আনতে এটি সহায়ক হতে পারে।

তবে এর সঙ্গে একটি ঝুঁকিও আছে।

মানুষের হাতে টাকা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ কতটা বাড়বে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সরবরাহ না বাড়লে একই চাহিদা আবার দাম বাড়ার কারণও হতে পারে।

কারণ অর্থনীতির সহজ হিসাব হলো- চাহিদা বাড়ল, কিন্তু পণ্য একই থাকল, তাহলে দামের ওপর চাপ তৈরি হবেই।

আহসান এইচ মনসুর উদাহরণ দিয়ে বলেন- “কিছু মানুষেরবেতন তো ডাবল হলো কিন্তু বাজারে যে ১০টা জিনিস ছিলো তা কিন্তু সেই ১০টাই রইলো। সুতরাং আগে যেটা ১০০ টাকা ছিলো সেটা ২০০টাকা হলেও তারা কিনতে পারবে। এতে মূল্যস্ফীতিতে চাপ পড়বেই। অন্যদিকে যে বেসরকারি চাকুরিজীবীর বেতন বাড়লো না তাকে কিন্তু এখন হিমসিম খেতে হবে।”

আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি এখনো বেশ উঁচু।

এই পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে কিনা, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ আছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “মূল্যস্ফীতির প্রভাব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাময়িক হলেও বাজারে এর প্রভাব পড়বে।”

তবে এই ঘোষণার পর থেকেই দাম বৃদ্ধি শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বেতন বৃদ্ধির আলোচনা শুরু হলেই মানুষের মধ্যে ভবিষ্যতে দাম বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশন’।

মানুষ যদি আগেই ধরে নেয় দাম বাড়বে, তাহলে ব্যবসায়ী, উৎপাদক ও ভোক্তারা সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। ফলে বাস্তবে দাম বাড়ার আগেই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইসড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধির ঝুঁকির কথা বলছেন।

তার মতে, “বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।”

কারণ মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্যের দাম কমেনি। শুধু দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।

এই অবস্থায় মানুষের হাতে একসঙ্গে বেশি টাকা গেলে চাহিদা বাড়বে। আর সরবরাহ সেই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

তিন ধাপে বেতন

তবে এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সরকার জানিয়েছে, একবারে পুরো পে-স্কেল দিচ্ছে না।

মূল বেতন বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে। ১লা জুলাই থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ। 

২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আরও ৩০ শতাংশ। 

আর ২০২৭ সালের জুলাইয়ে বাকি ৩০ শতাংশ বেতন কার্যকর হবে বলে অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থাৎ ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।

আর বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে।

সরকারের যুক্তি, একবারে পুরো টাকা দিলে বাজারে হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থ ঢুকত। ধাপে ধাপে দিলে সেই চাপ কিছুটা কমবে।

কম আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও রাখা হয়েছে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও নিট পেনশন ধাপে ধাপে বাড়বে।

বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন

সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১১ বছর। এই সময়ে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা সবকিছুর খরচ বেড়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীরা অবশ্য প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকের প্রকৃত আয় বাড়েনি।

এরপর ২০২৫ সালের ২৭এ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে।

কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে গত ২১এ জানুয়ারি।

নির্বাচনের পর বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গত ২১এ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি দীর্ঘ চার মাসে আটটি সভায় পর্যালোচনা শেষে গত ১২ই অগাস্ট চূড়ান্ত সুপারিশ প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে গত ৬ই অগাস্ট জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়নে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার।

এরপর সোমবার সচিব কমিটির সুপারিশের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

 

স্বস্তি নাকি নতুন চাপ

নতুন পে স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়বে, বাড়বে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী ও কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা পাবেন বড় সুবিধা।

কিন্তু এই সুবিধার বিপরীতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই অর্থের জোগান দিতে হবে রাজস্ব বাড়িয়ে, নয়তো ঋণ নিয়ে। একই সঙ্গে বাড়তি অর্থ বাজারে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই পে স্কেলের হিসাব শুধু কার বেতন কত বাড়ল, সেখানে আটকে নেই।

আসল প্রশ্ন সরকার এই বাড়তি খরচ সামলাবে কীভাবে, আর জনগণ এর বিনিময়ে কতটা ভালো সেবা পাবে? একই সঙ্গে সরকারের জন্য পরীক্ষা সরকারি কর্মচারীদের পকেটে স্বস্তি যেনো আমজনতার ঘাড়ে বাড়তি বোঝা না চাপায়।