প্রায় চার বছর পর আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বড় স্বস্তি কি ফিরলো অর্থনীতিতে, নাকি গ্যাস, জ্বালানি ও বিনিয়োগের সংকটে এখনও রয়ে গেছে বড় অস্বস্তি?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০২ পিএমআপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
বাংলাদেশের জন্য ৩৭ বিলিয়ন ডলার কি সত্যিই বড় স্বস্তি?
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় আতংকগুলোর একটি ছিলো ‘গ্রীনব্যাক’। একদিকে আমদানি বিল মেটাতে হিমসিম খেতে হচ্ছিলো, রিজার্ভ দ্রুত কমছিলো, সমান তালে চড়ছিলো মূল্যস্ফীতিও। তাতে জ্বালানি থেকে শিল্পের কাঁচামাল, সবকিছুর আমদানিতেই তৈরি হয়েছিলো অনিশ্চয়তা।
আর তাতে বাজারে বাড়ছিলো সেই গ্রীনব্যাক বা ডলারের দাম।
সেই জায়গা থেকে এখন দৃশ্যপট অনেকটাই বদলেছে। কারণ অনেকদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ।
একটা দেশের রিজার্ভ বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কারণ রিজার্ভ মানে দেশের হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সঞ্চয়।
যার দরকার খাদ্য আমদানিতে, জ্বালানি ক্রয়ে, বিদেশি ঋণ পরিশোধে; এমনকি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পের কাঁচামাল আনতে।
অর্থাৎ রিজার্ভ শক্তিশালী হলে ডলার নিয়ে হঠাৎ বড় ধরনের সংকটে পড়ার ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশের জন্য এই স্বস্তির জায়গাটা এখন আরও বড়।
কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট বা গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আলাপ-কে জানিয়েছেন, সর্বশেষ হিসাবে গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
২০এ অগাস্টের হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
আর ৩৭ বিলিয়নের এই মার্ক অব্যহত রয়েছে চলতি বছরের জুন থেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ৩৭ বিলিয়ন ডলার কি সত্যিই বড় স্বস্তি?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- রিজার্ভ বাড়ছে কেন?
আর এই টাকা দেশের চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সামাল কতটা সহায়ক হবে?
কারণ একই সময়ে কারখানায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ সংকট আছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, বিনিয়োগের গতি দুর্বল। তাহলে রিজার্ভের এই স্বস্তি অর্থনীতির কোন জায়গায় কাজে লাগবে?
৩৭ বিলিয়ন ডলার: সবশেষ কবে ছিলো
প্রথমে রিজার্ভের অংকটা পরিষ্কার করা যাক। সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন রিজার্ভের এই সংখ্যাটা বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ উঠেছিল ২০২১ সালের অগাস্টে। যা ছিলো ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার।
এরপর ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপের মধ্যে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।
সর্বশেষ ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিলো। পরদিনই তা নেমে যায় ৩৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।
এরপর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও গভীর হয়। এরপর থেকে আর এই অংক ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশের রিজার্ভ।
অর্থাৎ প্রায় চার বছর পর আবার সেই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিতে ফিরেছে বাংলাদেশ।
যা মোটামুটি অব্যহত রয়েছে চলতি বছরের জুন থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা বলছে, গত জুনে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিলো ৩৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
তবে দীর্ঘ সময়টা খুব স্বস্তির ছিলো না। ডলারের সংকট ছিলো। ব্যাংকগুলোতে ডলার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমনকি আমদানি নিয়ন্ত্রণও করতে হয়েছিল। রিজার্ভ রক্ষায় এলসি খোলায় নানা বিধিনিষেধও এসেছিল।
সেই জায়গা থেকে এখনকার অবস্থান নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন। আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
গ্রস রিজার্ভের পুরো ৩৭ বিলিয়ন ডলারকে হাতে থাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেখা যাবে না।
আইএমএফের বিপিএম-৬ বরং তুলনামূলকভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের চিত্র দেয়। সেই হিসাবে এখন রিজার্ভ প্রায় ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সংখ্যা বড় হলেও কোন হিসাবের রিজার্ভ নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া আজকের রিজার্ভ তাই রেকর্ড নয়, বরং কয়েক বছর ধরে চলা পতন থামিয়ে আবার একটি তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে ফেরার গল্প।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম ৪৮ দিনেই দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।
শুধু অগাস্টের প্রথম ২২ দিনেই এসেছে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্সে রেকর্ড হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। যা এক অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড।
রিজার্ভ বাড়ার দ্বিতীয় বড় উৎস রপ্তানি আয়।
জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এটি প্রায় ১ শতাংশ কম হলেও জুনের তুলনায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তবে রিজার্ভ বাড়ার গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো ডলার ক্রয়। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও বাজার থেকে ডলার কিনছে।
সহজ করে বললে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানির কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত ডলার জমে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ডলার কিনে রিজার্ভে যোগ করে।
শুধু ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
অর্থাৎ রিজার্ভ বাড়ার গল্পটা শুধু ‘দেশে বেশি ডলার আসছে’ এতটা সরল নয়।
রেমিট্যান্সে ডলার আসছে, রপ্তানি থেকেও আসছে। আর সেই ডলারের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে রিজার্ভে জমাচ্ছে।
এটাই আগের কয়েক বছরের সঙ্গে বড় পার্থক্য।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে উল্টো ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রেতা নয়, বরং ক্রেতার ভূমিকায়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “২০২৪ এর পর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়ে যায়। এর প্রধান কারণ ছিলো হুন্ডি মার্কেটের পতন ও অর্থপাচার বন্ধ হওয়া। এর পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও কমে গিয়েছিলো। অন্যদিকে দেশে বিনিয়োগ না হওয়ায়, ক্যাপিটাল মেশিনারি কেনাতে ডলার খরচ হয়নি। এতে যেটা হয়েছে সাপ্লাই যতো ছিলো, সে তুলনায় ডিমান্ড ততোটা ছিলো না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাজার থেকে ডলার কিনেছে। এতে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বেড়েছে।”
বাজার থেকে ডলার কেনার এই প্রক্রিয়া শুধু রিজার্ভ বাড়াচ্ছে না, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করছে বলে জানান তিনি।
এতে অবশ্য পুরনো বাফেদা-এবিবি নিয়ম থেকে সরে এসে আইএফের পরামর্শে ডলারকে বাজার ভিত্তিক করাটাও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গঠিত হোয়াইট পেপার (শ্বেতপত্র) কমিটির এই সদস্য।
সহজ করে বললে, ডলার আসছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা কিনছে; আর সেই কারণেই রিজার্ভে এখন জমছে ডলার।
জ্বালানি সংকটের ‘কুশন’
রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সবচেয়ে বাস্তব সুবিধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি সংকটের সময় সরকারকে কিছুটা আর্থিক কুশন দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এলএনজি, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি কিনতে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়।
এই জায়গায় রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে। যখন গ্যাসের অভাবে দেশের বিভিন্ন খাত রয়েছে হুমকির মুখে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২২ সালের পরিস্থিতি।
রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে তখন স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে বড় অংকের টাকা খরচ করতে হয়েছে নিয়মিত। যার প্রভাব পড়েছিল রিজার্ভে।
তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমছিল, ডলারের বাজারেও তৈরি হয়েছিল তীব্র চাপ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও ছিলো অনেক বেশি।
২০২১ সালের অগাস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকা রিজার্ভ ২০২৪ সালের মে মাসে নেমে এসেছিলো ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে আবারও জ্বালানি বাজারে আগুন। ঠিক এমন সময় রিজার্ভের এমন ফিগার কিছুটা হলেও স্বস্তি দিবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “জ্বালানি তেলের বাজারে এখন নিউ নরমাল সময় চলছে। কারণ যে তেলের দাম মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগে ৬০-৬৫ ডলারের মধ্যে ছিলো তা এখন ৯০-৯৫ ডলার পার ব্যারেলে আটকে গেছে। এমন সময়ে রিজার্ভ কুশন দিচ্ছে।”
অর্থাৎ, রিজার্ভের ওপর চাপ শুধু ডলারের বাজারেই থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনেও গিয়ে পড়ে।
বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হলে, রিজার্ভ সেই আমদানির বিল পরিশোধে আর্থিক সক্ষমতা দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। রিজার্ভ জ্বালানি কিনতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ তৈরি করতে পারে না।
এখানে বলে রাখা ভালো, অতিরিক্ত দামে জ্বালানি আমদানি করলেও বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে ডলার সমস্যা নয় কাজ করছে অভ্যন্তরীণ এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা।
তবে সমস্যা যে কারণেই হোক তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপ-কে জানিয়েছেন, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক কারখানায় দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
সহজ করে বললে যার অর্থ হলো, রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক আলাপ-কে বলেন, “ব্যবসায়ীদের কাছে এখন অন্য যেকোনো সমস্যার চেয়ে জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বড় ইস্যু।”
রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রা বাফার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমদানি বিল, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা বেড়েছে।
আরও বড় বিষয়, ডলার বাজারে আতংকের সেই পরিবেশ এখন নেই। ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে, এখন উল্টো বাজার থেকে ডলার কিনছে।
এটা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ড. জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এটিকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।”
কারণ রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি যদি বিনিয়োগ না বাড়ে, কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় না চলে, গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ না আসে এবং কর্মসংস্থান না বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তি মানুষের জীবনে খুব বেশি দূর পৌঁছাবে না।
এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরিত্য- ডলার আছে। রিজার্ভ আছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না।
জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১৯৯৩ সালের পর এত কম ঋণপ্রবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও এখনো অনেক বেশি। তাই রিজার্ভের বর্তমান উত্থানকে সবচেয়ে ভালোভাবে বলা যায় অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাফার ফিরে আসা।
এখন সেই বাফারকে কাজে লাগিয়ে যদি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কমানো যায়, বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, মূল্যস্ফীতি কমানো যায় তবেই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের এই স্বস্তি মানুষের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।
নইলে রিজার্ভের অংক বাড়বে, কিন্তু অর্থনীতির গতি বাড়বে না।
রিজার্ভ বাড়ছে, অর্থনীতিতে স্বস্তি কতটা
প্রায় চার বছর পর আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বড় স্বস্তি কি ফিরলো অর্থনীতিতে, নাকি গ্যাস, জ্বালানি ও বিনিয়োগের সংকটে এখনও রয়ে গেছে বড় অস্বস্তি?
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় আতংকগুলোর একটি ছিলো ‘গ্রীনব্যাক’। একদিকে আমদানি বিল মেটাতে হিমসিম খেতে হচ্ছিলো, রিজার্ভ দ্রুত কমছিলো, সমান তালে চড়ছিলো মূল্যস্ফীতিও। তাতে জ্বালানি থেকে শিল্পের কাঁচামাল, সবকিছুর আমদানিতেই তৈরি হয়েছিলো অনিশ্চয়তা।
আর তাতে বাজারে বাড়ছিলো সেই গ্রীনব্যাক বা ডলারের দাম।
সেই জায়গা থেকে এখন দৃশ্যপট অনেকটাই বদলেছে। কারণ অনেকদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ।
একটা দেশের রিজার্ভ বাড়ছে, যা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কারণ রিজার্ভ মানে দেশের হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সঞ্চয়।
যার দরকার খাদ্য আমদানিতে, জ্বালানি ক্রয়ে, বিদেশি ঋণ পরিশোধে; এমনকি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পের কাঁচামাল আনতে।
অর্থাৎ রিজার্ভ শক্তিশালী হলে ডলার নিয়ে হঠাৎ বড় ধরনের সংকটে পড়ার ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশের জন্য এই স্বস্তির জায়গাটা এখন আরও বড়।
কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট বা গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আলাপ-কে জানিয়েছেন, সর্বশেষ হিসাবে গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
২০এ অগাস্টের হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
আর ৩৭ বিলিয়নের এই মার্ক অব্যহত রয়েছে চলতি বছরের জুন থেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ৩৭ বিলিয়ন ডলার কি সত্যিই বড় স্বস্তি?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- রিজার্ভ বাড়ছে কেন?
আর এই টাকা দেশের চলমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সামাল কতটা সহায়ক হবে?
কারণ একই সময়ে কারখানায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ সংকট আছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, বিনিয়োগের গতি দুর্বল। তাহলে রিজার্ভের এই স্বস্তি অর্থনীতির কোন জায়গায় কাজে লাগবে?
৩৭ বিলিয়ন ডলার: সবশেষ কবে ছিলো
প্রথমে রিজার্ভের অংকটা পরিষ্কার করা যাক। সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন রিজার্ভের এই সংখ্যাটা বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ উঠেছিল ২০২১ সালের অগাস্টে। যা ছিলো ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার।
এরপর ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপের মধ্যে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।
সর্বশেষ ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিলো। পরদিনই তা নেমে যায় ৩৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।
এরপর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও গভীর হয়। এরপর থেকে আর এই অংক ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশের রিজার্ভ।
অর্থাৎ প্রায় চার বছর পর আবার সেই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের স্বস্তিতে ফিরেছে বাংলাদেশ।
যা মোটামুটি অব্যহত রয়েছে চলতি বছরের জুন থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা বলছে, গত জুনে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিলো ৩৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
তবে দীর্ঘ সময়টা খুব স্বস্তির ছিলো না। ডলারের সংকট ছিলো। ব্যাংকগুলোতে ডলার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমনকি আমদানি নিয়ন্ত্রণও করতে হয়েছিল। রিজার্ভ রক্ষায় এলসি খোলায় নানা বিধিনিষেধও এসেছিল।
সেই জায়গা থেকে এখনকার অবস্থান নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন। আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
গ্রস রিজার্ভের পুরো ৩৭ বিলিয়ন ডলারকে হাতে থাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেখা যাবে না।
আইএমএফের বিপিএম-৬ বরং তুলনামূলকভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের চিত্র দেয়। সেই হিসাবে এখন রিজার্ভ প্রায় ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সংখ্যা বড় হলেও কোন হিসাবের রিজার্ভ নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া আজকের রিজার্ভ তাই রেকর্ড নয়, বরং কয়েক বছর ধরে চলা পতন থামিয়ে আবার একটি তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে ফেরার গল্প।
রিজার্ভ বাড়ছে কেন
রিজার্ভ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রেমিট্যান্স। অর্থাৎ, বিদেশে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো আয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম ৪৮ দিনেই দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।
শুধু অগাস্টের প্রথম ২২ দিনেই এসেছে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্সে রেকর্ড হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। যা এক অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড।
রিজার্ভ বাড়ার দ্বিতীয় বড় উৎস রপ্তানি আয়।
জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এটি প্রায় ১ শতাংশ কম হলেও জুনের তুলনায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তবে রিজার্ভ বাড়ার গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো ডলার ক্রয়। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও বাজার থেকে ডলার কিনছে।
সহজ করে বললে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানির কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত ডলার জমে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ডলার কিনে রিজার্ভে যোগ করে।
শুধু ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
অর্থাৎ রিজার্ভ বাড়ার গল্পটা শুধু ‘দেশে বেশি ডলার আসছে’ এতটা সরল নয়।
রেমিট্যান্সে ডলার আসছে, রপ্তানি থেকেও আসছে। আর সেই ডলারের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে রিজার্ভে জমাচ্ছে।
এটাই আগের কয়েক বছরের সঙ্গে বড় পার্থক্য।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে উল্টো ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রেতা নয়, বরং ক্রেতার ভূমিকায়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “২০২৪ এর পর থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়ে যায়। এর প্রধান কারণ ছিলো হুন্ডি মার্কেটের পতন ও অর্থপাচার বন্ধ হওয়া। এর পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও কমে গিয়েছিলো। অন্যদিকে দেশে বিনিয়োগ না হওয়ায়, ক্যাপিটাল মেশিনারি কেনাতে ডলার খরচ হয়নি। এতে যেটা হয়েছে সাপ্লাই যতো ছিলো, সে তুলনায় ডিমান্ড ততোটা ছিলো না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাজার থেকে ডলার কিনেছে। এতে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বেড়েছে।”
বাজার থেকে ডলার কেনার এই প্রক্রিয়া শুধু রিজার্ভ বাড়াচ্ছে না, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করছে বলে জানান তিনি।
এতে অবশ্য পুরনো বাফেদা-এবিবি নিয়ম থেকে সরে এসে আইএফের পরামর্শে ডলারকে বাজার ভিত্তিক করাটাও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গঠিত হোয়াইট পেপার (শ্বেতপত্র) কমিটির এই সদস্য।
সহজ করে বললে, ডলার আসছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা কিনছে; আর সেই কারণেই রিজার্ভে এখন জমছে ডলার।
জ্বালানি সংকটের ‘কুশন’
রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সবচেয়ে বাস্তব সুবিধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি সংকটের সময় সরকারকে কিছুটা আর্থিক কুশন দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এলএনজি, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি কিনতে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়।
এই জায়গায় রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে। যখন গ্যাসের অভাবে দেশের বিভিন্ন খাত রয়েছে হুমকির মুখে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২২ সালের পরিস্থিতি।
রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন জ্বালানির দাম বাড়তে থাকে তখন স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে বড় অংকের টাকা খরচ করতে হয়েছে নিয়মিত। যার প্রভাব পড়েছিল রিজার্ভে।
তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমছিল, ডলারের বাজারেও তৈরি হয়েছিল তীব্র চাপ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও ছিলো অনেক বেশি।
২০২১ সালের অগাস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকা রিজার্ভ ২০২৪ সালের মে মাসে নেমে এসেছিলো ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে আবারও জ্বালানি বাজারে আগুন। ঠিক এমন সময় রিজার্ভের এমন ফিগার কিছুটা হলেও স্বস্তি দিবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “জ্বালানি তেলের বাজারে এখন নিউ নরমাল সময় চলছে। কারণ যে তেলের দাম মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগে ৬০-৬৫ ডলারের মধ্যে ছিলো তা এখন ৯০-৯৫ ডলার পার ব্যারেলে আটকে গেছে। এমন সময়ে রিজার্ভ কুশন দিচ্ছে।”
অর্থাৎ, রিজার্ভের ওপর চাপ শুধু ডলারের বাজারেই থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনেও গিয়ে পড়ে।
বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হলে, রিজার্ভ সেই আমদানির বিল পরিশোধে আর্থিক সক্ষমতা দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। রিজার্ভ জ্বালানি কিনতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ তৈরি করতে পারে না।
এখানে বলে রাখা ভালো, অতিরিক্ত দামে জ্বালানি আমদানি করলেও বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে ডলার সমস্যা নয় কাজ করছে অভ্যন্তরীণ এলএনজি টার্মিনালের সমস্যা।
তবে সমস্যা যে কারণেই হোক তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপ-কে জানিয়েছেন, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানা গ্যাস সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক কারখানায় দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
সহজ করে বললে যার অর্থ হলো, রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক আলাপ-কে বলেন, “ব্যবসায়ীদের কাছে এখন অন্য যেকোনো সমস্যার চেয়ে জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বড় ইস্যু।”
অর্থনীতিতে স্বস্তি কতটা
রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রা বাফার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমদানি বিল, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা বেড়েছে।
আরও বড় বিষয়, ডলার বাজারে আতংকের সেই পরিবেশ এখন নেই। ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে, এখন উল্টো বাজার থেকে ডলার কিনছে।
এটা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ড. জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের উন্নতি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু এটিকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।”
কারণ রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি যদি বিনিয়োগ না বাড়ে, কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় না চলে, গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ না আসে এবং কর্মসংস্থান না বাড়ে, তাহলে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তি মানুষের জীবনে খুব বেশি দূর পৌঁছাবে না।
এখানে সবচেয়ে বড় বৈপরিত্য- ডলার আছে। রিজার্ভ আছে। রেমিট্যান্স বাড়ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না।
জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১৯৯৩ সালের পর এত কম ঋণপ্রবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও এখনো অনেক বেশি। তাই রিজার্ভের বর্তমান উত্থানকে সবচেয়ে ভালোভাবে বলা যায় অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাফার ফিরে আসা।
এখন সেই বাফারকে কাজে লাগিয়ে যদি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কমানো যায়, বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, মূল্যস্ফীতি কমানো যায় তবেই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের এই স্বস্তি মানুষের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।
নইলে রিজার্ভের অংক বাড়বে, কিন্তু অর্থনীতির গতি বাড়বে না।
বিষয়: