স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ শিক্ষক গণপতি হত্যাকাণ্ড যেসব প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে

রংপুর শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়া বেশ ঘনবসতিপূর্ণ। রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী বেশিদিন হয়নি এ পাড়ার বাসিন্দা হয়েছেন। বাড়ির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি, পাড়া প্রতিবেশীর সাথে পরিচয়ও তেমনভাবে সারা হয়ে ওঠেনি। এই বাড়িতেই, গণপতি, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ পড়ে ছিলো। তিন, বা চারদিন। এলাকাবাসীর কথা, তারা কিছুই জানেন না।

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

“গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু জাবেদা খাতায় শুধু ব্যবসার ডেবিট-ক্রেডিট শেখাতেন না। ছাত্রদের শেখাতেন, 'এই যে দুইটা সারি, এক সারিতে থাকে তোদের ভালো কাজ, আরেক সারিতে মন্দ কাজ। তোরাই হিসাব করিস, দুই সারির যোগ-বিয়োগে শেষে থাকল কী। গণপতি চক্রবর্তীকে স্ত্রী, কন্যা, পুত্রসহ মেরে ফেলা হয়েছে। বাসায় ঢুকে চারজনকে মেরে ফেলে চলে গেছে হত্যাকারী।”

প্রিয় শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ছাত্র এবং সুপরিচিত লেখক রাজীব হাসান।

রংপুর শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির কাজ এখনো শেষ হয়নি। 

বাড়ির নিচতলাটা ফাঁকা। কিছুদিন হলো দোতলায় পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন গণপতি। এলাকার সবার সাথে পরিচয় পর্বটাও ঠিকঠাক সারা হয়ে ওঠেনি।

শনিবার রাতে সেই কাজ শেষ না হওয়া বাড়িটি থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য’র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

এসময় ঘরের জিনিসপত্র ছিলো এলোমেলো। চারজনের মরদেহ পড়ে ছিলো তিন জায়গায়। মরদেহে পঁচন ধরায় গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

গণপতির মরদেহ ছিলো ছাদে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় চিলেকোঠায়। আর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ ছিলো ঘরের ভেতর।

এ দৃশ্য অজস্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তার মধ্যে যে প্রশ্নটা সবার আগে আসবে– ঘনবসতি এলাকার মধ্যে একটি বাড়ির ভেতরে চার-চারটা মানুষ এমন নৃশংসভাবে প্রাণ হারালেন, আশপাশের কেউ কি কিছুই টের পেলেন না?

কীভাবে একই পরিবারের চারজন মানুষ নিজ বাড়ির ভেতরে প্রাণ হারালেন? কেন প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ পেলেন না?

স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও কেন এত সময় লেগে গেলো ঘটনাটি সামনে আসতে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো জানা যাবে এতগুলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।

গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য নিহতের ঘটনার নেপথ্যে কি ডাকাতি নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? নাকি আরও কোনো কারণ আছে? এসবই খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত হলেও ময়নাতদন্তের পর আরো বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।

রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আলাপ-কে বলেন, “চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।” 

“ডাকাতির ঘটনা নাকি অন্য কোনো বিষয় আছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তা বের করতে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে”, বলেন এই কর্মকর্তা।

অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

প্রতিটি মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, সবাইকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিলো। 

কারা গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করলো, কেনই বা করলো–তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

রংপুর সিআইডির এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, মরদেহগুলোতে পঁচন ধরেছে। প্রাথমিকভাবে তিন-চার দিন আগে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো এবং আসবাবপত্রের ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রাথমিকভাবে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, জানান সুমিত চৌধুরী।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”

বৃহষ্পতিবার রাতে শেষ কথা হয়

বৃহষ্পতিবার রাতে শেষবারের মতো বোন পূজা চক্রবর্তীর সাথে কথা বলেছিলেন প্রীতিলতা চক্রবর্তী। 

পূজা চক্রবর্তী আলাপ-কে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয়। 

শনিবার ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত ৯টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান। সেখানে পৌঁছে প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখেন। পরে ৯৯৯-এ কল দিলে কোতওয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ যায়।

বৃহষ্পতিবার রাতে শেষবারের মতো বোন পূজা চক্রবর্তীর সাথে কথা বলেছিলেন প্রীতিলতা চক্রবর্তী।

ফটক তালাবদ্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সকে ডাকা হয়। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। তারপরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরে ময়নাতদন্তের জন্য চারটি মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় বলে জানান পূজা চক্রবর্তী।

‘দেশকে অস্থিতীশীল করার চক্রান্ত’

গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনাকে দেশ অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হিসাবে দেখছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবীদরা। 

ঘটনার পর রংপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল ও রংপুর মহানগর জামায়াতের আমীর এ টি এম আজম খান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। 

প্রতিবেশী, নিহতদের স্বজন ও পুলিশের  সাথে কথা বলেন তারা। 

এ সময় আজম খান বলেন, “দেশকে অস্থিতিশীল করবার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এই হত্যাকাণ্ড।”

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যান। 

হোমিওপ্যথি চিকিৎসক হিসাবেও পরিচিতি আছে তার। 

গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী গৃহিণী ছিলেন। 

মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছেন। 

ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী ছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই মারা গেছেন। আরেক ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অসুস্থ, গ্রামেই থাকেন।