স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ শিক্ষক গণপতি হত্যাকাণ্ড যেসব প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে
সকালে ডাকাতির সম্ভাবনা, দুপুরে মাদকসেবনে বাধা দেওয়ার গল্প, একই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য বদলে গেছে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। এর মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের কারণ শনাক্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের ‘অস্বাভাবিক দ্রুততা’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৫ পিএমআপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি।
“গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু জাবেদা খাতায় শুধু ব্যবসার ডেবিট-ক্রেডিট শেখাতেন না। ছাত্রদের শেখাতেন, 'এই যে দুইটা সারি, এক সারিতে থাকে তোদের ভালো কাজ, আরেক সারিতে মন্দ কাজ। তোরাই হিসাব করিস, দুই সারির যোগ-বিয়োগে শেষে থাকল কী। গণপতি চক্রবর্তীকে স্ত্রী, কন্যা, পুত্রসহ মেরে ফেলা হয়েছে। বাসায় ঢুকে চারজনকে মেরে ফেলে চলে গেছে হত্যাকারী।”
প্রিয় শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ছাত্র এবং সুপরিচিত লেখক রাজীব হাসান।
রংপুর শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
বাড়ির নিচতলাটা ফাঁকা। কিছুদিন হলো দোতলায় পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন গণপতি। এলাকার সবার সাথে পরিচয় পর্বটাও ঠিকঠাক সারা হয়ে ওঠেনি।
শনিবার দিবাগত গভীর রাতে সেই কাজ শেষ না হওয়া বাড়িটি থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য’র মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসময় ঘরের জিনিসপত্র ছিলো এলোমেলো। চারজনের মরদেহ পড়ে ছিলো তিন জায়গায়। মরদেহে পঁচন ধরায় গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
গণপতির মরদেহ ছিলো ছাদে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় চিলেকোঠায়। আর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ ছিলো ঘরের ভেতর।
এ দৃশ্য অজস্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তার মধ্যে যে প্রশ্নটা সবার আগে আসবে– ঘনবসতি এলাকার মধ্যে একটি বাড়ির ভেতরে চার-চারটা মানুষ এমন নৃশংসভাবে প্রাণ হারালেন, আশপাশের কেউ কি কিছুই টের পেলেন না?
কীভাবে একই পরিবারের চারজন মানুষ নিজ বাড়ির ভেতরে প্রাণ হারালেন? কেন প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ পেলেন না?
স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও কেন এত সময় লেগে গেলো ঘটনাটি সামনে আসতে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো জানা যাবে এতগুলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।
গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য নিহতের ঘটনার নেপথ্যে কি ডাকাতি নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? নাকি আরও কোনো কারণ আছে? এসবই খতিয়ে দেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত হলেও ময়নাতদন্তের পর আরো বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
শুরুতে ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করলেও মাত্র ৭ ঘন্টার ব্যবধানে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি করে প্রেস ব্রিফিং করেছে পুলিশ। ব্রিফিংয়ে দু’জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের দাবি করে বলা হয়, মাদকসেবনে বাঁধা দেওয়ায় গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে একেক সময় একেক রকমের বক্তব্য পুলিশের
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী রবিবার সকালে আলাপ-কে বলেন, “চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
“ডাকাতির ঘটনা নাকি অন্য কোনো বিষয় আছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তা বের করতে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে”, বলেন এই কর্মকর্তা।
অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে পুলিশ
রবিবার সকালে আরও জানানো হয়, প্রতিটি মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, সবাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিলো।
কারা গণপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করলো, কেনই বা করলো–তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
রংপুর সিআইডির এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী সেসময় জানান, মরদেহগুলোতে পঁচন ধরেছে। তিন-চার দিন আগে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো এবং আসবাবপত্রের ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রাথমিকভাবে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, জানান সুমিত চৌধুরী।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”
সবশেষ যা জানালো পুলিশ
পুলিশের সকালের দেওয়া বক্তব্য রবিবার দুপুরে এসে পাল্টে যায়। ডাকাতি বা অন্য কোনো কারণ নয়, মাদকসেবীদের হাতে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান খুন হয়েছেন বলে দাবি করে পুলিশ।
রংপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।”
তবে পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন ও অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়ায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। অনেকেই একে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে শেষ কথা হয়
বৃহস্পতিবার রাতে শেষবারের মতো বোন পূজা চক্রবর্তীর সাথে কথা বলেছিলেন প্রীতিলতা চক্রবর্তী।
পূজা চক্রবর্তী আলাপ-কে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয়।
শনিবার ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত ৯টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান তিনি। সেখানে পৌঁছে প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখেন। পরে ৯৯৯-এ কল দিলে কোতওয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ যায়।
ফটক তালাবদ্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকা হয়। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। তারপরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে ময়নাতদন্তের জন্য চারটি মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় বলে জানান পূজা চক্রবর্তী।
‘দেশকে অস্থিতীশীল করার চক্রান্ত’
গণপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনাকে দেশ অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হিসাবে দেখছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবীদরা।
ঘটনার পর রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল ও রংপুর মহানগর জামায়াতের আমীর এটিএম আজম খান ঘটনাস্থল আসেন।
প্রতিবেশী, নিহতদের স্বজন ও পুলিশের সাথে কথা বলেন তারা।
এ সময় আজম খান বলেন, “দেশকে অস্থিতিশীল করবার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এই হত্যাকাণ্ড।”
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যান। হোমিওপ্যথি চিকিৎসক হিসাবেও পরিচিতি ছিলেন তিনি।
তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী গৃহিণী ছিলেন। মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছিলেন আর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই মারা গেছেন। আরেক ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অসুস্থ, গ্রামেই থাকেন।
স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ শিক্ষক গণপতি হত্যাকাণ্ড যেসব প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে
সকালে ডাকাতির সম্ভাবনা, দুপুরে মাদকসেবনে বাধা দেওয়ার গল্প, একই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য বদলে গেছে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। এর মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের কারণ শনাক্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের ‘অস্বাভাবিক দ্রুততা’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
“গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু জাবেদা খাতায় শুধু ব্যবসার ডেবিট-ক্রেডিট শেখাতেন না। ছাত্রদের শেখাতেন, 'এই যে দুইটা সারি, এক সারিতে থাকে তোদের ভালো কাজ, আরেক সারিতে মন্দ কাজ। তোরাই হিসাব করিস, দুই সারির যোগ-বিয়োগে শেষে থাকল কী। গণপতি চক্রবর্তীকে স্ত্রী, কন্যা, পুত্রসহ মেরে ফেলা হয়েছে। বাসায় ঢুকে চারজনকে মেরে ফেলে চলে গেছে হত্যাকারী।”
প্রিয় শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ছাত্র এবং সুপরিচিত লেখক রাজীব হাসান।
রংপুর শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
বাড়ির নিচতলাটা ফাঁকা। কিছুদিন হলো দোতলায় পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন গণপতি। এলাকার সবার সাথে পরিচয় পর্বটাও ঠিকঠাক সারা হয়ে ওঠেনি।
শনিবার দিবাগত গভীর রাতে সেই কাজ শেষ না হওয়া বাড়িটি থেকে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য’র মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসময় ঘরের জিনিসপত্র ছিলো এলোমেলো। চারজনের মরদেহ পড়ে ছিলো তিন জায়গায়। মরদেহে পঁচন ধরায় গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
গণপতির মরদেহ ছিলো ছাদে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় চিলেকোঠায়। আর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ ছিলো ঘরের ভেতর।
এ দৃশ্য অজস্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তার মধ্যে যে প্রশ্নটা সবার আগে আসবে– ঘনবসতি এলাকার মধ্যে একটি বাড়ির ভেতরে চার-চারটা মানুষ এমন নৃশংসভাবে প্রাণ হারালেন, আশপাশের কেউ কি কিছুই টের পেলেন না?
কীভাবে একই পরিবারের চারজন মানুষ নিজ বাড়ির ভেতরে প্রাণ হারালেন? কেন প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ পেলেন না?
স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও কেন এত সময় লেগে গেলো ঘটনাটি সামনে আসতে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হয়তো জানা যাবে এতগুলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ।
গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্য নিহতের ঘটনার নেপথ্যে কি ডাকাতি নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? নাকি আরও কোনো কারণ আছে? এসবই খতিয়ে দেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত হলেও ময়নাতদন্তের পর আরো বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
শুরুতে ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করলেও মাত্র ৭ ঘন্টার ব্যবধানে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি করে প্রেস ব্রিফিং করেছে পুলিশ। ব্রিফিংয়ে দু’জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের দাবি করে বলা হয়, মাদকসেবনে বাঁধা দেওয়ায় গণপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে একেক সময় একেক রকমের বক্তব্য পুলিশের
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী রবিবার সকালে আলাপ-কে বলেন, “চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
“ডাকাতির ঘটনা নাকি অন্য কোনো বিষয় আছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তা বের করতে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে”, বলেন এই কর্মকর্তা।
অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে পুলিশ
রবিবার সকালে আরও জানানো হয়, প্রতিটি মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, সবাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিলো।
কারা গণপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করলো, কেনই বা করলো–তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
রংপুর সিআইডির এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী সেসময় জানান, মরদেহগুলোতে পঁচন ধরেছে। তিন-চার দিন আগে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো এবং আসবাবপত্রের ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রাথমিকভাবে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, জানান সুমিত চৌধুরী।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”
সবশেষ যা জানালো পুলিশ
পুলিশের সকালের দেওয়া বক্তব্য রবিবার দুপুরে এসে পাল্টে যায়। ডাকাতি বা অন্য কোনো কারণ নয়, মাদকসেবীদের হাতে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান খুন হয়েছেন বলে দাবি করে পুলিশ।
রংপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।”
তবে পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন ও অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়ায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। অনেকেই একে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে শেষ কথা হয়
বৃহস্পতিবার রাতে শেষবারের মতো বোন পূজা চক্রবর্তীর সাথে কথা বলেছিলেন প্রীতিলতা চক্রবর্তী।
পূজা চক্রবর্তী আলাপ-কে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয়।
শনিবার ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত ৯টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান তিনি। সেখানে পৌঁছে প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখেন। পরে ৯৯৯-এ কল দিলে কোতওয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ যায়।
ফটক তালাবদ্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকা হয়। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। তারপরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে ময়নাতদন্তের জন্য চারটি মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় বলে জানান পূজা চক্রবর্তী।
‘দেশকে অস্থিতীশীল করার চক্রান্ত’
গণপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনাকে দেশ অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হিসাবে দেখছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবীদরা।
ঘটনার পর রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল ও রংপুর মহানগর জামায়াতের আমীর এটিএম আজম খান ঘটনাস্থল আসেন।
প্রতিবেশী, নিহতদের স্বজন ও পুলিশের সাথে কথা বলেন তারা।
এ সময় আজম খান বলেন, “দেশকে অস্থিতিশীল করবার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এই হত্যাকাণ্ড।”
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যান। হোমিওপ্যথি চিকিৎসক হিসাবেও পরিচিতি ছিলেন তিনি।
তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী গৃহিণী ছিলেন। মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছিলেন আর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
গণপতি চক্রবর্তীর গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই মারা গেছেন। আরেক ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অসুস্থ, গ্রামেই থাকেন।
বিষয়: