ব্যাংক-ভর্তুকি-করজাল: আইএমএফের আলোচনায় কী কী উঠে এলো

ঢাকায় আইএমএফের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের আলোচনায় উঠে এসেছে ব্যাংক খাত, ভর্তুকি, করজাল, বিনিময় হার ও সরকারি ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন কোন সংস্কারে জোর দিচ্ছে সংস্থাটি, আর কোথায় আপাতত নমনীয় অবস্থানে আছে সরকার?

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

মাস শেষে বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা পানির বিল। নিত্যপণ্যের দাম। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন। প্রথম দেখায় এসব বিষয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই আলোচনার প্রভাব পড়তে পারে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই।

এটি শুধু কয়েকশ কোটি ডলারের নতুন ঋণের বিষয় নয়। বরং আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে, কোন কোন খাতে সংস্কার হবে এবং তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পড়বে- সেই রূপরেখাও অনেকটা নির্ধারণ করবে এই আলোচনা।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ এবং জ্বালানি ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে সরকার আইএমএফের কাছে তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন করেছে।

সে আবেদনের অংশ হিসেবেই ১১ সদস্যের একটি আইএমএফ প্রতিনিধি দল পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় এসেছে। বৃহস্পতিবার তাদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও হংকংবিষয়ক মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে।

তাদের উদ্দেশ্য শুধু সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, চলমান সংস্কারের অগ্রগতি এবং আগামী দিনের নীতিগত অগ্রাধিকারও মূল্যায়ন করছে তারা।

তবে এটিকে এখনই আনুষ্ঠানিক ঋণ আলোচনা বলা যাচ্ছে না। আইএমএফ একে বলছে 'ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন'।

এই সফর শেষে প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে ফিরে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদন ইতিবাচক হলে আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সময় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। এরপর আরেকটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ, সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করবে।

এই আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়ও। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের আগের আইএমএফ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পেলেও রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং জ্বালানি খাতের সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যায়।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই কর্মসূচি কার্যত স্থগিত হয়ে পড়ে। পরে বর্তমান সরকার নতুন কর্মসূচির জন্য আবেদন করে। এ লক্ষ্যে গত ৯ই জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন অর্থমন্ত্রী।

সোমবার সচিবালয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “রাতারাতি কোনো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কার করা হবে এবং আইএমএফও এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে।”

অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই বর্তমান আলোচনার মূল বার্তাটি স্পষ্ট হয়। সরকার একসঙ্গে সব ধরনের সংস্কারে যেতে চায় না। বরং কোন সংস্কার আগে হবে, কোনটি পরে—সেটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। আইএমএফও আপাতত সেই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।

ভর্তুকি থাকবে, তবে বদলাবে কারা পাবেন

চলমান আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি।

প্রচলিত ধারণা, আইএমএফ মানেই সব ধরনের ভর্তুকি তুলে দেওয়ার চাপ। কিন্তু ঢাকার আলোচনায় সংস্থাটি এমন কোনো প্রস্তাব দেয়নি। বরং তাদের অবস্থান হলো, ভর্তুকি থাকবে, তবে সরকারি অর্থ যেন প্রকৃত প্রয়োজন থাকা মানুষের কাছেই পৌঁছায়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, সার, খাদ্য, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

এ সময় আইএমএফ জানতে চেয়েছে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ, এলএনজি আমদানির ব্যয়, জ্বালানি আমদানির খরচ, সার ভর্তুকি এবং এসব খাতে সরকারের মোট ব্যয়ের সর্বশেষ চিত্র।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চ আয়ের গ্রাহক- সবাই প্রায় একই ধরনের ভর্তুকি পাচ্ছেন। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও তার একটি বড় অংশ এমন মানুষের কাছেও পৌঁছাচ্ছে, যাদের এই সহায়তার প্রয়োজন নেই।

আইএমএফের মতে, এতে একদিকে ভর্তুকির কার্যকারিতা কমছে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক চাপও বাড়ছে।

এ কারণেই সংস্থাটি লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে। তবে উচ্চ আয়ের মানুষকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির প্রকৃত বা বাজারমূল্যের কাছাকাছি দাম পরিশোধ করতে হবে।

এতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে সীমিত সম্পদ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য ব্যবহার করাও সহজ হবে।

তবে সরকারও আইএমএফকে জানিয়েছে, আপাতত বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ গত মাসেই গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে আবার দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

ভর্তুকি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত ভর্তুকি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা খাতভিত্তিক সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন কর্মসূচির নীতিগত ভিত্তি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।”

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মনে করেন, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা গেলে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি বাস্তবায়ন সম্ভব।

“বিদ্যুৎ বা পানির উদাহরণ দিয়ে বলি; এখানে একটি নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ড থাকবে। এর বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে বুঝতে হবে তিনি আর নিম্ন আয়ের শ্রেণিতে নেই। যারা কম ব্যবহার করছেন, ধরে নিতে হবে তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। আর যারা বেশি ব্যবহার করছেন, তাদের কাছ থেকে বেশি নেওয়া যেতে পারে। এভাবে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীও আইডেনটিফাই করা সম্ভব। আর তাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি। 

ড. আশিকুর রহমানের মতে, বনানী, গুলশান বা বারিধারার মতো এলাকায় বসবাসকারীদের কাছ থেকে কম পানির বিল নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

তিনি বলেন, “বরং বেশি নেওয়া যেতে পারে, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি বাড়ানো সম্ভব হবে."

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির ধারণা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

আইএমএফের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে ব্যাংক খাতে।

ব্যাংক খাতেই সবচেয়ে বেশি নজর

চলমান আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। আইএমএফের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো এখানেই।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র, মূলধন ঘাটতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তারল্য সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।

বিশেষ করে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে কত অর্থ দেওয়া হয়েছে, কী শর্তে দেওয়া হয়েছে এবং সেই শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতটা- এসব বিষয়েই তাদের আগ্রহ ছিল বেশি।

আলোচনায় উঠে এসেছে ইসলামী ব্যাংকসহ তারল্য সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের বর্তমান অবস্থাও। বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন কোন পথে এগোবে, সেটিও জানতে চেয়েছে প্রতিনিধি দল।

অবশ্য এই অবস্থান আইএমএফের জন্য নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই সংস্থাটি বলে আসছে, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না হলে অন্য কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

তাদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনা—এসবই নতুন কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও একই মূল্যায়ন করেছেন।

“নতুন কর্মসূচিতেও পুরোনো বিষয়গুলোই ঘুরেফিরে আসবে। কারণ আইএমএফ সময় দিতে পারে, কিন্তু সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

আইএমএফের এবারের সফরে পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।

তার পর্যবেক্ষণ, আইএমএফ যেসব সংস্কারের কথা বলছে, সেগুলো শুধু ঋণদাতা সংস্থাটির শর্ত নয়; বাংলাদেশের নিজের অর্থনীতির প্রয়োজন থেকেও এগুলো জরুরি হয়ে উঠেছে।

“শুধু যে আইএমএফ এসব সংস্কারের কথা বলছে এমন তো না। আমরাও বহু বছর ধরে এই কথাগুলোই বলে আসছি। আসলে আমাদের অর্থনীতি যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে এসব সংস্কার হওয়া জরুরি,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “নয়-ছয় সুদের হার নিয়ে আমরা অনেক আগেই সতর্ক করেছিলাম। তখন ব্যবসায়ীরা আমাদের সমালোচনা করেছে। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি এটা কত বড় ক্ষতি করেছে। পরে আইএমএফ বলায় সেটা থেকে সরে আসল সরকার। কিন্তু আমরা যখন বলেছি তখন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।”

কর নয়, করজাল বাড়ানোর চাপ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আইএমএফের বৈঠকও ছিল এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কারণ নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো বরাবরই সংস্থাটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও সেই অনুপাতে কর আদায় বাড়েনি। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ঋণ পরিশোধে সরকারকে প্রতি বছরই বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। বর্তমানে তা ৭ শতাংশেরও নিচে।

গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনও একই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “গত তিন বছরে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়েছে।”

সরকারও এই বাস্তবতা অস্বীকার করছে না। তবে এবার তাদের কৌশল আগের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনবিআর কর্মকর্তারা আইএমএফকে জানিয়েছেন, আপাতত করের হার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। বরং নতুন করদাতা যুক্ত করা, কর ফাঁকি কমানো, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলা এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন করদাতা শনাক্তের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, “গত চার মাসে রাজস্ব আহরণে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।”

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ আর করের বোঝা বাড়ানো এক বিষয় নয়।

নতুন করদাতা যুক্ত করা এবং কর ফাঁকি কমানো এক ধরনের কাঠামোগত সংস্কার। কিন্তু যদি নতুন ভ্যাট আরোপ, কর অব্যাহতি কমানো বা অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, নতুন কর্মসূচিতেও কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর অব্যাহতি কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের মতো পুরোনো বিষয়গুলোই আবার সামনে আসবে।

তিনি বলেন, “কারণ এগুলো ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ানো সম্ভব নয়।”

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমানও মনে করেন, রাজস্ব বাড়ানো এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

তিনি বলেন, “আমাদের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তবে সেটা ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়িয়ে নয়। ট্যাক্স নেট বাড়াতে হবে। এখানে আইএমএফের পরামর্শ আমলে নিয়ে সরকারকে নিজেদের নীতি ঠিক করতে হবে।”

তার মতে, চলতি অর্থবছরেও বড় রাজস্ব ঘাটতি থাকবে।

তিনি বলেন, “স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ধরলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো হতে পারে। আর ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা হবে।

“অথচ এই অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।”

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এনবিআরের রাজস্ব আদায় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সাময়িক হিসাবে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেতন বাড়ানো হলে সরকারের ব্যয় অনেক বাড়বে।

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সতর্ক অবস্থান

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছে। তবে আইএমএফের সঙ্গে চলমান বৈঠকে বিষয়টি এসেছে বেশ সতর্কতার সঙ্গে।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের সামগ্রিক ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ রাজস্ব সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার সময় নতুন পে-স্কেলের বিষয়টিও অনানুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে বেতন বাড়ানো হলে সরকারের নিয়মিত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। কারণ রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতিও বড়।

এই পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বাড়তে পারে।

সংস্থাটির আরেকটি উদ্বেগ মূল্যস্ফীতি। নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও সামগ্রিক ভোগব্যয়ও বাড়তে পারে। উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই কারণেই আইএমএফের পরামর্শ, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে রাজস্ব আয় আরও শক্তিশালী করা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর দিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

যদিও সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সোমবারের বৈঠকে নতুন পে-স্কেল নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।

বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিয়ে কী চায় আইএমএফ

আগের ঋণ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা। সেই পথে কিছু অগ্রগতি হলেও পুরোপুরি বাজারনির্ভর ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি।

আইএমএফের মতে, কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করলে রপ্তানি, আমদানি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার- সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই বিনিময় হার নির্ধারণ হওয়া উচিত।

গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দামের একাধিক স্তর তুলে দিয়ে তুলনামূলক নমনীয় ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ কিছুটা কমেছে, পাশাপাশি রিজার্ভও আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে।

এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে আইএমএফ। তবে তাদের প্রত্যাশা, শুরু হওয়া এই সংস্কার যেন মাঝপথে থেমে না যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু হলে স্বল্পমেয়াদে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকারকে বাজারের বাস্তবতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ- দুই দিকই বিবেচনায় রাখতে হবে।

সংস্কার হবে, তবে বাস্তবতা মেনে

সোমবারের বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে একটি বিষয়ই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- সংস্কারের গতি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আইএমএফ নয়।

তিনি আরও বলেন, “কোনো দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান রাতারাতি করা সম্ভব নয়। কোন সংস্কার আগে হবে, কোনটি পরে হবে, তা দেশের প্রয়োজন ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই নির্ধারণ করা হবে।”

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, একটি রাজনৈতিক সরকারের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। তাই শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কীভাবে পড়বে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিশেষ করে ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম কিংবা অন্যান্য সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যাবে না।

তার দাবি, গত চার মাসে আর্থিক খাতের সংস্কার, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং রাজস্ব আহরণে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আইএমএফ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।

এখন সেই অগ্রগতির ভিত্তিতেই নতুন কর্মসূচির কাঠামো চূড়ান্ত করার আলোচনা এগোবে।

ঋণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আইএমএফে’র মূল্যায়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই সবার আগে আসে আইএমএফের ঋণের অঙ্ক। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ পাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সংস্থাটির মূল্যায়ন।

কারণ আইএমএফ শুধু একটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নয়; আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে এটি অনেকটা আস্থার মানদণ্ড হিসেবেও বিবেচিত হয়।

বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা কোনো দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় আইএমএফের পর্যবেক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

ফলে আইএমএফের সঙ্গে ইতিবাচক একটি কর্মসূচি শুধু তাদের কাছ থেকেই অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করে না; একই সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা, প্রকল্প ঋণ এবং নীতিগত সহযোগিতা পাওয়ার পথ সহজ করে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন কর্মসূচিকে শুধু ঋণ পাওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না।

তিনি বলেন, “আইএমএফের অর্থের চেয়ে তাদের মূল্যায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইএমএফের ইতিবাচক অবস্থান বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, এআইআইবি এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে শক্তিশালী আস্থার বার্তা দেয়।”

তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার জন্য ভবিষ্যতে আইএমএফের ঋণের প্রয়োজন না হলেও এই কর্মসূচি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও মনে করেন, “রিজার্ভ এখন আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকলেও আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে। তাই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ধরে রাখতে আইএমএফের ঋণ ভালো ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।

ঋণের চাপ বাড়ছে, কমছে অর্থছাড়

আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন ‘লো-রিস্ক স্ট্যাবিলাইজেশন ফেইজ’ থেকে ‘মিডিয়াম-রিস্ক অ্যাকসেলারেশন ফেইজ’-এ প্রবেশ করছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও দ্রুত বাড়বে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। অথচ স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ মোট পরিশোধ করেছে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। 

অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরেই আগের ৫৪ বছরের মোট পরিশোধের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করতে হবে।

কর্মকর্তারা আইএমএফকে আরও জানিয়েছেন, নমনীয় (কনসেশনাল) ঋণ কমে যাওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। জাপানসহ দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতারা আগের তুলনায় কম নমনীয় ঋণ দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো সংস্থার বাজারভিত্তিক ফ্লোটিং-রেট ঋণের অংশও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল ফ্লোটিং-রেট ঋণ।

অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের গতি কমেছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪ দশমিক ৫৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫ দশমিক ৪৮৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ কম। বর্তমানে ৪১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে তাই আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট হয় না; তারা দেখতে চায় বাস্তব অগ্রগতি। ২০২৩ সালের কর্মসূচিতেও সেই অগ্রগতি না হওয়ায় শেষ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যায়।

এবারের আলোচনায়ও একটি বিষয় স্পষ্ট। আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় অবস্থানে থাকলেও আইএমএফ তাদের মূল সংস্কার এজেন্ডা থেকে সরে আসেনি। ব্যাংক খাতের সুশাসন, রাজস্ব আহরণ, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং সরকারি ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই তারা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন যেমনটা বলছিলেন, “আগের কর্মসূচিতে যেসব সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, নতুন আলোচনাতেও সেগুলোই অগ্রাধিকার পাবে। কারণ ব্যাংক খাতের সুশাসন, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং জ্বালানি খাতের সংস্কারের ওপরই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।”

অন্যদিকে সরকারও চাইছে, এসব পরিবর্তন যেন ধাপে ধাপে এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাস্তবায়ন করা হয়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকার এই সংস্কারগুলোর কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে।

কারণ এই আলোচনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধু ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করবে না। বরং নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের কাছে বাংলাদেশ কতটা আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে তার ওপর।

অর্থাৎ আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনা শুধু আরেকটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে নয়। এটি আগামী কয়েক বছরের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পথচলা, সংস্কারের গতি এবং আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।