জুলাইয়ের প্রবাসী রাজনীতি এবং জুলাই পরবর্তী অন্তহীন বিপ্লবের ভিউ ব্যবসা
জুলাইয়ের সময় পাওয়া জনপ্রিয়তা আর রাজনৈতিক পুঁজিকে ব্যবহার করে কি কেউ কেউ এখনো ‘বিপ্লব’ বিক্রি করছেন? প্রতিদিন ‘সরকার পতন’, ‘আরেকটি জুলাই’, উত্তেজক বক্তব্য আর লাখ লাখ ভিউ-রাজনীতি কি পরিণত হয়েছে নতুন এক ভিউ ব্যবসায়?
ড. পুন্নি কবীর
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ এএমআপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
জুলাইয়ের সময় পাওয়া গ্রহণযোগ্যতা কাউকে আজীবন বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অভিভাবক বানায় না। কোনো গণআন্দোলনের নায়কের ভাগ্যেও এমন ছাড়পত্র জোটে না। মানুষ তার পরের কাজ দিয়েই আবার তাকে বিচার করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়। যে তিন-চার সপ্তাহের অভ্যুত্থানে হাসিনাশাহীর পতন ঘটেছিল, তার একটা বড় সময়জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে বাংলাদেশকে কার্যত সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ভয়ংকর খেলায় মেতেছিল হাসিনার সরকার। এর মধ্যেও বিদেশি সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন সংস্থা এবং সীমিত কিছু দেশীয় সূত্রের মাধ্যমে আমরা প্রবাসীরা খবর পাচ্ছিলাম রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারপন্থি বাহিনীর হাতে নির্বিচার হত্যার। বাংলাদেশের খবরাখবর এই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটা অনেকটাই করে যাচ্ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
মনে আছে, সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হাতে মদের বোতল নিয়ে ছবি দিয়ে লিখেছিলেন, “টাকা দিয়ে বিদেশে বসে মাল খাব, তবুও টাকা বাংলাদেশে দেব না।”
ওই ভয়ংকর মানসিক অবস্থার মধ্যে ছবিটা একটা টনিকের মতো কাজ করেছিল। হাসির ছলে জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জোয়ারের একটা প্রতীক হয়ে যায় ছবিটা। আমি নিজেও সংহতি জানিয়ে বেশ কিছুদিন ছবিটা ফেসবুকের প্রোফাইল ছবি হিসেবে রেখেছিলাম।
রেমিট্যান্স, যেটাকে আমরা সাধারণত পরিবার, দায়িত্ব, ভালোবাসা আর দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখি, সেটাই হঠাৎ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্র যদি নিজের নাগরিকের ওপর গুলি চালায়, তাহলে প্রবাসী কেন সেই রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ভরবে, এই ছিল রেমিট্যান্স বয়কটের সোজা বার্তা।
কিন্তু রেমিট্যান্স বয়কট জুলাইয়ে প্রবাসীদের একমাত্র ভূমিকা ছিল না। বরং এটা ছিল আরও বড় একটা রাজনৈতিক সক্রিয়তার সবচেয়ে কার্যকরী প্রকাশগুলোর একটা।
আমি নিজেও প্রবাসে থেকে দীর্ঘদিন বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখেছি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক পরিসর খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিশেষ করে হাসিনা সরকারের শেষ পাঁচ-ছয় বছর অনলাইনের এই রাজনৈতিক জগৎ আমার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জায়গা ছিল। জুলাইয়ের সময় সেখান থেকেই দেখেছি, বাংলাদেশের প্রবাসীদের একটা বড় অংশ কী দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এই সক্রিয়তা শুধু ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া বা সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নির্বাসিত সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, জনপ্রিয় অনলাইন মুখ এবং সাধারণ প্রবাসী, সবাই ভিন্ন ভিন্নভাবে একটা আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগের জালের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের ভেতরে তখন আসল লড়াইটা চলছিল রাজপথে। ঢাকা থেকে রংপুর, চট্টগ্রাম থেকে দেশের ছোট শহর, সর্বত্র মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল সেখানেই। মানুষ পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছে, জীবন দিয়েছে, দেশ অচল করে দিয়েছে। প্রবাসীরা সেই লড়াইয়ের বিকল্প কিছু ছিল না, হওয়ার প্রশ্নও আসে না। তারা নিজেদের জায়গা থেকে এমন কিছু কাজ করেছিল, যেগুলো তখন দেশের ভেতর থেকে করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
রাষ্ট্র যখন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে, ইন্টারনেট বন্ধ করছে এবং তথ্যের প্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকে খবর পৌঁছে দেওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ভিডিও, ছবি, ভয়েস মেসেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বিদেশে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছিল। সেখান থেকে আবার সেগুলো বিদেশি সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক জনপরিসরে যাচ্ছিল।
নির্বাসিত সাংবাদিকদের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শেখ হাসিনার আমলে অনেক সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং সরকারের ভেতরের খবর প্রকাশ করা মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। দেশের বাইরে থেকেও মামলা, পরিবারের ওপর চাপ, সম্পত্তি নিয়ে হুমকি এবং নানাভাবে হয়রানি তাদের পিছু ছাড়েনি। কিন্তু জুলাইয়ের সময় তাদের অবস্থান নতুন গুরুত্ব পেয়েছিল। বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যখন স্বাধীনভাবে অনেক কিছু বলতে পারছিল না, তখন দেশের বাইরে থাকা সাংবাদিক ও অনলাইন কণ্ঠগুলো বিকল্প তথ্যপ্রবাহের বড় উৎস হয়ে উঠেছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। প্রবাসীরা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে লিখেছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে তথ্য পাঠিয়েছে, নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত হয়েছে। কেউ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে লিখেছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা স্টেট ক্যাপিটলে জমায়েত করেছে, কেউ বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনের সামনে প্রতিবাদ করেছে।
নিউইয়র্ক থেকে সিডনি, কোপেনহেগেন পর্যন্ত প্রবাসীদের প্রতিবাদের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই জমায়েতগুলোর গুরুত্ব শুধু এই না যে প্রবাসীরা দেশের মানুষের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। একটা দেশকে যখন ইন্টারনেট কেটে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলার চেষ্টা চলছে, তখন বিদেশের রাস্তায় শত শত বাংলাদেশি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ানোর অর্থ ছিল বাংলাদেশের ঘটনাকে অন্য দেশের সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের চোখের সামনে রাখা।
তবে পৃথিবীর সব দেশে থাকা বাংলাদেশিদের এই সুযোগ এক ছিল না।
লন্ডন, নিউইয়র্ক বা ইউরোপের গণতান্ত্রিক শহরগুলোতে একজন বাংলাদেশি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বাসায় ফিরতে পেরেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে একই কাজের মূল্য হয়েছে কারাবাস। জুলাইয়ে আরব আমিরাতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার পর ৫৭ জন বাংলাদেশিকে খুব দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছিল।
এই ঘটনাটা প্রবাসী রাজনীতির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। আপনি দেশের বাইরে আছেন বলেই স্বাধীন, তা না। আপনি কোন দেশে আছেন, সেই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন, আপনার চাকরি-কাগজপত্র কতটা নিরাপদ, এসবের ওপর নির্ভর করে আপনার রাজনৈতিক স্বাধীনতা কতখানি।
একজন বাংলাদেশি লন্ডনে দাঁড়িয়ে যে স্লোগান দিতে পারে, দুবাইতে দাঁড়িয়ে সেই একই স্লোগানের মূল্য জেল হতে পারে। ফলে “প্রবাসী” বললেই একটা অভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী বোঝার সুযোগ নেই। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন নির্বাসিত সাংবাদিক এবং উপসাগরীয় দেশের একজন শ্রমিকের রাজনৈতিক সুযোগ ও ঝুঁকি এক না।
জুলাইয়ে প্রবাসীদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ধারালো রাজনৈতিক টেক্সটসমৃদ্ধ দারুণ সব কার্টুন, ডিজিটাল আর্ট, আর মিম। প্রবাসী শিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তীর “রাষ্ট্রযন্ত্রণা” সিরিজের লাল-হলুদ পোস্টারগুলো আন্দোলনের সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা সেগুলো ডাউনলোড করেছে, ছাপিয়েছে এবং বিভিন্ন শহরের প্রতিবাদে নিয়ে গেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া শিল্পকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন শহরের রাজপথে পোস্টার হয়ে বারবার দেখা দিয়েছে।
জুলাইয়ের কয়েক সপ্তাহে প্রবাসীদের মধ্যে একটা বিরল সংহতি তৈরি হয়েছিল। ভয়াবহ সংকটের মুহূর্তে এমন সংহতি তৈরি হয়। সামনে একটা খুব স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, হাসিনাশাহীর পতন।
সেই একটা লক্ষ্যে এমন অনেক মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল, যাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস এক ছিল না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়েও তাদের ধারণা এক ছিল না।
দুই বছর পরে এসে এই জায়গাটাই অনেক বেশি পরিষ্কার।
জুলাইয়ে শেখ হাসিনার পতনের প্রশ্নে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার পতন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একই রাজনৈতিক প্রকল্প না। অনেকের জন্য জুলাই ছিল গণতন্ত্রে ফেরার আন্দোলন। আবার অন্যদের জন্য একটা সরকারের পতন ছিল গণতন্ত্রের কাঠামোকেই উপড়ে ফেলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় রাষ্ট্র বানানোর খায়েশ বাস্তবায়নের সুযোগ।
জুলাইয়ের বিস্তৃত জোটে এমন শক্তিও ছিল যারা হাসিনার কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা করেছে, কিন্তু তার মানে এই না যে, তারা উদার গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ কিংবা সবার সমান অধিকারে বিশ্বাস করে। ইসলামপন্থি এবং অন্য অগণতান্ত্রিক শক্তির একটা অংশের কাছে শেখ হাসিনার পতন ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ। অভিন্ন শত্রুর কারণে জুলাইয়ে এই ফারাকটা খুব চোখে পড়েনি। কিন্তু প্রবাসী রাজনীতিতেও এই বিভাজনটা এখন পরিষ্কার।
প্রবাসীদের একটা বড় অংশ সংকটের সময় সক্রিয় হয়েছিল। দেশের ভেতরে মতপ্রকাশের জায়গা বন্ধ ছিল, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত ছিল, বিরোধী রাজনীতি দমিত ছিল। এখন বাংলাদেশ সেই জুলাইয়ের অবস্থায় নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল এটাকে ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলেছে।
এর মানে এই না যে বাংলাদেশ হঠাৎ আদর্শ গণতন্ত্র হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের সমস্যা আছে, থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, অধিকারের লড়াইও থাকবে।
কিন্তু এই অবস্থায় একজন প্রবাসীর স্বাভাবিক রাজনৈতিক ভূমিকা হতে পারে মত দেওয়া, সরকারের সমালোচনা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, নির্বাচনে ভোট দেওয়া। প্রতিদিন বিদেশে বসে আরেকটা গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া না।
এই জায়গাতেই জুলাই-পরবর্তী প্রবাসী অনলাইন রাজনীতির সুযোগসন্ধানী অংশটাকে দেখা যায়।
জুলাইয়ের সময় কিছু অনলাইন ব্যক্তিত্ব বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। মানুষ তাদের কথা শুনেছে, ভিডিও দেখেছে, লেখা ভাগ করে নিয়েছে। তার যথেষ্ট কারণও ছিল। ভয়াবহ সংকটের মধ্যে তারা এমন তথ্য ও ভাষ্য সামনে আনছিল, যা দেশের নিয়ন্ত্রিত সংবাদপরিসরে সহজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
সেই সময়ের গ্রহণযোগ্যতা পরে তাদের জন্য বিরাট রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে।
এখন সমস্যা হলো, তাদের একটা অংশ এই পুঁজিটা খাটিয়ে যাচ্ছে জুলাইয়ের সংকটকালীন ভাষায়।
তাদের কাছে জুলাই এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচন হলেও শেষ হয়নি। মানুষ কথা বলতে পারলেও শেষ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে কাজ করতে পারলেও শেষ হয়নি। সরকার বদলালেও শেষ হয়নি। প্রায় প্রতিদিন আবার জুলাই নামানোর হুমকি, আবার সরকার ফেলে দেওয়ার ইঙ্গিত, আবার বিপ্লব।
কিন্তু স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিপ্লবের ডাক ধোপে টেকার কথা না।
কারণ, গণতন্ত্রের রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে বিরক্তিকর। সেখানে ভোট করতে হয়, সংগঠন করতে হয়, মানুষের কাছে যেতে হয়, হেরে গেলে হার মেনে নিতে হয়, সংসদে কথা বলতে হয়, আপস করতে হয়, নিজের অপছন্দের মানুষকেও রাজনীতি করতে দিতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই সংখ্যালঘুর অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
স্থায়ী বিপ্লবের ব্যবসা তুলনায় অনেক সহজ। একটা শত্রু বানাও, মানুষকে সারাক্ষণ উত্তেজিত রাখো, তারপর বিদেশে নিরাপদে বসে ঘোষণা দিতে থাকো যে, আরেকটা জুলাই আসছে।
এদের অনেককেই আমি “ডিজিটাল জুলাই ব্যবসায়ী” বলি।
জুলাইয়ের স্মৃতি, আবেগ, রক্ত, নৈতিক শক্তি এবং সেই সময় অর্জিত নিজের জনপ্রিয়তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক সম্পদ বানানোর অর্থে। আর এর সঙ্গে এখন সরাসরি ভিউয়ের ব্যবসাও জড়িয়ে গেছে। দিনরাত বিপ্লব, পতন, রক্ত গরম করা কথাবার্তা, “আরেকটা জুলাই আসছে” ধরনের শিরোনাম আর উত্তেজক ভিডিও দিয়ে তারা লাখ লাখ, কখনো মিলিয়ন ভিউ তোলে। যত বেশি অস্থিরতা, তত বেশি দর্শক। যত বেশি ঘৃণা, জুজুর ভয়, আর উত্তেজনা, তত বেশি ক্লিক, শেয়ার, সাবস্ক্রাইবার।
তাই তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার জন্য জুলাইকে শেষ হতে দেওয়া যাবে না। জুলাই যদি ইতিহাস হয়ে যায়, রাজনীতি যদি নিয়মিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যায়, তাহলে এই বিপ্লবের বাজারও ছোট হয়ে আসে। ফলে একটা জুলাই শেষ হলে আরেকটা জুলাইয়ের সম্ভাবনা বেচতে হয়। নতুন শত্রু বানাতে হয়, নতুন পতনের গল্প বলতে হয়, নতুন করে মানুষকে বোঝাতে হয় যে, দেশ আবার বিস্ফোরণের মুখে।
এই জায়গায় রাজনীতি আর মতামতের মধ্যে থাকে না। এটা এক ধরনের অর্থনীতি হয়ে যায়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিজেই কনটেন্ট, আর মানুষের ক্ষোভ তার কাঁচামাল।
“জুলাই শেষ হয়নি” তাই আর নিরীহ স্মৃতিচারণ না। কিছু অগণতান্ত্রিক শক্তির কাছে এটা পরিষ্কার রাজনৈতিক কর্মসূচি।
এখানেই প্রশ্ন করা দরকার। আপনি হাসিনার পতন চেয়েছিলেন, ঠিক আছে। কিন্তু এরপর কী চান? একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে আপনার বিপক্ষের লোকটারও সমান অধিকার থাকবে? নাকি নিজের পছন্দের ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বসানোর সুযোগ?
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে শুধু সারাক্ষণ “বিপ্লব” বলে আর ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নাই।
জুলাইয়ের সময় পাওয়া গ্রহণযোগ্যতা কাউকে আজীবন বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অভিভাবক বানায় না। কোনো গণআন্দোলনের নায়কের ভাগ্যেও এমন ছাড়পত্র জোটে না। মানুষ তার পরের কাজ দিয়েই আবার তাকে বিচার করে।
বিদেশে বসে লাখ লাখ অনুসারী থাকা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিকল্প না। ইউটিউবের দর্শকসংখ্যা ভোটের বিকল্প না। ফেসবুক লাইভ থেকে প্রতিদিন বিপ্লবের ডাক দেওয়া রাজপথের রাজনীতির বিকল্প না।
চব্বিশের জুলাই আমাদের দেখিয়েছে, দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক পরিসর পুরোপুরি বন্ধ করলে রাজনীতি দেশের সীমানা পেরিয়ে যাবে। আবার যদি কোনো সরকার মানুষের গলা চেপে ধরে, সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে, বিরোধী রাজনীতি দমন করে, ইন্টারনেট কেটে দেয়, নাগরিকদের কথা বলার সব পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে আবার প্রবাসীরা সক্রিয় হবে। আবার তথ্য বাইরে যাবে, আবার বিদেশের রাস্তায় প্রতিবাদ হবে, আবার আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে।
হাসিনাশাহীর পতন ভবিষ্যতের সব সরকারের জন্য এই শিক্ষা রেখে গেছে।
কিন্তু আমাদের কামনা হওয়া উচিত, সেই দিন আর কখনো না ফিরুক।
কারণ চব্বিশের জুলাই আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটা। শুধু একটা ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদী সরকার পড়ে যাওয়ার কারণে না। এর জন্য যে মূল্য মানুষ দিয়েছে, সেই কারণেও। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১লা জুলাই থেকে ১৫ই অগাস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, আহত হয়েছে আরও কয়েক হাজার। নিহতদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। নিহতদের বিশাল অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা গেছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত প্রাণের বিনিময়ে, এত তীব্র একটা গণআন্দোলনের নজির আমাদের আর নেই।
এই ইতিহাসকে তাই প্রতিদিনের রাজনৈতিক স্লোগান বানিয়ে সস্তা করা যায় না। জুলাই কোনো অনলাইন ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না, কোনো ইউটিউব চ্যানেলের ব্র্যান্ড না, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্থায়ী লাইসেন্সও না।
জুলাই বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস।
সেই ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো পরিণতি অন্তহীন বিপ্লব না। সবচেয়ে ভালো পরিণতি হলো, বাংলাদেশের মানুষ যেন আর কখনো নিজের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য জীবন হাতে নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য না হয়।
জুলাইয়ের প্রবাসী রাজনীতি এবং জুলাই পরবর্তী অন্তহীন বিপ্লবের ভিউ ব্যবসা
জুলাইয়ের সময় পাওয়া জনপ্রিয়তা আর রাজনৈতিক পুঁজিকে ব্যবহার করে কি কেউ কেউ এখনো ‘বিপ্লব’ বিক্রি করছেন? প্রতিদিন ‘সরকার পতন’, ‘আরেকটি জুলাই’, উত্তেজক বক্তব্য আর লাখ লাখ ভিউ-রাজনীতি কি পরিণত হয়েছে নতুন এক ভিউ ব্যবসায়?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়। যে তিন-চার সপ্তাহের অভ্যুত্থানে হাসিনাশাহীর পতন ঘটেছিল, তার একটা বড় সময়জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে বাংলাদেশকে কার্যত সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ভয়ংকর খেলায় মেতেছিল হাসিনার সরকার। এর মধ্যেও বিদেশি সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন সংস্থা এবং সীমিত কিছু দেশীয় সূত্রের মাধ্যমে আমরা প্রবাসীরা খবর পাচ্ছিলাম রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারপন্থি বাহিনীর হাতে নির্বিচার হত্যার। বাংলাদেশের খবরাখবর এই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটা অনেকটাই করে যাচ্ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
মনে আছে, সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ছবি ভাইরাল হয়েছিল। একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হাতে মদের বোতল নিয়ে ছবি দিয়ে লিখেছিলেন, “টাকা দিয়ে বিদেশে বসে মাল খাব, তবুও টাকা বাংলাদেশে দেব না।”
ওই ভয়ংকর মানসিক অবস্থার মধ্যে ছবিটা একটা টনিকের মতো কাজ করেছিল। হাসির ছলে জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক জোয়ারের একটা প্রতীক হয়ে যায় ছবিটা। আমি নিজেও সংহতি জানিয়ে বেশ কিছুদিন ছবিটা ফেসবুকের প্রোফাইল ছবি হিসেবে রেখেছিলাম।
রেমিট্যান্স, যেটাকে আমরা সাধারণত পরিবার, দায়িত্ব, ভালোবাসা আর দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখি, সেটাই হঠাৎ রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্র যদি নিজের নাগরিকের ওপর গুলি চালায়, তাহলে প্রবাসী কেন সেই রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ভরবে, এই ছিল রেমিট্যান্স বয়কটের সোজা বার্তা।
কিন্তু রেমিট্যান্স বয়কট জুলাইয়ে প্রবাসীদের একমাত্র ভূমিকা ছিল না। বরং এটা ছিল আরও বড় একটা রাজনৈতিক সক্রিয়তার সবচেয়ে কার্যকরী প্রকাশগুলোর একটা।
আমি নিজেও প্রবাসে থেকে দীর্ঘদিন বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখেছি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক পরিসর খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিশেষ করে হাসিনা সরকারের শেষ পাঁচ-ছয় বছর অনলাইনের এই রাজনৈতিক জগৎ আমার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জায়গা ছিল। জুলাইয়ের সময় সেখান থেকেই দেখেছি, বাংলাদেশের প্রবাসীদের একটা বড় অংশ কী দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এই সক্রিয়তা শুধু ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া বা সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নির্বাসিত সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, জনপ্রিয় অনলাইন মুখ এবং সাধারণ প্রবাসী, সবাই ভিন্ন ভিন্নভাবে একটা আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগের জালের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের ভেতরে তখন আসল লড়াইটা চলছিল রাজপথে। ঢাকা থেকে রংপুর, চট্টগ্রাম থেকে দেশের ছোট শহর, সর্বত্র মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল সেখানেই। মানুষ পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছে, জীবন দিয়েছে, দেশ অচল করে দিয়েছে। প্রবাসীরা সেই লড়াইয়ের বিকল্প কিছু ছিল না, হওয়ার প্রশ্নও আসে না। তারা নিজেদের জায়গা থেকে এমন কিছু কাজ করেছিল, যেগুলো তখন দেশের ভেতর থেকে করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
রাষ্ট্র যখন সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে, ইন্টারনেট বন্ধ করছে এবং তথ্যের প্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকে খবর পৌঁছে দেওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ভিডিও, ছবি, ভয়েস মেসেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বিদেশে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছিল। সেখান থেকে আবার সেগুলো বিদেশি সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক জনপরিসরে যাচ্ছিল।
নির্বাসিত সাংবাদিকদের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শেখ হাসিনার আমলে অনেক সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং সরকারের ভেতরের খবর প্রকাশ করা মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। দেশের বাইরে থেকেও মামলা, পরিবারের ওপর চাপ, সম্পত্তি নিয়ে হুমকি এবং নানাভাবে হয়রানি তাদের পিছু ছাড়েনি। কিন্তু জুলাইয়ের সময় তাদের অবস্থান নতুন গুরুত্ব পেয়েছিল। বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম যখন স্বাধীনভাবে অনেক কিছু বলতে পারছিল না, তখন দেশের বাইরে থাকা সাংবাদিক ও অনলাইন কণ্ঠগুলো বিকল্প তথ্যপ্রবাহের বড় উৎস হয়ে উঠেছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। প্রবাসীরা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে লিখেছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে তথ্য পাঠিয়েছে, নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত হয়েছে। কেউ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে লিখেছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা স্টেট ক্যাপিটলে জমায়েত করেছে, কেউ বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনের সামনে প্রতিবাদ করেছে।
নিউইয়র্ক থেকে সিডনি, কোপেনহেগেন পর্যন্ত প্রবাসীদের প্রতিবাদের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই জমায়েতগুলোর গুরুত্ব শুধু এই না যে প্রবাসীরা দেশের মানুষের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। একটা দেশকে যখন ইন্টারনেট কেটে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলার চেষ্টা চলছে, তখন বিদেশের রাস্তায় শত শত বাংলাদেশি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ানোর অর্থ ছিল বাংলাদেশের ঘটনাকে অন্য দেশের সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের চোখের সামনে রাখা।
তবে পৃথিবীর সব দেশে থাকা বাংলাদেশিদের এই সুযোগ এক ছিল না।
লন্ডন, নিউইয়র্ক বা ইউরোপের গণতান্ত্রিক শহরগুলোতে একজন বাংলাদেশি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বাসায় ফিরতে পেরেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে একই কাজের মূল্য হয়েছে কারাবাস। জুলাইয়ে আরব আমিরাতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার পর ৫৭ জন বাংলাদেশিকে খুব দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছিল।
এই ঘটনাটা প্রবাসী রাজনীতির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। আপনি দেশের বাইরে আছেন বলেই স্বাধীন, তা না। আপনি কোন দেশে আছেন, সেই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন, আপনার চাকরি-কাগজপত্র কতটা নিরাপদ, এসবের ওপর নির্ভর করে আপনার রাজনৈতিক স্বাধীনতা কতখানি।
একজন বাংলাদেশি লন্ডনে দাঁড়িয়ে যে স্লোগান দিতে পারে, দুবাইতে দাঁড়িয়ে সেই একই স্লোগানের মূল্য জেল হতে পারে। ফলে “প্রবাসী” বললেই একটা অভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী বোঝার সুযোগ নেই। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন নির্বাসিত সাংবাদিক এবং উপসাগরীয় দেশের একজন শ্রমিকের রাজনৈতিক সুযোগ ও ঝুঁকি এক না।
জুলাইয়ে প্রবাসীদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ধারালো রাজনৈতিক টেক্সটসমৃদ্ধ দারুণ সব কার্টুন, ডিজিটাল আর্ট, আর মিম। প্রবাসী শিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তীর “রাষ্ট্রযন্ত্রণা” সিরিজের লাল-হলুদ পোস্টারগুলো আন্দোলনের সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা সেগুলো ডাউনলোড করেছে, ছাপিয়েছে এবং বিভিন্ন শহরের প্রতিবাদে নিয়ে গেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া শিল্পকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন শহরের রাজপথে পোস্টার হয়ে বারবার দেখা দিয়েছে।
জুলাইয়ের কয়েক সপ্তাহে প্রবাসীদের মধ্যে একটা বিরল সংহতি তৈরি হয়েছিল। ভয়াবহ সংকটের মুহূর্তে এমন সংহতি তৈরি হয়। সামনে একটা খুব স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, হাসিনাশাহীর পতন।
সেই একটা লক্ষ্যে এমন অনেক মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল, যাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস এক ছিল না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়েও তাদের ধারণা এক ছিল না।
দুই বছর পরে এসে এই জায়গাটাই অনেক বেশি পরিষ্কার।
জুলাইয়ে শেখ হাসিনার পতনের প্রশ্নে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার পতন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একই রাজনৈতিক প্রকল্প না। অনেকের জন্য জুলাই ছিল গণতন্ত্রে ফেরার আন্দোলন। আবার অন্যদের জন্য একটা সরকারের পতন ছিল গণতন্ত্রের কাঠামোকেই উপড়ে ফেলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় রাষ্ট্র বানানোর খায়েশ বাস্তবায়নের সুযোগ।
জুলাইয়ের বিস্তৃত জোটে এমন শক্তিও ছিল যারা হাসিনার কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা করেছে, কিন্তু তার মানে এই না যে, তারা উদার গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ কিংবা সবার সমান অধিকারে বিশ্বাস করে। ইসলামপন্থি এবং অন্য অগণতান্ত্রিক শক্তির একটা অংশের কাছে শেখ হাসিনার পতন ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ। অভিন্ন শত্রুর কারণে জুলাইয়ে এই ফারাকটা খুব চোখে পড়েনি। কিন্তু প্রবাসী রাজনীতিতেও এই বিভাজনটা এখন পরিষ্কার।
প্রবাসীদের একটা বড় অংশ সংকটের সময় সক্রিয় হয়েছিল। দেশের ভেতরে মতপ্রকাশের জায়গা বন্ধ ছিল, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত ছিল, বিরোধী রাজনীতি দমিত ছিল। এখন বাংলাদেশ সেই জুলাইয়ের অবস্থায় নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল এটাকে ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলেছে।
এর মানে এই না যে বাংলাদেশ হঠাৎ আদর্শ গণতন্ত্র হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের সমস্যা আছে, থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, অধিকারের লড়াইও থাকবে।
কিন্তু এই অবস্থায় একজন প্রবাসীর স্বাভাবিক রাজনৈতিক ভূমিকা হতে পারে মত দেওয়া, সরকারের সমালোচনা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, নির্বাচনে ভোট দেওয়া। প্রতিদিন বিদেশে বসে আরেকটা গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া না।
এই জায়গাতেই জুলাই-পরবর্তী প্রবাসী অনলাইন রাজনীতির সুযোগসন্ধানী অংশটাকে দেখা যায়।
জুলাইয়ের সময় কিছু অনলাইন ব্যক্তিত্ব বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। মানুষ তাদের কথা শুনেছে, ভিডিও দেখেছে, লেখা ভাগ করে নিয়েছে। তার যথেষ্ট কারণও ছিল। ভয়াবহ সংকটের মধ্যে তারা এমন তথ্য ও ভাষ্য সামনে আনছিল, যা দেশের নিয়ন্ত্রিত সংবাদপরিসরে সহজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
সেই সময়ের গ্রহণযোগ্যতা পরে তাদের জন্য বিরাট রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে।
এখন সমস্যা হলো, তাদের একটা অংশ এই পুঁজিটা খাটিয়ে যাচ্ছে জুলাইয়ের সংকটকালীন ভাষায়।
তাদের কাছে জুলাই এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচন হলেও শেষ হয়নি। মানুষ কথা বলতে পারলেও শেষ হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে কাজ করতে পারলেও শেষ হয়নি। সরকার বদলালেও শেষ হয়নি। প্রায় প্রতিদিন আবার জুলাই নামানোর হুমকি, আবার সরকার ফেলে দেওয়ার ইঙ্গিত, আবার বিপ্লব।
কিন্তু স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিপ্লবের ডাক ধোপে টেকার কথা না।
কারণ, গণতন্ত্রের রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে বিরক্তিকর। সেখানে ভোট করতে হয়, সংগঠন করতে হয়, মানুষের কাছে যেতে হয়, হেরে গেলে হার মেনে নিতে হয়, সংসদে কথা বলতে হয়, আপস করতে হয়, নিজের অপছন্দের মানুষকেও রাজনীতি করতে দিতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই সংখ্যালঘুর অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
স্থায়ী বিপ্লবের ব্যবসা তুলনায় অনেক সহজ। একটা শত্রু বানাও, মানুষকে সারাক্ষণ উত্তেজিত রাখো, তারপর বিদেশে নিরাপদে বসে ঘোষণা দিতে থাকো যে, আরেকটা জুলাই আসছে।
এদের অনেককেই আমি “ডিজিটাল জুলাই ব্যবসায়ী” বলি।
জুলাইয়ের স্মৃতি, আবেগ, রক্ত, নৈতিক শক্তি এবং সেই সময় অর্জিত নিজের জনপ্রিয়তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক সম্পদ বানানোর অর্থে। আর এর সঙ্গে এখন সরাসরি ভিউয়ের ব্যবসাও জড়িয়ে গেছে। দিনরাত বিপ্লব, পতন, রক্ত গরম করা কথাবার্তা, “আরেকটা জুলাই আসছে” ধরনের শিরোনাম আর উত্তেজক ভিডিও দিয়ে তারা লাখ লাখ, কখনো মিলিয়ন ভিউ তোলে। যত বেশি অস্থিরতা, তত বেশি দর্শক। যত বেশি ঘৃণা, জুজুর ভয়, আর উত্তেজনা, তত বেশি ক্লিক, শেয়ার, সাবস্ক্রাইবার।
তাই তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার জন্য জুলাইকে শেষ হতে দেওয়া যাবে না। জুলাই যদি ইতিহাস হয়ে যায়, রাজনীতি যদি নিয়মিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যায়, তাহলে এই বিপ্লবের বাজারও ছোট হয়ে আসে। ফলে একটা জুলাই শেষ হলে আরেকটা জুলাইয়ের সম্ভাবনা বেচতে হয়। নতুন শত্রু বানাতে হয়, নতুন পতনের গল্প বলতে হয়, নতুন করে মানুষকে বোঝাতে হয় যে, দেশ আবার বিস্ফোরণের মুখে।
এই জায়গায় রাজনীতি আর মতামতের মধ্যে থাকে না। এটা এক ধরনের অর্থনীতি হয়ে যায়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিজেই কনটেন্ট, আর মানুষের ক্ষোভ তার কাঁচামাল।
“জুলাই শেষ হয়নি” তাই আর নিরীহ স্মৃতিচারণ না। কিছু অগণতান্ত্রিক শক্তির কাছে এটা পরিষ্কার রাজনৈতিক কর্মসূচি।
এখানেই প্রশ্ন করা দরকার। আপনি হাসিনার পতন চেয়েছিলেন, ঠিক আছে। কিন্তু এরপর কী চান? একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে আপনার বিপক্ষের লোকটারও সমান অধিকার থাকবে? নাকি নিজের পছন্দের ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বসানোর সুযোগ?
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে শুধু সারাক্ষণ “বিপ্লব” বলে আর ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নাই।
জুলাইয়ের সময় পাওয়া গ্রহণযোগ্যতা কাউকে আজীবন বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অভিভাবক বানায় না। কোনো গণআন্দোলনের নায়কের ভাগ্যেও এমন ছাড়পত্র জোটে না। মানুষ তার পরের কাজ দিয়েই আবার তাকে বিচার করে।
বিদেশে বসে লাখ লাখ অনুসারী থাকা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিকল্প না। ইউটিউবের দর্শকসংখ্যা ভোটের বিকল্প না। ফেসবুক লাইভ থেকে প্রতিদিন বিপ্লবের ডাক দেওয়া রাজপথের রাজনীতির বিকল্প না।
চব্বিশের জুলাই আমাদের দেখিয়েছে, দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক পরিসর পুরোপুরি বন্ধ করলে রাজনীতি দেশের সীমানা পেরিয়ে যাবে। আবার যদি কোনো সরকার মানুষের গলা চেপে ধরে, সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে, বিরোধী রাজনীতি দমন করে, ইন্টারনেট কেটে দেয়, নাগরিকদের কথা বলার সব পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে আবার প্রবাসীরা সক্রিয় হবে। আবার তথ্য বাইরে যাবে, আবার বিদেশের রাস্তায় প্রতিবাদ হবে, আবার আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে।
হাসিনাশাহীর পতন ভবিষ্যতের সব সরকারের জন্য এই শিক্ষা রেখে গেছে।
কিন্তু আমাদের কামনা হওয়া উচিত, সেই দিন আর কখনো না ফিরুক।
কারণ চব্বিশের জুলাই আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটা। শুধু একটা ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদী সরকার পড়ে যাওয়ার কারণে না। এর জন্য যে মূল্য মানুষ দিয়েছে, সেই কারণেও। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১লা জুলাই থেকে ১৫ই অগাস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, আহত হয়েছে আরও কয়েক হাজার। নিহতদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। নিহতদের বিশাল অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা গেছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত প্রাণের বিনিময়ে, এত তীব্র একটা গণআন্দোলনের নজির আমাদের আর নেই।
এই ইতিহাসকে তাই প্রতিদিনের রাজনৈতিক স্লোগান বানিয়ে সস্তা করা যায় না। জুলাই কোনো অনলাইন ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না, কোনো ইউটিউব চ্যানেলের ব্র্যান্ড না, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্থায়ী লাইসেন্সও না।
জুলাই বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস।
সেই ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো পরিণতি অন্তহীন বিপ্লব না। সবচেয়ে ভালো পরিণতি হলো, বাংলাদেশের মানুষ যেন আর কখনো নিজের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য জীবন হাতে নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য না হয়।
(লেখক একজন নৃবিজ্ঞানী)
বিষয়: