দেশের এক প্রান্তে নৃশংশভাবে শিশু হত্যা, অন্য প্রান্তে সামান্য খাবার চুরির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে খুন; কোথাও পারিবারিক কলহে গৃহবধূর মৃত্যু, কোথাও বাবার দেওয়া বিষে প্রাণ যাচ্ছে তিন শিশুর। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
ঘটনাগুলো যেমন আলাদা, তেমনি আলাদা স্থান-কাল-পাত্রও। তবে ভিন্নতা খাকলেও প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে একাধিক প্রশ্নের সামনে। কোন পথে যাচ্ছি আমরা? অথবা কোন পথে যাচ্ছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র?
এর মধ্যেই রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে চাপে পড়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গত দুদিনে ঘটেছে ককটেল বিস্ফোরণ, যাত্রীবাহী বাসে আগুন ও নাশকতার ঘটনা।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনের সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আশপাশে বিস্ফোরণের ঘটনায় জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতেই বসানো হয়েছে তিন শতাধিক বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি। কিন্তু এত কড়াকড়ির মধ্যেও বিস্ফোরণ ও নাশকতা ঠেকানো যায়নি। শনিবার রাতে জোড়া ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুরের প্ল্যাটফর্মে।
রবিবারও দিনে-দুপুরে বোমাবাজি ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিটা আসলে কোথায়?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর পেছনের কারণগুলো এক নয়। কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও মাদক ও জুয়ার নেশা, কোথাও ক্রোধ, লোভ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা সম্পর্কের চরম অবনতি।
কিন্তু বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা একসঙ্গে জোড়া দিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক আস্থা যেমন কমছে, তেমনি হারাচ্ছে সহনশীলতাও।
আর ছোট ছোট বিরোধও কখনো কখনো পরিণত হচ্ছে ভয়াবহ অপরাধে। যেন সমাজের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা, ক্রোধ আকারে বিস্ফোরিত হচ্ছে একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জন নিখোঁজ শিশুর। এর সঙ্গে আরো যুক্ত হচ্ছে হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, মাদক, জুয়া এবং নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা।
এদিকে পুলিশের হিসাবেই ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) সারাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়। এর মধ্যে এখনো নিখোঁজের সংখ্যা ২ হাজার ৩৮ জন।
প্রশ্ন উঠছে, এসব কি কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি সমাজের গভীরে তৈরি হওয়া বড় কোনো সংকটের বহিঃপ্রকাশ?
অপরাধ কেন বাড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন।
তার মতে, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মোটিভেশনাল কার্যক্রম বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিচ্ছিন্ন অপরাধ থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা – সব মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্রটি আসলে কী বলছে? মানুষ কি শুধু অপরাধের ভয়েই আতঙ্কিত, নাকি তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সামাজিক আস্থার সংকটও?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে? তারা কি ঘটনার পর ব্যবস্থা নিচ্ছে, নাকি অপরাধ প্রতিরোধে আসলেই তৎপর রয়েছে?
অপ্রতিমের মৃত্যু যে বার্তা দিল আমাদের

শুধু নিজের নয়, বন্ধুদের সঙ্গেও ছবি তুলতে ভালোবাসতো ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সময় পেলেই ছুটে যেত লালমাই পাহাড়ে। কুমিল্লার কোটবাড়ি থেকে হাঁটাপথে খুব বেশি দূরে নয় সেই পাহাড়। ছবি তোলার জন্য মায়ের আইফোনটিই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়।
কিন্তু যে আইফোনে অপ্রতিম স্মৃতি ধরে রাখতে চেয়েছিল, সেই ফোনই শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো বলে পুলিশের বক্তব্য শুনে অন্তত তেমনটাই মনে হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মাথায় ছিল আঘাতের চিহ্ন।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সি তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের দাবি, দামি আইফোনের জন্যই প্রাণ দিতে হয়েছে সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে।
কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুকে শুধু একটি আইফোনের জন্য সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে কি পুরো ছবিটা দেখা হবে?
ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে সামনে আসে আরও ভয়ংকর একটি বাস্তবতা। অপ্রতিমকে যারা হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তারা তার অপরিচিত কেউ নয়। তাদের সঙ্গে ছিলো পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং ঘনিষ্ঠতা। যাতায়াত ছিলো তাদের বাসায়ও।
অর্থাৎ শিশুটির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিলো কোনো অচেনা অপরাধীর কাছ থেকে নয়, পরিচিত মানুষের বৃত্তের ভেতর থেকেই। এমনটাই হচ্ছে বাংলাদেশের আরো বহু শিশুর সঙ্গে।
এখানেই অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সামনে নতুন করে পুরোনো প্রশ্নটি হাজির করে, আমরা কি আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার সংজ্ঞাটাই ভুলভাবে নির্ধারণ করছি?
দামি মোটরসাইকেল, স্মার্টফোন, পোশাক, খাবার কিংবা জীবনযাপনের নানা উপকরণ; এসবের প্রতি আকর্ষণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো প্রদর্শন করা, কে কত দামি জিনিস ব্যবহার করছে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা এবং সেই জীবনযাপনকে নিজের সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা তৈরি করেছে নতুন এক সংস্কৃতি, যাকে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় অনেক সময় ‘ফ্লেক্স কালচার’ বলা হয়।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই সংস্কৃতির সম্পর্ক কতটা, সেটি তদন্তের বিষয়।
তবে পুলিশের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে এই বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দামি ডিভাইসের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ, ভোগের প্রতিযোগিতা এবং অপরাধপ্রবণ কিশোর-তরুণ সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে কোথাও না কোথাও যুক্ত হচ্ছে কি না, সেটি গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন।
আর সেই জায়গাতেই এসে পড়ে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির প্রশ্ন।
অপ্রতিমের বয়স মাত্র ১৩। সে নিজেই হয়তো বুঝতে পারেনি, যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, যাদের সঙ্গে ঘুরছে, তাদের জীবনযাপন ও আচরণ তার জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অপ্রতিমের মা একজন শিক্ষক। সন্তানের হাতে নিজের মোবাইল ডিভাইস তুলে দিয়েছেন, পরিচিতজনদের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতাও দিয়েছেন। একজন অভিভাবকের কাছে এগুলো ছিল স্বাভাবিক বিশ্বাসের জায়গা।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগই যদি অপরাধীরা নেয়, তাহলে প্রশ্নটা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, এ ঘটনায় জড়িতরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো; নিহত শিশুটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, ওঠাবসা ও বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স অপ্রতিমের চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি।
অর্থাৎ অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সতর্ক করছে যে, শিশুদের ঝুঁকি এখন শুধু অপরিচিত মানুষ, রাস্তা কিংবা অন্ধকার জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। ঝুঁকি ঢুকে পড়তে পারে বন্ধুত্বের বৃত্তে, পরিচিতজনের মাধ্যমে, এমনকি প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগের জগতের মধ্য দিয়েও।
তবে শিশুদের জন্য বিপদ শুধু কিশোর গ্যাং নয়। তারা আক্রান্ত হচ্ছে পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় এবং নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র—আসকের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮ জন, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ শিশুকে—যাদের মধ্যে দুইজন ছেলে শিশু। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে চারজনকে। গুলিতে নিহত হয়েছে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে দুজন, উত্ত্যক্তকারীর হাতে নিহত হয়েছে দুজন এবং অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে।
এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাই আছে আরও ৯৯টি।
এই প্রতিটি সংখ্যার পেছনে শিশু, পরিবার ও তাদের ভবিষ্যৎ। অপ্রতিমও সেই সংখ্যার আরেকটি নাম।
তবে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সামনে অন্তত একটি সুযোগ তৈরি করেছে যে, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আসলে আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আনার।
কারণ, একটি শিশুকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে শুধু ঘরের মধ্যে রাখাটাই যথেষ্ট নয়। সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী দেখছে, কী ধরনের সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং তার চারপাশে থাকা বড়রা তাকে কী ধরনের মূল্যবোধ কিংবা অপসংস্কৃতি সংস্পর্শে নিয়ে যাচ্ছে- এগুলোও বিবেচনার বিষয়।
তাই অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের জন্য চরম একটি সতর্কবার্তা। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন- শিশুদের আমরা যতটা স্বাধীনতা দিচ্ছি, সেই স্বাধীনতার সঙ্গে নিরাপত্তা ও সচেতনতার কাঠামো তৈরি করতে পারছি কি? যদি না পারি, তাহলে পরবর্তী অপ্রতিম কে হবে– এটাও কিন্তু শঙ্কা তৈরি করবে।
তুচ্ছ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র খুন হলেন কেন?

যেদিন অপ্রতিম নিহত হলেন, সেদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলো আরেকটি জঘন্য খুনের ঘটনা।
মাত্র এক প্লেট ভাত। সেই ভাত খাওয়ার অভিযোগ। এতটুকুই কি একটি হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে?
হ্যাঁ পারে। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এটিই দেখলাম আমরা। খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অপবাদে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন আযমকে।
অভিযোগ উঠেছে, তাকে হত্যা করেছে তারই পরিচিত ও বন্ধুরা।
শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলাম নগর রোডের একটি ছাত্রাবাসে ঘটে এই ঘটনা। চারতলা ভবনের ছাত্রাবাসটিতে প্রায় ৬০ শিক্ষার্থী থাকতেন। এক বছর ধরে সেখানেই থাকতেন আজমুল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মেসের ম্যানেজার মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মারধর করা হয় আজমুলকে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় ছাত্রাবাসের গলি থেকে।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ভাত নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো- একজনের খাবার অন্যজন খেয়ে ফেলেছে, এই অভিযোগের জবাব কি মারধর এবং হত্যা?
ছাত্রাবাসের জীবন এমনিতেই ভাগাভাগির জীবন। একই ঘরে থাকা, একই টেবিলে বসে খাওয়া, একে অন্যের খাবার-পোশাক ব্যবহার করা, কখনো একজনের রান্না আরেকজনের খাওয়া; এসবই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
সেখানে ভুল বোঝাবুঝি, মনোমালিন্য কিংবা খাবার নিয়ে বিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি সাধারণ বিরোধ যখন যুক্তি, কথা কিংবা সমঝোতার পথ ছেড়ে সরাসরি সহিংসতায় গড়ায়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত বিরোধ থাকে না। সেটিই হয়ে ওঠে সমাজের সহনশীলতা হারানোর ভয়ংকর উদাহরণ।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এটি শুধু দুজনের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা নয়। বাইরে থেকে লোক ডেকে এনে দলবদ্ধভাবে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে।
অর্থাৎ একটি তুচ্ছ অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ‘মব’। সেখানে ব্যক্তির বিচারবোধ হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছেন থামিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিও।
একজনকে ঘিরে যখন অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে যায়, তখন তার ওপর সহিংসতা চালানো যেন সহজ হয়ে ওঠে। আর সেই সহিংসতার শেষ পরিণতি যে মৃত্যু হতে পারে, তারই নির্মম উদাহরণ হলেন আজমুল।
খুলনার ঘটনাটিও সমাজের আরেকটি গভীর সংকটের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আমরা কি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি? সামান্য অপমান, রাগ, সন্দেহ কিংবা বিরোধের জবাব কি এখন কথার বদলে বলপ্রয়োগ করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করছে?
যে বয়সে একজন তরুণের স্বপ্ন দেখার কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন জীবন শুরু করার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার কথা; সেই বয়সেই যদি এক প্লেট ভাতের অভিযোগ প্রাণ দিতে হয়, তাহলে ঘটনাটি শুধু মাত্র হত্যাকাণ্ড হিসেবে ভেবে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আজমুলের মৃত্যুও তাই প্রশ্ন রেখে যায়, ভাতের জন্য একজন মানুষ খুন হলো, নাকি ভাত ছিলো কেবল অজুহাত? আসল সংকট কি আমাদের ভেতরে জমে থাকা ক্রোধ, অসহিষ্ণুতা আর দলবদ্ধ সহিংসতার সংস্কৃতিতে?
অভাব-অবিশ্বাস থেকে ককটেল আতঙ্ক: এক অস্থির সময়ের ছবি

কদমতলীর ঘটনাটি যেন সম্পর্কের ভেতরে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের ভয়াবহ পরিণতি। মাত্র তিন মাস আগে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন জুয়েল ও ইয়ানূর বেগম।
কিন্তু ভালোবাসার সেই সংসারে দ্রুতই জায়গা করে নেয় অভাব, কলহ আর অবিশ্বাস। বৃহস্পতিবার রাতেও দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। নিজের মাকে ফোন করে সে কথা জানিয়েছিলেন ইয়ানূর।
পরদিন তালাবদ্ধ ঘরের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার হলো ২৫ বছর বয়সি এই নারীর গলাকাটা মরদেহ। ঘটনার পর থেকে পলাতক স্বামী জুয়েল।
একটি সংসারের ভেতরে জমতে থাকা অভাব আর অবিশ্বাস কীভাবে শেষ পর্যন্ত জীবন কেড়ে নিতে পারে, তারই নির্মম উদাহরণ কদমতলীর ঘটনা।
যে সম্পর্ক নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই সম্পর্কই যখন আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠে, সমাজের ভেতরে পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ঘটনাটি আরও ভয়াবহ। অভিযোগ, মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত শরাফত আলী বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন নিজের তিন সন্তানকে।
নিহত মাওয়া আক্তারের বয়স ১০, শামিম মিয়ার ৭ এবং তামিমের মাত্র ২ বছর। স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, জুয়া ও নেশার পেছনে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা হারিয়েছিলেন শরাফত।
মাদকের নেশা শুধু নিজের জীবন নষ্ট করে না, প্রায়ই এর বিষাক্ত ছোবল আঘাত করে পুরো পরিবারের ওপর। প্রায়ই সেই নির্মমতার ভূক্তভোগী হয় অবুঝ শিশুরা, যাদের কোনো সুযোগই ছিলো কোনো সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার।
মানিকগঞ্জের ঘটনাটিও আলাদা। একই পরিবারের তিনজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে নিজেদের ঘরে। একরাম হোসেন, তার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা এবং দেড় বছরের শিশু অ্যালিজা।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন একরাম। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর কারণ নিশ্চিত নয়। উঠে আসছে, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের বিষয়ও।
পাঁচটি ঘটনা, আলাদা পরিবার, আলাদা প্রেক্ষাপট। কিন্তু কোথাও না কোথাও মিল আছে। সম্পর্কের ভাঙন, অর্থনৈতিক চাপ, অবিশ্বাস, মাদক, জুয়া কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধ।
এ যেন ঘরের ভেতরের অস্থিরতার এক চিত্র। কিন্তু অস্থিরতা কি সীমাবদ্ধ শুধুই ঘরের ভেতরে? রাজপথের চিত্র বলছে, না।
যখন মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছে না পরিবারে ভেতরে, তখন রাজপথেও তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক।
ঢাকায় টানা কয়েকদিন ধরে ঘটছে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগ। শুক্রবার দুপুর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঢাকার অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
শনিবার রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে জোড়া ককটেল বিস্ফোরণ। এর আগে বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, মিরপুর, মধ্য বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মধ্যরাতে জুলাই জাদুঘর এলাকাতেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
রবিবার দুপুরেও থামেনি এই আতঙ্ক। মিরপুরে বঙ্গবন্ধু কলেজ রোডে বাসে আগুন, সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ; একটির পর একটি ঘটনা যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনকে।
উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। এগুলোকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। কয়েকদিন ধরে একই ধরনের ঘটনা ঘটছে, ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়।
একদিকে ঘরের ভেতর অভাব, অবিশ্বাস, মাদক ও জুয়ার কারণে ভাঙছে পরিবার, মরছে মানুষ। অন্যদিকে রাজপথে ককটেল, আগুন আর নাশকতার ঘটনায় প্রশ্নের মুখে জননিরাপত্তা।
এই দুই ধরনের ঘটনা বড় একটি বাস্তবতাকে সামনে আনছে। তা হলো- সহনশীলতা কমছে, সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি।
আর তখনই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো– এই অস্থিরতার প্রতিকার কোথায়?
ঘটনার পর কেবল পুলিশ পাঠিয়ে, মামলা করে কিংবা নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে কি এই সংকটের সমাধান সম্ভব? নাকি অপরাধের পেছনের কারণগুলো– মাদক, জুয়া, দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক অবিশ্বাস, কিশোর অপরাধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা– একসঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন?
অপরাধের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু অপরাধের আগেই যদি তার কারণগুলোকে চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে এক ঘটনার জায়গায় আরেকটি ঘটনা আসতেই থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অপ্রতিম, আজমুল কিংবা ইয়ানূর; প্রতিটি মৃত্যুই আলাদা গল্প। কিন্তু গল্পগুলোর ভেতরের অস্বস্তি একই। আস্থার সংকট, অসহিষ্ণুতা, মাদক, জুয়া, পারিবারিক ভাঙন ও সহিংসতার বিস্তার।
রাজপথের ককটেল-আগুন সেই অস্থিরতাকে দৃশ্যমান করছে আরো।
কিন্তু এর প্রতিকার দরকার, প্রয়োজন শান্ত, সহনশীল সমাজ। আর এটা করতে শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না; অপরাধের আগেই চিহ্নিত করতে হবে কারণগুলো। সেটা করতে না পারলে একের পর এক ঘটতেই থাকবে ঘটনা। নিরাপত্তাহীনতা হবে আরো গভীর।


ককটেল আতঙ্কে ঢাকায় ৩০০ তল্লাশি চৌকি, জমায়েতে কড়াকড়ি
