এআই ক্যামেরার নজরদারিতে বদলে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৫০ কিলোমিটার জুড়ে বসানো দেড় হাজারের কাছাকাছি এআই ক্যামেরা গতিসীমা লঙ্ঘন থেকে শুরু করে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সবকিছুই ধরছে মুহূর্তের মধ্যে। ফল মিলছে হাতেনাতে। বদলে যাচ্ছে চালকদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর ধীরে ধীরে কমে আসছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও।

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

গত ২৪এ অগাস্ট কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকার আব্দুল মালেক যে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তা তিনি হাইওইয়ের উল্টো লেনে ঢুকিয়ে গন্তব্য চলে যান। কেউ তাকে থামায়নি, কোন পুলিশ সদস্যও আসেনি। 

কিছুদিন পর গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে চলে যায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার মামলার তথ্য; ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসানো এআই ক্যামেরা গাড়ি শনাক্ত করে জরিমানা করে দিয়েছে।

মালেক বলেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আর কখনো উল্টো পথে গাড়ি ঢোকাবেন না তিনি। একই সড়কে ওভারটেকিংয়ের অভিযোগে জরিমানার মুখে পড়েছেন তাজুল নামের আরেক গাড়িচালকও।

মালেক আর তাজুলের মতো চালকদের অভিজ্ঞতাই বলে দিচ্ছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘সজাগ’। বাংলাদেশের সড়কপথের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় চলাচল করে হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন, আর দেশের অর্থনীতিতেও এর ভূমিকা অনেক বড়।

এই মহাসড়ককে আরও নিরাপদ রাখতে ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো হয়েছে এক হাজার ৪৭২টি এআই ক্যামেরা। ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরতে পারছে গতিসীমা লঙ্ঘন, অবৈধ পার্কিং আর উল্টো পথে চলাচলের মতো অপরাধ এবং আইন অমান্যকারীদের করা হচ্ছে জরিমানা। গত ১৮ই অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট হাইওয়ে মনিটরিং সেন্টার থেকে ১৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে হওয়া এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। 

মামলা হচ্ছে, বদলাচ্ছে অভ্যাস

এআই ক্যামেরা বসানো পর এক ধরা পড়ছে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা। যেমন, ওভারস্পিডিং, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং ও ছোট-বড়-মাঝারি নানা ধরনের যানবাহনের উল্টো পথে ঢুকে যাওয়া। 

হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্যামেরা চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই হয় ৪৪৯টি মামলা, আদায় হয় ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা। সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে ওভারস্পিডিং বা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। 

মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য চলে যাচ্ছে গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বরে। নির্ধারিত লেন না মানা, অবৈধ পার্কিং, ওভারস্পিডিংয়ের মতো প্রবণতার খেসারত অনেককে দিতে হচ্ছে ‘অটো জরিমানার’ মাধ্যমে।

কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, এআই ক্যামেরার পয়েন্টগুলোতে এসে এখন অনেক চালক ওভারস্পিডিং থেকে বিরত থাকছেন, আর যারা এই ক্যামেরা সম্পর্কে জেনেছেন তারাও আর উল্টো পথে গাড়ি ঢোকাচ্ছেন না।

তার মতে, চালকদের আচরণে একরকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে মহাসড়কের ৪৯০টি পয়েন্টে বসানো এআই ক্যামেরা সড়ক শৃঙ্খলায় বেশ কাজে আসছে বলে জানান তিনি।

যেভাবে কাজ করে এআই ক্যামেরা

ক্যামেরাগুলো রিয়েল টাইমে সবকিছু বিশ্লেষণ করে কোনটি কী ধরনের যানবাহন তা মুহূর্তের মধ্যে আলাদা করতে পারে। প্রবল বৃষ্টি বা রাতের অন্ধকারেও প্রতিটি যানবাহনকে আলাদা করতে সক্ষম কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি রয়েছে এতে। মহাসড়কে লেন দখল করে রাস্তা আটকে রাখলেও নির্দিষ্ট সময় পর ক্যামেরা সার্ভারে বার্তা পাঠিয়ে দেয়।

গাড়ি শনাক্ত করতে রয়েছে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন এর সাথে ব্যবহার করা হয় অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন, যা যানবাহনের নম্বরপ্লেটের (বাংলা বা ইংরেজি) ছবি ডিজিটাল টেক্সটে রূপান্তর করে। যতই অস্পষ্ট হোক না কেন, ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির দিয়ে সঠিক নম্বরটি বের করা যায়।  

আইন লঙ্ঘনকারী বাহনের অপরাধের ধরন, স্থান ও সময়, সবকিছু ভিডিও প্রমাণসহ সংরক্ষিত থাকে সার্ভারে। 

তবে অনেক থ্রি-হুইলার বা ছোট পিকআপ রয়েছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন, আর অটোরিকশারও নেই কোনো বৈধ নম্বর বা কাগজপত্র। এই যানবাহনগুলোই বেশিরভাগ সময় উল্টো পথে চলে। এআই ক্যামেরা অপরাধের ধরন শনাক্ত করতে পারলেও রেজিস্ট্রেশন না থাকায় জরিমানার করা যাচ্ছে না মালিকদের।

চেকপোস্ট থেকে ক্যামেরায়

মেঘনাঘাট হাইওয়ে পুলিশ কমান্ড অ্যান্ড মনিটরিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ই অগাস্ট থেকে ১২ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬৬টি মামলা হয়েছে, এর মধ্যে কুমিল্লায় ৬১৫টি। এই সড়কে ওভারস্পিডিংয়ের জন্য ৫৯০টি এবং উল্টো লেনে যাওয়ার জন্য ২৫টি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর রিজিয়নে এই দুই অপরাধে হয়েছে আরও ৫১টি মামলা। 

হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম আলাপ-কে জানিয়েছেন, চেকপোস্ট বসিয়ে কার্যক্রম চালাতে গিয়ে যানবাহনের মালিক-চালক ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে প্রায়ই মনোমালিন্যের ঘটনা ঘটত, যা এখন আর হচ্ছে না।

তিনি বলেন, মামলার সংখ্যা কমে এলেও প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি মামলা হচ্ছে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে, আর কমে এসেছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। “ক্যামেরার অটো মামলার কারণে এই মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।”  

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় সার্ভার তাদের ডেটাবেইজের সাথে যুক্ত। প্রায় দেড় হাজারের মতো এআই ক্যামেরা চালুর শুরুর দিকে মামলা সংখ্যা অনেক হলেও এখন তা কমে আসতে শুরু করছে। বিআরটিএ আরও জানিয়েছে, তারা বারবার আইন অমান্যকারী যানবাহন ও তার চালক-মালিকদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করবে খুব তাড়াতাড়ি।

মালেক অথবা তাজুলের মতো চালকদের কাছে হিসাবটা এখন পরিস্কার। ক্যামেরার সামনে যুক্তি খাটে না, ফাঁকিও চলে না, চলে শুধু নিয়ম। আর এই একটি পরিবর্তনই ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চেহারা।