পুলিশ ঢুকতেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় কক্সবাজারের হিমছড়িতে একটি রিসোর্টে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ভেতরে থাকা চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকরা ছুটেন রিসোর্টের পেছনে খোলা সৈকতের দিকে।
পঁচিশে অগাস্টের সেই অভিযানে যা পাওয়া গেছে তা দেখে পুলিশ সদস্যদের চোখ কপালে। ভেতরে বড় হলরুম জুড়ে সারি সারি কম্পিউটার, মনিটর, আইফোন, সঙ্গে ছয়টা কক্ষ, যেখান থেকে বাইরে কোনো শব্দ যায় না, ভেতরেও ঢোকে না। মোট ১,৯৩৮টা আইফোন, ৫০টা মনিটর, ৪৪টা কম্পিউটার, ৩০টা কি-বোর্ড, দুটো ল্যাপটপ, চল্লিশটা মাউস। আর তার সঙ্গে চীনের দুটো জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ, একটা ডায়েরি।
তদন্তে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা আরও চমকে দেওয়ার মতো। এটি কোনো বৈধ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণা চক্রের ঘাঁটি। এই চক্রের সদস্য বিভিন্ন দেশে সক্রিয় এবং তারা এরই মধ্যে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশে বসেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে প্রতারণা চালাচ্ছিল চক্রটি। সামাজিক মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছিলো বিশ্বাসের সম্পর্ক, দেখানো হচ্ছিল মুনাফা।
আর তারপরই বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছিলো অর্থ।
শুধু একটি রিসোর্ট নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই নেটওয়ার্ক। পুলিশের তথ্য বলছে, চক্রটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৯৪ জন চীনা নাগরিকের সন্ধান মিলেছে। তাদের হয়ে কাজ করছে আরো দুই শতাধিক চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক।
অভিযোগ রয়েছে, পুঁজিবাজারের প্রতারণার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমেও বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই চক্রের নজর ছিলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকেও। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু প্রতারণার ‘অপারেশন সেন্টার’ হয়ে উঠেছিলো, নাকি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরেও ঢুকে পড়ার চেষ্টা চলছিলো? এসব প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
একদিকে কক্সবাজারের রিসোর্টে গড়ে ওঠা অত্যাধুনিক সাইবার ল্যাব, অন্যদিকে হাজার হাজার মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে আর্থিক লেনদেনের জাল। সব মিলিয়ে সামনে আসছে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার এক ভয়ংকর নেটওয়ার্কের চিত্র।
বাংলাদেশকে ব্যবহার করে কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিলো এই প্রতারণা? কারা ছিলো এর পেছনে? কীভাবে এআইকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছিলো বিনিয়োগের ফাঁদ?
আর এই চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কত টাকা পাচার হয়েছে দেশের বাইরে?
আখড়া কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্ট
হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ ভিলাস’ রিসোর্ট। বড় হলরুম জুড়ে কম্পিউটার ল্যাব। সাথে ছয়টি কক্ষ এমনভাবে বানানো, যাতে কোনো শব্দ ঢুকতে বা বের হতে না পারে।
আপাতদৃষ্টিতে ল্যাব মনে হলেও এটি আসলে চীনা প্রতারক চক্রের বিছানো জালের অত্যাধুনিক ল্যাব।
এর সন্ধান পেয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিস্মিত হয়ে গেছেন।
তথ্য-প্রযুক্তির ‘উচ্চ জ্ঞান সম্পন্ন’ এই চীনা প্রতারক চক্রের সরাসরি সদস্য সংখ্যা ৯৪ জন। তাদের হয়ে কাজ করতেন আরো দুই শতাধিক চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক।
অগাস্টের শেষের দিকে ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে ওই ‘ল্যাব’ দুই দফায় পরিদর্শনে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদলও।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) বলছে, ল্যাব থেকে জব্দ করা ‘ইলেকট্রনিক ডিভাইস’ ফরেনসিক করে এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এআই ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে লোভনীয় তথ্য আদান-প্রদান করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার প্রলোভন দিতো এই চক্রের সদস্যরা।
এসবি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “বিনিয়োগের পর প্রথমে সামান্য মুনাফা দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করার পর আরো বেশি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে প্রতারক চক্র।”
এভাবে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিতে একসময় বিনিয়োগকারীকে বলা হতো, যে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেটিতে সমস্যা হয়েছে। এটি ঠিক করতে হলে আরো অর্থ দিতে হবে। এভাবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পর ভুক্তভোগীকে সামাজিক মাধ্যমে ব্লক করে দেয় প্রতারক চক্র।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকেও এই চক্রের নজর ছিলো বলে জানান এসবির আরেক কর্মকর্তা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের যুগ্ম- কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন আলাপ-কে বলেন, “সাইবার প্রতারণার সাথে কিছু চীনা নাগরিক জড়িত, এটা সঠিক। সিটিটিসিসহ পুলিশের বিভিন্ন শাখা এবং জেলা পুলিশ এ নিয়ে কাজ করছে।
“সিটিটিসি মূলত ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থান করা চীনা চক্রের প্রতারণার বিষয়টি খোঁজ রাখছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য শাখা ও সংস্থা কাজ করছে। প্রয়োজনে এক শাখা আরেক শাখাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।”
এসবি'র অনুসন্ধান সূত্রে জানা যাচ্ছে, মিথ্যা পরিচয়ে কক্সবাজারে রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার পর চীনা প্রতারক চক্র ল্যাব উপযোগী কাঠামো তৈরি করে সাজসজ্জায় পরিবর্তন এনেছিলো। নিরাপত্তাকর্মীসহ জনবল নিয়োগ করে রিসোর্ট ব্যবস্থাপনাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলো তারা।
কক্সবাজারের হিমছড়ি, ইনানি, কলাতলি ও সুগন্ধা এলাকায় ৩রা সেপ্টেম্বরের অভিযানে পাঁচজন চীনা ও একজন তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার এবং ল্যাব জব্দ করার আগে-পরে এমন আরো অনেক আলামত পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রতারক চক্রের ৩০০ সদস্যের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে গোয়েন্দারা। চক্রটি তিন দেশের পুঁজিবাজার প্রতারণা ছাড়াও অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে জড়িত বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন অভিযান সংশ্লিষ্ট এসবির এক কর্মকর্তা।
চলতি বছরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানে ২২ জন চীনা নাগরিক ও তাইওয়ানের এক নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালে মে পর্যন্ত অভিযানে গ্রেপ্তার হন আরো ৬ জন চীনা নাগরিক।

দেশজুড়ে ডিজিটাল প্রতারণার জাল বিছিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চীনা প্রতারক চক্রের অন্য আরেকটি দল এরইমধ্যে মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা পাচার করেছে বলে প্রমাণও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকটি শাখা।
অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে এসব টাকা চীনে পাচার করা হয়েছে বলেও প্রমাণ পেয়েছেন তারা।
পূঁজিবাজার প্রতারণা, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এরই মধ্যে ৭৯ হাজার মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যে জুলাই মাসে ১০ হাজার ও অগাস্ট মাসে ১৪ হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়।
পুলিশের কক্সবাজার অভিযান
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্ট এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকের অবস্থানের তথ্য উল্লেখ করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে এক চীনা নাগরিক গত এপ্রিল থেকে এসব রিসোর্ট ও আবাসিক ভবন ভাড়া নেন। ‘বাবর আলী’র প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তার সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।
অন্যদিকে, উ ওয়েইপিং নামে আরেক চীনা নাগরিক ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে বলতেন তিনি।
তবে বিশেষ শাখার অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রথম দফায় ২৫এ অগাস্ট মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকরা পেছনের খোলা সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান। এ সময় রিসোর্টের হলরুম ও অন্যান্য স্থানে তল্লাশি চালিয়ে ল্যাব ও শব্দরোধী কক্ষ জব্দ করা হয়।
পরে বিষয়টি ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসকে জানায় এসবি। ২৬এ অগাস্ট চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মেরিনা বিচ ভিলাস পরিদর্শন করে।
তারা কম্পিউটার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ, আইফোনসহ বিভিন্নস্থান ঘুরে দেখেন। ১লা সেপ্টেম্বর চীনা দূতাবাসের আরেকটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় চীনা প্রতারকদের সক্ষমতা জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেন দূতাবাসের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
এর দুই দিন পর ২৮এ অগাস্ট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একটি দল রিসোর্ট পরিদর্শন করে। ৩রা অগাস্ট অভিযান চালানো হয় কলাতলীর দুটি হোটেলে।
সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিং। পলাতক চারজন হলেন, ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং ও জিয়ান ঝাং।
তাদের কাছ থেকে ছয়টি মুঠোফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট ও তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়ে বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন রামু থানার পরিদর্শক মিন্টু দত্ত।
সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে মিন্টু দত্ত বলেন, “মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জন ছাড়াও আরো চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।”
এসবির একজন কর্মকর্তা জানান, ল্যাবে পাওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস ফরেনসিক করে দেখা গেছে চীনা প্রতারক চক্রের জাল বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামে সক্রিয় এই চক্রের সদস্যরা।
তারা এরই মধ্যে ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে ২ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
যেভাবে চীনা প্রতারকচক্রের সন্ধান মিললো
মার্চের শুরু থেকেই চীনা প্রতারকচক্রের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রেখেছিলো এসবি। অনুসন্ধানে চীনাদের বাংলাদেশে আসার বিষয়ে নানা অনিয়ম উঠে আসে।
চীনা নাগরিকরা এসেছেন কর্মসংস্থান ভিসায় (ই-ভিসা)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টস (ডিআইপি) চীনাদের বাংলাদেশে আগমনের বিষয়টি জানলেও এসবি’র ফরেন ডেস্ক (বা প্রবাসী/বিদেশি সহায়তা সেল) জানতো না।
নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসার পর বিদেশি নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসবিতে নিবন্ধন করতে হয়।
বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি জেলা বিশেষ শাখায় দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারের রিসোর্টে অবস্থানকারী চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের বিষয়ে এমন কপি জমা দেওয়া হয়নি। বিদেশি নাগরিকদের হোটেল-রিসোর্ট ভাড়া দেওয়ার তথ্যও জেলা এসবিকে জানায়নি মালিকপক্ষ।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় এসবি। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে এসবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
মাসে পাচার ২৫০ কোটি টাকা
অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার মাধ্যমে আয় করা ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা প্রতিমাসে বিদেশে পাচার হচ্ছিলো বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
গত ১লা অগাস্ট ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর এ নিয়ে কথা বলেন ডিবি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “১৪টি ল্যাপটপ, ১৬টি স্মার্টফোন, মুঠোফোনের ৬ হাজার সচল সিম ও ২০টি ডিজিটাল গেটওয়ে মেশিন ব্যবহার করে চীনা চক্রটি সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।”
কীভাবে সাইবার প্রতারণা হয় তারই একটি উদাহরণ দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, “চীনা চক্রটি সাধারণ মানুষের মুঠোফোনে আকর্ষণীয় বার্তা পাঠাতো। চাকরির সুযোগ ও বাড়তি আয়ের বিভিন্ন লিংক দিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলতো তারা। ভুক্তভোগীরা ওই লিংকে ক্লিক করার সাথে সাথেই ফাঁদে পড়ে যেতেন।”
তিনি বলেন, “নজরদারি এড়াতে অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করতো প্রতারকরা। তারা একটি মোবাইলের সঙ্গে একাধিক স্লট যুক্ত করে একসঙ্গে ১২টি সিম পরিচালনা করতো। ফলে ভুক্তভোগীরা টাকা খুইয়ে অভিযোগ করলেও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ডিভাইসের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হতো না।”
ঢাকার উত্তরায় অভিযান
গত ১৩ই মে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার ১৩ নম্বর সেক্টর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কাউসার, করিম ও রোকন নামে তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন তুরাগ থানার রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট এলাকায় আরেক অভিযানে গ্রেপ্তার হন ছয় চীনা নাগরিক।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬৪-পোর্ট বিশিষ্ট তিনটি জিএসএম, জিপিআরএস সিম মডিউল (ভিওআইপি জিএসএম গেটওয়ে) মেশিন, ৮-পোর্টের একটি ও ২৫৬-পোর্টের একটি জিএসএম মডিউল মেশিন, বিভিন্ন অপারেটরের প্রায় ২৮০টি সিম কার্ড, একাধিক ল্যাপটপ, ২০টি স্মার্টফোন, নগদ ৬ লাখ টাকা, চীনা পাসপোর্ট ও এনআইডি কার্ড এবং একটি টয়োটা মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রাম গ্রুপ ও ওয়েবসাইটে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন ও ডিপোজিট বোনাসের প্রলোভনের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করেছে পুলিশ।
ফিলিপাইনে বসেও চলে চীনা চক্রের প্রতারণা
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এজেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। আর ফিলিপাইনে বসে এই লেনদেন পরিচালনা করেন চীনা নাগরিকদের একটি চক্র।
তাদের এমএফএসের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করছে বাংলাদেশে থাকা চক্রের অন্য সদস্যরা।
এমএফএসের ভার্চুয়াল লেনদেনের সুবিধা থাকায় চক্রটি বাংলাদেশকে টার্গেট করে ছড়িয়ে দিয়েছে অনলাইন জুয়ার অসংখ্য ওয়েবসাইট। এর মাধ্যমেই দেশ থেকে পাচার হয়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা।
সম্প্রতি, চক্রের ৫ বাংলাদেশি সদস্যকে গ্রেফতারের পর এমন তথ্য প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ভাটারা ও বাড্ডা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন চীনা নাগরিকদের পাঁচ বাংলাদেশি সহযোগী আহমেদ রাফি, ফারহান তানভীর, হায়দার আলী, হাসানুজ্জামান ওরফে বাবু ও জামাল হোসেন ভূঁইয়া।
তাদের কাছ থেকে ১৬৩টি বিকাশ ও নগদের সক্রিয় এজেন্ট অ্যাকাউন্ট যুক্ত সিমসহ নানা আলামত জব্দ করা হয়।
এ সময় ডিবি জানায়, রাফি ও তানভীর ফিলিপাইনে বসবাসরত মাইক ও ল্যান্ডন নামে চীনের দুই নাগরিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাইক ও ল্যান্ডন অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন। রাফি ও তানভীর বাড্ডা, নোয়াখালী, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বিকাশ ও নগদের ডিস্ট্রিবিউশন হাউজ থেকে এমএফএস এজেন্ট সিম সংগ্রহ করেন।
এরপর নিজেদের মোবাইলে সিমগুলো চালু করে ফিলিপাইনে থাকা চক্রের সদস্যদের ‘এনক্রিপ্টেড অ্যাপ’ টেলিগ্রামের মাধ্যমে নম্বর ও লগইন পিন নাম্বার পাঠায়। ওটিপি এলে পুনরায় ফিলিপাইনে অবস্থানরত চক্রের সদস্যদের পাঠায়।
এর মাধ্যমে দেশে থাকা এমএফএসের এজেন্ট সিমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনলাইন জুয়া চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর তারা নাম্বারগুলো অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ব্যবহার করে অবাধে অর্থ লেনদেন ও পাঁচার করতে থাকে।
অনলাইন জুয়ার টাকা পাচার হয় যেভাবে
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার মনিটরিং সেল থেকে জানা গেছে, চক্রটি সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বেটিং ওয়েবসাইটের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। এসব বেটিং ওয়েবসাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে নির্দিষ্ট মুঠোফোন আর্থিক সেবা (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা ‘টপ-আপ’ বা জমা দিতে হয়।
টাকা জমা দেওয়ার পর ব্যবহারকারীর বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বেট মানি যুক্ত হয়। পরে সেই অর্থ ব্যবহার করেই জুয়ায় অংশ নেন গ্রাহকেরা।
সাইবার মনিটরিং সেল আরও জানায়, অবৈধ লেনদেনের জন্য ব্যবহার হওয়া এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এজেন্টদের কাছ থেকে এসব নম্বর সংগ্রহ করে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হয়।
পরে সাইটে সেগুলো প্রদর্শন করা হলে ব্যবহারকারীরা অর্থ পাঠায়। সংগৃহীত অর্থ থেকে এজেন্টরা নির্দিষ্ট কমিশন রেখে অবশিষ্ট টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। এরপর ‘বাইন্যান্স’-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হয় বলে নিশ্চিত হয়েছে সিআইডি।
শুধু ডিজিটাল প্রতারণা নয়, বিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি নারীকে চীনে পাচারের চেস্টার অভিযোগও উঠেছে চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে। চীনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে প্রতারণায় যুক্ত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এমন একটি মামলার তদন্তও করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ৭ই নভেম্বর, ৯ই ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালে ২৮এ মে এমন অভিযানে ৬ জন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ৭ই জানুয়ারি ৩ জন, ১২ই জানুয়ারি ৫ জন, ১৩ই মে ৬ জন, ১লা অগাস্ট ৩ জন এবং সবশেষ ৩রা অগাস্ট ৫ চীনা নাগরিকসহ ৬ জন গ্রেপ্তার হন।



