প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদ সদস্যের পদত্যাগ: নজির নাকি ব্যতিক্রম

একটি পদত্যাগ হয়তো একটি বার্তা দিতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হলে সেই বার্তাকে নিয়মে, প্রতিষ্ঠানে এবং ধারাবাহিক প্রয়োগে পরিণত করতে হয়।

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

সংরক্ষিত মহিলা আসনের দলীয় এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে শুধু একজন এমপির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের পুরোটা ধরা পড়ে না। এর মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে কিছু বার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কী সেই বার্তা?  

১ 

দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে সরকার যে রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনআস্থা বজায় রাখতে চায়, কোনো নেতাকর্মীর আচরণ তা ব্যাহত করলে তার রাজনৈতিক পরিণতি শোচনীয় হতে পারে—এই ঘটনাকে তার একটি সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় বা পদ ব্যবহার করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে, যা সরকারের ভাবমূর্তি বা জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, নেতৃত্ব প্রয়োজনে দৃশ্যমান সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারে—তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্তে এমন একটি সংকেত রয়েছে।

তবে এটিকে শুধু দলীয় শৃঙ্খলার বিষয় হিসাবে না দেখে রাজনৈতিক জবাবদিহির দিক থেকেও দেখা যায়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত শুধু তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর পড়ে না; তা সংশ্লিষ্ট দল ও সরকারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ধরনের ঘটনায় নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি জনআস্থা রক্ষার একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য অবশ্য নির্ভর করবে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনায় নেতৃত্ব কতটা ধারাবাহিকভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করে তার ওপর।

২ 

এই ঘটনাকে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় দলীয় নেতৃত্বের বিশেষত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অবস্থানের একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের কোনো জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দলের গ্রহণযোগ্যতা এবং সরকারের প্রতি জনআস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্তটির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

সিদ্ধান্তটির তাৎপর্য শুধু এই যে একজন জনপ্রতিনিধিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে—তা নয়। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এমন একটি সংকেত দেওয়া হয়েছে যে, দলীয় পদ, জনপ্রতিনিধিত্ব কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না। একই সঙ্গে এটি দলের অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীদের জন্যও একটি প্রত্যাশিত আচরণের মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।

তবে এই একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং এর রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে একই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব কতটা ধারাবাহিকভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করে তার ওপর। সেই অর্থে, এটি প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত; এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিক পদক্ষেপের ভিত্তিতে।

পদত্যাগ করা সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

৩ 

এই ঘটনা জনপরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে—সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা গুরুতর অভিযোগের ঘটনা ঘটলে তা যথাযথভাবে সরকারপ্রধানের নজরে আনা হলে তিনি বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। এমপি মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় অন্তত এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।

এর ফলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে একটি প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে যে, ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ নিয়েও নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর এবং তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই একটি ঘটনাকে বৃহত্তর ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে না দেখে, জবাবদিহির প্রতি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে দেখা অধিক যৌক্তিক।

৪

বহু রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যে জনরায়ে তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, সেটি তার সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে তার নেতৃত্বে কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনে।

এই প্রেক্ষাপটে এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে জনরায়ের প্রতি তার দায়বদ্ধতার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখতে না চাইলেও বরং বলা যায়, জনআস্থা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তার নেতৃত্বে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে দলীয় সিদ্ধান্ত এবং আইনগত দায়—দুটি বিষয় আলাদা। মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এবং কোনো অপরাধে তার ব্যক্তিগত দায় রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

৫

পদত্যাগী এমপি মিষ্টি দলের প্রধানের নির্দেশ পালন করেছেন এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে দলীয় শাস্তি পেয়েছেন। এটি দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু দলীয় শাস্তি কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য ফৌজদারি বা আইনগত দায় নির্ধারণ করে না।

তার বিরুদ্ধে যদি কোনো আইনভঙ্গের অভিযোগ থাকে, তাহলে অভিযোগটির সত্যতা ও তার ব্যক্তিগত দায় যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া গেলে শুধু রাজনৈতিক বা দলীয় অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত দায় আরোপেরও সুযোগ নেই।

সুতরাং, এই ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—দলীয় শাস্তি হয়েছে কি না, তার পাশাপাশি আইন ভঙ্গের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত দায় কতটুকু—তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হচ্ছে কি না।

৬

বিএনপির নেতারা, মন্ত্রী-এমপি, বুদ্ধিজীবী কিংবা বিএনপির পক্ষে বয়ান তৈরি করা টকশো বক্তারা যতই ইতিবাচক বক্তব্য দিন না কেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা প্রশাসনের কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ উঠছে, তা জনঅভিজ্ঞতা থেকে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে এই সমস্যাকে শুধু কোনো দলের নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত আচরণ বা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলেও এর গভীরতর অসুখের কারণটি ধরা পড়বে না।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের যে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি—তার মধ্যে দলীয় প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতা, আমলাতান্ত্রিকতা, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক ব্যবহার গভীরভাবে প্রোথিত। রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামোয় এমন মৌলিক সংস্কার এখনও হয়নি, যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা আদায়ের পুরনো সম্পর্কটি ভেঙে যেতে পারে। ফলে সরকার বা দল পরিবর্তন হলেও পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনেক আচরণ নতুন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও পুনরুৎপাদিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক কর্মীদের জীবিকা ও রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা একজন কর্মীর জন্য রাষ্ট্র বা দলীয় ব্যবস্থায় কোনো স্বচ্ছ, বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের প্রবণতা তৈরি হয়। দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ বা প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার তখন কেবল ব্যক্তিগত লোভের বিষয় থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

এই ব্যবস্থার সঙ্গে আবার একটি উল্লম্ব পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক কাজ করে—নিচের কর্মী থেকে স্থানীয় নেতা, সেখান থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত। ফলে অবৈধ বা অনৈতিক সুবিধা বণ্টনের একটি চেইন তৈরি হতে পারে এবং সেই চেইন রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকে।

তাই সমস্যার সমাধান কেবল ‘ভালো মানুষ’ দিয়ে রাজনীতি করার আহ্বানে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার, যেখানে দলীয় পরিচয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক কাজে অনধিকার হস্তক্ষেপের সুযোগ দেবে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য বৈধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার একটি স্বচ্ছ পরিসর এবং দলীয় অর্থায়ন, স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় ব্যক্তি ও দল পরিবর্তিত হলেও পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন নামে ফিরে আসার আশংকা থেকেই যাবে।

তাই মিষ্টি এমপির ঘটনায় যদি কোনো শিক্ষা থাকে, সেটি শুধু একজন এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল পরীক্ষা হলো—ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় কি রাজনৈতিক সুরক্ষা দেবে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সমানভাবে জবাবদিহিও থাকবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি দলীয় শাস্তির নিদর্শনে নয়, পাওয়া যাবে ধারাবাহিক রাজনৈতিক আচরণে। একটি পদত্যাগ হয়তো একটি বার্তা দিতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হলে সেই বার্তাকে নিয়মে, প্রতিষ্ঠানে এবং ধারাবাহিক প্রয়োগে পরিণত করতে হয়।

নজির তখনই নজির হয়, যখন তা ব্যতিক্রম থাকে না।

 

শুভ কিবরিয়া একজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব]