টেকনোফ্যাসিজম: রাজনীতিবিদ নয়, প্রযুক্তিবিদরাই কি চালাবেন ভবিষ্যৎ পৃথিবী?

ভবিষ্যতের পৃথিবী কি রাজনীতিবিদরা চালাবেন? নাকি ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যাবে প্রযুক্তিবিদদের হাতে? এআই, ডেটা, নজরদারি ও যুদ্ধ প্রযুক্তি সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ প্যালান্টিয়ার। তাদের নতুন রাজনৈতিক দর্শন ঘিরে উঠেছে বড় প্রশ্ন, প্রযুক্তি কি শুধু মানুষের জীবন বদলাবে, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার কাঠামোকেও বদলে দেবে?

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

একসময় পৃথিবীর ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল রাজপ্রাসাদ। মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হতো রাজা-বাদশাহদের সিদ্ধান্তে। পরে সেই ক্ষমতা ধীরে ধীরে চলে যায় রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে। 

শিল্পবিপ্লবের পর বড় বড় শিল্পপতি ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলো হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গোষ্ঠী। ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষদের গভীর চিন্তা-ভাবনা শুধু তাদের নিজেদের মধ্যে, বন্ধুদের মাঝে বা পেশাগত মহলে সীমাবদ্ধ থাকত। সাধারণ মানুষ সেগুলো খুব একটা জানতে পারত না।

কিন্তু ইন্টারনেট আসার পর আমূল বদলে গেছে পুরো পরিস্থিতি। এখন স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই, যে কেউ নিজের চিন্তা-ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারে লাখো মানুষের কাছে।

এই সুযোগের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন সিলিকন ভ্যালির ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা। এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট নন, অংশ নেননি কোনো নির্বাচনে তবু তাদের সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলে কোটি কোটি মানুষের জীবনে।

প্রযুক্তির ধনকুবেরদের হাতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সব কোম্পানি, সবচেয়ে বড় ডেটা ভাণ্ডার এবং এমন প্রযুক্তি যা বদলে দিচ্ছে মানুষের যোগাযোগ, অর্থনীতি এমনকি যুদ্ধের ধরনও।

শুধু কোম্পানিই তৈরি করছেন না সিলিকন ভ্যালির নতুন প্রজন্মের এই ধনকুবেররা। তারা বদলে দিচ্ছেন মানুষের যোগাযোগের ধরন, নিয়ন্ত্রণ করছেন তথ্যের প্রবাহ এবং নির্ধারণ করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ।

একসময় প্রযুক্তির মূল প্রতিশ্রুতি ছিল, এটি মানুষকে আরও স্বাধীন করবে, সবার কাছে পৌঁছে দেবে জ্ঞান এবং সমাজে তৈরি হবে সমান সুযোগ।

কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তি দুনিয়ার একটি অংশের চিন্তায় জায়গা করে নিচ্ছে নতুন একটি ধারণা।

এই ধারণার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস'। তারা এখন শুধু নতুন পণ্য তৈরি করছেন না; ভবিষ্যৎ পৃথিবী কেমন হবে, তা নিয়েও নিজেদের দর্শন প্রকাশ করছেন তারা।

আর সেই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। যারা এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে ক্ষমতার ভবিষ্যৎ।

প্রযুক্তিবিদদের নতুন ম্যানিফেস্টো

২০২৩ সালের অক্টোবরে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম 'আন্দ্রেসেন হোরোউইৎস'-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মার্ক অ্যান্ড্রিসেন ব্লগে প্রকাশ করেন দ্য টেকনো-অপটিমিস্ট ম্যানিফেস্টো

সেই লেখায় প্রযুক্তিকে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অগ্রগতির শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন অ্যান্ড্রিসেন। তার মতে, প্রযুক্তি ভয় পাওয়ার বিষয় নয়; বরং এটা হলো মানবজাতির সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে বড় ও প্রধান হাতিয়ার। 

লেখাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রযুক্তি দুনিয়ায়। পরে অনেক প্রভাবশালী উদ্যোক্তা নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাবনা প্রকাশে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি সমালোচকরাও তোলেন তীব্র প্রশ্ন।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সিনিয়র কলামিস্ট ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক শিরা ওভাদে লিখেছেন, “প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি এর ঝুঁকি, অসমতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। 

“কারণ প্রযুক্তি শুধু মানুষের জীবন সহজ করছে না; একই সঙ্গে এটি এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে, যাদের ওপর সাধারণ মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই।” 

এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্স কার্প এবং তাদের প্রধান নীতি কর্মকর্তা নিকোলাস জামিসকার লেখা বই দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক প্রকাশের পর।

অ্যান্ড্রিসেনের লেখায় যেখানে প্রযুক্তির প্রতি প্রবল আশাবাদ ছিল। প্যালান্টিয়ারের বই সেখানে আরও রাজনৈতিক, আরও কঠোর এবং আরও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক।

এই বইয়ের মূল প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের পৃথিবী পরিচালনা করবেন কি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা? নাকি সেই প্রযুক্তিবিদরা, যাদের হাতে থাকবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি?

প্যালান্টিয়ার আসলে কী ধরনের প্রতিষ্ঠান?

প্যালান্টিয়ারের নাম সাধারণ অনেক মানুষের কাছে পরিচিত না হলেও বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এটি বেশ পরিচিত।

 অ্যালেক্স কার্প, মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েল, জো লন্সডেল, স্টিফেন কোহেন এবং নাথান গেটিংস মিলে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল শাখা ইন-কিউ-টেল প্রতিষ্ঠার সময়ই এতে প্রাথমিক অর্থায়ন করা হয়।

৯/১১-এর হামলার পর বিশাল পরিমাণ বিচ্ছিন্ন তথ্য কীভাবে দ্রুত বিশ্লেষণ করা যায়, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় একটি সমস্যা ছিল।

প্যালান্টিয়ার কাজ শুরু করে সেই জায়গাতেই।

প্রতিষ্ঠানটি এমন সফটওয়্যার তৈরি করে, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি, ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্যে জটিল সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারে।

শুরুতে এটি মূলত সিআইএ, এফবিআই এবং পেন্টাগনের মতো গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার জন্য তৈরি হলেও, পরে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা এবং সরকারি বিভিন্ন বেসামরিক খাতে কার্যক্রম বাড়ায় কোম্পানিটি।

বর্তমানে প্যালান্টিয়ারের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। এই কারণেই প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো রাজনৈতিক বক্তব্য সাধারণ প্রযুক্তি কোম্পানির বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

পশ্চিমা বিশ্বে যেভাবে প্যালান্টিয়ার আধিপত্য বিস্তার করছে

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় ডেটা-মাইনিং এবং নজরদারি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যালান্টিয়ারের মূল শক্তি হলো তাদের গথাম এবং ম্যাভেন সফটওয়্যার। 

এগুলো সাধারণ মানুষের ড্রাইভিং লাইসেন্স, সোশ্যাল মিডিয়া চ্যাট, লোকেশন হিস্ট্রি থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যন্ত সব ধরনের বিচ্ছিন্ন ডেটা একত্রিত করে একেকটি নিখুঁত অ্যালগরিদমিক প্রোফাইল তৈরি করতে পারে বলে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে। 

প্যালান্টিয়ারের সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স, এফবিআই, সিআইএ এবং ইমিগ্রেশন বিভাগের পুরো নজরদারি ব্যবস্থা।

যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রযুক্তি সাংবাদিকদের বিশ্লেষণে প্যালান্টিয়ারকে "২১ শতকের এআই অস্ত্রের ডিলার" বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে উক্রেইনের যুদ্ধ পরিচালনা, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজায় সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ড্রোন হামলার টার্গেট নির্ধারণে সরাসরি ব্যবহার করা হচ্ছে প্যালান্টিয়ারের এআই অ্যালগরিদম। ফলে পশ্চিমা যেকোনো যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষমতা এখন এই একটি প্রাইভেট কোম্পানির হাতে চলে গেছে।

মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট দীর্ঘ সময় ধরে প্যালান্টিয়ারের ইনভেস্টিগেটিভ কেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করছে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অভিবাসন নীতি ও ব্যাপকহারে অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কারে গতি আনতে প্যালান্টিয়ারের প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি বিশাল মাস্টার ইমিগ্রেশন ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটি, বায়োমেট্রিক ডেটা,  ট্র্যাভেল হিস্ট্রি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য প্যালান্টিয়ারের সিস্টেমে একত্রিত করে আমেরিকার নাগরিকদের ওপর গভীর নজরদারির ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

আমেরিকার বাইরে ইউরোপেও জাল বিস্তার করেছে প্যালান্টিয়ার। রয়টার্স-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের দিকে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শত কোটি ডলারের চুক্তি গেছে প্যালান্টিয়ারের পকেটে।

জনসেবা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় নিজেদের অপরিহার্য করে তোলার মাধ্যমে তারা "গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে সার্বভৌমত্বের গোপনীকরণের ইজারাদার" হয়েছে। 

প্যালান্টিয়ার মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে এমনভাবে তাদের সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে যে, সরকার চাইলেও সহজে তাদের বাদ দিতে পারছে না। এর পিছনেও রয়েছে কিছু কারণ।

রয়টার্স ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ডিফেন্স ওয়ান-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অগাস্টে মার্কিন সেনাবাহিনীর ফিউচার সফটওয়্যার অ্যান্ড ডেটা প্রকল্পের জন্য প্যালান্টিয়ারের সাথে ১০ বছরের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন (১,০০০ কোটি) ডলারের একটি বিশাল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এছড়াও ২০২৬ সালের সামরিক বাজেট সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রজেক্ট ম্যাভেন ও এআই যুদ্ধের প্রসারের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের কাছে আগামী ৫ বছরের জন্য আরও ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট চেয়েছে, যার বড় অংশই প্যালান্টিয়ারের পকেটে যাচ্ছে।

২২ দফার প্রো-ওয়েস্ট ম্যানিফেস্টো কী বলছে?

প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের ২২ দফার প্রো-ওয়েস্ট ম্যানিফেস্টো বা পশ্চিমাপন্থি ইশতেহারটি মূলত বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা সামরিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব বা একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার একটি কট্টর রূপরেখা। 

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্যালান্টিয়ারের সিইও অ্যালেক্স কার্প এবং নিকোলাস জামিসকার লেখা বই দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক-এর সারসংক্ষেপ হিসেবে এই ইশতেহারটি প্রকাশ করা হয় কোম্পানির অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে।

বইটির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো সিলিকন ভ্যালির টেক কোম্পানিগুলোর শুধু ব্যবসা করলেই চলবে না, তাদের দেশের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তায়ও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। 

লেখকদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি কোম্পানিকে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ, বিনিয়োগ ও গবেষণা অবকাঠামো। তাই দেশের নিরাপত্তায় অবদান রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বইটিতে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের বিশ্বে সবচেয়ে বড় শক্তি হবে সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। লেখকদের ভাষায়, "শুধু কূটনীতি বা নৈতিক বক্তব্য দিয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। তাদের প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এবং এআই-নির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।"

এই কারণেই বইটিতে একটি বিতর্কিত দাবি করা হয়েছে। তা হলো, এআইভিত্তিক অস্ত্র তৈরি হবেই। একারণেই প্রশ্ন এইটা না যে অস্ত্র তৈরি করা হবে কিনা বরং কারা এই প্রযুক্তি তৈরি করবে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে।

লেখকদের মতে, যদি গণতান্ত্রিক দেশগুলো পিছিয়ে থাকে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাবে।

বইটিতে আধুনিক সমাজের কিছু প্রচলিত ধারণারও সমালোচনা করা হয়েছে। লেখকদের মতে, সব সংস্কৃতি বা সব মূল্যবোধ সমান নয়। 

তাদের দাবি, কিছু সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, আবার কিছু সংস্কৃতি পিছিয়ে রয়েছে। এই বক্তব্যের কারণেই বইটি “সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের” অভিযোগের মুখে পড়েছে।

বাইশ দফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা নিয়ে লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা মনে করেন, প্রযুক্তি খাতের মানুষ শুধু উদ্যোক্তা নন, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গঠনেও তাদের বড় ভূমিকা থাকা উচিত।

সমালোচকদের মতে, এখান থেকেই এমন একটি ধারণা উঠে আসে যে, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিবিদরাই সবচেয়ে প্রভাবশালী শ্রেণিতে পরিণত হতে পারেন। আর এখান থেকেই টেকনোফ্যাসিজম-এর ধারণাটা আসছে।

বেলিংক্যাট-এর প্রতিষ্ঠাতা এলিয়ট হিগিন্স প্যালান্টিয়ারের বই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তার মতে, এই ২২টি বক্তব্যকে শুধু দর্শন বা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

তিনি বলেন, “প্যালান্টিয়ার যখন বলে, কিছু সংস্কৃতি 'পিছিয়ে আছে' এবং বহুত্ববাদ বা ভিন্ন মতের সহাবস্থান 'অর্থহীন', তখন তারা শুধু কোনো পণ্য বিক্রির কথা বলছে না। বরং তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরছে।”

আর ঠিক এই কারণেই প্যালান্টিয়ারের বক্তব্য সাধারণ কোনো প্রযুক্তিবিদের বক্তব্যের মতো দেখা হচ্ছে না। 

টেকনোফ্যাসিজম ও প্যালান্টিয়ারের ‘প্রো-ওয়েস্ট ম্যানিফেস্টো’

প্যালান্টিয়ারের ২২ দফার প্রো-ওয়েস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের পর যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো ‘টেকনোফ্যাসিজম।’

ফ্যাসিবাদ বলতে সাধারণত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্র, সামরিক শক্তি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে।

সমালোচকদের মতে, প্যালান্টিয়ারের ম্যানিফেস্টো সেই পুরোনো ধারণার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিকে যুক্ত করে এক নতুন ধরনের ক্ষমতার কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। সেই কারণেই তারা একে টেকনোফ্যাসিজম হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

প্যালান্টিয়ারের এই ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়েছে, সিলিকন ভ্যালির টেক কোম্পানিগুলোর দেশের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখা নৈতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে। তাই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে শুধু ব্যবসা নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থারও অংশ হতে হবে। 

লেখকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র তৈরি বন্ধ হবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই প্রযুক্তি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর হাতে থাকবে, নাকি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে।

আর এখানেই আপত্তি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদদের।

তাদের মতে, এই ম্যানিফেস্টোতে প্রযুক্তিকে কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়নি, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতা, সামরিক আধিপত্য এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রধান অস্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। 

একইসঙ্গে এতে বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শুধু সফটওয়্যার নির্মাতা নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তা কাঠামোরও প্রভাবশালী অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বইটির আরও কিছু বক্তব্য এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। যেমন, লেখকেরা বলেছেন, শুধু নৈতিক বক্তব্য বা কূটনীতি দিয়ে বিশ্বে নেতৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজন ‘হার্ড পাওয়ার’ বা বাস্তব সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। 

তারা আরও যুক্তি দিয়েছেন, সব সংস্কৃতি সমান নয়। কিছু সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় বড় অবদান রেখেছে, আবার কিছু সংস্কৃতি পিছিয়ে রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য "পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্বের" ধারণাকে শক্তিশালী করে।

এ কারণেই ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা প্রযুক্তি দার্শনিক মার্ক কোকেলিন প্যালান্টিয়ারের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে টেকনোফ্যাসিজমের একটি স্পষ্ট উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন। 

তার ভাষ্যে, “যখন প্রযুক্তি, রাষ্ট্রের অদম্য ক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক আদর্শ একই কাঠামোর মধ্যে একীভূত হতে শুরু করে, তখন গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ও নাগরিক স্বাধীনতা চিরতরে দুর্বল হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।”

একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গ্রিক অর্থনীতিবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও লেখক ইয়ানিস ভারুফাকিস। তার লেখা টেকনোফিউডালিজম: হোয়াট কিলড ক্যাপিটালিজম-এর বইয়ের আলোকে প্যালান্টিয়ারের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন, “প্যালান্টিয়ারের এই চিন্তাধারা এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম পরিণত হচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বগ্রাসী ভয়ের নতুন হাতিয়ারে।”

একভাবে দেখলে প্যালান্টিয়ারের এই ম্যানিফেস্টোকে একটি সাধারণ করপোরেট বক্তব্য বলা যায় যেখানে তারা বিনিয়োগকারী, সরকার, অংশীদার এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। কিন্তু এর ভাষার মধ্যে আরও পুরোনো একটি ইতিহাস ও রাজনৈতিক ধারা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। 

রোমভিত্তিক ইতিহাস বিষয়ক প্রকাশনা ইতালিয়ান হিস্টোরিক্যাল রিভিউ-এর মতে, এটি অনেকটা প্রাচীন রোমের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও বক্তা সিসেরোর ঐতিহাসিক বক্তব্যের মতো। সিসেরো প্রায়ই রোমান প্রজাতন্ত্রের সভ্যতা রক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা তৈরি নিয়ে কথা বলতেন।

প্যালান্টিয়ারও প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবসার বিষয় হিসেবে দেখছে না। তারা এটিকে পশ্চিমা সভ্যতা রক্ষার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরছে।

সিসেরো যখন ভাষণ দিতেন, তখন তিনি শুধু নিজের মত প্রকাশ করতেন না, তিনি দাবি করতেন তিনি কথা বলছেন পুরো রোমান রাষ্ট্রের অস্তিত্বের হয়ে।

একইভাবে প্যালান্টিয়ারও নিজেকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরছে, যারা আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ ও সভ্যতার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার একচ্ছত্র অধিকার রাখে।

গণতন্ত্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ?

প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্স কার্প

প্যালান্টিয়ারের সিইও অ্যালেক্স কার্পের অন্যতম যুক্তি হলো, ভবিষ্যতের জাতীয় নিরাপত্তা হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নয়, ডেটা, সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে বলে তার দাবি। 

আর এখানেই প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকার ও শাসনতান্ত্রিক বিশেষজ্ঞরা। 

মার্কিন গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন -এর এক পলিসি ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, যদি একই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একদিকে সরকারের জন্য গোপন নজরদারি প্রযুক্তি তৈরি করে, অন্যদিকে নিজেরাই রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশ করে রাষ্ট্রকে দিকনির্দেশনা দেয়, তাহলে তাদের ক্ষমতার সীমা কতদূর থাকবে?

কারণ প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে শুধু কোটি কোটি ডলারের অর্থ না, তাদের কাছে রয়েছে কোটি কোটি মানুষের সংবেদনশীল তথ্য, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অটোমেটেড অ্যালগরিদম এবং সমাজকে প্রভাবিত করার অভূতপূর্ব ক্ষমতা।

প্রযুক্তিবিদদের এই নতুন ভূমিকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কী অর্থ বহন করবে, তা তুলে ধরা হয়েছে কানাডার গ্লোবাল রিসার্চ থিঙ্কট্যাঙ্ক-এর এক নিবন্ধে। 

সেখানে বলা হয়েছে, গণতন্ত্রের মূল ধারণা হলো, নির্বাচিত জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা আসে এবং ক্ষমতাবানদের থাকতে হয় জবাবদিহিতার মধ্যে। কিন্তু টেক কোম্পানিগুলোর সমস্যা হলো, তাদের অনেক সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোটারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

একটি অ্যালগরিদম কীভাবে নজরদারি করবে, কোন তথ্য মানুষকে দেখানো হবে, কোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে, এসব সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ সময়ই থাকে বন্ধ দরজার পেছনের কয়েকজন প্রযুক্তিবিদ, মিলিটারি কন্ট্রাক্টর ও সিইও-এর হাতে।

এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার নয়, বরং প্রযুক্তির দক্ষতা ও বিপুল ডেটার মালিকরাই বিশ্ব শাসনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন।

সমতার ধারণা কি পুরোনো হয়ে যাচ্ছে?

গত কয়েক দশকে আধুনিক পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল সমতা। এই ধারণায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ সমান অধিকার ও সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। জন্ম বা সামাজিক অবস্থান নয়; মানুষের যোগ্যতা ও পরিশ্রমই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ।

তবে এখন এই ধারণাকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছেন সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি দুনিয়ার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও টেকনো-অলিগার্ক

তাদের মতে, বর্তমান দুনিয়া এমন এক বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রবেশ করেছে, যেখানে সমতা বা সামাজিক সুযোগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযুক্তিগত 'সক্ষমতা' ও 'আধিপত্য'।

সব মানুষ বা সব সংস্কৃতি সমান কি না, তার চেয়ে তাদের কাছে বড় প্রশ্ন হলো—কে  তৈরি করতে পারছে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই এবং সামরিক প্রযুক্তি।

এই চিন্তাধারায় প্রযুক্তি শুধু একটি ব্যবসায়িক হাতিয়ার নয় বরং প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস।

যার হাতে থাকবে সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবচেয়ে বড় ডেটা ভাণ্ডার এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সফটওয়্যার, তার হাতেই থাকবে ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ।

যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই চিন্তা ধীরে ধীরে এমন একটি কর্তৃত্ববাদী সমাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি কোম্পানির মালিক অল্প কিছু করপোরেট গোষ্ঠী। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক সমতার জায়গায় তৈরি হতে পারে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক নতুন আধুনিক রাজতন্ত্র।

সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিদরা বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের অনেক সময় শুধু সাধারণ ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হিসেবে দেখেন না। তারা নিজেদের দেখেন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর রূপকার ও প্রজা-শাসক হিসেবে।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন সরকার, আইনি ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো আধুনিক প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

আবার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নতুন সমাধান তৈরি করতে পারে এবং অসম্ভবকে বাস্তবায়ন করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি-ভিত্তিক সমাজবিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড হিউম্যান ভ্যালুস-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই অতি-আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় এক বিপজ্জনক ধারণা। সমাজের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান রাজনীতিবিদদের তুলনায় অনেক ভালোভাবে করতে পারবেন প্রযুক্তিবিদরা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তিগত বা অ্যালগরিদমিক দক্ষতা কি কাউকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অধিকার দেয়?

একটি প্রাইভেট কোম্পানি যদি কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে কি সেই কোম্পানি মানুষের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ন্ত্রণের আইনি ও নৈতিক ক্ষমতা পেয়ে যায়?

ভবিষ্যতের লড়াই আসলে কার?

প্যালান্টিয়ারের বইকে ঘিরে বিতর্কের মূল জায়গা প্রযুক্তি নয়, ক্ষমতা।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব কার থাকবে? যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন, নাকি যারা এমন প্রযুক্তি তৈরি করবেন, যা মানুষের সিদ্ধান্ত, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে?

প্রযুক্তির ইতিহাস দেখিয়েছে, নতুন প্রযুক্তি সবসময় নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে।

মুদ্রণযন্ত্র জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইন্টারনেট যোগাযোগ বদলে দিয়েছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিতে পারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে?

প্যালান্টিয়ারের দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছে। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই যারা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারবে।

কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, যদি প্রযুক্তির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণি হয়ে উঠবেন সেই প্রযুক্তিবিদরা, যাদের হাতে থাকবে মানুষের জীবন পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

আর তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, প্রযুক্তি কি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে?