এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর রেখে যাওয়া চিরকুটে মৃত্যুরহস্য

রবিবার বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে মরিয়মের বাবাকে এমপি নজরুল ফোন দিয়ে ন্যাম ভবনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে রুমের দরজা ভেঙে ঢুকে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। বিছানার ওপর ’সুইসাইড নোট’ও দেখেন তিনি।

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

"সে বলেছিল, আজ থেকে আমরা বন্ধু, চলো একটা গেমস খেলি। আমি তো সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানত, আমিই ছিলাম তার গেমের দাবার গুটি।"

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্যাডের একটি পৃষ্ঠায় লেখা ছিলো লাইনটি। কে লিখেছেন তা তদন্ত সাপেক্ষ। তবে যেখানে চিরকুটটি পাওয়া গেছে সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ।

এই মরিয়ম খাতুন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। কিছুদিন আগে নজরুল ও মরিয়মের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিলো।

নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নজরুল ইসলামকে বহিস্কারও করেছিলো তার দল বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী। এর সপ্তাহ কয়েক পরই এই ঘটনা ঘটলো।

মরদেহ উদ্ধার হওয়ার স্থান থেকে পুলিশের জব্দ করা আরেকটি চিরকুটে লেখা ছিলো, “সে অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকারে ছিল তার বউ এর। আর আমি ছিলাম বোকা। অন্য কারো স্বামীকে বানিয়ে ছিলাম নিজের শখের পুরুষ।”

সংসদ ভবনের উল্টোদিকে ন্যাম ভবন। এই ভবনগুলোতে থাকেন সংসদ সদস্যরা। এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ফ্ল্যাট থেকেই তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার হয় রবিবার রাতে।

প্রথমে এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা খানমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করলে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই মামলায় আসামি করা হয়েছে মরিয়মের মামা এবং এমপি নজরুলের সাবেক গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে।

ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধারের সময় একাধিক চিরকুট পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা ওই চিরকুটেই লুকিয়ে আছে তার মৃত্যু রহস্য।

ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে গলায় কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলছিলো মরিয়মের মরদেহ। পাশে ছিলো একটি কাঠের চেয়ার। পা ছিলো মেঝেতে।

ঘটনার পরই শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের পাশাপাশি কাজ শুরু করে পিবিআই, সিআইডিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। সিআইডির ফরেনসিক টিম সেখান থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

সতর্ক তদন্তে পুলিশ

সুরতহাল ও আলামত সংগ্রহের পরই গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে মরিয়মের বাবা মামলা করলে তাদের দুজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এক পুলিশ কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, "গাজী নজরুল যেহেতু সংসদ সদস্য, তাই আইন মেনেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সুরতহাল দেখে আমরা মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ সম্পর্কে ধারণা দিই। কিন্তু এটি একটি হাই-প্রোফাইল মামলা। তাই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া কিছু বলবো না।"

তবে এই পুলিশ কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

পুলিশ গ্রেপ্তার দুই আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে সোমবার দুপুরে আদালতে পাঠানো হলে গাজী নজরুলকে সাত দিন ও মাকসুদা খানমকে একদিনের রিমান্ড দেওয়া হয়।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন আলাপ-কে বলেন, "রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মামলাটি তদন্ত করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো সুযোগ নেই।"

চিরকুট উদ্ধারের বিষয়ে তিনি জানান, লেখাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। “তদন্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগুলো সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।”

যা আছে এজাহারে

আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে রবিবার রাতে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ।

এজাহারে বলা হয়েছে, মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে হয়। এরপর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ন্যাম ভবনের ২০৩ নাম্বার ফ্ল্যাটে নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম। বিয়ের পর থেকেই মরিয়মের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে এজাহারে।

রবিবার বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে মরিয়মের বাবাকে এমপি নজরুল ফোন দিয়ে ন্যাম ভবনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে রুমের দরজা ভেঙে ঢুকে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। বিছানার ওপর ’সুইসাইড নোট’ও দেখেন তিনি।

পুলিশের জব্দ করা কয়েকটি চিরকুট।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান আলাপ-কে বলেন, "মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন। এটি হত্যা নাকি প্ররোচনায় আত্মহত্যায়, তা প্রমাণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজসহ আনুষঙ্গিক সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে।”

তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যথেষ্ট নয় বলে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

ইবনে মিজান বলেন, "আমরা প্রাথমিকভাবে জেনেছি, মরিয়মকে কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না। পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগও করতে দেওয়া হতো না। তিনি একপ্রকার বন্দিজীবন কাটাতেন। এসব তথ্যও আমরা নিখুঁতভাবে যাচাই করবো।"

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডা. নাশাত জাবীন আলাপ-কে জানিয়েছেন, মরিয়মের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

মন্তব্য করবে না জামায়াত

নৈতিক স্খলনের দায়ে গত ২২এ জুলাই গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী নজরুলকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। তবে তিনি এখনো এমপি পদে বহাল আছেন।

তার গ্রেপ্তার সম্পর্কে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আলাপ-কে বলেন, "তাকে আমরা আগেই দল থেকে বহিষ্কার করেছি। তাই এ নিয়ে দলের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য নেই।"

ভাইরাল ভিডিওতে আলোচনায় দম্পতি

গত ২০এ জুলাই একটি হোটেল কক্ষে এক নারীর সঙ্গে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আলোচনায় আসেন এমপি গাজী নজরুল।

ভিডিওটি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। প্রথমে ভিডিওটি ‘এআই দিয়ে তৈরি', ‘এডিটেড’ বলে দাবি করলেও, তা ধোপে টেকেনি।

পরে জানা যায়, ভিডিওতে নজরুলের সাথে দেখা যাওয়া নারীর নাম মরিয়ম। কয়েক দিনের মধ্যে মরিয়মকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন নজরুল।

এই আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন জামায়াত সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে। ২২এ জুলাই দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুলকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কার করা হয়।  এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে এবং তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গাজী নজরুল এর আগেও দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। তার নির্বাচনি এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামপুর উপজেলার স্থানীয় এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, "নজরুলের নৈতিক স্খলনের অভিযোগ বেশ পুরোনো। এর আগেও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো।"

মুক্তিযোদ্ধা দাবি নিয়ে বিতর্ক

গাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করলেও তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক আছে।

জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দাবি করেছিলেন তিনি। সে সময় তার আসনের সাবেক এমপি ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক একে ফজলুল হক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

ফজলুল হকের ভাষ্যমতে, নজরুল জাসদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে জামায়াতে যোগ দেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলকালীন তিনি কোথায় যুদ্ধ করেছেন,  প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

‘ক্ষমতার দাপটে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ‘অপচেষ্টায় লিপ্ত’ নজরুল বলে সেসময় দাবি করেছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মো. মুজিবর রহমান। তার দাবি নজরুল সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নন।

গাড়িচালককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

মগবাজারের একটি হোটেলে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিলো বলে খবর চাউর হয়। অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় নিজের গাড়িচালক ওবায়দুরের ওপর ক্ষিপ্ত হন নজরুল।

ভিডিও ফাঁসের জন্য চালককে দায়ী করে তাকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনায় গত ২১এ জুলাই ওবায়দুর বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় জামিনে আছেন এমপি নজরুল।

জামায়াতে ইসলামী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে, তবে সংসদ সদস্য হিসেবে তার পদ এখনো বহাল আছে। এর আগেও একবার নৈতিক স্খলন ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও রয়েছে নির্বাচনি বিতর্ক। এছাড়া নিজের সাবেক গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানের হত্যাচেষ্টা মামলায় জামিনে থাকা অবস্থাতেই ঘটলো মরিয়মের মৃত্যু।