তেলের বাজারে আগুন, যৌক্তিকতার সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব
পাঁচ মাসে বাংলাদেশে লিটার প্রতি বিভিন্ন তেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা। এরপরও এই সময়ে বিপিসি’র লস ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। তবে এর আগের পাঁচ অর্থবছরে বিপিসির নিট লাভ ছিলো ১৭ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। লাভ লসের এই হিসাব ছাড়াও প্রশ্ন রয়েছে আইএফের প্রেসক্রিপশনে বিইআরসি গণশুনানি বাদ দিয়ে সরকারের দাম নির্ধারণের এই প্রক্রিয়া নিয়েও।
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএমআপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
ইতিহাসের সর্বোচ দামে জ্বালানি তেল। ৫ মাসে লিটার প্রতি বেড়েছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা।
ধানমন্ডি থেকে বনানী। রবিবারও উবারে বাইক ভাড়া ছিলো ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। আজ একই পথে একজন যাত্রীকে দিতে হয়েছে ২২০ টাকা।
শুধু ভাড়াই নয়, বদলে গেছে চালকের আচরণও। বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ সামলাতে তিনি ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে চাইছেন না। কারণ অ্যাপের নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী বহন করলে জ্বালানি, কমিশন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকছে কম টাকা।
জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রথম ধাক্কাটা এভাবেই পড়ছে পরিবহন খাতে। সাধারণ যাত্রীর খরচে।
২১এ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু দাম বাড়ল কিনা, তা নয়। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ কতটা, আর বিপিসির লোকসানের হিসাবই বা কতটা সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
পাঁচ মাসে বাড়লো ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা
২১এ সেপ্টেম্বরের আগে ১লা জুলাই ও ১৯এ এপ্রিল দাম বাড়ানোর সময়ও কারণ হিসাবে একই কথা বলেছিলো সরকার।
১৮ই এপ্রিল থেকে ২১এ সেপ্টেম্বর এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশে বিভিন্ন তেলের লিটার প্রতি দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা।
এই সময়ে ডিজেল ১০০ থেকে ৩৫ টাকা বা ৩৫ শতাংশ বেড়ে সোমবার উঠেছে ১৩৫ টাকায়।
অকটেন ১২০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা বা ৩৭.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা।
পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ৪৪ টাকা বা ৩৭.৯৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা।
এই পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কেরোসিনের দাম। শতাংশের হিসাবে বেড়েছে ৩৮.৩৯ শতাংশ। ১১২ টাকা ৪৩ টাকা বেড়ে এখন লিটার প্রতি কেরেসিনের দাম ১৫৫ টাকা।
কতটা অস্থির আন্তর্জাতিক তেলের বাজার
জ্বালানি তেলের রেকর্ড দামের ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের প্রেস রিলিজে বেশ কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছে।
প্রধান কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার দাবি করা হয়েছে।
এখানে সরকারের যুক্তির একটি বড় ভিত্তি আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যা এখনও বর্তমান। গত কয়েক সপ্তাহে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার।
১০ই সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলা বাড়ার পর একদিনে ব্রেন্টের দাম ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১০৭ দশমিক ৬৩ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ১০২ দশমিক ৪৮ ডলারে উঠে যায়।
এরপর ১৪ই সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পর সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে দাম আরও বাড়ে।
তবে সবশেষ সোমবার ২১এ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম কমেছে ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে।
এর কারণে হিসাবে কেএমএম ক্যাপিটালের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, “মনে হচ্ছে, এ সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক কোনো পথ তৈরি হতে পারে। এমন আশায় তেলের দামে থাকা ঝুঁকির প্রিমিয়াম কিছুটা কমে যাচ্ছে।”
“তবে সেই আশা সত্যিই বাস্তবসম্মত কি না, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। সময়ই তা বলে দেবে,” বলেও মন্তব্য করেছেন এই বিশ্লেষক।
তবে রয়টার্স বলছে, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলেও সৌদি আরব বিকল্প পথে তেল রপ্তানি বাড়াতে পারায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
জ্বালানি-বাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে সৌদির তেল রপ্তানি দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেলে নেমে গেলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল যাওয়ার পরিমাণও অগাস্টের দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল থেকে গত ছয় দিনে গড়ে ২৯ লাখ ব্যারেলে উঠেছে।
তবে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১২টি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে, আগের সপ্তাহান্তে যা ছিল ৩৫টি।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতো।
জাহাজভাড়ার চাপ বেড়েছে কতটা
সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আরেকটি প্রধান কারণ হিসাবে ফ্রেইট চার্জ বা পরিবহন ভাড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে’ বলে জানানো হয়েছে।
সহজ করে বললে, জাহাজে তেল আনা হলে- তেল কেনার দামের বাইরে জাহাজে করে সেই তেল বাংলাদেশে পৌঁছানোর যে পরিবহন খরচ, সেটাই ফ্রেইট চার্জ।
এর এক আদর্শ উদাহরণ হতে পারে এমটি নিমেনিয়া জাহাজের উদাহরণ।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে জানায়, জাহাজটি ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রামের পথে ছিলো।
কিন্তু লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে না এসে জিব্রাল্টার প্রণালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চট্টগ্রামের দিকে আসতে হয়।
এতে পাড়ি দিতে হয় অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল পথ। বাড়তি পরিবহন ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৪ লাখ মার্কিন ডলার। টাকার অংকে তাতেই খরচ বেড়ে যায় প্রায় ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
তবে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত অতিরিক্ত খরচ ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করেছিলো শিপিং করপোরেশন।
এতে বেড়ে গিয়েছিলো সময়ও। ওই জাহাজের চট্টগ্রামে পৌঁছাতে লেগেছিলো প্রায় ৫০ দিন। অথচ স্বাভাবিক পথে এই যাত্রায় সময় লাগতো মাত্র ১৩ থেকে ১৫ দিন।
অর্থাৎ সংঘাতের কারণে শুধু তেলের আন্তর্জাতিক দাম নয়, তেল দেশে পৌঁছানোর সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
এতো গেলো বাংলাদেশের উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে।
২৩এ জুলাই রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তেলবাহী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে।
এতে একটি যাত্রার সময় ১৯ দিন থেকে বেড়ে ৪৮ দিন এবং জ্বালানি খরচ ১২ লাখ ৬০ হাজার ডলার থেকে ২৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
৫ই অগাস্ট এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের জাহাজভাড়া মাত্র কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর কারণ হিসাবে, দীর্ঘ বিকল্প পথ, জাহাজের সংকট এবং বাড়তি জ্বালানি খরচকে দায়ী করা হয়।
বিপিসির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ও অর্থ বিভাগের সরকারি কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে ২০২০–২১ অর্থবছরেই ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিলো বিপিসি।
তবে ২০২১-২২ অর্থবছরেই মূল বড় লোকসানের ধাক্কা আসে। ওই বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির লোকসান হয় প্রায় ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।
এরপর ২০২২–২৩ সালে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি, ২০২৩–২৪ সালে প্রায় ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২৪–২৫ সালে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে।
অর্থাৎ পাঁচ অর্থবছরে বিপিসির নিট লাভ প্রায় ১৭ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত লাভ-লোকসানের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই বলা যাচ্ছে না।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ২রা সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতো, তাই তখন কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন হয়নি।
তবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ জানাতে গিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের প্রেস রিলিজে জানিয়েছে, দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখায় মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
আর সেটা চলতে থাকলে বছরে তাদের লোকসান হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
যদিও সেপ্টেম্বরের সবশেষ দাম বৃদ্ধির হিসাব বাদ দিলেও এপ্রিল থেকে দুই দফায় সরকার বিভিন্ন জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিলো ১৫ টাকা থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত।
এরপরও সরকারের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে প্রতি লিটার ডিজেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
সরকার পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত হিসাব দিয়ে দেওয়া হলেও লিটার প্রতি দাম ৮৯ টাকা লোকসানের মধ্যে ঠিক কোন খাতে কত টাকা- আন্তর্জাতিক পণ্যদর, প্রিমিয়াম, জাহাজভাড়া, বীমা, কর-শুল্ক, পরিবহন, বিপিসির অন্যান্য খরচ কত; সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যে তার বিস্তারিত হিসাব নেই।
তেল পাচারের যুক্তি
জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণ হিসাবে পাশ্ববর্তী দেশের উদাহরণ দিয়ে পাচার ঠেকানোকেও যুক্তি হিসাবে দেখিয়েছে সরকার।
এ জন্য বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশে ডিজেলের দাম উল্লেখ করেছে।
তাদের হিসাবে- বর্তমানে ভারতে (কলকাতা) এক লিটার ডিজেলের মূল্য ১৩৪.৭৬ টাকা। যেখানে বাংলাদেশে এখন ১ লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা।
মায়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১.২৪ টাকা, শ্রীলংকায় ১৭৯.৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭.০০ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০.৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮.৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৪৪.৭৯ টাকা বলেও উল্লেখ করা হয়।
ভারতে জ্বালানি পাচারের আশঙ্কা একেবারে নতুন নয়। সীমান্তে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডিজেল পাচারের একাধিক ঘটনার নজিরও আছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে চুয়াডাঙ্গায় ২১২ লিটার ডিজেল জব্দ করে বিজিবি। বিজিবির ভাষ্য, তেলটি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল। একটি ভ্যান থেকে তেলটি উদ্ধার করা হয়; চালক পালিয়ে যায়।
এর আগে বেনাপোল সীমান্তেও জ্বালানি পাচার ঠেকাতে ভারতীয় ট্রাকের তেলের মাত্রা পরীক্ষা শুরু করেছিল বিজিবি।
তবে এসব ঘটনা সীমান্তে পাচারের ঝুঁকি থাকার প্রমাণ হলেও, এর মাধ্যমে দেশে বিক্রি হওয়া মোট জ্বালানি তেলের কতটা ভারতে পাচার হচ্ছে তার পরিমাণ জানা যায় না।
আগে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের নির্দিষ্ট মাসিক ব্যবস্থা ছিলো না। আইন অনুযায়ী দাম নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। গণশুনানি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাম ঠিক হতো।
২০২২ সালের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দেয় আইএমএফ।
পরে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন সংস্থাটির কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নেয়, তখন আইএমএফ বেশ কিছু শর্ত দেয়। অন্যতম প্রধান শর্ত ছিলো জ্বালানি খাতে সরকারকে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করতে হবে।
আইএমএফের চাপে পড়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আইন সংশোধনের পর ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা নেয়।
শেষ পর্যন্ত আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে ও ভর্তুকির চাপ এড়াতেই ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে শেখ হাসিনার সরকার।
এই ব্যবস্থায় শুধু ক্রুড তেলের দাম নয়, আন্তর্জাতিক পরিশোধিত পণ্যের দর, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, কর-শুল্ক, দেশের ভেতরের পরিবহন খরচ এবং ডিলার-এজেন্ট কমিশনের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
যা অব্যাহত রয়েছে এখনো।
কিন্তু ভোক্তার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে সরকার যে সংকটে ভুগছে, এর ফলে যে হারে দাম বাড়ানো হলো তা তার চেয়েও বেশি অস্বাভাবিক।”
তার প্রশ্ন, দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি কেন গণশুনানির বাইরে থাকবে। তিনি বলেন, “দাম বৃদ্ধিটা আগে বিইআরসি’র হাতে ছিলো। তাতে গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ হলো। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এটা নষ্ট করা হয়েছে। বিইআরসি দাম ঠিক করলে সাধারণ মানুষ এর যৌক্তিকতা বুঝতে পারতো।”
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে জীবনযাত্রা ও ব্যবসার ব্যয় বাড়বে।
তিনি জ্বালানির দাম নির্ধারণের হিসাব আরও স্বচ্ছ করার এবং পরিবহন ভাড়া ও বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে এর মধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। আর পরিবহন ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব পড়বে সর্বত্র।
তাই জ্বালানি তেলের দাম যতই যৌক্তিক হোক সরকারকে এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হবে বলেই মনে করেন শামসুল আলম।
তার ভাষায়, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন না হয় বেড়েছে কিন্তু আর কারও তো বাড়েনি। এই মূল্যবৃদ্ধি ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে।”
তেলের বাজারে আগুন, যৌক্তিকতার সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব
পাঁচ মাসে বাংলাদেশে লিটার প্রতি বিভিন্ন তেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা। এরপরও এই সময়ে বিপিসি’র লস ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। তবে এর আগের পাঁচ অর্থবছরে বিপিসির নিট লাভ ছিলো ১৭ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। লাভ লসের এই হিসাব ছাড়াও প্রশ্ন রয়েছে আইএফের প্রেসক্রিপশনে বিইআরসি গণশুনানি বাদ দিয়ে সরকারের দাম নির্ধারণের এই প্রক্রিয়া নিয়েও।
ধানমন্ডি থেকে বনানী। রবিবারও উবারে বাইক ভাড়া ছিলো ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। আজ একই পথে একজন যাত্রীকে দিতে হয়েছে ২২০ টাকা।
শুধু ভাড়াই নয়, বদলে গেছে চালকের আচরণও। বাড়তি জ্বালানি খরচের চাপ সামলাতে তিনি ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে চাইছেন না। কারণ অ্যাপের নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী বহন করলে জ্বালানি, কমিশন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকছে কম টাকা।
জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রথম ধাক্কাটা এভাবেই পড়ছে পরিবহন খাতে। সাধারণ যাত্রীর খরচে।
২১এ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা শুধু দাম বাড়ল কিনা, তা নয়। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ কতটা, আর বিপিসির লোকসানের হিসাবই বা কতটা সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
পাঁচ মাসে বাড়লো ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা
২১এ সেপ্টেম্বরের আগে ১লা জুলাই ও ১৯এ এপ্রিল দাম বাড়ানোর সময়ও কারণ হিসাবে একই কথা বলেছিলো সরকার।
১৮ই এপ্রিল থেকে ২১এ সেপ্টেম্বর এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশে বিভিন্ন তেলের লিটার প্রতি দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা থেকে ৪৫ টাকা।
এই সময়ে ডিজেল ১০০ থেকে ৩৫ টাকা বা ৩৫ শতাংশ বেড়ে সোমবার উঠেছে ১৩৫ টাকায়।
অকটেন ১২০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা বা ৩৭.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা।
পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ৪৪ টাকা বা ৩৭.৯৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা।
এই পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কেরোসিনের দাম। শতাংশের হিসাবে বেড়েছে ৩৮.৩৯ শতাংশ। ১১২ টাকা ৪৩ টাকা বেড়ে এখন লিটার প্রতি কেরেসিনের দাম ১৫৫ টাকা।
কতটা অস্থির আন্তর্জাতিক তেলের বাজার
জ্বালানি তেলের রেকর্ড দামের ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের প্রেস রিলিজে বেশ কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছে।
প্রধান কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার দাবি করা হয়েছে।
এখানে সরকারের যুক্তির একটি বড় ভিত্তি আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যা এখনও বর্তমান। গত কয়েক সপ্তাহে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার।
১০ই সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলা বাড়ার পর একদিনে ব্রেন্টের দাম ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ১০৭ দশমিক ৬৩ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ১০২ দশমিক ৪৮ ডলারে উঠে যায়।
এরপর ১৪ই সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পর সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে দাম আরও বাড়ে।
তবে সবশেষ সোমবার ২১এ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে।
সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ০৬ ডলারে নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম কমেছে ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে।
এর কারণে হিসাবে কেএমএম ক্যাপিটালের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, “মনে হচ্ছে, এ সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক কোনো পথ তৈরি হতে পারে। এমন আশায় তেলের দামে থাকা ঝুঁকির প্রিমিয়াম কিছুটা কমে যাচ্ছে।”
“তবে সেই আশা সত্যিই বাস্তবসম্মত কি না, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। সময়ই তা বলে দেবে,” বলেও মন্তব্য করেছেন এই বিশ্লেষক।
তবে রয়টার্স বলছে, ইয়েমেনের হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলেও সৌদি আরব বিকল্প পথে তেল রপ্তানি বাড়াতে পারায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
জ্বালানি-বাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অগাস্টে সৌদির তেল রপ্তানি দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেলে নেমে গেলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল যাওয়ার পরিমাণও অগাস্টের দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল থেকে গত ছয় দিনে গড়ে ২৯ লাখ ব্যারেলে উঠেছে।
তবে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১২টি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে, আগের সপ্তাহান্তে যা ছিল ৩৫টি।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতো।
জাহাজভাড়ার চাপ বেড়েছে কতটা
সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আরেকটি প্রধান কারণ হিসাবে ফ্রেইট চার্জ বা পরিবহন ভাড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে’ বলে জানানো হয়েছে।
সহজ করে বললে, জাহাজে তেল আনা হলে- তেল কেনার দামের বাইরে জাহাজে করে সেই তেল বাংলাদেশে পৌঁছানোর যে পরিবহন খরচ, সেটাই ফ্রেইট চার্জ।
এর এক আদর্শ উদাহরণ হতে পারে এমটি নিমেনিয়া জাহাজের উদাহরণ।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে জানায়, জাহাজটি ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রামের পথে ছিলো।
কিন্তু লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে না এসে জিব্রাল্টার প্রণালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চট্টগ্রামের দিকে আসতে হয়।
এতে পাড়ি দিতে হয় অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল পথ। বাড়তি পরিবহন ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৪ লাখ মার্কিন ডলার। টাকার অংকে তাতেই খরচ বেড়ে যায় প্রায় ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
তবে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত অতিরিক্ত খরচ ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করেছিলো শিপিং করপোরেশন।
এতে বেড়ে গিয়েছিলো সময়ও। ওই জাহাজের চট্টগ্রামে পৌঁছাতে লেগেছিলো প্রায় ৫০ দিন। অথচ স্বাভাবিক পথে এই যাত্রায় সময় লাগতো মাত্র ১৩ থেকে ১৫ দিন।
অর্থাৎ সংঘাতের কারণে শুধু তেলের আন্তর্জাতিক দাম নয়, তেল দেশে পৌঁছানোর সময় ও পরিবহন ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
এতো গেলো বাংলাদেশের উদাহরণ। আন্তর্জাতিক বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে।
২৩এ জুলাই রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তেলবাহী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে।
এতে একটি যাত্রার সময় ১৯ দিন থেকে বেড়ে ৪৮ দিন এবং জ্বালানি খরচ ১২ লাখ ৬০ হাজার ডলার থেকে ২৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
৫ই অগাস্ট এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের জাহাজভাড়া মাত্র কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর কারণ হিসাবে, দীর্ঘ বিকল্প পথ, জাহাজের সংকট এবং বাড়তি জ্বালানি খরচকে দায়ী করা হয়।
বিপিসির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ও অর্থ বিভাগের সরকারি কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে ২০২০–২১ অর্থবছরেই ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিলো বিপিসি।
তবে ২০২১-২২ অর্থবছরেই মূল বড় লোকসানের ধাক্কা আসে। ওই বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির লোকসান হয় প্রায় ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।
এরপর ২০২২–২৩ সালে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি, ২০২৩–২৪ সালে প্রায় ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২৪–২৫ সালে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে।
অর্থাৎ পাঁচ অর্থবছরে বিপিসির নিট লাভ প্রায় ১৭ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত লাভ-লোকসানের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই বলা যাচ্ছে না।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ২রা সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতো, তাই তখন কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন হয়নি।
তবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ জানাতে গিয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের প্রেস রিলিজে জানিয়েছে, দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখায় মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
আর সেটা চলতে থাকলে বছরে তাদের লোকসান হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
যদিও সেপ্টেম্বরের সবশেষ দাম বৃদ্ধির হিসাব বাদ দিলেও এপ্রিল থেকে দুই দফায় সরকার বিভিন্ন জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিলো ১৫ টাকা থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত।
এরপরও সরকারের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক দরে প্রতি লিটার ডিজেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
সরকার পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত হিসাব দিয়ে দেওয়া হলেও লিটার প্রতি দাম ৮৯ টাকা লোকসানের মধ্যে ঠিক কোন খাতে কত টাকা- আন্তর্জাতিক পণ্যদর, প্রিমিয়াম, জাহাজভাড়া, বীমা, কর-শুল্ক, পরিবহন, বিপিসির অন্যান্য খরচ কত; সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যে তার বিস্তারিত হিসাব নেই।
তেল পাচারের যুক্তি
জ্বালানির দাম বাড়ানোর কারণ হিসাবে পাশ্ববর্তী দেশের উদাহরণ দিয়ে পাচার ঠেকানোকেও যুক্তি হিসাবে দেখিয়েছে সরকার।
এ জন্য বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশে ডিজেলের দাম উল্লেখ করেছে।
তাদের হিসাবে- বর্তমানে ভারতে (কলকাতা) এক লিটার ডিজেলের মূল্য ১৩৪.৭৬ টাকা। যেখানে বাংলাদেশে এখন ১ লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা।
মায়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১.২৪ টাকা, শ্রীলংকায় ১৭৯.৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭.০০ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০.৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮.৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৪৪.৭৯ টাকা বলেও উল্লেখ করা হয়।
ভারতে জ্বালানি পাচারের আশঙ্কা একেবারে নতুন নয়। সীমান্তে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডিজেল পাচারের একাধিক ঘটনার নজিরও আছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে চুয়াডাঙ্গায় ২১২ লিটার ডিজেল জব্দ করে বিজিবি। বিজিবির ভাষ্য, তেলটি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল। একটি ভ্যান থেকে তেলটি উদ্ধার করা হয়; চালক পালিয়ে যায়।
এর আগে বেনাপোল সীমান্তেও জ্বালানি পাচার ঠেকাতে ভারতীয় ট্রাকের তেলের মাত্রা পরীক্ষা শুরু করেছিল বিজিবি।
তবে এসব ঘটনা সীমান্তে পাচারের ঝুঁকি থাকার প্রমাণ হলেও, এর মাধ্যমে দেশে বিক্রি হওয়া মোট জ্বালানি তেলের কতটা ভারতে পাচার হচ্ছে তার পরিমাণ জানা যায় না।
দাম নির্ধারণের পদ্ধতি, যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা
আগে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের নির্দিষ্ট মাসিক ব্যবস্থা ছিলো না। আইন অনুযায়ী দাম নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। গণশুনানি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাম ঠিক হতো।
২০২২ সালের শেষ দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দেয় আইএমএফ।
পরে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন সংস্থাটির কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নেয়, তখন আইএমএফ বেশ কিছু শর্ত দেয়। অন্যতম প্রধান শর্ত ছিলো জ্বালানি খাতে সরকারকে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করতে হবে।
আইএমএফের চাপে পড়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আইন সংশোধনের পর ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা নেয়।
শেষ পর্যন্ত আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে ও ভর্তুকির চাপ এড়াতেই ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে শেখ হাসিনার সরকার।
এই ব্যবস্থায় শুধু ক্রুড তেলের দাম নয়, আন্তর্জাতিক পরিশোধিত পণ্যের দর, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, কর-শুল্ক, দেশের ভেতরের পরিবহন খরচ এবং ডিলার-এজেন্ট কমিশনের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
যা অব্যাহত রয়েছে এখনো।
কিন্তু ভোক্তার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে সরকার যে সংকটে ভুগছে, এর ফলে যে হারে দাম বাড়ানো হলো তা তার চেয়েও বেশি অস্বাভাবিক।”
তার প্রশ্ন, দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি কেন গণশুনানির বাইরে থাকবে। তিনি বলেন, “দাম বৃদ্ধিটা আগে বিইআরসি’র হাতে ছিলো। তাতে গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণ হলো। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এটা নষ্ট করা হয়েছে। বিইআরসি দাম ঠিক করলে সাধারণ মানুষ এর যৌক্তিকতা বুঝতে পারতো।”
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে জীবনযাত্রা ও ব্যবসার ব্যয় বাড়বে।
তিনি জ্বালানির দাম নির্ধারণের হিসাব আরও স্বচ্ছ করার এবং পরিবহন ভাড়া ও বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে এর মধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। আর পরিবহন ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব পড়বে সর্বত্র।
তাই জ্বালানি তেলের দাম যতই যৌক্তিক হোক সরকারকে এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হবে বলেই মনে করেন শামসুল আলম।
তার ভাষায়, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন না হয় বেড়েছে কিন্তু আর কারও তো বাড়েনি। এই মূল্যবৃদ্ধি ক্রয়ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে।”
বিষয়: