হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলের দাম নিয়ে যে হুঁশিয়ারি ছিলো তা পুরোপুরি সত্য হয়নি। চীনের চাহিদা কমে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড রপ্তানি, কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড় এবং হরমুজের বিকল্প রুট ব্যবহারের মতো কারণগুলো আপাত ধাক্কা সামাল দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন এই পরিকল্পনা আর কতদিন টিকবে?
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএমআপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
হরমুজ প্রণালি তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ থাকলেও বড় ধাক্কা সামলে নিয়েছে জ্বালানি তেলের বাজার।
দশকের পর দশক ধরে তেল দুনিয়ার বাঘা বাঘা ব্যবসায়ী, শীর্ষ নির্বাহী আর বাজার বিশ্লেষকদের মুখে একটা চেনা হুঁশিয়ারি শোনা যেত- হরমুজ প্রণালি একবার বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ থাকলেও বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধাক্কা সামলে নিয়েছে। বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা থাকায় এখনো ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে রয়েছে। অর্থাৎ ২০০ থেকে ৩০০ ডলার দাম হওয়ার আগাম পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এর পেছনের কারণ হিসাবে দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- তিনটি প্রধান ঘটনা, যেগুলোর মাধ্যমেই সামাল দেওয়া গেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা দৈনিক ১ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেলের বিশাল ঘাটতি।
এছাড়া, যুদ্ধ লাগার আগে দেশগুলোর জমিয়ে রাখা উদ্বৃত্ত মজুতও এই ধাক্কা সামলাতে বড় ‘কুশন’ বা ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও বেশ খোস মেজাজেই বলেছেন, “সবাই ভেবেছিল পরিস্থিতি নরক হয়ে যাবে। আজ দেখলাম তেলের দাম ৯৬ ডলার। অথচ লোকে ভাবছিলো এটা ৩০০ ডলার হয়ে যাবে!”
তবে আসল খেলাটা নাকি এখানেই শেষ নয়, বলছে দ্য ইকোনমিক টাইমস। এই জোড়াতালির ব্যাক-আপ প্ল্যান আর কতদিন টিকবে তা নিয়েও প্রতিবেদনে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার কবে পুরোদমে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে আর তেলের দামের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে, তাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা অনিশ্চয়তা বলেও দাবি করা হয়েছে।
সামগ্রিক চিত্র
তেল বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক দেশ চীন। শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা ‘ভরটেক্সা লিমিটেড’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে চীন অপরিশোধিত তেল আমদানি গত বছরের গড় আমদানির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
এই হ্রাসকৃত চাহিদার পরিমাণ যুদ্ধজনিত কারণে বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-পঞ্চমাংশ (হিসাবের ভিন্নতা অনুযায়ী) ঘাটতি একাই পূরণ করে দিচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘সুইং সাপ্লায়ার’ বা বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
গত মে মাসে আমেরিকার অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি রপ্তানির পরিমাণ গত বছরের সামগ্রিক দৈনিক গড় রপ্তানির চেয়ে ২০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি ছিলো। এছাড়াও অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ বাজারের ওপর চাপ অনেকটাই কমিয়েছে।
বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিগুলো সমন্বিতভাবে তাদের কৌশলগত জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে। একই সাথে পারস্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল সরবরাহ পাঠাচ্ছে।
সমস্ত ঝুঁকি ও সামরিক হুমকি উপেক্ষা করেই কিছু ট্যাংকার এখনো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অস্পষ্ট কৌশল অবলম্বন করে এই প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন সচল রেখেছে।
গ্রিসের সবচেয়ে বড় জাহাজ মালিকানা কোম্পানি ‘অ্যাঞ্জেলিকুশিস গ্রুপ’-এর প্রধান নির্বাহী মারিয়া অ্যাঞ্জেলিকুশিস বলেন, “এই সংকটের তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও বিশ্ব অর্থনীতি বিস্ময়কর রকম সহনশীলতা দেখিয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ এবং এশিয়ার এলএনজি’র দাম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে ঠিকই, তবে তা আকাশচুম্বী বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, যা অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে আশঙ্কা করেছিলাম।”
আপাতত তেলের দাম ২০০ ডলারের নিচে থাকায় ইরানের সাথে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। তবে তেলের দাম যদি আবারও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বাঁচাতে ওয়াশিংটনের ওপর দ্রুত চুক্তি করার চাপ তীব্র হবে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ, বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত এখন রেকর্ড গতিতে কমছে, যা বাজারকে যে কোনো নতুন সংকটের মুখে চরম অরক্ষিত করে তুলবে। জোগান কমতে থাকায় সামান্যতম কোনো অচলাবস্থাও তেলের দামকে এক ধাক্কায় বহুদূর নিয়ে যেতে পারে।
প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের কমোডিটি পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিমকো’র পণ্য বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান গ্রেগ শেয়ারনাউ বলেন, “প্রতি সপ্তাহে বাজার থেকে ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন (৭ থেকে ৮ কোটি) ব্যারেল তেল কমে যাচ্ছে। আপনি তো আর চিরকাল এভাবে চলতে পারবেন না। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাজার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে আর কোনো বাড়তি বিকল্প ব্যবস্থা অবশিষ্ট থাকবে না, কারণ মজুতভাণ্ডার প্রায় শেষ হয়ে আসছে।”
আমেরিকার উৎপাদন জোয়ার
গত এক দশক আগে শুরু হওয়া ‘শেল রেভল্যুশন’ বা ভূগর্ভস্থ পাথর চিরে তেল উত্তোলনের প্রযুক্তির কল্যাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দেশটিকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি নিট রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
ঘরোয়া জ্বালানির এই প্রাচুর্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এমন কিছু ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে যা এক সময় অচিন্তনীয় ছিল।
যার মধ্যে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করাই নয়, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনাও রয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে ওয়াশিংটন তার এই জ্বালানি শক্তিকে পুরোদমে ব্যবহার করছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার অঙ্গীকার করেছে।
গত মাসে মাত্র এক সপ্তাহেই এই মজুত থেকে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল করে তেল উত্তোলন করা হয়েছে, যা আগে অসম্ভব বলে মনে করা হতো। এই উত্তোলিত তেলের প্রায় অর্ধেকই পাঠানো হয়েছে ইউরোপ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গন্তব্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই রপ্তানি বৃদ্ধি এবং চীনের বাজারের মন্দা এই দুই শক্তির জের ধরেই বিশ্ব বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিজিক্যাল ক্রুড প্রাইস ‘ডেটেড ব্রেন্ট’-এর দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধের শুরুতে রেকর্ড ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক ফিউচার মার্কেটের মেয়াদ শেষের সময়টাতেও বাজারে বড় ধরনের কোনো ঘাটতির লক্ষণ দেখা যায়নি।
তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতাও এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক তেলের মজুত গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। সামনে গ্রীষ্মকালীন পিক ডিমান্ড বা তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার মৌসুম ঘনিয়ে আসায় জরুরি মজুত ও জ্বালানি স্টক এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে।
পিমকোর শেয়ারনাউ বলেন, “আমাদের পক্ষে এই পরিমাণ রপ্তানি ধরে রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও জানান, ওকলাহোমার কুশিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন তেল সংরক্ষণাগারগুলোর মজুত এখন প্রায় শেষের দিকে।
একই সাথে মার্কিন শোধনাগারগুলো অভ্যন্তরীণ জ্বালানির চাহিদা মেটাতে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। ফলে এশিয়ার বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের তুলনায় মার্কিন তেলের প্রিমিয়াম বা বাড়তি দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি বড় কৌশলগত চাল চেলেছে। তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু ছাড় দিয়েছে, যার ফলে বিশেষ করে ভারতীয় শোধনাগারগুলোর জন্য রুশ তেল কেনা সহজ হয়েছে। মে মাসে ভারতে রাশিয়ার তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১৭ দশমিক ৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি।
চীনের প্রত্যাবর্তন ও বাজার পরিস্থিতি
অধিকাংশ জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী মনে করছেন, চীন আবার আগের মতো জ্বালানি তেল কেনা শুরুলেই তেলের দাম আবার আকাশচুম্বী হবে।
উক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেলে পৌঁছানো চীনের তেলের ক্ষুধা আপাতত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ দেশটি তাদের বিশাল
কৌশলগত মজুত বাড়ানো সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
পাশাপাশি, কয়লার মতো কাঁচামাল থেকে রাসায়নিক তৈরিতে চীনের ঝোঁক এবং দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির রেকর্ড বিক্রি পেট্রোলের চাহিদাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
‘কেপলার’ এবং ‘এনার্জি অ্যাসপেক্টস লিমিটেড’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে ও জুন মাসে চীনের শোধনাগারগুলোর দৈনিক তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে, যা ২০২০ সালের মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ের পর সর্বনিম্ন। অথচ গত বছর এই গড় ছিল দৈনিক ১ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেল।
আইএনজি গ্রুপের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, “বিশ্ব বাজারে তৈরি হওয়া এই ভারসাম্যের পেছনে চীনের পিছিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যা তেলের দামকে নাগালের মধ্যে রেখেছে। এই বিষয়টি বাজার বিশ্লেষকদের অনেকটাই অবাক করেছে।”
হরমুজের বর্তমান চিত্র
পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারীরা সংকটের শুরুর দিনগুলোতে দ্রুত কিছু বিকল্প বের করেছিল।
সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরে পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের বাইরে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল নিয়ে আসছে।
ঝুঁকি নিয়ে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এখনও এই প্রণালি পারাপার করছে, যার বেশিরভাগই দ্বিপাক্ষিক সরকারি চুক্তি বা বিশেষ মার্কিন সহায়তায় সম্পন্ন হচ্ছে।
তবে যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় দৈনিক প্রায় ১০০ জাহাজের তুলনায় বর্তমানে এই সংখ্যা কমে মাত্র ২ থেকে ৩টিতে নেমে এসেছে।
জিপিএস জ্যামিং এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচলের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অবশ্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত দুই মাসে প্রায় ১,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করেছে, যা আগের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি।
রেমন্ড জেমসের বিশ্লেষক পাভেল মোলচানভ বলেন, “অর্থপূর্ণ পুনরুদ্ধার বলতে আমরা যা বুঝি, তার জন্য সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০টি জাহাজের যাতায়াত প্রয়োজন। তবে মার্কিন-ইরান টেকসই কোনো শান্তি চুক্তি ছাড়া তা বাস্তবসম্মত নয়, যা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।”
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিয়ত আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও পরোক্ষ চাপও বড় ভূমিকা রাখছে। যার কারণে বড় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মেয়াদে তেলের ওপর বাজি ধরতে ভয় পাচ্ছেন।
বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, শান্তি চুক্তির সামান্যতম আভাসেই দাম হঠাৎ করে পড়ে যাওয়ার ভয়ে বড় বড় ‘অয়েল বুলস’ (যারা দাম বাড়ার পক্ষে বাজি ধরেন) এখন সাইডলাইনে গিয়ে বসে আছেন। বাজি ধরলেও, তা নিচ্ছেন খুবই ছোট অঙ্কের এবং অতি অল্প সময়ের জন্য।
ঝুঁকি নেওয়ার এই অনীহার কারণে বাজারে কাগজের টাকার প্রবাহে লাগাম লেগেছে, যা তেলের দামকে কৃত্রিমভাবে বাগে রেখেছে।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাগুলো আপাতত বড় ধরনের বিপর্যয় রুখে দিয়েছে।
তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়া এই জোড়াতালির স্বস্তি কতদিন টিকবে?
বিশ্বের শীর্ষ স্বাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভিটল বাহরাইনের প্রধান টম বেকার এই সপ্তাহে একটি সম্মেলনে বলেন, “সবাই ভাবছে খুব দ্রুতই হয়তো কোনো সমাধান চলে আসবে। কিন্তু উৎপাদন যত দ্রুতই স্বাভাবিক হোক না কেন, বাজারে যে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই শূন্যস্থান কিন্তু রয়েই যাবে।”
হরমুজ সংকটের পরও কেন বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০০ ডলার হয়নি
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলের দাম নিয়ে যে হুঁশিয়ারি ছিলো তা পুরোপুরি সত্য হয়নি। চীনের চাহিদা কমে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড রপ্তানি, কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড় এবং হরমুজের বিকল্প রুট ব্যবহারের মতো কারণগুলো আপাত ধাক্কা সামাল দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন এই পরিকল্পনা আর কতদিন টিকবে?
দশকের পর দশক ধরে তেল দুনিয়ার বাঘা বাঘা ব্যবসায়ী, শীর্ষ নির্বাহী আর বাজার বিশ্লেষকদের মুখে একটা চেনা হুঁশিয়ারি শোনা যেত- হরমুজ প্রণালি একবার বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ থাকলেও বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধাক্কা সামলে নিয়েছে। বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা থাকায় এখনো ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে রয়েছে। অর্থাৎ ২০০ থেকে ৩০০ ডলার দাম হওয়ার আগাম পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এর পেছনের কারণ হিসাবে দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- তিনটি প্রধান ঘটনা, যেগুলোর মাধ্যমেই সামাল দেওয়া গেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা দৈনিক ১ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেলের বিশাল ঘাটতি।
এছাড়া, যুদ্ধ লাগার আগে দেশগুলোর জমিয়ে রাখা উদ্বৃত্ত মজুতও এই ধাক্কা সামলাতে বড় ‘কুশন’ বা ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও বেশ খোস মেজাজেই বলেছেন, “সবাই ভেবেছিল পরিস্থিতি নরক হয়ে যাবে। আজ দেখলাম তেলের দাম ৯৬ ডলার। অথচ লোকে ভাবছিলো এটা ৩০০ ডলার হয়ে যাবে!”
তবে আসল খেলাটা নাকি এখানেই শেষ নয়, বলছে দ্য ইকোনমিক টাইমস। এই জোড়াতালির ব্যাক-আপ প্ল্যান আর কতদিন টিকবে তা নিয়েও প্রতিবেদনে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার কবে পুরোদমে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে আর তেলের দামের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে, তাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা অনিশ্চয়তা বলেও দাবি করা হয়েছে।
সামগ্রিক চিত্র
তেল বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক দেশ চীন। শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা ‘ভরটেক্সা লিমিটেড’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে চীন অপরিশোধিত তেল আমদানি গত বছরের গড় আমদানির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
এই হ্রাসকৃত চাহিদার পরিমাণ যুদ্ধজনিত কারণে বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-পঞ্চমাংশ (হিসাবের ভিন্নতা অনুযায়ী) ঘাটতি একাই পূরণ করে দিচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘সুইং সাপ্লায়ার’ বা বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
গত মে মাসে আমেরিকার অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি রপ্তানির পরিমাণ গত বছরের সামগ্রিক দৈনিক গড় রপ্তানির চেয়ে ২০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি ছিলো।
এছাড়াও অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ বাজারের ওপর চাপ অনেকটাই কমিয়েছে।
বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিগুলো সমন্বিতভাবে তাদের কৌশলগত জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে। একই সাথে পারস্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল সরবরাহ পাঠাচ্ছে।
সমস্ত ঝুঁকি ও সামরিক হুমকি উপেক্ষা করেই কিছু ট্যাংকার এখনো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অস্পষ্ট কৌশল অবলম্বন করে এই প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন সচল রেখেছে।
গ্রিসের সবচেয়ে বড় জাহাজ মালিকানা কোম্পানি ‘অ্যাঞ্জেলিকুশিস গ্রুপ’-এর প্রধান নির্বাহী মারিয়া অ্যাঞ্জেলিকুশিস বলেন, “এই সংকটের তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও বিশ্ব অর্থনীতি বিস্ময়কর রকম সহনশীলতা দেখিয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ এবং এশিয়ার এলএনজি’র দাম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে ঠিকই, তবে তা আকাশচুম্বী বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, যা অন্তত আমি ব্যক্তিগতভাবে আশঙ্কা করেছিলাম।”
আপাতত তেলের দাম ২০০ ডলারের নিচে থাকায় ইরানের সাথে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। তবে তেলের দাম যদি আবারও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বাঁচাতে ওয়াশিংটনের ওপর দ্রুত চুক্তি করার চাপ তীব্র হবে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ, বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত এখন রেকর্ড গতিতে কমছে, যা বাজারকে যে কোনো নতুন সংকটের মুখে চরম অরক্ষিত করে তুলবে। জোগান কমতে থাকায় সামান্যতম কোনো অচলাবস্থাও তেলের দামকে এক ধাক্কায় বহুদূর নিয়ে যেতে পারে।
প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের কমোডিটি পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিমকো’র পণ্য বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান গ্রেগ শেয়ারনাউ বলেন, “প্রতি সপ্তাহে বাজার থেকে ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন (৭ থেকে ৮ কোটি) ব্যারেল তেল কমে যাচ্ছে। আপনি তো আর চিরকাল এভাবে চলতে পারবেন না। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাজার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে আর কোনো বাড়তি বিকল্প ব্যবস্থা অবশিষ্ট থাকবে না, কারণ মজুতভাণ্ডার প্রায় শেষ হয়ে আসছে।”
আমেরিকার উৎপাদন জোয়ার
গত এক দশক আগে শুরু হওয়া ‘শেল রেভল্যুশন’ বা ভূগর্ভস্থ পাথর চিরে তেল উত্তোলনের প্রযুক্তির কল্যাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দেশটিকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি নিট রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
ঘরোয়া জ্বালানির এই প্রাচুর্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এমন কিছু ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে যা এক সময় অচিন্তনীয় ছিল।
যার মধ্যে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করাই নয়, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনাও রয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে ওয়াশিংটন তার এই জ্বালানি শক্তিকে পুরোদমে ব্যবহার করছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার অঙ্গীকার করেছে।
গত মাসে মাত্র এক সপ্তাহেই এই মজুত থেকে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল করে তেল উত্তোলন করা হয়েছে, যা আগে অসম্ভব বলে মনে করা হতো। এই উত্তোলিত তেলের প্রায় অর্ধেকই পাঠানো হয়েছে ইউরোপ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গন্তব্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই রপ্তানি বৃদ্ধি এবং চীনের বাজারের মন্দা এই দুই শক্তির জের ধরেই বিশ্ব বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিজিক্যাল ক্রুড প্রাইস ‘ডেটেড ব্রেন্ট’-এর দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধের শুরুতে রেকর্ড ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক ফিউচার মার্কেটের মেয়াদ শেষের সময়টাতেও বাজারে বড় ধরনের কোনো ঘাটতির লক্ষণ দেখা যায়নি।
তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতাও এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক তেলের মজুত গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। সামনে গ্রীষ্মকালীন পিক ডিমান্ড বা তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার মৌসুম ঘনিয়ে আসায় জরুরি মজুত ও জ্বালানি স্টক এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে।
পিমকোর শেয়ারনাউ বলেন, “আমাদের পক্ষে এই পরিমাণ রপ্তানি ধরে রাখা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও জানান, ওকলাহোমার কুশিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন তেল সংরক্ষণাগারগুলোর মজুত এখন প্রায় শেষের দিকে।
একই সাথে মার্কিন শোধনাগারগুলো অভ্যন্তরীণ জ্বালানির চাহিদা মেটাতে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। ফলে এশিয়ার বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের তুলনায় মার্কিন তেলের প্রিমিয়াম বা বাড়তি দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন আরেকটি বড় কৌশলগত চাল চেলেছে। তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু ছাড় দিয়েছে, যার ফলে বিশেষ করে ভারতীয় শোধনাগারগুলোর জন্য রুশ তেল কেনা সহজ হয়েছে। মে মাসে ভারতে রাশিয়ার তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১৭ দশমিক ৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি।
চীনের প্রত্যাবর্তন ও বাজার পরিস্থিতি
অধিকাংশ জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী মনে করছেন, চীন আবার আগের মতো জ্বালানি তেল কেনা শুরুলেই তেলের দাম আবার আকাশচুম্বী হবে।
উক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেলে পৌঁছানো চীনের তেলের ক্ষুধা আপাতত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ দেশটি তাদের বিশাল
কৌশলগত মজুত বাড়ানো সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
পাশাপাশি, কয়লার মতো কাঁচামাল থেকে রাসায়নিক তৈরিতে চীনের ঝোঁক এবং দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির রেকর্ড বিক্রি পেট্রোলের চাহিদাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
‘কেপলার’ এবং ‘এনার্জি অ্যাসপেক্টস লিমিটেড’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে ও জুন মাসে চীনের শোধনাগারগুলোর দৈনিক তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে, যা ২০২০ সালের মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ের পর সর্বনিম্ন। অথচ গত বছর এই গড় ছিল দৈনিক ১ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেল।
আইএনজি গ্রুপের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, “বিশ্ব বাজারে তৈরি হওয়া এই ভারসাম্যের পেছনে চীনের পিছিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যা তেলের দামকে নাগালের মধ্যে রেখেছে। এই বিষয়টি বাজার বিশ্লেষকদের অনেকটাই অবাক করেছে।”
হরমুজের বর্তমান চিত্র
পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারীরা সংকটের শুরুর দিনগুলোতে দ্রুত কিছু বিকল্প বের করেছিল।
সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরে পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের বাইরে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল নিয়ে আসছে।
ঝুঁকি নিয়ে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এখনও এই প্রণালি পারাপার করছে, যার বেশিরভাগই দ্বিপাক্ষিক সরকারি চুক্তি বা বিশেষ মার্কিন সহায়তায় সম্পন্ন হচ্ছে।
তবে যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় দৈনিক প্রায় ১০০ জাহাজের তুলনায় বর্তমানে এই সংখ্যা কমে মাত্র ২ থেকে ৩টিতে নেমে এসেছে।
জিপিএস জ্যামিং এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচলের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অবশ্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত দুই মাসে প্রায় ১,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করেছে, যা আগের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি।
রেমন্ড জেমসের বিশ্লেষক পাভেল মোলচানভ বলেন, “অর্থপূর্ণ পুনরুদ্ধার বলতে আমরা যা বুঝি, তার জন্য সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০টি জাহাজের যাতায়াত প্রয়োজন। তবে মার্কিন-ইরান টেকসই কোনো শান্তি চুক্তি ছাড়া তা বাস্তবসম্মত নয়, যা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।”
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিয়ত আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও পরোক্ষ চাপও বড় ভূমিকা রাখছে। যার কারণে বড় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ মেয়াদে তেলের ওপর বাজি ধরতে ভয় পাচ্ছেন।
ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সে ওপেন ইন্টারেস্ট বা অপরিশোধিত তেলের বাজারে চুক্তির পরিমাণ গত আগস্টের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। শান্তি চুক্তির সামান্যতম আশঙ্কায় দাম পড়ে যাওয়ার ভয়ে বড় বিনিয়োগকারীরা আপাতত বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন।
বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, শান্তি চুক্তির সামান্যতম আভাসেই দাম হঠাৎ করে পড়ে যাওয়ার ভয়ে বড় বড় ‘অয়েল বুলস’ (যারা দাম বাড়ার পক্ষে বাজি ধরেন) এখন সাইডলাইনে গিয়ে বসে আছেন। বাজি ধরলেও, তা নিচ্ছেন খুবই ছোট অঙ্কের এবং অতি অল্প সময়ের জন্য।
ঝুঁকি নেওয়ার এই অনীহার কারণে বাজারে কাগজের টাকার প্রবাহে লাগাম লেগেছে, যা তেলের দামকে কৃত্রিমভাবে বাগে রেখেছে।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাগুলো আপাতত বড় ধরনের বিপর্যয় রুখে দিয়েছে।
তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়া এই জোড়াতালির স্বস্তি কতদিন টিকবে?
বিশ্বের শীর্ষ স্বাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভিটল বাহরাইনের প্রধান টম বেকার এই সপ্তাহে একটি সম্মেলনে বলেন, “সবাই ভাবছে খুব দ্রুতই হয়তো কোনো সমাধান চলে আসবে। কিন্তু উৎপাদন যত দ্রুতই স্বাভাবিক হোক না কেন, বাজারে যে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই শূন্যস্থান কিন্তু রয়েই যাবে।”
দ্য ইকোনমিক টাইমস এর প্রতিবেদন অবলম্বনে
বিষয়: