এআই এজেন্ট এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারছে। ফলে, এআই যদি নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল করে বা কারও সিস্টেমে ঢুকে ক্ষতি করে, তাহলে আইনি দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে- এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৭ পিএমআপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করছে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছে এআই এজেন্টরা। তাদের এই সক্ষমতাই তৈরি করছে নতুন আইনি ঝুঁকি।
প্রশ্ন উঠছে, এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দায় নেবে কে?
কয়েকটি উন্নত দেশে এআই নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারবিধি নিয়ে ইতোমধ্যে আইন হয়েছে, সেখানে আইন প্রয়োগ নিয়ে স্পষ্টতাও আছে।
কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এআই নিয়ে আইন চূড়ান্ত করতে পারেনি, খসড়া পর্যায়ে আছে। তাহলে বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনায় ব্যবস্থা কী হবে?
এআই এজেন্ট মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে প্রবেশ করছে- সম্প্রতি বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন ঘটনার কথা জানিয়েছে রয়টার্সকে।
চ্যাটজিপিটি -এর নির্মাতা ওপেনএআই জানাচ্ছে, তাদের একটি এআই এজেন্ট ‘হাগিং ফেইস’ নামে একটি এআই স্টার্টআপ এর সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছিল।
ওপেনএআই আরও জানিয়েছে, এআই এজেন্টগুলোকে তৈরি করা হয়েছিলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করার জন্য। কিন্তু সেই নির্ধারিত সীমা মেনে চলেনি এজেন্টরা।
এআই এজেন্টদের নির্ধারিত ডিজিটাল সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করার আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে ওপেনএআই।
আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আরেকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, এপ্রিলের পর থেকে তাদের ক্লড এআই মডেল তিনটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে।
সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের একটি এআই মডেল অন্য একটি কোম্পানির সিস্টেম হ্যাক করেছিলো বলে জানিয়েছে মেটা।
মেটা আরও জানায়, তাদের এআই মডেলকে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা করছিলো। এই পরীক্ষা পরিচালনা করছিলো ‘ইররেগুলার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
মেটার দাবি, ‘ইররেগুলার’-এর একটি ভুল কনফিগারেশনের কারণে পরীক্ষার সময় এআই মডেলটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়।
‘হাগিং ফেইস’ এর প্রধান নির্বাহী ক্লেম দেলাঙ্গে জানিয়েছেন, ওপেনএআই -এর ঘটনার জন্য তারা মামলা করার পরিকল্পনা করছেন না।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার হামলা ছড়িয়ে পড়লে এবং এসব কর্মকাণ্ডের জন্য নির্মাতারা দায়ভার না নিলে এটি নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কারা মামলা করতে পারে?
এইভাবে এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দায় কার অথবা কীভাবে এর প্রতিকার পাওয়া যাবে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একাধিক পক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রথমত, মামলা করতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। ওই কোম্পানির কর্মী বা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন তারাও।
এমনকি সাইবার হামলার কারণে কোনো কোম্পানির বাজারমূল্য বা শেয়ারের দাম কমে গেলে শেয়ারহোল্ডাররাও মামলা করতে পারেন।
এছাড়া কোনো এআই এজেন্টের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা জড়িত থাকলে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও ব্যবস্থা নিতে পারে।
কোন আইনে মামলা হতে পারে, দায় কার?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের বিষয়টি নতুন হলেও প্রচলিত আইন দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ উঠতে পারে। অর্থাৎ এআইয়ের কারণে কোনো ক্ষতি হলে, প্রথমে দেখা হবে এআই কোম্পানির গাফিলতি ছিলো কিনা।
এআই তৈরি, পরীক্ষা বা ব্যবহারের সময় সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি- এমন অভিযোগও উঠতে পারে কোম্পানির বিরুদ্ধে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড এবিউজ অ্যাক্ট’-এর আওতায়ও মামলা হতে পারে। এই আইনে অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার সিস্টেমে ঢোকার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। আইন অনুযায়ী কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে কী উদ্দেশ্য ছিলো, তা প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু মানুষের নির্দেশ ছাড়া এআই নিজে কোনো সিস্টেমে ঢুকলে সেই এআই- এর উদ্দেশ্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে এখনো আদালতের পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এআই এজেন্টের কারণে ক্ষতি হলে প্রথমেই দায়বদ্ধতা আসে সেটি তৈরি করা কোম্পানির উপর। তবে এআই তৈরি করা কোম্পানিই শুধু দায়ী হবে এমন নয়। যে প্রতিষ্ঠান এআই এজেন্টটি ব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হতে পারে।
একই ঘটনায় একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে আলাদা আইনি দাবিও তুলতে পারে।
একজন আইন বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে একটি উদাহরণের দিয়ে বুঝিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রির জন্য একটি খুচরা দোকানের বিরুদ্ধে মামলা করেন, তাহলে ওই দোকান পণ্য প্রস্তুতকারকের বিরুদ্ধে আইনি দাবি তুলতে পারে।
কোম্পানিগুলো যুক্তি কী হবে?
এআই নির্মাতা বা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে পারে, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিলো না এবং তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি ঠেকাতে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছিলো। তারা আরও দাবি করতে পারে, এআই এজেন্টের এমন আচরণ আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিলো না।
তবে এখানেই সামনে আসছে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এআই এজেন্টের ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে?
ক্যালিফোর্নিয়ার নতুন ‘এসেম্বলি বিল ৩১৬’ অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি শুধু এই যুক্তি দিয়ে দায় এড়াতে পারবে না যে, এআই প্রযুক্তিই ঘটনার জন্য দায়ী।
ক্যালিফোর্নিয়ার এসেম্বলি বিল ৩১৬ হলো একটি এআই বিষয়ক আইন, যা ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো এআই টুলের মাধ্যমে যদি কোনো ক্ষতি সাধিত হয়, তবে এর ডেভেলপার বা ব্যবহারকারীরা আদালতে এই সাফাই বা দাবি করতে পারবে না যে, এআই নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ক্ষতি ঘটিয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করতে পারবে যে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ক্ষতি হয়নি বা ঘটনার জন্য অন্য পক্ষও দায়ী।
বাংলাদেশের আইনে কী আছে
এআই নিজে থেকে কোনো সিস্টেমে ঢুকে পড়লে বা ক্ষতি করলে কার দায় হবে, এমন নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি বাংলাদেশে।
তবে এ বিষয়ে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬-২০৩০’-এর খসড়ায় এআই-জনিত ক্ষতির দায়ভার নির্ধারণে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী- স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা, নিয়োগ, বিচার ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই সিস্টেমের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার একটি ‘স্ট্রিক্ট লায়াবিলিটি’ কাঠামো গ্রহণ করবে।
এর অর্থ, এআই সিস্টেমের কারণে কোনো ক্ষতি হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হবে, দোষ বা উদ্দেশ্য প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই। এআই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কাজ করেছে এমন যুক্তি দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না। এটা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘এসেম্বলি বিল ৩১৬’ আইনের মতোই।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, এআইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রতিকার, আদালতের মাধ্যমে পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
এ ছাড়া উচ্চঝুঁকির এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মডেলের সংস্করণ, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের লগ, সিদ্ধান্তের রেকর্ডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য কমপক্ষে পাঁচ বছর বা সংশ্লিষ্ট আইনি কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্ত ও দায় নির্ধারণ সহজ হবে।
তবে এসব এখনো খসড়া নীতিমালার প্রস্তাব, যা চলতি বছরের ২৮এ জানুয়ারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এআই-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এ বিষয়ে আইন প্রস্তাব করার কথা রয়েছে।
এআই যতো বেশি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, ততোই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। এআই আগে সাধারণত মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতো। তাই এআই কোনো ভুল করলে সহজেই বলা যেত যে, মানুষ বা কোম্পানির নির্দেশেই এই ভুল হয়েছে। তাই এর দায়ও মানুষের।
কিন্তু এখন এআই এজেন্ট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারছে। ফলে এআই যদি নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল করে বা কারও সিস্টেমে ঢুকে ক্ষতি করে, তাহলে আইনি দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে দায় নেবে কে?
এআই এজেন্ট এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারছে। ফলে, এআই যদি নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল করে বা কারও সিস্টেমে ঢুকে ক্ষতি করে, তাহলে আইনি দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে- এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করছে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছে এআই এজেন্টরা। তাদের এই সক্ষমতাই তৈরি করছে নতুন আইনি ঝুঁকি।
প্রশ্ন উঠছে, এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দায় নেবে কে?
কয়েকটি উন্নত দেশে এআই নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারবিধি নিয়ে ইতোমধ্যে আইন হয়েছে, সেখানে আইন প্রয়োগ নিয়ে স্পষ্টতাও আছে।
কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এআই নিয়ে আইন চূড়ান্ত করতে পারেনি, খসড়া পর্যায়ে আছে। তাহলে বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনায় ব্যবস্থা কী হবে?
এআই এজেন্ট মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে প্রবেশ করছে- সম্প্রতি বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন ঘটনার কথা জানিয়েছে রয়টার্সকে।
চ্যাটজিপিটি -এর নির্মাতা ওপেনএআই জানাচ্ছে, তাদের একটি এআই এজেন্ট ‘হাগিং ফেইস’ নামে একটি এআই স্টার্টআপ এর সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেছিল।
ওপেনএআই আরও জানিয়েছে, এআই এজেন্টগুলোকে তৈরি করা হয়েছিলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করার জন্য। কিন্তু সেই নির্ধারিত সীমা মেনে চলেনি এজেন্টরা।
এআই এজেন্টদের নির্ধারিত ডিজিটাল সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করার আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে ওপেনএআই।
আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় আরেকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, এপ্রিলের পর থেকে তাদের ক্লড এআই মডেল তিনটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে।
সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের একটি এআই মডেল অন্য একটি কোম্পানির সিস্টেম হ্যাক করেছিলো বলে জানিয়েছে মেটা।
মেটা আরও জানায়, তাদের এআই মডেলকে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা করছিলো। এই পরীক্ষা পরিচালনা করছিলো ‘ইররেগুলার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
মেটার দাবি, ‘ইররেগুলার’-এর একটি ভুল কনফিগারেশনের কারণে পরীক্ষার সময় এআই মডেলটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়।
‘হাগিং ফেইস’ এর প্রধান নির্বাহী ক্লেম দেলাঙ্গে জানিয়েছেন, ওপেনএআই -এর ঘটনার জন্য তারা মামলা করার পরিকল্পনা করছেন না।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার হামলা ছড়িয়ে পড়লে এবং এসব কর্মকাণ্ডের জন্য নির্মাতারা দায়ভার না নিলে এটি নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কারা মামলা করতে পারে?
এইভাবে এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দায় কার অথবা কীভাবে এর প্রতিকার পাওয়া যাবে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একাধিক পক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রথমত, মামলা করতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। ওই কোম্পানির কর্মী বা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন তারাও।
এমনকি সাইবার হামলার কারণে কোনো কোম্পানির বাজারমূল্য বা শেয়ারের দাম কমে গেলে শেয়ারহোল্ডাররাও মামলা করতে পারেন।
এছাড়া কোনো এআই এজেন্টের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা জড়িত থাকলে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও ব্যবস্থা নিতে পারে।
কোন আইনে মামলা হতে পারে, দায় কার?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের বিষয়টি নতুন হলেও প্রচলিত আইন দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ উঠতে পারে। অর্থাৎ এআইয়ের কারণে কোনো ক্ষতি হলে, প্রথমে দেখা হবে এআই কোম্পানির গাফিলতি ছিলো কিনা।
এআই তৈরি, পরীক্ষা বা ব্যবহারের সময় সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি- এমন অভিযোগও উঠতে পারে কোম্পানির বিরুদ্ধে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড এবিউজ অ্যাক্ট’-এর আওতায়ও মামলা হতে পারে। এই আইনে অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার সিস্টেমে ঢোকার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। আইন অনুযায়ী কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে কী উদ্দেশ্য ছিলো, তা প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু মানুষের নির্দেশ ছাড়া এআই নিজে কোনো সিস্টেমে ঢুকলে সেই এআই- এর উদ্দেশ্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে এখনো আদালতের পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এআই এজেন্টের কারণে ক্ষতি হলে প্রথমেই দায়বদ্ধতা আসে সেটি তৈরি করা কোম্পানির উপর। তবে এআই তৈরি করা কোম্পানিই শুধু দায়ী হবে এমন নয়। যে প্রতিষ্ঠান এআই এজেন্টটি ব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হতে পারে।
একই ঘটনায় একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে আলাদা আইনি দাবিও তুলতে পারে।
একজন আইন বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে একটি উদাহরণের দিয়ে বুঝিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রির জন্য একটি খুচরা দোকানের বিরুদ্ধে মামলা করেন, তাহলে ওই দোকান পণ্য প্রস্তুতকারকের বিরুদ্ধে আইনি দাবি তুলতে পারে।
কোম্পানিগুলো যুক্তি কী হবে?
এআই নির্মাতা বা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে পারে, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিলো না এবং তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি ঠেকাতে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছিলো। তারা আরও দাবি করতে পারে, এআই এজেন্টের এমন আচরণ আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিলো না।
তবে এখানেই সামনে আসছে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এআই এজেন্টের ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে?
ক্যালিফোর্নিয়ার নতুন ‘এসেম্বলি বিল ৩১৬’ অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি শুধু এই যুক্তি দিয়ে দায় এড়াতে পারবে না যে, এআই প্রযুক্তিই ঘটনার জন্য দায়ী।
ক্যালিফোর্নিয়ার এসেম্বলি বিল ৩১৬ হলো একটি এআই বিষয়ক আইন, যা ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো এআই টুলের মাধ্যমে যদি কোনো ক্ষতি সাধিত হয়, তবে এর ডেভেলপার বা ব্যবহারকারীরা আদালতে এই সাফাই বা দাবি করতে পারবে না যে, এআই নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ক্ষতি ঘটিয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করতে পারবে যে তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ক্ষতি হয়নি বা ঘটনার জন্য অন্য পক্ষও দায়ী।
বাংলাদেশের আইনে কী আছে
এআই নিজে থেকে কোনো সিস্টেমে ঢুকে পড়লে বা ক্ষতি করলে কার দায় হবে, এমন নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি বাংলাদেশে।
তবে এ বিষয়ে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬-২০৩০’-এর খসড়ায় এআই-জনিত ক্ষতির দায়ভার নির্ধারণে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী- স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা, নিয়োগ, বিচার ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই সিস্টেমের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার একটি ‘স্ট্রিক্ট লায়াবিলিটি’ কাঠামো গ্রহণ করবে।
এর অর্থ, এআই সিস্টেমের কারণে কোনো ক্ষতি হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হবে, দোষ বা উদ্দেশ্য প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই। এআই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কাজ করেছে এমন যুক্তি দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না। এটা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘এসেম্বলি বিল ৩১৬’ আইনের মতোই।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, এআইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রতিকার, আদালতের মাধ্যমে পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
এ ছাড়া উচ্চঝুঁকির এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মডেলের সংস্করণ, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের লগ, সিদ্ধান্তের রেকর্ডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য কমপক্ষে পাঁচ বছর বা সংশ্লিষ্ট আইনি কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্ত ও দায় নির্ধারণ সহজ হবে।
তবে এসব এখনো খসড়া নীতিমালার প্রস্তাব, যা চলতি বছরের ২৮এ জানুয়ারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এআই-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এ বিষয়ে আইন প্রস্তাব করার কথা রয়েছে।
এআই যতো বেশি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, ততোই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। এআই আগে সাধারণত মানুষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতো। তাই এআই কোনো ভুল করলে সহজেই বলা যেত যে, মানুষ বা কোম্পানির নির্দেশেই এই ভুল হয়েছে। তাই এর দায়ও মানুষের।
কিন্তু এখন এআই এজেন্ট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারছে। ফলে এআই যদি নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল করে বা কারও সিস্টেমে ঢুকে ক্ষতি করে, তাহলে আইনি দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিষয়: