বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬: এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিতে জোর

আলোচনা থেকে উঠে আসা সুপারিশ এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্প খাতের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং উচ্চ মূল্যসংযোজনভিত্তিক খাতে রূপান্তরের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ঠ নীতিনির্ধারক, শিল্পোদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

আর এ লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্ডাস্ট্রি ৪.০, দক্ষ মানবসম্পদ, নীতিগত সহায়তা, তরুণ নেতৃত্ব এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।  

সোমবার রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী 'বায়লা ফিউচার সামিট ২০২৬'-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে তারা এসব কথা বলেন। 

‘থিংক বিয়ন্ড টুডে’ প্রতিপাদ্যে সম্মেলনটি আয়োজন করেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডারস অ্যালায়েন্স (বায়লা)। এতে দেশ-বিদেশের দেড় হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী, ৫০০–এর বেশি সিএক্সও এবং ২০–এর বেশি আন্তর্জাতিক বক্তা অংশ নিচ্ছেন। 

উদ্বোধনী দিনের আলোচনায় নেতৃত্ব, এআই, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের পরিবর্তিত প্রবণতা উঠে আসে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, "বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও দায়িত্বশীল তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা জরুরি।"

সরকার, মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করে একটি সুষম কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। 

"প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পুনর্দক্ষীকরণ (রিস্কিলিং) এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে," যোগ করেন মন্ত্রী। 

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে নিজেরাই নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারেন। সফলতার জন্য পরিশ্রম, সততা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের বিকল্প নেই।"

শেলটেক গ্রুপ, এনভয় লিগ্যাসি ও এনভয় টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বায়লার উপদেষ্টা তানভীর আহমেদ।

সামিটে শেলটেক গ্রুপ, এনভয় লিগ্যাসি ও এনভয় টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বায়লার উপদেষ্টা তানভীর আহমেদ বাংলাদেশের পোশাক খাতের ঐতিহাসিক লড়াকু মানসিকতা তুলে ধরেন। 

"বাংলাদেশ কখনো আরামদায়ক বা সহজ পরিস্থিতি বা পরিবেশে বড় হয়নি। আমরা কোটা প্রথার (রপ্তানিতে) অবসান মোকাবিলা করেছি, আমরা মন্দা মোকাবিলা করেছি এবং আমরা মহামারির ধাক্কাও সামলেছি।”

তিনি বলেন, “প্রতিবারই যখন বিশ্ব আমাদের হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল, আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছি। প্রশ্ন এটি নয় যে, আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবো কি না? প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা এই পরিবর্তন আনতে পারি?"

তানভীর আহমেদ বলেন, "আমাদের পোশাক শিল্পকে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে টিকিয়ে রাখলে চলবে না। বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের উচ্চ-মূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং নতুন প্রযুক্তির সংযোজন করতে হবে। বিশেষ করে অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের উৎপাদনশীলতা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।” 

“এলডিসির পর যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, তা মোকাবিলায় আমাদের এখনই সাপ্লাই চেইন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে," যোগ করেন তিনি। 

তার মতে, এলডিসি-পরবর্তী প্রস্তুতিতে বাংলাদেশকে পাঁচটি প্রধান বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে- বাজার বহুমুখীকরণ, ভ্যালু চেইনের উন্নয়ন, লজিস্টিকস ও লিড টাইম কমানো, লিন ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।

ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন শুধু পোশাক কেনেন না; তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে মান, টেকসই উৎপাদন, আস্থা, উদ্ভাবন এবং নির্ভরযোগ্যতাও কিনছেন। তিনি বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা প্রতিটি পণ্য যেন উৎকর্ষতার প্রতীক হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।

সিমিন রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তি বা উৎপাদনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না; বরং আজকের তরুণ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি।

সামিটে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও নীতিগত সহায়তা এখন শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।"

ইউরোচ্যামের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ ইউরোপীয়ান বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদার কথা জানিয়ে বলেন, "ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের শক্তিশালী চাহিদা থাকলেও ভবিষ্যতে স্থায়িত্ব, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স এবং পণ্যের বৈচিত্র্যই প্রতিযোগিতার মূল নির্ধারক হবে। পরিবেশবান্ধব কারখানা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ইতিবাচক সংকেত।"

এর আগে বায়লার সভাপতি আবরার হোসাইন সায়েম প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল দিয়ে আগামী দিনের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, "‘থিংক বিয়ন্ড টুডে’ শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দর্শন। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের এআই ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করতে হবে।"

বায়লা ফিউচার সামিটের লক্ষ্য জানিয়ে তিনি বলেন, "এর লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক ক্রেতা, নীতিনির্ধারক এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা।"

এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্স, আধুনিক সাপ্লাই চেইন এবং ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলেও মনে করেন বায়লার সভাপতি।

দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার টেকসই অর্থায়ন, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পরিবর্তন এবং আগামী এক দশকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের রূপরেখা নিয়ে একাধিক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। 

আয়োজকদের আশা, এসব আলোচনা থেকে উঠে আসা সুপারিশ এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্প খাতের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।