হাওরে বোরো হারানোয় খাদ্য নিরাপত্তায় শঙ্কা কতটা

সরকার বলছে, হাওরে বোরো ধানের ক্ষতি মাত্র ১০ শতাংশ। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র সাড়ে ১৭ শতাংশ। বিশ্লেষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি ৫০-৬০ শতাংশ। সব মিলে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, সরকারি সংগ্রহ এবং চালের দাম নিয়ে নতুন উদ্বেগের আশঙ্কা আসলে কতটা?

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

বৈশাখে হাওরে ধান কাটার উৎসব হলেও এবার সেখানে দীর্ঘশ্বাস। প্রায় এক মাস ধরে কৃষকের স্বপ্ন ডুবে আছে হাওরের পানিতে। 

যে ধান বিক্রি করে তাদের সংসার চলে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাড় হয়, পরের মৌসুমের চাষের পুঁজিটা পর্যন্ত নির্ভর করে, সেই ধানের বেশিরভাগই এবার পানির নিচে হারিয়ে গেছে।

এই আফসোস শুধু কৃষকের পারিবারিক কষ্টের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, প্রভাব পড়ছে সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রায়। যা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি এবং সরকারি খাদ্য মজুত ব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

হাওরের ‘‘প্রায় ৯০ শতাংশ’’ ধান কাটা হয়েছে বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।

কাগজে-কলমে সেটি স্বস্তির খবর হলেও সরকারের এই ভাষ্যকে ‘গোঁজামিল’ বলে দাবি করেছেন, সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার।

“খুব বেশি হলে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ বোরো ধান হয়তো উঠেছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি এবং এর ফলে ধানের দাম এরইমধ্যে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক মিলন।

“গত বছর যে ধান ২,৫০০ টাকা বস্তা কেনা গিয়েছে, সেটা এখনই ২,৯০০ টাকায় পৌঁছে গেছে। তার চেয়েও বড় বিষয়, কৃষকের কাছে ধান না থাকার কারণে গুদামে ধান সংগ্রহের হারও কম,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

সবমিলিয়ে এবারের বোরো মৌসুম শুধু ফসলহানির গল্প নয়; এটি যেমন একটি পরিবারের সারা বছরের আয় হারানোর গল্প, অন্যদিকে এটা আভাস দিচ্ছে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন তথা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের শঙ্কার।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সুনামগঞ্জের ধান?

বাংলাদেশের মোট চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। আর এই বোরো ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের বোরো মৌসুমে উৎপাদিত মোট ধানের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওর অঞ্চলের সাত জেলা থেকে।

আবার জাতীয় ধান উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ আসে হাওর এলাকা থেকেই। যার বেশিরভাগই এবার তলিয়ে গেছে পানিতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাওরভুক্ত সাত জেলায় চলতি মৌসুমে ৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৫ লাখ ৮ হাজার হেক্টর।

অর্থাৎ হাওরের উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা মানে শুধু স্থানীয় কৃষকের ক্ষতি নয়; এর প্রভাব জাতীয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়বে বলেই মনে করেন অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার।

“আমার বয়স এখন প্রায় ৭২ বছর। বহু বছর ধরেই আমি হাওরের এই সমস্যা দেখে আসছি। বৃষ্টির পানিতে এবার যেটা হয়েছে সেটাকে আমরা স্থানীয় ভাষায় বলি, ডুবরার পানি বা ট্যাবলার পানি। এটা ফসলের যে ক্ষতি করে সেটা শুধু যে সুনামগঞ্জের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে এমনটা নয় এর ফলে চালের দাম বাড়বে যেটা সাধারণ মানুষের ওপরে পড়বেই,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

এভাবেই ডুবে যাওয়া ধান সংগ্রহ করছেন নারীরা।

২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানির নিচে

'খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা' হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে রয়েছে ১৯৩টি ছোট-বড় হাওর ও বিল। চলতি বছর জেলায় প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল।

কৃষি বিভাগের ২৩ মে'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাওরে এক লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান কাটা হয়েছে। হাওরে এই ধান কাটার হার ৮৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। হাওরেরর বাইরে ৫৩ হাজার ৭৯৬ হেক্টরে ধান কাটা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে ধান কাটার হার ৯২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

সরকারি হিসাবে, জেলার হাওরে প্রায় পৌনে চার লাখ ছোট-বড় ও মাঝারি কৃষক আছেন।

আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের যে তালিকা করা হয়েছে সেখানে সরকারিভাবে সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৩৮৪ জন।  যারা টানা তিন মাস তিন হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল প্রণোদনা পাবেন।

গেলো ২৫ মে থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক সহায়তা বিতরণ শুরু করেছেন।

অর্থাৎ কৃষি বিভাগ যে হিসাব দিয়েছে, তাতে হাওরে ১০ শতাংশের কম ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সরকারি তালিকা অনুযায়ীই, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আবার ১৭ শতাংশের বেশি।

আর এখানেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

এই দুই তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতির কারণে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় কৃষক, আন্দোলনকর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা।

এখানে অনিয়ম হয়েছে বলে জানালেন মোঃ ওবায়দুল হক মিলন।

আলাপ-কে তিনি বলেন, “শুরুতে বলা হলো, বড় কৃষকরা ৭,৫০০ টাকা, মাঝারি কৃষকরা ৫,৫০০ টাকা, আর ছোট কৃষকরা ২,৫০০ টাকা এবং ২০ কেজি করে চাল পাবেন। কিন্তু পরে এটা গড়ে ৩,০০০  টাকা এবং ১৫ কেজি ধান হয়ে গেল। যেটা আসলে খুবই অন্যায্য এবং তালিকাটিও সঠিক নয়।”

১০ শতাংশ নয়, ক্ষতি অন্তত অর্ধেক বা তারও বেশি 

সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদারের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

তার ভাষায়, “হাওর এলাকার জায়গাভেদে কৃষকের অর্ধেকের বেশি খেত নষ্ট হয়েছে। যারা সাধারণত সরকারি গুদামে ধান দিতে পারতেন, এবার তারা দিতে পারছেন না। সে কারণেই গুদামে ধান সংগ্রহে গতি নেই।”

অন্যদিকে সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক মিলন বলেন, “৬০ শতাংশ বোরো ধান পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এর আগে যে ধান কাটা হয়েছিল সেটাও বৃষ্টিতে শুকানো যায়নি। অর্থাৎ সেটাও নষ্ট হয়ে হয়েছে। তাই সরকারের হিসাব মিথ্যা ও বানোয়াট।”

এবার বৃষ্টির কারণে পাকার আগেই ধান কাটতে হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “কাটা ধানেরও একটি অংশ বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। আবার যেটা পানিতে ডুবে আছে সেটাতো নষ্ট হয়েছেই। সবমিলে যে ধান হয়তো সরকারি হিসাবে কাটার তালিকায় রাখা হয়েছে সেটা আসলে শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে।”

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক আলাপ-কে বলেন, “মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন যাচাই করেই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাছাড়া আমরা হিসাব করি হেক্টরে আর কৃষকরা হিসাব করে 'কেয়ার'-এ। এতে তাদের হিসাবের সঙ্গে অমিল হতে পারে।”

সাধারণত ৩০ শতাংশকে এক কেয়ার ধরে হিসাব করেন হাওর এলাকার কৃষকরা।

যে ধান কাটা হয়েছে সেটাও শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে পানিতে।

খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম সংকেত: সরকারি গুদামে ধান নেই

ফসলের প্রকৃত ক্ষতি কতটা হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলছে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহের চিত্রে।

চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে সরকার ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান, ১৭ হাজার ৭০৪ টন সিদ্ধ চাল এবং ৯ হাজার ৩৪৭ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

খাদ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৫ মে পর্যন্ত মাত্র তিন হাজার ৭৭৩ টন ধান সংগ্রহ করা গেছে।

আর সিদ্ধ চাল চার হাজার ৬৪৮ টন এবং আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৯৮১ টন।

অর্থাৎ ৩রা মে থেকে সুনামগঞ্জে ধান সংগ্রহ শুরু করার পর থেকে তিন সপ্তাহে ধান সংগ্রহে পূরণ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় কী প্রভাব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনামগঞ্জের ক্ষতি এককভাবে বড় ধরনের জাতীয় খাদ্য সংকট তৈরি করবে না, কারণ দেশের অধিকাংশ এলাকায় বোরো উৎপাদন ভালো হয়েছে।

তবে হাওরের এই সংকটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক মিলন।

তিনি বলেন, “এতে সরকারি মজুত বা ধান সংগ্রহে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারের জন্য লক্ষ্যপূরণ কঠিন হবে। তাছাড়া হাওর ও স্থানীয় বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেছে এতে দাম বেড়েছে। সার্বিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে।”

হাওরের পানির নিচে শুধু ধান নয় আসলে ডুবে গেছে বহু কৃষক পরিবারের সারা বছরের সঞ্চয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও।

আর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় প্রশ্নও রেখে যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি হাওরের মতো কৌশলগত খাদ্য উৎপাদন অঞ্চলগুলো বারবার এমন দুর্যোগের মুখে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে?