বিএসইসিতে বদলের হিড়িকে চাঙ্গা শেয়ারবাজার, ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন

বিএসইসিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশা। ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেনের পাশাপাশি টানা নবম দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী সূচক।

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম

দিনের শুরুটা ছিল নেতিবাচক। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমছিল, সূচকও ছিল লাল ঘরে। কিন্তু আগের কমিশনের বিদায় ও নতুন কমিশনের নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বদলে যেতে থাকে শেয়ারবাজারের চিত্র। দিনের শেষে, লেনদেনে পৌঁছে যায় শেষ ৯ মাসের রেকর্ড মাইলস্টোনে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরে আসার প্রতিফলন যা প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া হিসাবে এসেছে।

শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক মঈন উদ্দীন আলাপকে বলেন, “প্রশ্নবিদ্ধ নানারকম সিদ্ধান্তের কারণে আগের কমিশনের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিরক্ত ছিলেন। এরপর গত কয়েকদিন ধরেই যখন কমিশন পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, আমার মনে হয় সেটা গ্ল্যাডলি নিয়েছে। আর তারই প্রভাব দেখা যাচ্ছে শেয়ারবাজারের লেনদেনে।”

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “নতুন কমিশনের জন্য শেয়ারবাজারের এই পজিটিভ ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হবে।”

একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্বতন্ত্র পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

তিনি আলাপকে বলেন, “কয়েকদিন আগেই সরকারের একজন মন্ত্রী বিএসইসি পুনর্গঠনের কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই লেনদেন বাড়ছিল। যা আজও অব্যাহত ছিল। আমার মনে হয় এর পেছনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বিশ্বাসের মতো বিষয়গুলো কাজ করেছে।”

মন্ত্রীর বক্তব্যের পরই গতি

গত মঙ্গলবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসি পুনর্গঠন করা হবে এবং সেখানে বাজার-জানা পেশাদারদের আনা হবে।

সেই ঘোষণার পর থেকেই বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে শুরু করে।

বৃহস্পতিবার সকালে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফউদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএসইসি।

এরপর দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. মাসুদ খান এবং তিন নতুন কমিশনার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আর এতেই পুঁজিবাজারে গতি ফিরে আসে বলে জানান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।

“আজ একদিনে আগের কমিশনের বিদায় এবং নতুন করে নিয়োগ হওয়াতে বাজারে একদিনেই বড় ধরনের পজিটিভ পরিবর্তন দেখা গেছে.” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

লেনদেনের শেষ পর্যন্ত সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে। সূচক, লেনদেন, বাজার মূলধন-সবকিছুতেই দেখা যায় উত্থান।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন পৌঁছে যায় গত বছরের ৮ই সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে।

ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঈদুল আযহার ছুটির পর গত সোমবার বাজার খোলার পর থেকেই ইতিবাচক ধারায় ছিল শেয়ার বাজার। পুরো সপ্তাহজুড়েই অর্থাৎ শেষ চার কার্যদিবসেই বাজার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ

পুরানোদের বিদায়ের নেপথ্যে

ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে একদিনেই বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও চারজন কমিশনার পদত্যাগ করলেও এর পেছনে ‘নতুন সরকারের নিজেদের লোক’ বসানোর মতো কারণ ছিল বলে মনে করেন মিনহাজ মান্নান ইমন।

তার ভাষায়, “নতুন সরকার আসবে এবং তারা তাদের লোক সেখানে বসাবে এটা প্রত্যাশিত ছিল। অন্যান্য সেক্টরে এটা হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় এটাও হয়েছে।”

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ২০২৪ সালের ১৮ই অগাস্ট বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।

একই সময়ে কমিশনের সদস্য হিসেবে নতুন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের দায়িত্ব ছিল পুঁজিবাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা।

কিন্তু রাশেদ মাকসুদ কমিশনের দীর্ঘসূত্রিতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছিল বলে মনে করেন শেয়ার বাজার বিশ্লেষকরা।

“তারা যখন দায়িত্ব নিয়েছিল তখনও হঠাৎ করে লেনদেন বেড়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডে গতি আনতে না পারায় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। যার ফলে আবারও পরে যায় শেয়ার বাজার,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “সবশেষ কমিশনের সময় আমরা ১০ টাকার শেয়ার ৬০০ টাকা হতেও দেখেছি। তবে এখানে ভালো দিক ছিল সেখানে তারা বাজারে হস্তক্ষেপ করেননি। আবার খারাপ দিক হলো- তারা তদন্তও করেনি। এগুলো তাদের প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছিল।”

এখন নজর নতুন কমিশনের দিকে

আগের কমিশনের বিদায়ের পর বৃহস্পতিবারই নিয়োগ দেওয়া হয়, করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে।

একই সঙ্গে কমিশনের তিন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ-আল-তারিককে।

মাসুদ খান ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (গ্রুপ সিইও)। এর আগে তিনি ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

নতুন কমিশন ঘোষণার পর এ নিয়ে বাজারে তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাস তৈরি হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে নতুন কমিশনের জন্য।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা এবং দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট মোকাবিলার মতো কঠিন কাজগুলোই নির্ধারণ করবে এই উত্থান সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় রূপ নেবে বলে মনে করেন মঈন উদ্দীন।

“তবে অন্তত বৃহস্পতিবারের লেনদেন একটি বার্তা স্পষ্ট করেছে বিনিয়োগকারীরা পরিবর্তনের সংকেতকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন,” বলেছেন তিনি।

তবে এই অতিদ্রুত রদবদল বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মিনহাজ মান্নান ইমন।

তার ভাষায়, “নতুন কমিশনকে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন কারসাজি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যদি তারা সেটা না পারে তবে তাহলে বাজারে আবারও ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।”

এর পেছনে কমিশন পরিবর্তনের গুঞ্জন কাজ করেছিল বলেও মনে করেন মিনহাজ মান্নান ইমন।

৯ কার্যদিবস ধরে ঊর্ধ্বমুখী বাজার

বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ডিএসইতে ২৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ১০৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৫টির।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৩ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্টে।

ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০৮ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৬৮ পয়েন্টে উঠে এসেছে।

এর মাধ্যমে টানা নয় কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকল বাংলাদেশের শেয়ারবাজার।

১০ শতাংশ দর বেড়ে গেইনার বা দর বৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে ছিল জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসি। অন্যদিকে প্রায় ১০ শতাংশ দর হারিয়ে টপ লুজার বা দর কমার তালিকায় শীর্ষে ছিল যমুনা ব্যাংক পিএলসি।

৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন

মূল্যসূচকের পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনও।

দিন শেষে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

আগের কার্যদিবস বুধবার লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২৭৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ একদিনে লেনদেন বেড়েছে ৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এটি গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ দৈনিক লেনদেনের রেকর্ড। ওই দিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৮২ পয়েন্ট বেড়েছে।

বাজারটিতে ২৫৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫২টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৭৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৯টির।

বৃহস্পতিবার একদিনে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।