মেট্রোরেলের নিচে পাওয়া আইইডি কতটা শক্তিশালী?

মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী দূর-নিয়ন্ত্রিত আইইডি কতটা শক্তিশালী ছিলো? ওই পথ দিয়েই যাওয়ার কথা ছিলো রথযাত্রা, কিন্তু বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কথা বলে ওই জায়গা ঘিরে রাখে পুলিশ।

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

রাজধানীর ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকটি কোনো ‘ককটেল’ বা হাতে তৈরি ‘সাধারণ বোমা’ ছিলো না জানিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি। 

তারা বলছেন, এটি অত্যন্ত ‘দক্ষ’ কারিগরি কৌশলে তৈরি একটি ‘দূর-নিয়ন্ত্রিত আইইডি’ বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস। 

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ‘যথাসময়ে’ বিস্ফোরকটি নিষ্ক্রিয় করায় ভেস্তে গেছে বড় ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক পরিকল্পনা।

আইইডি উদ্ধারের ঘটনায় মামলা বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে, ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার মিছিলটি জাতীয় প্রেস ক্লাব ও মতিঝিল হয়ে স্বামীবাগের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। আর বিস্ফোরকটি রাখা হয়েছিলো ঠিক এই রুটের সংবেদনশীল পয়েন্টেই।  

তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরক পাওয়ার জায়গাটি পুলিশ ঘিরে ফেলে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে রথযাত্রাকে নিরাপদ দূরত্ব দিয়ে অতিক্রম করায়। 

খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে দ্রুত যায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আইইডিটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে।

এতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায় জনবহুল এলাকাটি। 

অতীতে বাংলাদেশে এ ধরনের আইইডির বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, যার সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা ছিলো বলে সিটিটিসি কর্তারা জানিয়েছেন। 

পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা দায়েরের পর জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। 

যেভাবে আইইডির খবর পায় পুলিশ  

শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন থাকায় অফিসপাড়া হিসেবে পরিচিত মতিঝিল এলাকা ছিলো প্রায় জনশূন্য। ওই এলাকায় আনাগোনা ছিলো কিছু পথচারী ও মেট্রারেল যাত্রীদের। 

তাদের মধ্যেই কেউ একজন হঠাৎ একটি পরিত্যক্ত বস্তার মধ্যে লাইট জ্বলতে দেখেন। সেসময়ই জানাজানি বোমাসদৃশ বস্তুর খবর চাউর হতে থাকে। 

মুহূর্তেই জড়ো হয়ে অনেক মানুষ। স্থানীয় থানার মাধ্যমে খোঁজ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। 

প্রাথমিকভাবে আইইডি বলে নিশ্চিত হয়ে নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু করেন তারা। 

পুলিশ বলছে, ছাতাটি কেউ খোলার চেষ্টা করলেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতো আইইডিটি। 

রবিন হোসেন নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “পিলারের নিচে একটি ছাতায় মিটমিট করে আলো জ্বলতে দেখে আমার সন্দেহ হয়।” 

এক পর্যায়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এলাকাটি ঘেরাও করে ফেলে বলে জানান রবিন। 

“পরে দেখলাম বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারওয়ালা বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করলো,” যোগ করেন তিনি। 

আইইডি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরক চোখে লেগে আহত হন এক পথচারী। 

আইইডি কী ও কতটা শক্তিশালী? 

'ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস' বা আইইডি প্রথাগত সামরিক কারখানায় তৈরি কোনো অস্ত্র নয়। সাধারণ বা গৃহস্থালি সামগ্রী, পাইপ, গ্যাস সিলিন্ডার কিংবা সামরিক বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ একত্র করে গোপনে এটি তৈরি করা হয়।

এতে মূল উপাদান হিসেবে থাকে তিনটি প্রধান অংশ। বাইরের আবরণ বা ক্যাসিং, মূল বিস্ফোরক এবং বিস্ফোরণ ঘটানোর মাধ্যম বা ট্রিগারিং সিস্টেম (যেমন টাইমার, রিমোট কন্ট্রোল বা মোবাইল ফোন)। 

আইইডি কতটা শক্তিশালী তা সুনির্দিষ্ট থাকে না। এটি হতে পারে হাতের মুঠোয় রাখার মতো ছোট পাইপ বোমা থেকে শুরু করে একটি বিশাল গাড়িতে বহন করা ভারী বিস্ফোরক পর্যন্ত। 

ছোট আকারের আইইডি মানুষের অঙ্গহানি বা স্থানীয়ভাবে কাচ ও দেয়াল ভেঙে ফেলতে সক্ষম। আর বড় বা শক্তিশালী আইইডি বিস্ফোরণে পুরো কনভয়, সামরিক যান কিংবা আস্ত ভবনও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারে। 

মতিঝিলে পাওয়া আইইডির ক্ষয়ক্ষতির ক্ষমতা মাঝারি মানের ছিলো জানিয়েছেন সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা। 

“আইইডিটি ছিলো দক্ষ হাতে বানানো। এটি বানাতে একাধিক বিস্ফোরক কেমিক্যাল ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”  

তিনি আরও বলেন, “রথ শোভাযাত্রার সময় এটি বিস্ফোরিত হলে অনেক মানুষ হতাহতের আশঙ্কা ছিলো। পাশাপাশি আতংকিত হয়ে অনেকে পদদলিত হয়েও মৃত্যুবরন বা আহত হতে পারতো।” 

“আমরা এখন খুঁজছি কারা, কীভাবে আর কী উদ্দেশ্যে বোমাটি এখানে রাখা হয়েছিল,” যোগ করেন ওই কর্মকর্তা।  

মামলার এজাহারে যা উল্লেখ করা হয়েছে 

ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন মতিঝিল থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার। 

মামলার বাদী মতিঝিল থানার এসআই মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা এজাহারে উল্লেখ করেছেন, 

ঘটনার সময় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয়ে আসা রথ যাত্রা দৈনিক বাংলার মোড় হয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের দিকে যাচ্ছি। সেখান স্বামীবাগ যাওয়ার কথা ছিলো।

“ঘটনাস্থলের কাছাকাছি আসলে বৈদ্যুতিক শটসার্কিটের কথা বলে রথ যাত্রার ঘটনাস্থল পাশ কাটিয়ে যেতে বলি। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা আমাদের কথা রাখেন।” 

ওসি কামরুজ্জামান বলেন, “অল্প সময়ের মধ্যে বোমটি নিষ্ক্রিয় হওয়ায়, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ খুঁজছি। সেটি পাওয়া গেলে অপরাধী শনাক্তে আরো সুবিধা হবে।” 

এই যাত্রায় রক্ষা হলেও মতিঝিল পাড়ার মতো ব্যস্ত অফিসপাড়ায় এমন ঘটনা আতংকের কারণ মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা গেলে, আরো কোনো মিশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে যাবে।