মূল্যস্ফীতির মূল্য এই বছর কতটা চুকাতে হতে পারে?

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশে বসবাস করে আপনার আয় বাড়ছে নাকি কমছে?

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

তৈরি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা তানভির সারোয়ার ২০২৪ সালে বেতন পেতেন ৩০,০০০ টাকা। গেল বছরে বেড়ে হয়েছিল ৩২,১০০ টাকা। অর্থাৎ ইনক্রিমেন্ট ৭ শতাংশ। 

তাহলে তো আয় বেড়েছে তানভিরের? কিন্তু আসলে তা না। কেন তা বুঝতে হলে আগে জানা দরকার মূল্যস্ফীতি ব্যাপারটা কী?

গত বছর এই সময়ে, যে পণ্য বা সেবা কিনতে যত টাকা খরচ হতো আপনার, এই বছর নিশ্চয়ই তা আর পারছেন না? কিছুটা বেশি টাকা লাগছে- সহজভাবে এটাই মূল্যস্ফীতি।  

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেই পণ্য বা সেবা কিনতে ১০০ টাকা লাগতো এক বছর পর অর্থাৎ এই গেল ডিসেম্বরে তার জন্য লেগেছে ১০৮ টাকা ৪৯ পয়সা।

এই হিসাবে ডিসেম্বরের মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশ।

কিন্তু যদি অর্থবছর ধরি, তাহলে তা বিবিএস’র হিসাবে দাঁড়ায় ১০.০৩ শতাংশে। অর্থাৎ ১০০ টাকার জিনিসের দাম ১১০.০৩ টাকা। 

এখন যদি ধরে নেই, তানভীরের বেতন ছিল ১০০ টাকা, তাহলে তা বেড়ে হয়েছিল ১০৭ টাকা। কিন্তু আগের মত চলতে গেলে তার দরকার ছিল ১১০ টাকার একটু বেশি।

তাহলে তানভিরের আয় আসলে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ পয়েন্টের মতো কমে গেছে !

অর্থনীতির জটিল হিসাবে না গিয়ে তানভিরের অভিজ্ঞতা দিয়েই আরেকটু গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি।

২০২৬ সালে আপনার আয় মূল্যস্ফীতির সাথে সঙ্গতি রেখে বাড়বে তো?

মূল্যস্ফীতির মূল্য

মূল্যস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেতন না বাড়ায়, গত বছরই সংসার খরচ জোগাতে বিকল্প আয়ের কথা ভাবতে হয়েছে তানভিরকে ।

চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু ৯টা-৬টা চাকরি করে সেটাও কঠিন। কষ্টে জমানো সঞ্চয় ভাঙার সাহসও করতে পারেন নি, বিপদ-আপদ কখন আসে কে জানে! তাই ধারদেনা করেই চালিয়ে যাচ্ছেন।

তানভিরের যখন বেতন ৩০ হাজার টাকা ছিল তখন মাসে ২ হাজার টাকার মতো সঞ্চয় করতেন। এখনও তাই, কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ।

খরচের খাত মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া তানভির প্রথমেই কাটছাঁট করেছেন সংসার খরচে। 

“যে ইনক্রিমেন্ট হয়েছিল তার তুলনায় খরচ বেড়েছে অনেক বেশি। শপিং কমিয়ে দিয়েছি। আগের মতো প্রতি সপ্তাহে আর পরিবার নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাই না। যাতায়াতে আগে কখনও কখনও উবার, পাঠাও ব্যবহার করলেও এখন বাসে চড়ি,” আলাপ-কে বলছিলেন ৩৮ বছর বয়সী তানভির।

সরকারি মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তার।

“আমার হিসাবে, শুধু বাজার খরচ ধরলেও আগের বছর থেকে তা ১৫ শতাংশ বেশি । তার ওপর অক্টোবরেই বাড়িওয়ালা জানিয়ে দিয়েছিলেন ভাড়া বাড়বে ১ হাজার টাকা।”

এদিকে গত বছর থেকে ছেলে যাওয়া শুরু করেছে স্কুলে। এই জানুয়ারিতে বসেছিলেন সেই খরচের হিসাব মেলাতে।

স্কুলের ভর্তি ফি ১৮ হাজার টাকা, পুরো বছরের বেতন বাবদ ৪৩ হাজার টাকাসহ ইউনিফর্ম, বই-খাতা-কলম সব মিলিয়ে এক বছরে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু ইনক্রিমেন্ট হওয়ার পর তার বাৎসরিক বেতন বেড়েছিল ২৫ হাজার টাকার একটু বেশি।

তানভির আরও জানালেন, গত বছর ইনক্রিমেন্ট হলেও এই বছর তার অফিসে এ নিয়ে কোনো আলোচনাই নাকি নেই!

তানভির কিছুটা ভাগ্যবান, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধু ছিল, সহযোগিতা পেয়ে ছিলেন পরিবার থেকেও।

এবার আপনি হিসাব কষে দেখুন, ২০২৫ সালে আপনার আয় অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছিল কি? ২০২৬ সালে আপনার আয় মূল্যস্ফীতির সাথে সঙ্গতি রেখে বাড়বে তো?

যদি তা না হয়, তাহলে বিকল্প আয়ের ভাবনা ভাবতে থাকুন। 

আদতে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতির মূল্য কতটা চুকাতে হবে আপনাকে? দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশে বসবাস করা আপনার প্রকৃত আয় বাড়ছে নাকি কমছে?

মূল্যস্ফীতির মূল্য এই বছর কতটা চুকাতে হতে পারে?

দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ

মধ্যবিত্ত পরিবার যখন আগের বছরের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, তখন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার হার কমবে। তারপরও তা গত বছরের মতোই থাকবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।

জাতিসংঘের অর্থনীতি এবং সামাজিকবিষয়ক বিভাগের প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টস ২০২৬’ প্রতিবেদনটি বলছে চলতি বছর বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে ৭.১ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮.৯ শতাংশ। 

তবে এর মানে কিন্তু গত বছরের তুলনায় আপনার খরচ কমবে না।

কারণ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কেনা ১০০ টাকার পণ্য, ২০২৫ সালে আপনি কিনেছেন ১০৯ টাকায় আর এই জানুয়ারিতে কিনছেন ১১৫ টাকা ৫০ পয়সায়।