স্ট্যাগফ্লেশন - তরুণদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা 

২০২৬ সালজুড়ে পৃথিবীতে অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে। যা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২১০ কোটি জনে। এর বড় একটি অংশ থাকবে দক্ষিণ এশিয়ায়। একদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থান। অর্থনীতির ভাষায় এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন।

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

মিজান ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন দুই বছর আগে। তার হাতে দামি ডিগ্রি থাকলেও নেই একটি ভালো স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা। 
অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদন চোখ পড়ে মিজানের। সেখানে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই হার কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশে নামলেও তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে থাকবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

একদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থান। অর্থনীতির ভাষায় এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন। স্ট্যাগফ্লেশনের সময় উচ্চ বেকারত্ব ও চাহিদার অভাব থাকলেও বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতি

মিজানের মতো তরুণদের জন্য এই বাস্তবতা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ঠিক এমন সময় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মানসম্মত ও ভালো কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

চাকরিদাতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ স্থবির থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটাই পথ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, বলছেন চাকরিদাতারা।

সংখ্যার আড়ালে নির্মম বাস্তবতা

আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের হার প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশের আশেপাশেই থাকবে। তবে এই স্থিতিশীল হার বাস্তব চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না।

প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮৬ মিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ শ্রমিক এমন কাজে যুক্ত, যা মানসম্মত নয়। অর্থাৎ কাজ আছে, কিন্তু নেই নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি বা সামাজিক সুরক্ষা।

এর ফলে ২০২৬ সালজুড়ে পৃথিবীতে অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে। যা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২১০ কোটি জনে। এর বড় একটি অংশ থাকবে দক্ষিণ এশিয়ায়, যেখানে এই প্রবণতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্বেগজনকভাবে, এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের দৈনিক আয় ৩ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৬৩ টাকারও কম।

কী এই অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান

অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বলতে এমন কাজকে বোঝানো হয়, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার বাইরে। এসব কাজে শ্রম আইন, সামাজিক নিরাপত্তা বা চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না।

দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, গৃহকর্মী কিংবা চুক্তিভিত্তিক কাজ সবই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব কাজে সাধারণত কম মজুরি, অনিশ্চয়তা এবং অধিকারহীনতা বিদ্যমান।

আইএলওর হিসাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ৮৪ শতাংশেরও বেশি এই অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল।

iu

তরুণ বেকারত্ব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে তরুণদের বেকারত্ব বেড়ে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের নির্দিষ্ট তরুণ বেকারত্বের তথ্য না থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বা বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২৪ হাজার।

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনোন বলেন,“এই প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে আমরা যে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলো দেখছি, সেগুলোর প্রতিফলন বৈশ্বিক পর্যায়েও রয়েছে। জনমিতিক লভ্যাংশ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ এখন একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিকতা ও সামাজিক চাপের ঝুঁকি নেবে।”

আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ. হংবোও সতর্ক করে বলেন,“স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের হার আমাদের বিভ্রান্ত করা উচিত নয়। বাস্তবতা হলো কোটি কোটি শ্রমিক এখনও দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিকতা ও বঞ্চনার ফাঁদে আটকে আছেন।”

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আলাপকে বলেন, “অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যার ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। প্রতি বছর নতুন করে কয়েক লক্ষ শিক্ষিত তরুণ জব মার্কেটে আসছে। এর ফলে চাকরিদাতারা কর্মীদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে উৎসাহী হচ্ছে না।”

এই অবস্থার দ্রুতই কোনো সমাধান দেখছেন না এই ব্যাবসায়িক নেতা। এ জন্য তিনি জোর দিচ্ছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগবান্ধব অবস্থা তৈরির।

আইএলওর সুপারিশ

আইএলওর প্রতিবেদনের সুপারিশেও বলা হয়েছে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কার্যকর করতে হবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নীতি।

পাশাপাশি কমাতে হবে ঋণঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা না গেলে মিজানের মতো শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কাজ পাওয়া ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে।