ট্যাক্সি ড্রাইভার-এর অর্ধ শতাব্দীতে ট্র্যাভিস বিকলের নিঃসঙ্গ চোখ ও ঢাকার যানজট

ট্যক্সি ড্রাইভার স্রেফ আরও একটি সিনেমা নয়, সতর্কবাণীও। পঞ্চাশ বছর পরেও স্করসেসির সিনেমা প্রতিনিয়তই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে যদি মানুষ না থাকে, যদি সমবেদনা, সান্নিধ্যই না থাকে, তাহলে “কী ঘর বানাইছি আমরা শূণ্যেরও মাঝার !”

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম

পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের অন্ধকার গলিপথে প্রথম চাকা ঘুরেছিল হলদে রঙা এক ট্যাক্সি’র। স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন ক্ষুরধার অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো, আর নেপথ্যে তরুণ ইতালীয়-আমেরিকান পরিচালক মার্টিন স্করসেসি।

নোনা-শ্যাঁওলা ধরা দেওয়ালের ধারে, রাতের নিয়ন আলোয় চিনেছিলেম ট্র্যাভিস বিকলকে — 'গডস লোননি ম্যান', ঈশ্বরের নিঃসঙ্গ বান্দা।

অনন্য সেই সিনেম্যাটিক জার্নির সুবর্ণ জয়ন্তীতে বিশ্বজুড়ে সিনেফাইলরা মাতছেন ট্র্যাভিসের সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘ইউ টকিং টু মি’ নিয়ে, আর আমি বারে বারে ফিরে যাচ্ছি গেল সপ্তাহের মরা এক বিকেলের কাছে।

ক্যাওসে অন্তলীন ক্যাকোফোনিতে স্তব্ধ এক সন্ধ্যা। দেড় ঘণ্টা ধরে স্থবির হয়ে আছে সিগন্যাল। আর আমার উবার ড্রাইভার, মধ্যবয়সী মানুষটি স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে একদৃষ্টিতে সামনের লাল আলোটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

রেডিওতে কোন গান বাজছে না, ফোনে কোনো স্ক্রল নেই। জীবন নামের মানুষটি স্রেফ তাকিয়ে আছেন। আয়নায় তার চোখ দুটো দেখে আমার হুট করে মনে হলো, এই চোখ আমি কোথায় যেন দেখেছি। খুব চেনা। মুহূর্তেই মনে পড়লো।

আরে এ তো সেই ট্র্যাভিস বিকলের চোখ!

ঈশ্বরের নিঃসঙ্গ বান্দা: ঢাকা বনাম নিউ ইয়র্ক

১৯৭৬ সালের নিউ ইয়র্ক। মন্দা, অপরাধ আর অন্ধকারে ঘেরা এক শহর। স্করসেসির সিনেমায় তাকে মনে হয়েছিল এক টুকরো নরক।

আর আজকের ঢাকা? আমাদের মেগাসিটি? সে কি নিউ ইয়র্কের মতো অতোখানি অন্ধকার? কিংবা বিপজ্জনক? যান্ত্রিকতায়, দূষণে কি ঢাকার মানুষও অনেকের মধ্যে একা নন?

ট্যাক্সি ড্রাইভার  সিনেমার চালক ছিল প্রোটাগনিস্টের ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে থেকে ফিরে রাতের পর রাত ট্র্যাভিস ঘুমাতে পারতো না। সারা রাত ছাদের কড়িকাঠ গোনার বদলে সে বেছে নেয় ট্যাক্সি চালানোর কাজ।

চারধারের নোংরামো দেখে গা ঘিন ঘিন করে তার। কিন্তু অদ্ভুত কোন এক মায়ায় সেই নরকে ট্র্যাভিস আটকে যায়।

ঢাকার উবার চালক জীবনের সাথে ট্র্যাভিসের এই বিচ্ছিন্নতার মিলটা কোথায়? মিলটা হলো, তারা হাজার হাজার মানুষের সাথে রোজ কথা বলছেন, ভিড়ের মধ্যে গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু দিনশেষে তারা চরম একা।

যানজটের স্থবিরতায় যখন জীবনের ঘড়ি থেমে যায়, তখন তাদের মনের ভেতরেও কি ট্র্যাভিসের মতো কোনো ‘ব্যাড আইডিয়াস’ জন্ম নেয়? তারা কি কখনো ভাবেন যে, ‘কোনো একদিন এক পশলা বৃষ্টি এসে এই শহরের সব আবর্জনা ধুয়ে মুছে দেবে? ’

সেই বিখ্যাত ‘টেলিফোন সিন’ এবং আধুনিক ঢাকা

সম্প্রতি বিবিসির এক প্রবন্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার-এর একটি দৃশ্যের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। ট্র্যাভিস যখন ফোনবুথ থেকে মেয়েটির কাছে ক্ষমা চাইছিল, ক্যামেরা তখন ট্র্যাভিসকে ফেলে পাশের অন্ধকার গলির দিকে এগিয়ে যায়।

স্করসেসি বুঝিয়েছিলেন, ফোনের ওপারে ট্র্যাভিসের প্রত্যাখ্যান এতটাই করুণ যে খোদ ক্যামেরাও সেটা নিতে পারছিল না আর।

আমাদের এই নগরেও রোজ এমন হাজারো ‘অদৃশ্য’ মানুষ তৈরি হচ্ছে। বাসে বা সিগন্যালে আমাদের কাঁচের জানালার ওপাশে যে মানুষটি হাত বাড়িয়ে আছে, কিংবা যে চালকটি আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন, আমরা কি তাদের দিকে ঠিকমতো তাকাই?

নাকি আমরাও স্করসেসির ক্যামেরার মতো মুখ ফিরিয়ে নেই? সযতনে? পঞ্চাশ বছর আগে রাগী-উত্তেজিত স্করসেসি যে নরকের এক ঋতুর ছবি আমাদের দেখিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এসে ঢাকা কি পেরেছে সেই নিউ ইয়র্কের সমান হতে? অসামাজিক বিচ্ছিন্নতায়?

‘হিরো’ তুমি কার?

ট্যাক্সি ড্রাইভারের শেষ দৃশ্য নিয়ে আজও বিতর্ক হয়। উৎসবের রেট্রোস্পেকটিভে, ফিল্ম সোসাইটির টেবিলে, ক্যাফেতে। শেষ বিচারে ট্র্যাভিস কী? খুনি নাকি রক্ষাকর্তা?

রক্তগঙ্গা বইয়ে সে যখন আইরিস নামের কিশোরীকে (জোডি ফস্টার) উদ্ধার করে, সমাজ তাকে বীরের মর্যাদা দেয়। কিন্তু ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখে পরমেশ্বরের মতো আমরাও জানি, ট্র্যাভিসের বীরত্ব আদপে দীর্ঘদিনের চাপা থাকা নিঃসঙ্গতা আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

আজকের দিনে আমরা একে বলি ‘রেডিক্যালাইজেশন’ বা উগ্রপন্থী হয়ে ওঠা। বিচ্ছিন্ন মানুষ যখন সমাজের সাথে তাল মিলাতে পারে না, তখন সে নিজেই নিজের ভেতরে তৈরি করে এক অলীক জগত।

ট্র্যাভিস যেমন নিজেকে ‘এভেঞ্জিং এঞ্জেল’ বা ন্যায়বিচারের দেবদূত মনে করতেন, আজকের দিনে ডিজিটাল দুনিয়ার বহু মানুষও ঠিক একই ‘হিরো কমপ্লেক্স’-এ ভুগছেন। স্করসেসি এবং চিত্রনাট্যকার পল শ্রেডার ৫০ বছর আগেই আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, অবহেলিত একাকীত্ব জন্ম দিতে পারে ভয়ংকর সহিংসতার।

‘রেইন উইল কাম সামডে’

ট্যাক্সি ড্রাইভারের শেষ দিকে ট্র্যাভিসের ডায়েরিতে একটা এন্ট্রি ছিল “একাকীত্ব আমাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। সর্বত্র… সেখান থেকে কোন মুক্তি নেই। আমি ঈশ্বরের নিঃসঙ্গ বান্দা।”

পঞ্চাশ বছর পাড়ি দেওয়া সিনেমাটার কাছে ফিরলে উপলব্ধি হয়, ট্র্যাভিস বিকল আসলে মরেননি। তিনি বেঁচে আছেন বড় বড় শহরগুলোর ট্রাফিক জ্যামে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো পিপ-হোল লাগানো দরজাওয়ালা হাজারো ফ্ল্যাটে। এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের চোখের হতাশায়, ক্লান্তিতে।

ঢাকার সেই উবার চালক জীবনের কাছে ফিরে যাই। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যখন আমি গাড়ি থেকে নামলাম, তিনি শুধু একবার মাথা নেড়ে বিদায় জানালেন। আমার মনে হলো, আমি আর তিনি—দুজনেই দিনশেষে একই হলুদ ট্যাক্সির যাত্রী। পার্থক্য শুধু একটাই, তার ট্যাক্সিতে মিটার আছে, আর আমাদের জীবনের ট্যাক্সিতে জমাখরচের খাতায় থাকে শুধু সময়।

ট্যাক্সি ড্রাইভার, স্রেফ একটি সিনেমা নয়; একটি সতর্কবাণীও। পঞ্চাশ বছর পরেও স্করসেসির সিনেমা প্রতিনিয়তই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে যদি মানুষ না থাকে, যদি সমবেদনা, সান্নিধ্যই না থাকে, তাহলে “কী ঘর বানাইছি আমরা শূণ্যেরও মাঝার!”

ট্র্যাভিস বিকলের হাত আলতো করে রাখা আছে স্টিয়ারিংয়েই। চোখভরা শূন্যতা নিয়ে তিনি আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন, ‘ইউ টকিং টু মি’? “তুমি কি আমার সাথে কথা বলছ?”  

আমরা কি উত্তর দিতে প্রস্তুত?