হাদি হত্যার বিচার থেকে যমুনা সংঘর্ষ: ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন কি নির্বাচনি অস্থিরতার ইঙ্গিত?

হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন নির্বাচন সামনে রেখে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ন্যায্য দাবির পাশাপাশি এই আন্দোলনের সময় ও কৌশল, নির্বাচনি পরিবেশে অস্থিরতা ও সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ইনকিলাব মঞ্চকে ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজপথ। সংগঠনটির আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার বিচার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ারগ্যাস ও জলকামান, সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এই আন্দোলনের সময় বাছাই কি কেবলই কাকতাল, নাকি এর পেছনে আছে বড় কোনো রাজনৈতিক হিসাব।

বিচার চাওয়ার ন্যায্য দাবির আড়ালে নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে কি-না, সে প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। পুরো দেশ এখন নির্বাচনমুখী। সরকারও ব্যস্ত নির্বাচনি আয়োজনে। ভোটগ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগে হাদি হত্যার বিচার চাওয়াকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দানা বেঁধেছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এত অস্থির হয়ে উঠল ইনকিলাব মঞ্চ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শরিফ ওসমান বিন হাদি। নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ই ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডেই তাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা।

চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতালের পর নেওয়া হয় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ই ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান।

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান করছে ইনকিলাব মঞ্চ।

সবশেষ শুক্রবার বিকেলে হাদি হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করার দাবিতে এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাত্রা করেন।

এদিন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকার সামনে পুলিশ জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। বেশ কয়েকজন আহত হন বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

ইনকিলাব মঞ্চের ফেইসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, “জাবের ভাই গুলিবিদ্ধ। জুমা -শান্তাকে বুট দিয়ে পাড়ানো হইছে।” পরে এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

কী বার্তা দিচ্ছে

হাদি হত্যার বিচারকে কেন্দ্র করে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন শুধু একটি ন্যায়বিচারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ নেই বলে মনে করছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তাদের মতে, শাহবাগ ও যমুনাকেন্দ্রিক এই আন্দোলনের কৌশল একদিকে যেমন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই আন্দোলনের ভাষা ও সময় নির্বাচন, কোনো বিশেষ পক্ষের জন্য পরিস্থিতি তৈরি করছে কি না।

গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বার হাসান এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, “হাদি হত্যাকে একটা রাজনৈতিক দল ইস্যু বানিয়েছে। যতটা না তারা হাদি হত্যার বিচার চায় তার থেকে বেশি এই হত্যাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায়।”

গণসংহতির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদও মনে করেন হাদির মৃত্যুকে ঘিরে রাজনীতি করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সেই রাজনীতি হাদি করতেন না বলে মত তার।

তিনি বলেন, “হাদী শহীদ হবার পর তাকে ব্যবহার করে যে রাজনীতি হয়ে চলেছে, তা হাদীর রাজনীতি থেকে চরমভাবেই পৃথক।”

“হাদীকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম দঙ্গলবাজি হয়েছে, গণমাধ্যমে আগুন দেয়া হয়েছে, ভেতরে সাংবাদিকদের রেখে। কয়েকজন মুখচেনা মানুষ রীতিমতো আয়োজন করে যেভাবে এই দঙ্গলবাজি ঘটিয়েছেন, তার সাথে ওসমান হাদী নিজে একমত হতেন, এটা আমি আদৌ বিশ্বাস করি না”, যোগ করেন ফিরোজ আহমেদ।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, “শহিদ ওসমান হাদীর আনুপূর্বিক ঘটনাবলির তদন্তে জাতিসংঘকে যুক্ত করা হবে, এমন প্রস্তাবে আপত্তির কিছু নাই। সকল প্রার্থীরই উচিত একে সমর্থন করা।”

“আমার মনে হয় একটা নিরপেক্ষ তদন্তে হাদীর সাথে খুনী কিভাবে সম্পর্কিত হলেন, খুনীর স্পষ্টত লীগ পরিচয় থাকার পরও এত ঘনিষ্ঠতার সুযোগ পেলেন এবং অবশেষে গ্রেফতারের হাত থেকেও রেহাই পেলেন, এগুলো জানাটা গোটা জাতির জন্যই জরুরি।”

সরকারের শেষ সময়ে এসে তাদের কাছে দাবি জানানো অমূলক বলে মনে করেন রাজনীতি পর্যবেক্ষক ও সিনিয়র সাংবাদিক গাজী নাসিরুদ্দিন খোকন। 
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে ইনকিলাব মঞ্চ একটা চাপ তৈরির চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি আলাপকে বলেন, “তারা সবসময় এমন অবস্থানেই ছিল। শাহবাগ বা যমুনাকেন্দ্রিক একটা প্রেশার তারা সবসময়ই রাখতে চেয়েছে।”

সাংবাদিক আমিন আল রশীদ বলেন, ওসমান হাদি হত্যার বিচার তো সবাই চায়। কিন্তু বিচারের দাবি জানাতে গিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা কাম্য নয়। 
নির্বাচনের কিছুদিন আগে এমন ঘটনাকে ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ বলে মন্তব্য করেছেন  দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। আলাপকে তিনি বলেন, “আগে সচিবালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় এমন দাবিকে মব বলা হয়েছে, যা আসলে দুর্বল উদাহরণ। নীরব প্রতিবাদ সবচেয়ে ভালো প্রতিবাদ হতে পারতো।”

তিনি মনে করেন, “আমাদের সহ্য ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একটু ধৈর্যশীল হলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো যেত।”

তবে রাজনীতি পর্যবেক্ষক শুভ কিবরিয়া বলছেন, এই আন্দোলন চলমান ছিল, এবং শুক্রবারের ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা।

আলাপকে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের দাবি বাস্তবায়নের পক্ষেই ছিল বলে মনে হয়েছে। এমন হতে পারে যে যেহেতু সময় হয়ে গেছে, সুতরাং  সামনে এনে ইস্যুটাকে জিইয়ে রাখা।”

নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা?

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে, রাজপথের এমন সংঘাত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, নির্বাচনের ঠিক আগে ধারাবাহিক আন্দোলন ও সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কেউ কেউ এটিকে নির্বাচন পেছানোর চাপ তৈরির সম্ভাব্য কৌশল হিসেবেও দেখছেন, যদিও ইনকিলাব মঞ্চ সরাসরি তা অস্বীকার করেছে।

গবেষক মুবাশ্বার হাসান বলছেন, “আমি অবশ্যই আমার ভাই হাদি হত্যার বিচার চাই। এই বিচার করতেই হবে। তবে এই বিচার কেন্দ্র করে সকল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে না বলতে হবে, সবার আগে বাংলাদেশ।”

গণসংহতির ফিরোজ আহমেদ বলেন, “নির্বাচন বানচাল বা পেছাবার কোন সুযোগ কাউকে দেয়াটা ভয়াবহ ভুল হবে। নির্বাচন যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হবার সাথে হাদীর তদন্তের কোন বিরোধ নেই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যেন জাতীয় জীবনে কোন বিপর্যয় ডেকে না নিয়ে আসে।”

নির্বাচনের কয়েকদিন আগে এমন ঘটনা সন্দেহ তৈরি করছে বলে মনে করছেন গাজী নাসিরুদ্দিন আহমেদ। আলাপকে তিনি বলেন, “তথ্য ছাড়া তো বলা যাবে না এটাতে ষড়যন্ত্র আছে কি না, কিন্তু এই যেই সময়ে ঘটনা ঘটলো তাতে সন্দেহ করার সুযোগ আছে।”

তবে এটি নির্বাচন প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা হতেও পারে বলে মনে করেন শুভ কিবরিয়া। তিনি বলেন, “সামনে যেহেতু নির্বাচন। সব পক্ষই খেলছে।”
তবে পুলিশের আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক। তিনি বলছেন, পুলিশ কেনইবা তাদের কাছে যেতে দিল, আবার কাছাকাছি যাওয়ার পর চড়াও হলো তা বোধগম্য নয়।

“একজনকে পেটানোর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ছেলেটা নীরব প্রতিবাদ করছিল। সেটা ভবিষ্যতে আন্দোলনের নতুন একটা ডাইমেনশন তৈরি করতে পারে”, যোগ করেন শুভ কিবরিয়া।

ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রমে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন আমিন আল রশীদ। তিনি বলেন, “যারা ভাবছিল নির্বাচন স্মুথ হবে, তাদের মনে তো একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যারা নির্বাচন চায় না, তাদের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে ইনকিলাব মঞ্চ।”

তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে অনেকগুলো পাওয়ার হাউজ তৈরি হয়েছে ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে থেকে। নির্বাচনের পরে যদি তারা ছিটকে যায়, এমন শঙ্কা থেকে তারা নির্বাচন নাও চাইতে পারে।”

তবে ইনকিলাব মঞ্চ থেকে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, “নির্বাচন ১২ তারিখেই হবে। নির্বাচন হতেই হবে। কোনভাবেই নির্বাচন বানচাল করতে দেওয়া হবে না।”

সংগঠনটির দাবি, তাদের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ঢুকে পড়েছিল এবং সেজন্য তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।