কনডম থেকে গার্মেন্টস, চিপ থেকে প্লাস্টিক, তেল থেকে সার- হরমুজের ধাক্কায় লণ্ডভণ্ড
একটি সরু সামুদ্রিক রুটের অস্থিরতা এখন ঢাকার রান্নাঘর, টোকিওর কেমিক্যাল কারখানা, মালয়েশিয়ার কনডম শিল্প, ভারতের সার বাজার, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন, ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজার এবং লন্ডনের ব্যাংকিং খাতকে কীভাবে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০৯:৪৭ এএমআপডেট : ১২ মে ২০২৬, ১০:০৬ এএম
ঢাকার রান্নাঘরে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে, কনডম ও মেডিকেল গ্লাভসের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে দিল্লি-মালয়েশিয়ায়, তাইওয়ানে সমস্যা বাড়ছে চিপ উৎপাদনে, টোকিওতে কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে আর ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগকারীরা বড় বড় কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ঝুঁকছেন সোনায়।
ঘটনাগুলো আপনার কাছে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ বলছে, এগুলো সব এক সূত্রে গাঁথা। আর তা হলো হরমুজ প্রণালি।
সহজ করে বললে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়ার অর্থ এখন শুধু জ্বালানির দাম বাড়া নয়; এটি নাড়িয়ে দিচ্ছে- বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন, ব্যাংক, বিমা, সার, খাদ্যসহ পুরো আর্থিক বাজারকেই।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার যখন সেঞ্চুরি ছাপিয়ে যাচ্ছে তখন বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ পুরোপুরি অচল হলে তেলের দাম ছাপিয়ে যতে পারে ১৫০ ডলারও।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানির এই রুটে ঝামেলা বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে ধারা করছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া একটি সামুদ্রিক রুটের সংকটে বদলে যাচ্ছে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির সমীকরন।
সার ও খাদ্যশিল্পে নতুন সংকট
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব সালফার ও অ্যামোনিয়া সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। সালফার থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং সেখান থেকে ফসফেট সার তৈরি হয়।
ফলে হরমুজে জট তৈরি হওয়া মানেই সার শিল্পে সরাসরি ধাক্কা।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হওয়া মোট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে জানিয়ে সতর্ক করা হয়েছে, সার সরবরাহ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলে বিশ্ব খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়বে।
রয়টার্সের প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় ৩০% হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া।
ব্যাংক অফ আমেরিকা সতর্ক করেছে যে, এই সংঘাত বিশ্বের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহের ওপর হুমকি সৃষ্টি করেছে এবং এর দাম ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, সার সংকটে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুতরাং, এই সংকট দীর্ঘ হলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং কয়েক মাস পর খাদ্যের বাজারেও বড় চাপ তৈরি হবে।
আর এটাকে শুধু সার সংকট নয়, ভবিষ্যতের খাদ্য মূল্যস্ফীতির সংকেত হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কনডম, মেডিকেল গ্লাভস ও স্বাস্থ্যপণ্য শিল্পেও চাপ
হরমুজ সংকটের অভিঘাত এবার এমন সব খাতেও পড়েছে, যেগুলো সাধারণত মানুষ জ্বালানি সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে না।
বিশ্বের কনডম উৎপাদনে ব্যবহৃত সিনথেটিক ল্যাটেক্স, লুব্রিকেন্ট, প্যাকেজিং ফিল্ম, পলিমার ও রাসায়নিক উপাদানের বড় অংশ পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।
দ্য গার্ডিয়ানের ৯ই মে’র প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহে ধাক্কা লাগায় এশিয়ার স্বাস্থ্যপণ্য শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় কনডম ও মেডিকেল গ্লাভস উৎপাদক। যদিও প্রাকৃতিক রাবার স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়, কিন্তু উৎপাদনে ব্যবহৃত বহু রাসায়নিক ও প্যাকেজিং উপাদান আমদানিনির্ভর। যেটা মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর।
ভারতের কনডম বাজার বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউনিটের বেশি বলে শিল্প বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
যে বাজারে রয়েছে ম্যানকাইন্ড, কিউপিড লিমিটেড, রেকিট (ডিউরেক্স), এইচএলএল লাইফকেয়ারের মতো কোম্পানি।
ভারতের অল ইন্ডিয়া রবার ইন্ডাট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, সিনথেটিক রাবার ও পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকলে মেডিকেল ও রাবারভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে।
রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এর মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পেট্রোকেমিক্যাল বিশ্লেষণে বলা হয়, ন্যাফথা ও পলিমারের দাম বাড়ায় দ্রুত বেড়েছে স্বাস্থ্যপণ্য উৎপাদকদের ব্যয়।
প্লাস্টিক ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বড় ধাক্কা
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাতগুলোর একটি এখন পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে দেখা যাচ্ছে।
রয়টার্স ২৬এ মার্চ ২০২৬–এর প্রতিবেদনে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব পলিথিন রপ্তানির ৪০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রস্তুত পণ্যে কোনো না কোনোভাবে পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান রয়েছে।
অর্থাৎ প্লাস্টিক, মোবাইল ফোন, গাড়ি, আসবাবপত্র, প্যাকেজিং, মেডিকেল সরঞ্জাম সবকিছুর উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের আরেকটি প্রতিবেদন জানায়, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদকরা বিকল্প ন্যাফথা সরবরাহ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
আবার এশিয়ার ন্যাফথা আমদানির ৬০-৭০ শতাংশ হরমুজ রুটনির্ভর বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এতে দক্ষিণ কোরিয়ার এলজি কেম, লট্টে কেমিক্যাল ও এসকে এনার্জির মতো কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বড় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি চান্দ্রা আসরি রয়টার্সকে এমন তথ্যই জানিয়েছে।
চিপ ও প্রযুক্তি শিল্পে উদ্বেগ
ডিসিএসসি নামের একটি ইন্ডাস্ট্রি প্ল্যাটফর্মে এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের চিপ শিল্প জ্বালানি ও শিল্প গ্যাস সরবরাহের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
হরমুজ হয়ে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ উৎপাদন অঞ্চল হওয়ায় এর প্রভাব মোবাইল ফোন, ডেটাসেন্টার, এআই চিপ ও ইলেকট্রনিকস বাজারেও পড়তে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট চালাতে একটি ছোট শহরের সমান বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এই শিল্পের উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে হরমুজ সংকট চিপ ও প্রযুক্তি শিল্পে তিনটি প্রধান প্রভাব তৈরি করছে- জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং লজিস্টিক ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি।
এর ফলাফল হিসেবে পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পে চাপ
বিশ্বের পোশাকশিল্পও এই সংকটের বাইরে নেই।
পলিয়েস্টার, স্প্যানডেক্স, নাইলন ও বিভিন্ন সিনথেটিক ফাইবার পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক। ফলে ন্যাফথা ও পলিমারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেক্সটাইল শিল্পে।
জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, সার ও বৈশ্বিক কমোডিটি বাজারসংক্রান্ত তথ্য, বিশ্লেষণ ও মূল্য নির্ধারণকারী আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও ডেটা প্রতিষ্ঠান আইসিআইএস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পলিয়েস্টার ও শিল্প ফাইবারের দাম দ্রুত বাড়ছে। যার ফলে চাপ বাড়ছে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের বিশ্বের বড় পোশাক উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদনে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ দেশের বড় অংশের সিনথেটিক সুতা ও ডাইং কেমিক্যাল আমদানিনির্ভর।
সহজ করে বললে, বাংলাদেশে ডাইং কেমিক্যালের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংই আমদানিনির্ভর। সিনথেটিক সুতা ও ফ্যাব্রিকের বড় অংশও বিদেশ থেকে আসে ফলে আরএমজি সেক্টর বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ঝুঁকির মধ্যে আছে।
এভিয়েশন ও শিপিং শিল্পে ব্যয় বিস্ফোরণ
হরমুজের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের দামই বাড়েনি, এটা পুরো এশিয়াকেই চাপে রেখেছে।
রয়টার্সের ৭ই মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় জেট ফুয়েল রপ্তানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
এপ্রিল মাসে জেট ফুয়েল রপ্তানি দাঁড়ায় মাত্র ৫ লাখ ৯৬ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনে, যা ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন।
এর ফলে বিমান ভাড়া, কার্গো ব্যয় ও আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সংকটে মেরিন ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। কারণ এখন প্রতিটি ট্যাংকার যাত্রা যুদ্ধ ঝুঁকির হিসাব কষে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
ব্যাংক, বিমা ও শেয়ারবাজারে আতঙ্ক
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বাধা শুধু জ্বালানি সংকটই তৈরি করবে না, বরং তা বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে।
জ্বালানি ও শিপিং খাতে যে সব আন্তর্জাতিক ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, তারা এখন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক ন্যাটওয়েস্ট।
তারা বলছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের প্রায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন, পরিবহন ও শিল্প কোম্পানিগুলোর শেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
এর কারণ হিসাবে দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
বিশ্ব কি এখন নতুন অর্থনৈতিক যুগে
বর্তমান বাজার এখন কার্যত হেডলাইন ড্রিভেন হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাত বাড়ার খবর এলে বাজার পড়ে যাচ্ছে, আর যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত মিললে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের এপ্রিল ২০২৬ এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বলেছে, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভূরাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি অর্থনৈতিক নীতিকে বদলে দিচ্ছে।
সতর্ক করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
শুধু তাই নয়, অত্যন্ত সংকটময় পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়ে আইএমএফ বলছে, বিশ্ব কার্যত নতুন এক বৈশ্বিক মন্দার কাছাকাছি চলে যেতে পারে।
আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা রয়টার্সকে বলেন, “যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।”
শুধু তাই নয় আইএমএফ সতর্ক করছে, যদি সংকট দীর্ঘ হয়, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত মন্দার দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে পারে।
কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটের পর এবার হরমুজ দেখিয়ে দিল, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর।
একটি সরু সামুদ্রিক রুটের অস্থিরতা এখন ঢাকার রান্নাঘর, টোকিওর কেমিক্যাল কারখানা, মালয়েশিয়ার কনডম শিল্প, ভারতের সার বাজার, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন, ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজার এবং লন্ডনের ব্যাংকিং খাতকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।
আর সেই কারণেই হরমুজের আগুন এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়- এটি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় সতর্কসংকেত।
কনডম থেকে গার্মেন্টস, চিপ থেকে প্লাস্টিক, তেল থেকে সার- হরমুজের ধাক্কায় লণ্ডভণ্ড
একটি সরু সামুদ্রিক রুটের অস্থিরতা এখন ঢাকার রান্নাঘর, টোকিওর কেমিক্যাল কারখানা, মালয়েশিয়ার কনডম শিল্প, ভারতের সার বাজার, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন, ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজার এবং লন্ডনের ব্যাংকিং খাতকে কীভাবে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে?
ঢাকার রান্নাঘরে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে, কনডম ও মেডিকেল গ্লাভসের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে দিল্লি-মালয়েশিয়ায়, তাইওয়ানে সমস্যা বাড়ছে চিপ উৎপাদনে, টোকিওতে কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে আর ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগকারীরা বড় বড় কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ঝুঁকছেন সোনায়।
ঘটনাগুলো আপনার কাছে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ বলছে, এগুলো সব এক সূত্রে গাঁথা। আর তা হলো হরমুজ প্রণালি।
সহজ করে বললে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়ার অর্থ এখন শুধু জ্বালানির দাম বাড়া নয়; এটি নাড়িয়ে দিচ্ছে- বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন, ব্যাংক, বিমা, সার, খাদ্যসহ পুরো আর্থিক বাজারকেই।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার যখন সেঞ্চুরি ছাপিয়ে যাচ্ছে তখন বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ পুরোপুরি অচল হলে তেলের দাম ছাপিয়ে যতে পারে ১৫০ ডলারও।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানির এই রুটে ঝামেলা বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে ধারা করছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া একটি সামুদ্রিক রুটের সংকটে বদলে যাচ্ছে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির সমীকরন।
সার ও খাদ্যশিল্পে নতুন সংকট
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব সালফার ও অ্যামোনিয়া সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। সালফার থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড এবং সেখান থেকে ফসফেট সার তৈরি হয়।
ফলে হরমুজে জট তৈরি হওয়া মানেই সার শিল্পে সরাসরি ধাক্কা।
ফোর্বসের প্রতিবেদন বলছে, হরমুজে চলমান সংকট বৈশ্বিক সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় প্রভাবে ফেলতে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হওয়া মোট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে জানিয়ে সতর্ক করা হয়েছে, সার সরবরাহ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলে বিশ্ব খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়বে।
রয়টার্সের প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় ৩০% হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া।
ব্যাংক অফ আমেরিকা সতর্ক করেছে যে, এই সংঘাত বিশ্বের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহের ওপর হুমকি সৃষ্টি করেছে এবং এর দাম ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, সার সংকটে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুতরাং, এই সংকট দীর্ঘ হলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং কয়েক মাস পর খাদ্যের বাজারেও বড় চাপ তৈরি হবে।
আর এটাকে শুধু সার সংকট নয়, ভবিষ্যতের খাদ্য মূল্যস্ফীতির সংকেত হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কনডম, মেডিকেল গ্লাভস ও স্বাস্থ্যপণ্য শিল্পেও চাপ
হরমুজ সংকটের অভিঘাত এবার এমন সব খাতেও পড়েছে, যেগুলো সাধারণত মানুষ জ্বালানি সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে না।
বিশ্বের কনডম উৎপাদনে ব্যবহৃত সিনথেটিক ল্যাটেক্স, লুব্রিকেন্ট, প্যাকেজিং ফিল্ম, পলিমার ও রাসায়নিক উপাদানের বড় অংশ পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।
দ্য গার্ডিয়ানের ৯ই মে’র প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহে ধাক্কা লাগায় এশিয়ার স্বাস্থ্যপণ্য শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় কনডম ও মেডিকেল গ্লাভস উৎপাদক। যদিও প্রাকৃতিক রাবার স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়, কিন্তু উৎপাদনে ব্যবহৃত বহু রাসায়নিক ও প্যাকেজিং উপাদান আমদানিনির্ভর। যেটা মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর।
ভারতের কনডম বাজার বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউনিটের বেশি বলে শিল্প বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
যে বাজারে রয়েছে ম্যানকাইন্ড, কিউপিড লিমিটেড, রেকিট (ডিউরেক্স), এইচএলএল লাইফকেয়ারের মতো কোম্পানি।
ভারতের অল ইন্ডিয়া রবার ইন্ডাট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, সিনথেটিক রাবার ও পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকলে মেডিকেল ও রাবারভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে।
রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এর মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পেট্রোকেমিক্যাল বিশ্লেষণে বলা হয়, ন্যাফথা ও পলিমারের দাম বাড়ায় দ্রুত বেড়েছে স্বাস্থ্যপণ্য উৎপাদকদের ব্যয়।
প্লাস্টিক ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বড় ধাক্কা
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাতগুলোর একটি এখন পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে দেখা যাচ্ছে।
রয়টার্স ২৬এ মার্চ ২০২৬–এর প্রতিবেদনে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব পলিথিন রপ্তানির ৪০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণে বলা হয়, বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রস্তুত পণ্যে কোনো না কোনোভাবে পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান রয়েছে।
অর্থাৎ প্লাস্টিক, মোবাইল ফোন, গাড়ি, আসবাবপত্র, প্যাকেজিং, মেডিকেল সরঞ্জাম সবকিছুর উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের আরেকটি প্রতিবেদন জানায়, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদকরা বিকল্প ন্যাফথা সরবরাহ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
আবার এশিয়ার ন্যাফথা আমদানির ৬০-৭০ শতাংশ হরমুজ রুটনির্ভর বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এতে দক্ষিণ কোরিয়ার এলজি কেম, লট্টে কেমিক্যাল ও এসকে এনার্জির মতো কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বড় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি চান্দ্রা আসরি রয়টার্সকে এমন তথ্যই জানিয়েছে।
চিপ ও প্রযুক্তি শিল্পে উদ্বেগ
ডিসিএসসি নামের একটি ইন্ডাস্ট্রি প্ল্যাটফর্মে এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের চিপ শিল্প জ্বালানি ও শিল্প গ্যাস সরবরাহের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
হরমুজ হয়ে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ উৎপাদন অঞ্চল হওয়ায় এর প্রভাব মোবাইল ফোন, ডেটাসেন্টার, এআই চিপ ও ইলেকট্রনিকস বাজারেও পড়তে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির শিল্প বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট চালাতে একটি ছোট শহরের সমান বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এই শিল্পের উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে হরমুজ সংকট চিপ ও প্রযুক্তি শিল্পে তিনটি প্রধান প্রভাব তৈরি করছে- জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং লজিস্টিক ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধি।
এর ফলাফল হিসেবে পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পে চাপ
বিশ্বের পোশাকশিল্পও এই সংকটের বাইরে নেই।
পলিয়েস্টার, স্প্যানডেক্স, নাইলন ও বিভিন্ন সিনথেটিক ফাইবার পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক। ফলে ন্যাফথা ও পলিমারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেক্সটাইল শিল্পে।
জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, সার ও বৈশ্বিক কমোডিটি বাজারসংক্রান্ত তথ্য, বিশ্লেষণ ও মূল্য নির্ধারণকারী আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও ডেটা প্রতিষ্ঠান আইসিআইএস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পলিয়েস্টার ও শিল্প ফাইবারের দাম দ্রুত বাড়ছে। যার ফলে চাপ বাড়ছে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতের বিশ্বের বড় পোশাক উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদনে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ দেশের বড় অংশের সিনথেটিক সুতা ও ডাইং কেমিক্যাল আমদানিনির্ভর।
সহজ করে বললে, বাংলাদেশে ডাইং কেমিক্যালের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংই আমদানিনির্ভর। সিনথেটিক সুতা ও ফ্যাব্রিকের বড় অংশও বিদেশ থেকে আসে ফলে আরএমজি সেক্টর বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ঝুঁকির মধ্যে আছে।
এভিয়েশন ও শিপিং শিল্পে ব্যয় বিস্ফোরণ
হরমুজের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের দামই বাড়েনি, এটা পুরো এশিয়াকেই চাপে রেখেছে।
রয়টার্সের ৭ই মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় জেট ফুয়েল রপ্তানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
এপ্রিল মাসে জেট ফুয়েল রপ্তানি দাঁড়ায় মাত্র ৫ লাখ ৯৬ হাজার ব্যারেল প্রতিদিনে, যা ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন।
এর ফলে বিমান ভাড়া, কার্গো ব্যয় ও আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সংকটে মেরিন ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। কারণ এখন প্রতিটি ট্যাংকার যাত্রা যুদ্ধ ঝুঁকির হিসাব কষে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
ব্যাংক, বিমা ও শেয়ারবাজারে আতঙ্ক
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বাধা শুধু জ্বালানি সংকটই তৈরি করবে না, বরং তা বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে।
জ্বালানি ও শিপিং খাতে যে সব আন্তর্জাতিক ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, তারা এখন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক ন্যাটওয়েস্ট।
তারা বলছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের প্রায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত আর্থিক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন, পরিবহন ও শিল্প কোম্পানিগুলোর শেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
এর কারণ হিসাবে দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
বিশ্ব কি এখন নতুন অর্থনৈতিক যুগে
বর্তমান বাজার এখন কার্যত হেডলাইন ড্রিভেন হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাত বাড়ার খবর এলে বাজার পড়ে যাচ্ছে, আর যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত মিললে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের এপ্রিল ২০২৬ এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বলেছে, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভূরাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি অর্থনৈতিক নীতিকে বদলে দিচ্ছে।
সতর্ক করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
শুধু তাই নয়, অত্যন্ত সংকটময় পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়ে আইএমএফ বলছে, বিশ্ব কার্যত নতুন এক বৈশ্বিক মন্দার কাছাকাছি চলে যেতে পারে।
আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা রয়টার্সকে বলেন, “যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।”
শুধু তাই নয় আইএমএফ সতর্ক করছে, যদি সংকট দীর্ঘ হয়, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত মন্দার দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে পারে।
কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটের পর এবার হরমুজ দেখিয়ে দিল, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর।
একটি সরু সামুদ্রিক রুটের অস্থিরতা এখন ঢাকার রান্নাঘর, টোকিওর কেমিক্যাল কারখানা, মালয়েশিয়ার কনডম শিল্প, ভারতের সার বাজার, তাইওয়ানের চিপ উৎপাদন, ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজার এবং লন্ডনের ব্যাংকিং খাতকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।
আর সেই কারণেই হরমুজের আগুন এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়- এটি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় সতর্কসংকেত।