তেল ও গ্যাসের পর বিদ্যুত বিলের বাড়তি চাপ আসছে

জ্বালানি তেল, এলপিজি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপের মধ্যে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার বলছে, ভর্তুকির চাপ সামলাতে এই উদ্যোগ জরুরি। তবে ভোক্তা, ব্যবসায়ী অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা, এর প্রভাব পড়বে বাজার থেকে শিল্প উৎপাদন সর্বত্র। সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করতে হবে মধ্যবিত্ত নিম্ন আয়ের মানুষকেই।

আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

মাসের বাজার করতে গিয়ে এখন আর তালিকা মেলাতে পারেন না নাজমুন নাহার। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন সেটি চার-পাঁচ দিনেই শেষ হয়ে যায়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ বেড়েছে, তার প্রভাব পড়েছে সবজির দাম থেকে মাছ-মাংস পর্যন্ত প্রায় সবকিছুর ওপর।

বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় এলপিজি ব্যবহার করেন তিনি। সেই খরচও বেড়েছে কয়েক দফায়। এরপর সয়াবিন তেল।

এখন নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে বিদ্যুতের বিল নিয়ে।

“বাচ্চাদের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, বাজার - সব মিলিয়ে এমনিতেই টিকে থাকা কঠিন। এখন যদি বিদ্যুতের বিলও কয়েকশ টাকা বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যাবে,” আলাপ-কে বলেন ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুন নাহার।

চিন্তা শুধু গৃহস্থদেরই নয়, কারখানার মালিকরাও শঙ্কিত হচ্ছেন।

“জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ সামলাতে না পেরে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে,” বলছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম।

“মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি খরচ বেড়েছে। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে খরচ আরও বাড়বে। এতে নিশ্চিতভাবেই আরও অনেক কারখানা চাপে পড়বে,” আলাপ-কে বলেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ছোট ব্যবসায়ী ও বড় কারখানা মালিক- সবাই যখন জ্বালানি তেল, এলপিজি ও সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাড়তি খরচের নতুন হিসাব কষছেন, তখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর যে প্রস্তাব, তা বাস্তবায়ন করা হলে নতুন করে চাপ বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেন, “তেল, গ্যাসের দাম ইতোমধ্যেই বাড়ানো হয়েছে। এখন ভর্তুকির দোহাই দিয়ে বিদ্যুতের খরচও হয়তো বাড়ানো হবে।”

কার কত প্রস্তাব, কার্যকর কবে

পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসিতে) প্রস্তাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

পাইকারির সঙ্গে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে দাম।

নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

আর সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে বিতরণ সংস্থার কাছে বিদ্যুত সরবরাহ করা পিজিসিবি প্রতি ইউনিটের জন্য সঞ্চালন চার্জ নেয়।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, “কিছু প্রস্তাব আমাদের কাছে এসেছে মাত্র। এখনো কমপ্লিট না। কারণ সবগুলো বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব এখনো আমরা পাইনি।”

তিনি জানান, প্রস্তাব পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী কারিগরি কমিটি সেটি যাচাই-বাছাই করবে। এরপর গণশুনানির নোটিশ দিয়ে শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত হবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের যুক্তি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ভর্তুকির চাপ

কতটা ভর্তুকি, কতটা ব্যবস্থাপনা সংকট

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের যুক্তি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ভর্তুকির চাপ।

পরিসংখ্যান বলছে, বছরে ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুত সরবরাহ করে পিডিবি।

দেড় টাকা বাড়লে বছরে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করতে পারবে তারা। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে বছরে বাড়তি আয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যুত উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ।

বর্তমানে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদনে ব্যয় করছে প্রায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু পাইকারি পর্যায়ে সেটি বিক্রি করা হচ্ছে ৭ টাকায়। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সাড়ে পাঁচ টাকার মতো।

বিদ্যুত বিভাগ বলছে, এই ভর্তুকি টিকিয়ে রাখা এখন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুত খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর তা ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

লাইফলাইন গ্রাহকদের বাইরে রেখে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে নতুন ট্যারিফ নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে সাধারণত যারা মাসে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুত ব্যবহার করেন, তারা লাইফলাইন গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত হন।

এখন গ্রাহকের কাছ ইউনিট ভেদে বিদ্যুতের দাম যথাক্রমে, ০-৫০ ইউনিট ৪ দশমিক ৬৩ টাকা, ৫১-৭৫ ইউনিট ৫ দশমিক ২৬ টাকা, ৭৬-২০০ ইউনিট ৭ দশমিক ২০ টাকা, ২০১-৩০০ ইউনিট ৭ দশমিক ৫৯ টাকা, ৩০১-৪০০ ইউনিট ৮ দশমিক ০২ টাকা, ৪০১-৬০০ ইউনিট ১২ দশমিক ৬৭ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ১৪ দশমিক ৬১ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
তবে এই দামের সঙ্গে ডিমান্ড বা সার্ভিস চার্জ, ৫ ভাগ হারে ভ্যাট এবং মিটার ভাড়া জমা দিতে হয়।

“ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানোর অজুহাত পুরোনো। মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়,” বলে মনে করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।

তিনি বলেন, “কিন্তু বিদ্যুত উৎপাদনে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বাড়তি কিছু খরচ আছে। প্রায় ৪০ শতাংশের এই বাড়তি খরচ কমানো গেলেই ভর্তুকি কমিয়ে আনা সম্ভব।”

জ্বালানি সংকট থেকে মূল্যবৃদ্ধির চক্র

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি আলাপ-কে বলেন, “জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামে প্রভাব পড়লে এর প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপটা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।”

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি একটি “চেইন রিঅ্যাকশন”। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পোশাক, খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়বে।

ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামে সমন্বয় করবেন। ফলে আবারও বাড়বে মূল্যস্ফীতি।

তৈরি পোশাক শিল্পও নতুন করে চাপে পড়ার আশঙ্কা

পোশাক শিল্পে নতুন উদ্বেগ

দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও নতুন করে চাপে পড়ার আশঙ্কা দেখছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, “শিল্পখাত এখন একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামলাচ্ছে। এখন আবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে নতুন করে আরও কারখানা ঝুঁকিতে পড়বে।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ইতোমধ্যে কম খরচে উৎপাদনের সুবিধা পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্পখাত আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

বাড়ছে খরচ, কমছে স্বস্তি

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু বিদ্যুতের বিলের নয়, টিকে থাকারও।

কারণ এই বাড়তি খরচের ধাক্কা শুধু মিটারের ঘূর্ণনে আটকে থাকবে না এটি পৌঁছে যাবে রান্নাঘরের হাঁড়িতে, সন্তানের স্কুল ফিতে, কারখানার উৎপাদন লাইনে, এমনকি মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও।

তেল, গ্যাস, এলপিজি, সয়াবিনের পর এবার বিদ্যুত; প্রতিটি নতুন মূল্যবৃদ্ধি যেন মধ্যবিত্তের জীবন থেকে একটু একটু করে স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে।

কারণ মানুষের আয় বাড়েনি, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতে স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরাও। কারণ খরচ বাড়ছে একের পর এক- তেল, গ্যাস, এলপিজি, সয়াবিনের পর এবার আলোচনায় বিদ্যুত।

আর বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে বাসা থেকে কারখানা, বাজার থেকে পরিবহন সবখানে।