প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ০৭:১৭ পিএমআপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
কৃষি বিভাগের হিসাবে, ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন বন্যার শংকাই বাস্তব। কিছুদিন আগেও যেখানে বাতাসে দুলছিল সোনালি ধানের ঢেউ, সেখানে আজ থইথই পানি, ডুবে থাকা জমি আর কৃষকের মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।
“এখনো হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটা বাকি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মাসের ১৫-১৬ তারিখের মধ্যে শেষ করা যাবে”, কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমানের এই কথায় যেমন ছিলো আশা, তেমনি লুকিয়ে ছিলো গভীর শঙ্কাও।
কারণ হাওরের কৃষক জানেন, এখানে সময়ের সঙ্গে লড়াই মানেই ফসলের সঙ্গে লড়াই।
কর্মকর্তাদের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় উঠে এসেছে যে প্রাক-বর্ষার ভারী বৃষ্টি এবং উজানের ঢলের চাপে দেশের অন্যতম বোরো উৎপাদন অঞ্চল বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এতে বাংলাদেশে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধানের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরঘেরা জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষতির খবর দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চয়তার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় ভরসাগুলোর একটি বোরো ধান। এপ্রিল ও মে মাসে কাটা এই ফসল দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ জোগান দেয়।
চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিলো। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ টনেরও বেশি। কিন্তু প্রকৃতির আচমকা আঘাতে সেই হিসাব এখন নতুন করে লিখতে হচ্ছে।
অনেক কৃষক কিছু ধান ঘরে তুলতে পারলেও যেসব জমিতে ফসল কাটার অপেক্ষায় ছিলো, সেগুলোই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও জমিতে পড়ে থাকা পাকা ধান পচতে শুরু করেছে।
কোথায় ক্ষতি বেশি
সংকট এখন শুধু জমিতে নয়, ঘরেও। কাটা ধান শুকানোর মতো রোদ নেই, শ্রমিকের সংকট আছে, আর জলমগ্ন জমিতে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মজুরি বেড়েছে, কিন্তু শ্রমিক মেলেনি। যন্ত্রপাতির অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
কৃষকদের ভাষায়, ধান কাটা শেষ মানেই যুদ্ধ শেষ নয় বরং এখন শুরু হয়েছে ধান বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ। উঠোনে ধান শুকাতে না পারলে মুহূর্তেই নষ্ট হওয়ার শঙ্কা।
ভারী বৃষ্টিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরাই।
সুনামগঞ্জের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক আলাপ-কে বলেন, প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টরে চূড়ান্ত ক্ষতি হয়েছে।
আর কিশোরগঞ্জে ১২ হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, যার মধ্যে ১১ হাজার ১৭৩ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. সাদিকুর রহমান।
আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে আকাশে সূর্যের উপস্থিতি রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছুটা মেঘ দেখা গেলেও সূর্যের দেখা মিলছে। এতে মানুষজন ধান শুকানোর কাজে নেমেছেন। বিশেষ করে, যেসব ধান রোদের অভাবে জমে গিয়েছিল বা নষ্ট হওয়ার অবস্থায় ছিল, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণে এখন তারা বেশি ব্যস্ত।”
এখনো হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ২৮ শতাংশ ধান কাটা বাকি রয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মাসের ১৫ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে বাকি ধান কাটা শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কী প্রভাব পড়তে পারে
এই ক্ষয়ক্ষতির সরাসরি প্রতিফলন পড়তে পারে চালের বাজারে। সরবরাহ কমে গেলে ইতোমধ্যেই চড়া দামের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ সাধারণত নিজস্ব উৎপাদনেই চাহিদা মেটায়। তবে উৎপাদনে ধাক্কা লাগলে বিদেশমুখী হতে হয়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে সেই বাস্তবতা। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশে বন্যা, অতিবৃষ্টি আর আকস্মিক ঢল যেন বারবার ফিরে আসা এক দুঃস্বপ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতা, দ্রুত ফসল কাটার যন্ত্র সহায়তা এবং কৃষকের জন্য জরুরি পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখন আর বিকল্প নয়, প্রয়োজন।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু হাওরের মানুষের চোখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, বাকি যে ৩০ শতাংশ ধান মাঠে দাঁড়িয়ে আছে, তা কি তারা নিজ বাড়িতে উঠাতে পারবে, নাকি পানির গল্পেই হারিয়ে যাবে এবারের মৌসুম?
ভারী বৃষ্টিতে বোরো বিপর্যয়ের ক্ষত বেরিয়ে আসছে
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন বন্যার শংকাই বাস্তব। কিছুদিন আগেও যেখানে বাতাসে দুলছিল সোনালি ধানের ঢেউ, সেখানে আজ থইথই পানি, ডুবে থাকা জমি আর কৃষকের মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।
“এখনো হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটা বাকি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মাসের ১৫-১৬ তারিখের মধ্যে শেষ করা যাবে”, কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমানের এই কথায় যেমন ছিলো আশা, তেমনি লুকিয়ে ছিলো গভীর শঙ্কাও।
কারণ হাওরের কৃষক জানেন, এখানে সময়ের সঙ্গে লড়াই মানেই ফসলের সঙ্গে লড়াই।
কর্মকর্তাদের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় উঠে এসেছে যে প্রাক-বর্ষার ভারী বৃষ্টি এবং উজানের ঢলের চাপে দেশের অন্যতম বোরো উৎপাদন অঞ্চল বড় ধাক্কা খেয়েছে।
এতে বাংলাদেশে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধানের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরঘেরা জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষতির খবর দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চয়তার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় ভরসাগুলোর একটি বোরো ধান। এপ্রিল ও মে মাসে কাটা এই ফসল দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ জোগান দেয়।
চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিলো। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ টনেরও বেশি। কিন্তু প্রকৃতির আচমকা আঘাতে সেই হিসাব এখন নতুন করে লিখতে হচ্ছে।
অনেক কৃষক কিছু ধান ঘরে তুলতে পারলেও যেসব জমিতে ফসল কাটার অপেক্ষায় ছিলো, সেগুলোই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও জমিতে পড়ে থাকা পাকা ধান পচতে শুরু করেছে।
সংকট এখন শুধু জমিতে নয়, ঘরেও। কাটা ধান শুকানোর মতো রোদ নেই, শ্রমিকের সংকট আছে, আর জলমগ্ন জমিতে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মজুরি বেড়েছে, কিন্তু শ্রমিক মেলেনি। যন্ত্রপাতির অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
কৃষকদের ভাষায়, ধান কাটা শেষ মানেই যুদ্ধ শেষ নয় বরং এখন শুরু হয়েছে ধান বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধ। উঠোনে ধান শুকাতে না পারলে মুহূর্তেই নষ্ট হওয়ার শঙ্কা।
ভারী বৃষ্টিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরাই।
সুনামগঞ্জের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক আলাপ-কে বলেন, প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টরে চূড়ান্ত ক্ষতি হয়েছে।
আর কিশোরগঞ্জে ১২ হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, যার মধ্যে ১১ হাজার ১৭৩ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. সাদিকুর রহমান।
আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে আকাশে সূর্যের উপস্থিতি রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছুটা মেঘ দেখা গেলেও সূর্যের দেখা মিলছে। এতে মানুষজন ধান শুকানোর কাজে নেমেছেন। বিশেষ করে, যেসব ধান রোদের অভাবে জমে গিয়েছিল বা নষ্ট হওয়ার অবস্থায় ছিল, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণে এখন তারা বেশি ব্যস্ত।”
এখনো হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ ২৮ শতাংশ ধান কাটা বাকি রয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মাসের ১৫ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে বাকি ধান কাটা শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কী প্রভাব পড়তে পারে
এই ক্ষয়ক্ষতির সরাসরি প্রতিফলন পড়তে পারে চালের বাজারে। সরবরাহ কমে গেলে ইতোমধ্যেই চড়া দামের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ সাধারণত নিজস্ব উৎপাদনেই চাহিদা মেটায়। তবে উৎপাদনে ধাক্কা লাগলে বিদেশমুখী হতে হয়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে সেই বাস্তবতা। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশে বন্যা, অতিবৃষ্টি আর আকস্মিক ঢল যেন বারবার ফিরে আসা এক দুঃস্বপ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতা, দ্রুত ফসল কাটার যন্ত্র সহায়তা এবং কৃষকের জন্য জরুরি পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখন আর বিকল্প নয়, প্রয়োজন।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু হাওরের মানুষের চোখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন, বাকি যে ৩০ শতাংশ ধান মাঠে দাঁড়িয়ে আছে, তা কি তারা নিজ বাড়িতে উঠাতে পারবে, নাকি পানির গল্পেই হারিয়ে যাবে এবারের মৌসুম?