পর্যটক হেনস্তা: বিশ্বজনীন সংকট ও আতিথেয়তার চিরায়ত দর্শন

কেন আধুনিক যুগেও পর্যটকদের হেনস্তার মুখোমুখি হতে হয়? মানুষের এই আক্রমণাত্মক আচরণের পেছনে সমাজতাত্ত্বিক মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো আসলে কী? এই সংকট থেকে উত্তরণে সমাধানই বা কী?

 

আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

কোন পর্যটক যখন অন্য একটি দেশে পা রাখেন, তখন তিনি শুধু একটি ভূখণ্ড বা নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে আসেন না। আসেন একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং স্থানীয় মানুষের জীবনবোধের সাথে পরিচিত হতে। সম্প্রতি নাটোরে দুই টিকটকারের হাতে বিদেশি পর্যটকদের হেনস্তার ঘটনাটি এদেশের আতিথেয়তার ঐতিহ্যকে আরো একবার কলুষিত করেছে। তথাকথিতকন্টেন্টতৈরির নামে বিদেশি পর্যটকদের ব্যক্তিগত পরিসর লঙ্ঘন বিচ্ছিন্ন কোন অপরাধ ছিল না। এটি ছিলো বৃহত্তর বৈশ্বিক সংকটের ক্ষুদ্র এক প্রতিচ্ছবি মাত্র।

আধুনিক পৃথিবীর অনেক দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ পর্যটন। অথচ পর্যটক হেনস্তা বর্তমানে একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার এক প্রতিবেদন বলছে, প্রতি বছর প্রায় থেকে শতাংশ আন্তর্জাতিক পর্যটক কোনো না কোনোভাবে শিকার হচ্ছেন হেনস্তার। আর এই হেনস্তার প্রায় ৩০ শতাংশই ঘটছে ডিজিটাল পরিসরে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে অনেক দেশই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হারিয়েছে দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম গ্রহণযোগ্যতা।

মিশরের পিরামিড সংলগ্ন এলাকায় পর্যটকদের ওপর উট চালক এবং স্থানীয় হকারদের মারমুখী আচরণ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাগুলো বিশ্বব্যাপী কুখ্যাত। লাক্সর গণহত্যা থেকে আধুনিক যুগের স্ক্যামের কারণে বারবার হোঁচট খেয়েছে মিশরের পর্যটন।

অতি রোমান্টিক প্রত্যাশা নিয়ে প্যারিস গিয়ে পর্যটক যখন মুখোমুখি হন ভিড়, অপরিচ্ছন্নতা কিংবা স্থানীয়দের রুক্ষ আচরণের, তখন তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক বিশাল 'কালচার শক' বা সাংস্কৃতিক অভিঘাতের। এই মানসিক ধাক্কা থেকেই জন্ম নেয়প্যারিস সিনড্রমের’।

অতিথি দেবা ভব' বলা ভারতও পিছিয়ে নেই পর্যটক হেনস্তায়। ঝাড়খণ্ডের দুমকায় স্প্যানিশ পর্যটককে গণধর্ষণের ঘটনা ভারতের পর্যটন নিরাপত্তাকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মধ্যপ্রদেশে সুইস নারী পর্যটককে  স্বামীর সামনেই গণধর্ষণের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিল। আর্থিক প্রতারণা বা বিদেশি পর্যটকদের অনুমতি ছাড়াই ছবি তোলা বা ভিডিও করার প্রবণতা ভারতে প্রকট।

পর্যটক হেনস্তার এইসব ঘটনা শুধু একটি দেশের ভাবমূর্তিই নষ্ট করছে না, বাধাগ্রস্থ করছে দেশের পর্যটন খাতের প্রবৃদ্ধিকেও। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল বলছে, পর্যটক নিরাপত্তার অভাব একটি দেশের পর্যটন খাতের প্রবৃদ্ধিকে কমিয়ে দিতে পারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।  

একটি দেশের পর্যটন বিকাশেনিরাপত্তা সুরক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামেরট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স

পর্যটক হেনস্তার মনস্তাত্ত্বিক সমাজতাত্ত্বিক কারণ

কেন মানুষ পর্যটকদের হেনস্তা করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঢুকতে হবে মানব মনের গহীনে। গভীরভাবে দেখতে হবে সমাজের জটিল কাঠামোকে।

দার্শনিক সাহিত্যিক এডওয়ার্ড সাঈদ তার বই 'ওরিয়েন্টালিজমেদেখিয়েছিলেন, কীভাবে মানুষনিজেদেরথেকেভিন্নমানুষকেঅপরহিসেবে গণ্য করে। ভিনদেশি পোশাক বা ভাষায় কথা বলা পর্যটককে অনেক সময় স্থানীয় মানুষ দেখেঅদ্ভুত বস্তুবাভোগের পণ্যহিসেবে। মানুষ হিসেবে না দেখে দেখা হয়অবজেক্টহিসেবে। 

নাটোরে সেই টিকটকারদের কাছে হেনস্তার শিকার সেই পর্যটকের সম্মানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলভিউবালাইক ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদলিয়র এই বিষয়টিকে বলেছেন 'হাইপাররিয়েলিটি' এটি এমন এক অবস্থা যেখানে বাস্তবের চেয়েসিমুলেশনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভার্চুয়াল অস্তিত্বের জন্য বাস্তব মানুষকে অপমান করতেও দ্বিধা করা হয় না।

অনেক সময় পর্যটকদের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণের পেছনে কাজ করে অবদমিত হীনম্মন্যতা। পর্যটকদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা দেখে স্থানীয় নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে এক ধরণের সুপ্ত ক্ষোভ তৈরি হয়। যা প্রকাশিত হয় হেনস্তার মাধ্যমে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জেনোফোবিয়া। 

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ পর্যটকরা প্রধানত আর্থিক প্রতারণার শিকার হন। আর নারী পর্যটকরা শিকার হন যৌন হয়রানি শারীরিক হেনস্তার। সিমন দ্য বোভোয়ার তার 'দ্য সেকেন্ড সেক্স' বইয়ে যে লিঙ্গীয় অসমতার কথা বলেছেন, পর্যটনের ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন ঘটে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় নারী পর্যটকের একা চলাফেরাকে দেখা হয়সহজলভ্যতা প্রতীক হিসেবে।

স্যামুয়েল হান্টিংটন তার 'দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন্স' বইয়ে লিখেছিলেন, আধুনিক বিশ্বে সংঘাতের মূল কারণ হবে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যকার বিরোধ। এই তত্ত্বের প্রয়োগ অনেক সময় পর্যটনের মত ক্ষুদ্র পরিসরেও ঘটে। পর্যটকের পোশাক বা আচরণের পার্থক্যকে স্থানীয় ধর্মীয় বা সামাজিক রীতির সাথে সাংঘর্ষিকতার অজুহাতেও অনেক সময় তাদের হেনস্তা করা হয়।

আতিথেয়তার দর্শন

আতিথেয়তা কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়। প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় দর্শন পর্যন্ত, 'অতিথি' এবং 'আতিথেয়তা'কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে মানবিকতার মাপকাঠি হিসেবে। 

প্রাচীন গ্রিসে আতিথেয়তাকে বলা হতোজেনিয়াজেনিয়াকেবল সৌজন্য ছিল না, ছিল একটি পবিত্র ধর্মীয় বিধান। গ্রিকরা বিশ্বাস করতেন, দেবতারা ছদ্মবেশে যেকোনো সময় মানুষের দরজায় হাজির হতে পারেন। তাই অতিথির সাথে খারাপ ব্যবহার করা মানে স্বয়ং দেবতাদের অসন্তুষ্ট করা।

এই বিশ্বাসের প্রতিরুপ দেখা যায় প্রাচ্যের ধর্ম দর্শনেও। উপমহাদেশে আতিথেয়তাকে পূজা হিসেবে গণ্য করা হতো। উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘অতিথি দেবা ভবঃ অর্থাৎ অতিথি দেবতার ন্যায়। লালন সাঁই বা হাসন রাজার দর্শন বলে, মানুষের ভেতরেই স্রষ্টার বাস। বিদেশি বা অচেনা মানুষটি এমন একজন, যার মধ্যে বাস করে পরমাত্মা।

হোমারের 'ওডিসি' মহাকাব্যে আতিথেয়তাকে দেখানো হয়েছে সভ্য অসভ্য জাতির মধ্যে পার্থক্যের মানদণ্ড হিসেবে। যেখানে অতিথিকে সম্মান করা সভ্য, আর তাদের হেনস্তা করা অসভ্য জাতির পরিচায়ক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'ভারত তীর্থ' কবিতায় লিখেছিলেন, "হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন, শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।

দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তাঁর 'পারপেচুয়াল পিসপ্রবন্ধেকসমোপলিটান রাইটবাবিশ্বনাগরিক অধিকারেরকথা বলেছেন। কান্টের মতে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে অন্য কোনো দেশে গিয়ে হেনস্তার শিকার না হওয়ার। তিনি একে পরোপকার বা করুণা নয়, বরং একটিআইনি অধিকারহিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জাক দেরিদা আতিথেয়তাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। দেরিদার মতে, প্রকৃত আতিথেয়তা হলো সেই অবস্থা যেখানে আগন্তুক কে, কোথা থেকে এসেছেন বা কেন এসেছেন, তা জিজ্ঞাসা না করেই তাকে বরণ করে নেওয়া হয়। 

উত্তরণের পথ: সমাধান প্রস্তাবনা

পর্যটক হেনস্তা রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্যটন এলাকায় সাধারণ পুলিশের চেয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্যুরিস্ট পুলিশ বেশি কার্যকর। তারা বিদেশি ভাষা এবং পর্যটন আইন বিষয়ে দক্ষ হয়। পর্যটন গবেষকদের মতে, হেনস্তার ঘটনায় 'ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট' বা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করলে অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। থাইল্যান্ডে পর্যটন সংক্রান্ত অপরাধের জন্য পৃথক পর্যটন আদালত আছে।

স্মার্ট ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট হেনস্তা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, পর্যটন গন্তব্যে সরকারি 'সেফটি অ্যাপ' থাকা জরুরি। যেখানে জিপিএস ট্র্যাকিং এবং তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকবে। দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়া এই মডেলটি সফলভাবে ব্যবহার করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি অপরাধের হার ৪০ থেকে ৫০ কমিয়ে দেয়।

ইউনেস্কো এবং ইউএনডিপি বিভিন্ন প্রতিবেদনে 'কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমেরওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যখন স্থানীয় জনগণ সরাসরি পর্যটন থেকে লাভবান হন, তখন তারা পর্যটকদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একইসাথে স্থানীয়দের মধ্যে 'ডিজিটাল এথিকস' এবং আতিথেয়তার গুরুত্ব নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা পর্যটক হেনস্তার ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে পারে। 

ইউএনডব্লিউটিওগ্লোবাল কোড অব এথিক্স ফর ট্যুরিজমেকয়েকটি সুনির্দিষ্ট সমাধানের কথা বলা হয়েছে। এসবের মধ্যে আছে পর্যটক স্বাগতিক দেশের জন্য সুস্পষ্ট আচরণবিধি নির্ধারণ করা। পর্যটকদের স্থানীয় আইন, ধর্মীয় রীতি এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগেই অবহিত করা। বড় পর্যটন শহরগুলোতে বেশি হেনস্তার শিকার হওয়া যায়গাগুলোকে 'হটস্পট ম্যাপিং' করে অতিরিক্ত টহল বাড়ানো।

নাটোরে বিদেশি পর্যটকদের সাথে হওয়া সেই আচরণ একটি সতর্কবার্তা। বিশ্বের দরবারে একটি উন্নত সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রতিটি নাগরিককে হতে হবে ণীজ সংস্কৃতির একজন সজাগ প্রতিনিধি।

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন,  "নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো অন্যের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।" নাটোরের সেই ঘটনার অন্ধকার কাটিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে সেই চিরায়ত দর্শনে, যেখানে অতিথি মানেই দেবতা, আর আতিথেয়তাই হলো উপাসনা।