স্থূলতার কারণে যে দেশে গুনতে হয় জরিমানা

বিশ্বজুড়ে স্থূলতা এখন এক নীরব মহামারি। এই মহামারি ঠেকাতে ‘মেটাবো ল’ বলে একটি আইন রয়েছে জাপানে - যার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মোটা হওয়া ঠেকানো।

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৪৫ পিএম

এই শতাব্দির শুরুর দিকে জাপান একটা অপ্রিয় সত্য বুঝতে শুরু করে। দেশটির মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশি ঠিকই, কিন্তু সেই দীর্ঘ জীবনের বড় অংশ তাদের কাটে রোগে ভুগে।

এরপরই প্রশ্নটা আসে - লম্বা জীবন যদি রোগে ভরা হয়, তাহলে লাভটা কোথায়?

এই ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে চালু হয় ‘মেটোবোলিক সিনড্রোম কাউন্টারমেজার্স অ্যাক্ট’ যা পরবর্তীতে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘মেটাবো ল’ নামে। আইনটির লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে স্থূলতার হার ২৫ শতাংশ কমানো।

বিশ্বজুড়ে স্থূলতা এখন এক নীরব মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, ২০২২ সালে পৃথিবীর প্রায় ১৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্থূলতায় ভুগেছে। স্থূলতার কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, টাইপ–২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, এমনকি ক্যান্সারে - তালিকা যেন শেষই হয় না।

বেশিরভাগ দেশ যেখানে এই সমস্যার মোকাবিলায় হাসপাতাল, ওষুধ আর ব্যয়বহুল চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে, সেখানে জাপান নিয়েছিল আইনের আশ্রয়। 

কর্মঠ দেশ, অথচ বসে থাকার ফাঁদ

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দায়িত্ববোধ, নিয়মানুবর্তিতা এসবের কারণে জাপানীরা বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এমন দেশে স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা আইন কেন?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে আধুনিক জীবনের এক বড় বৈপরীত্যে।

অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডেস্কে বসে কাজ করা, ট্রেনে-বাসে যাতায়াত, স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো - মানসিক পরিশ্রম তারা যতটা করে সেই তুলনায় কায়িক শ্রম তাদের নেই বললেই চলে। তাই বাইরে থেকে তাদের অনেক কর্মব্যস্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তাদের নানাবিধ সমস্য তৈরি হয় শুধুমাত্র শারিরীক পরিশ্রম না করার কারণেই। 

কী আছে মেটাবো ল’তে

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর স্ক্রিন-কেন্দ্রিক কাজের আড়ালে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা আধুনিক জাপানের অদৃশ্য সমস্যা।

মেটাবো আইনের কথা শুনে অনেকের মাথায় প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসে, মোটা হলেই কি তবে জেল খাটতে হবে? উত্তর হচ্ছে - না।

এই আইন কোনো শাস্তিমূলক আইন নয়। বরং একে বলা যায় সমাজ আর নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের স্বাস্থ্যচুক্তি। এই আইন অনুযায়ী মোটা হওয়া মানেই অপরাধ নয়, বরং এর মাধ্যমে সরকার নাগরিকদের আগে থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে সতর্ক করে থাকে। 

তবে শাস্তির বিধান একটা আছে, সেই শাস্তি হল জরিমানা। আর এই জরিমানা যিনি নির্ধারিত সীমার চাইতে বেশি মোটা তাকে করা হবে না, করা হবে অন্য আরেকজনকে।

জরিমানা করা হবে আসলে ওই ব্যক্তির কর্মস্থল, স্বাস্থ্য বীমা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনকে। নির্দিষ্ট হারে কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হলে, প্রতিষ্ঠানকেই আর্থিক জরিমানা গুনতে হবে - এটাই মেটাবো ল’য়ের বিধান।

মেটাবো ল অনুযায়ী, দেশের ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। সেখানে প্রতি নাগরিকদের কোমরের মাপ নেওয়া হয়। পুরুষদের জন্য কোমরের মাপ সর্বোচ্চ ৮৫ সেন্টিমিটার বা ৩৩ দশমিক ৫ ইঞ্চি। আর নারীদের জন্য সর্বোচ্চ সীমা ৯০ সেন্টিমিটার বা ৩৪ দশমিক ৪ ইঞ্চি। 

যাদের কোমরের মাপ নির্ধারিত সীমার বেশি, তাদের জন্য থাকে স্থানীয় সরকারের সহায়তামূলক কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জ্ঞান, জীবনযাপন পরিবর্তনের পরামর্শ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সহায়তা।

এই ব্যবস্থার ফল হিসেবে জাপানের বহু প্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে পুষ্টি বিষয়ক কর্মশালা, অফিসভিত্তিক ব্যায়াম, দলগত হাঁটা বা খেলাধুলার কর্মসূচি। কাজ ও জীবনের ভারসাম্য এখানে ধীরে ধীরে নীতিগত বাস্তবতায় রূপ পেয়েছে।

আইনটি চালুর পর সমালোচনাও হয়েছে। কেউ এই আইনকে ব্যক্তিগত জীবনে সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ আশঙ্কা করেছেন শরীরের গঠন নিয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার একটি অংশ এটি। 

তবে সামগ্রিকভাবে জাপানি সমাজ আইনটিকে শাস্তি হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেছে।